Robbar

ট্রফি ফটোগ্রাফ এবং ঔপনিবেশিক বাঘ শিকার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 29, 2026 5:56 pm
  • Updated:July 29, 2026 6:03 pm  

‘ল্যান্টার্ন রিডিংস: টাইগার শুটিং ইন ইন্ডিয়া’ বা হুপারের বাঘ শিকারের ছবিগুলি শুধু শিকার-ইতিহাসের দলিল নয়; এগুলি ঔপনিবেশিক মানসিকতা, প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা এবং বন্যপ্রাণের প্রতি নির্মম উদাসীনতারও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। যে ফোটোগ্রাফ ও দৃশ্যগুলি একসময় বীরত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, আজ সেগুলিকেই আমরা পরিবেশ-ইতিহাসের আলোকে এক গভীর পরিবেশগত বিপর্যয়ের চিহ্ন হিসেবে দেখি।

হিরণ্ময় মাইতি

উইলোবি ওয়ালেস হুপারের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ ওঠে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একদল ডাকাতের হত্যার মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করার জন্য তিনি জবরদস্তি ও নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন! কী করেছেন হুপার? মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মুহূর্তের ছবি তোলার জন্য, ক্যামেরার শাটারের সময়কে তিনি ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলি চালানোর নির্দেশের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। এর ফলে, ফায়ারিং স্কোয়াড গুলি চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কয়েকবার বিলম্ব ঘটে। উপস্থিত সাক্ষীরা মনে করেছিলেন, এই বিলম্ব মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট বাড়িয়ে দেয়। অমানবিক আচরণের জন্য হুপারকে সামরিক কোর্ট অফ ইনকোয়ারির সামনে হাজির হতে বলা হয়, এমনকী তাঁকে তিরস্কার করা হয় এবং সাময়িকভাবে তাঁর বেতন-গ্রেড কমিয়ে দেওয়া হয়।

তবে তাঁর ফোটোগ্রাফকে তাক-লাগানো করে তোলা ও রোমাঞ্চকরভাবে উপস্থাপিত করার চেষ্টা এই প্রথম ছিল না। হুপার ১৮৭৬-’৭৮ সালে মাদ্রাজে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের ছবিও তোলেন। সেখানে তিনি দুর্ভিক্ষের শিকার কঙ্কালসার মানুষদের, নারী-পুরুষ ও বয়সভেদে সারিবদ্ধভাবে সরকারি ভবনের সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলেন। তাঁর এই ছবিগুলো ব্রিটেনে প্রকাশিত হলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ব্যঙ্গাত্মক সাময়িকী ‘Punch’-এ তাঁকে বিদ্রুপ করে কার্টুন প্রকাশিত হয়। অভিযোগ ওঠে, তিনি যাঁদের ছবি তুলেছিলেন, সেই অনাহার-পীড়িত মানুষদের কোন‌ও সাহায্য না-করেই শুধু আলোকচিত্র গ্রহণ করেছিলেন।

মাদ্রাজ দুর্ভিক্ষের সময় তোলা উইলোবি হুপারের তোলা ছবি, সূত্র: ইন্টারনেট

১৮৮৫ সালে তৃতীয় বার্মা যুদ্ধে হুপার বার্মা এক্সপেডিশনারি ফোর্সের প্রভোস্ট মার্শাল হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং পুরো অভিযানের বিস্তৃত আলোকচিত্র তুলেছিলেন। পরে সেগুলো ‘Burmah, A Series of One Hundred Photographs’ (১৮৮৭) নামে প্রকাশিত হয়। এতে মাদ্রাজ থেকে যাত্রা, রাজা থিবাও-এর বন্দি হওয়া, বার্মার প্রাকৃতিক দৃশ্য, স্থানীয় মানুষের জীবনযাপন, শিল্প এবং অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে এই অভিযানের সময়ই হুপার ওই ডাকাত-দলের মৃত্যুর মুহূর্তের ছবি তোলার আয়োজন করেছিলেন। হুপারের ‘Burmah’ গ্রন্থে ডাকাত বন্দিদের একটি আলোকচিত্র প্রকাশিত হলেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিতর্কিত ছবিগুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

‘Burmah’ গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা, সূত্র: অ্যান্টিপোডিয়ান

এই অমানবিক আচরণ ও অনাচারের নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গেলে সামনে উঠে আসে ভারতে তাঁর লাগামছাড়া সাম্রাজ্যবাদী জীবনযাপন। বন্দুক হাতে যাঁরা ভারত শাসন করতে চেয়েছেন, ক্যামেরা হাতে হুপার তাঁদেরই নতুন মাত্রা দিয়েছেন। একে কেউ কেউ চিহ্নিত করেছেন ‘ফ্রেমড অ্যাট্রোসিটি’ বা সাজানো নৃশংসতা বলে।

