sanjib chattopadhyay on raghu rai and his photography | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রঘুর ছবি, আমার লেখা

আমার আর রঘু রাইয়ের যৌথ কাজ ‘ভারতের শেষ ভূখণ্ড’। রঘু আমার বইটাকে ভরিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। আনন্দ পাবলিশার্স জানিয়েছিলেন– সরকারি ছবি তাঁরা নেবেন না। তাঁরাই প্রথম রঘু রাইয়ের নাম আমায় বলেন। তারপর আন্দামান-বিষয়ক সমস্ত ছবি রঘু রাই নিয়ে এসেছিলেন। সেখান থেকে বেছে বেছে ছবি নেওয়া হয়েছিল বইয়ের জন্য। এত যত্ন করে বইটা করা হয়েছিল। যদিও রঘু রাইয়ের ছবি সম্বলিত যে বইটি, সেটি আর পুনর্মুদ্রিত হয়নি। বর্তমানে সে বই অন্য প্রকাশক ছেপেছেন, কিন্তু রঘুর ছবিগুলি সেই বইতে মুদ্রিত হয়নি। খুবই আশ্চর্যজনক! কারণ আমার মনে হয়, ‘ভারতের শেষ ভূখণ্ড’-র প্রথম সংস্করণ যত না লেখার জন্য, তার চেয়েও বেশি করে ছবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সুন্দর।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১৭:৪১   
Facebook WhatsApp Messenger
sanjib chattopadhyay on raghu rai and his photography

চলে যেতে হবেই, উপায় তো নেই। তবু রঘু, রঘু রাই, অসাধারণ একজন মানুষ, আজ চলে গেলেন। চাইলেই তো সকলকে ধরে রাখতে পারি না। আমাদের কেবল স্মৃতি সংরক্ষণের একটা পরম্পরা রয়েছে। রঘু চলে গেলেন, এই যে, আমি তাঁর স্মৃতি ধরে রেখেছি। সেই স্মৃতি, আমি যদি, অন্যকেও দিয়ে যেতে পারি, তবে অস্তিত্বের শিকড়টুকু আরেকটু গভীরে যায়। রঘু রাইদের মতো মানুষ যে-সময়টায় এসেছিলেন, দুঃখের বিষয়, এঁদের সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়টারও ক্রমশ মৃত্যু হয়ে চলেছে। সকলেই ওঁর ছবির কথা বলেন, বলবেন। কিন্তু এমন অসাধারণ একজন মানুষ, তাঁর জীবনের কথাও বলা উচিত। এ নিয়ে একটা বই অন্তত লেখা উচিত। রঘু রাই: নট অনলি এ ফোটোগ্রাফার। হি মাস্ট বি ফটোগ্রাফ্‌ড। রঘু রাই সকলের ছবি তুললেন, তাঁর ছবি কি আমরা তুলে রাখলাম?

zoom
রঘু রাই

সরকারি আমন্ত্রণে আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম আন্দামান। ১৯৭৮ সালের মার্চ মাস। কথা ছিল, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে একজন ফোটোগ্রাফার থাকবেন। যদ্দুর মনে পড়ে, সরকারের পক্ষ থেকে ফোটো তুলতে যিনি গিয়েছিলেন, তাঁর নাম প্রভাতবাবু, পুরো নাম মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। তিনিও চমৎকার মানুষ। ফোটো ডেভলপ করতে গিয়ে তাঁর হাতের আঙুলের একটা অংশ পুড়ে গিয়েছিল। জাহাজে  যাওয়ার সময়ে, আমরা প্রায় একটা মাস ভারত মহাসাগরে কাটিয়েছিলাম। অনেকটা সময়, আড্ডা, গল্প, ঝড়-ঝঞ্ঝা-সাইক্লোন ওই জলযানেই ভাগ করে নিয়েছিলাম সকলে। তারপর যখন ফিরলাম, আনন্দ পাবলিশার্স জানালেন– এই সরকারি ছবিগুলো তাঁরা নেবেন না। তাঁরাই প্রথম রঘু রাইয়ের নাম আমাকে বললেন। বললেন, বইটাকে আরও উন্নত করার জন্য তাঁরা রঘু রাইয়ের ছবি রাখতে চান। তারপর আন্দামান-বিষয়ক সমস্ত ছবি রঘু রাই নিয়ে এসেছিলেন। সেখান থেকে বেছে বেছে ছবি নেওয়া হয়েছিল বইয়ের জন্য। এত যত্ন করে বইটা করা হয়েছিল! এর জন্য আমি সত্যিই প্রকাশকের কাছে কৃতজ্ঞ। যদিও রঘু রাইয়ের ছবি সম্বলিত যে বইটি, সেটি আর পুনর্মুদ্রিত হয়নি। বর্তমানে সে বই অন্য প্রকাশক ছেপেছেন, কিন্তু রঘুর ছবিগুলি সেই বইতে মুদ্রিত হয়নি। খুবই আশ্চর্যজনক! কারণ আমার মনে হয়, ‘ভারতের শেষ ভূখণ্ড’-র প্রথম সংস্করণ যত না লেখার জন্য, তার চেয়েও বেশি করে ছবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সুন্দর। 

আমার মনে হয়, শুধু এই ছবিগুলোর জন্যই রঘু রাইয়ের একখানা সাক্ষাৎকার নেওয়া যেতে পারত। যেভাবে তুলেছেন– এমন এমন জায়গায় গিয়ে, এমনকী, জীবন বিপন্নও করে ছবি তুলেছিলেন রঘু রাই।

zoom
রঘু রাইয়ের তোলা আন্দামানের ছবি

রঘু রাই যখন ছবিগুলো নিয়ে এসেছিলেন, সক্কলে মিলে বসা হয়েছিল। কাজের ব্যাপারে কী গভীর নিমজ্জন তাঁর– আন্দামান, আদিবাসী, বিভিন্ন দ্বীপের ভূগোল ইত্যাদির বাইরে তখন কোনও কথাই প্রায় বলেননি। পরে, সামান্য হাসিঠাট্টা। যদিও কিন্তু নিজের জীবনের কথা কিছুই বলেননি। পারফেক্ট ‘প্রফেশনাল’ বলতে যা বোঝায়। আমি তো ক্যামেরার কিছুই বুঝি না, তাঁর কাছে যে কত রকমের লেন্স ছিল, তা খানিক বোঝার চেষ্টা করেছিলাম ওঁর কাছ থেকেই। বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টার পরে, রঘু মজা করে বলেছিলেন, ‘‘এ আপনার শাস্ত্র নয়। যদি পরেরবার আমি আপনি দু’জনেই ফোটোগ্রাফার হয়ে আসি, তখন না-হয় একসঙ্গে ঘর করা যাবে।”

zoom
রঘু রাইয়ের তোলা আন্দামানের ছবি

অপূর্ব এক মানুষ বিদায় নিলেন। সমস্ত শিল্প মাধ্যমেই তো একটা প্রতিযোগিতা থাকে। ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রে, আমার মনে হয়, সেটা খানিক বেশিই। কিন্তু রঘু রাই, একেবারে স্টিম রোলারের মতো, সবকিছু পিষে দিয়ে চলে যেতে পেরেছিলেন। কারণ তাঁর বিরাট মানবিকতা। ছোটখাটো ব্যাপার তিনি কখনও গায়েই মাখেননি। কখনও কারও সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়েও কাজ করেননি। একটা পর্বত যেমন, নিজের সম্ভ্রান্ত অস্তিত্ব নিয়ে আকাশের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকে– রঘু রাই ছিলেন ঠিক সেইরকম একজন। 

andaman & nicober indian photographer obituary photographer Raghu Rai Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on