উইলোবি ওয়ালেস হুপারের (১৮৩৭-১৯১২) কর্মজীবনের শুরু ইস্ট ইন্ডিয়া হাউসের সচিব বিভাগে। ১৮৫৮ সালে তিনি সপ্তম মাদ্রাজ ক্যাভালরিতে যোগ দিয়ে ভারতে আসেন। পরবর্তী প্রায় ৪০ বছর তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবনের শুরুতেই তরুণ লেফটেন্যান্ট হুপার একজন স্বশিক্ষিত আলোকচিত্রী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর আলোকচিত্রের দক্ষতা তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড ক্যানিংয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ক্যানিং ভারতের মানুষ, ভূপ্রকৃতি, পেশা ও স্থাপত্যের আলোকচিত্র সংগ্রহের একটি আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং বিভিন্ন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাকে এই সংগ্রহে ছবি পাঠাতে উৎসাহিত করতেন।

মাদ্রাজ ক্যাভালরি ইউনিফর্মে হুপার, ১৮৭০

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকদের কাছে ভারতের বহুস্তরীয় সামাজিক ও জাতিভিত্তিক কাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, সামরিক ও প্রশাসনিক– উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে, তাঁর ব্যক্তিগত আলোকচিত্র সংগ্রহ সরকারি উদ্যোগে পরিণত হয় এবং ইন্ডিয়া অফিসের তত্ত্বাবধানে একটি বৃহৎ প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু হয়। এর লক্ষ্য ছিল আলোকচিত্র ও বর্ণনামূলক তথ্যের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত নথি প্রস্তুত করা, যা তাদের ভাষায় ‘ভারতের বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব’ করবে।

এই উদ্যোগের ফলে প্রকাশিত হয় আট খণ্ডের সুবৃহৎ গ্রন্থ ‘The People of India: A Series of Photographic Illustrations, with Descriptive Letterpress, of the Races and Tribes of Hindustan’ (লন্ডন, ১৮৬৮-১৮৭৫)। গ্রন্থটিতে ভারতের বিভিন্ন জাতি, উপজাতি ও বর্ণ-সম্প্রদায়ের মানুষের আলোকচিত্রের পাশাপাশি তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক বিস্তার, সামাজিক ও নৈতিক চরিত্র এবং ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টিতে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য সম্পর্কে বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গ্রন্থটি সংকলন ও সম্পাদনা করেন ইন্ডিয়া অফিসের দুই কর্মকর্তা জে. ফোর্বস ওয়াটসন এবং জন উইলিয়াম কে। প্রকল্পটির জন্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর শখের আলোকচিত্রীদের তোলা ছবির পাশাপাশি কয়েকজন পেশাদার আলোকচিত্রীর কাজও ব্যবহার করা হয়।

এই প্রকল্পে কাজ করার জন্য  ১৮৬২ সালে লেফটেন্যান্ট হুপারকে নিয়মিত সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে চতুর্থ ক্যাভালরিতে পাঠানো হয়। তিনি মূলত সাগর ও সেকেন্দ্রাবাদে কাজের সুযোগ পান। পরের দিকে তিনি মধ্য ভারতের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ছবি তোলেন।  The People of India-এর জন্য তিনি ৪৫০টিরও বেশি আলোকচিত্র সরবরাহ করেছিলেন।

সেভেন্থ মাদ্রাজ লাইট ক্যাভালরি, বাজার, হুপারের তোলা ছবি, সূত্র: ইন্টারনেট

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আলোকচিত্রচর্চার অভিজ্ঞতা এবং The People of India-তে কাজের অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে হুপার আলোকচিত্রী জর্জ ওয়েস্টার্নের সঙ্গে যৌথভাবে Hooper and Western নামে একটি বাণিজ্যিক আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁরা মূলত অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সমাজজীবন ও ঔপনিবেশিক ভারতের বিভিন্ন দৃশ্যের আলোকচিত্র বাজারজাত চেষ্টা করেন। এই সময়েই অর্থাৎ ১৮৭২ সালে তাঁর ১২টি ‘স্টেজড ফোটোগ্রাফ অফ টাইগার শুটিং’ খুবই জনপ্রিয় হয়। সেই ছবিগুলির সেটিং সম্ভাব্য ও বিশ্বাসযোগ্য জায়গায় করা হয়, তবে জ্যান্ত বাঘের বদলে মরা বাঘ বা স্টাফড টাইগারকে সাজিয়ে তিনি শিকারের ১২টি ছবি তোলেন। তাঁর ‘Tiger Shooting’ (১৮৭২) নামে বারোটি সাজানো আলোকচিত্রের সিরিজ বাণিজ্যিকভাবে সফল হলেও হুপার সামরিক জীবনই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ক্রমান্বয়ে ক্যাপ্টেন (১৮৭০), মেজর (১৮৭৮), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (১৮৮৪) এবং ১৮৮৮ সালে কর্নেল পদে উন্নীত হন। বলা ভালো, তিনি সামরিক সুরক্ষার বলয়ে নিরাপদে কাজ করতে চেয়েছেন। এর ১৫ বছর পরে, ১৮৮৭ সালে, ম্যাজিক ল্যানটার্নের জনপ্রিয়তা দেখে তিনি দু’টি সিরিজ তৈরি করেন। লন্ডনের জে. এ. লাগার্ড-এর মাধ্যমে তিনি ‘Lantern Readings Illustrative of the Burmah Expeditionary Force and the Manners and Customs of the Burmese’ নামে কাঁচের লণ্ঠন-স্লাইড ও ব্যাখ্যামূলক পুস্তিকা প্রকাশ করেন। একই বছরে তিনি আগের ছবিগুলিকে নতুনভাবে সম্পাদনা করে ম্যাজিক ল্যানটার্ন স্লাইডে রূপান্তরিত করেন এবং ব্যাখ্যামূলক পাঠ-সহ ‘Lantern Readings: Tiger Shooting in India’ নামে প্রকাশ করেন। এটি সে যুগের ব্রিটেনে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৯৬ সালে অবসর গ্রহণের পর হুপার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানেই ১৯১২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

হুপারের তোলা বাঘ শিকারের ছবি, সূত্র: ইন্টারনেট

‘ল্যান্টার্ন রিডিংস: টাইগার শুটিং ইন ইন্ডিয়া’ বা হুপারের বাঘ শিকারের ছবিগুলি শুধু শিকার-ইতিহাসের দলিল নয়; এগুলি ঔপনিবেশিক মানসিকতা, প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা এবং বন্যপ্রাণের প্রতি নির্মম উদাসীনতারও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। যে ফোটোগ্রাফ ও দৃশ্যগুলি একসময় বীরত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, আজ সেগুলিকেই আমরা পরিবেশ-ইতিহাসের আলোকে এক গভীর পরিবেশগত বিপর্যয়ের চিহ্ন হিসেবে দেখি। এই কারণেই পরিবেশ-ইতিহাসবিদদের কাছে হুপারের ‘Tiger Shooting’ সিরিজ হল এক ধরনের নেতিবাচক আর্কাইভ বা পরিকল্পিত বিপর্যয়ের উদাহরণ। এগুলি থেকে বোঝা যায় যে, কীভাবে ঔপনিবেশিক শিকার-সংস্কৃতি ভারতীয় বাঘকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল আর কেনই বা পরবর্তীকালে ‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর মতো সংরক্ষণ কর্মসূচি অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।

দ্য টাইগার হান্ট: ব্যাগড, হুপার, ১৮৭২, সূত্র: ইন্টারনেট

হুপার বাঘ শিকারের বিভিন্ন পর্যায়কে বিষয় করে একাধিক ছবিগুলি প্রকৃত শিকারের মুহূর্তের সরাসরি নথি ছিল না; বরং শিকার-পর্বকে সাজিয়ে, পুনর্নির্মাণ করে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেই সময় ইউরোপীয় শিকারিদের কাছে তিনি এসব ছবি বিক্রি করতেন শিকার-স্মারক এবং শিকার-সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে। উনিশ শতকের শেষভাগে ম্যাজিক ল্যানটার্ন জনশিক্ষা ও বিনোদনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে। গ্রামাঞ্চলের সভাঘর, বিদ্যালয়, সাহিত্যসভা ও বিভিন্ন নাগরিক সমাবেশে হুপারের বাঘ শিকারের স্লাইড প্রদর্শিত হত। এসব প্রদর্শনীর মাধ্যমে ব্রিটিশ দর্শকদের সামনে ভারতকে এক রহস্যময়, বিপদসংকুল এবং রোমাঞ্চে ভরা উপনিবেশ হিসেবে তুলে ধরা হত। হুপারের ছবিগুলি একটি জনপ্রিয় ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল– সাহসী ইংরেজ শিকারি বিপজ্জনক অরণ্যে প্রবেশ করে ভয়ংকর বাঘটিকে পরাস্ত করছে। এই বিজয়কে কেবল শিকারি-দক্ষতার নিদর্শন হিসেবে নয়, বরং ভারতীয় প্রকৃতি ও ভূখণ্ডের ওপর ব্রিটিশ আধিপত্যের প্রতীক হিসেবেও প্রচার করা হয়েছিল। বাঘের ওপর বিজয় যেন সাম্রাজ্যের শক্তি ও কর্তৃত্বেরই দৃশ্যমান প্রকাশ। ঔপনিবেশিক ভারতে বাঘ শিকার ছিল শুধু বিনোদন নয়, ক্ষমতা ও মর্যাদা প্রদর্শনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপায়। রাজা-মহারাজা, ব্রিটিশ কর্মকর্তা এবং ইউরোপীয় অভিজাতদের মধ্যে বাঘ-হত্যা ছিল গৌরবের বিষয়। গবেষকদের অনুমান, ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৪০ হাজার বা তারও বেশি বাঘ শিকার করা হয়। এই নির্বিচার নিধনের ফলে বাঘের সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে।

শিকারের পর ওয়েলসের সাহেবের সঙ্গে মাধবরাও সিন্ধিয়া, সূত্র: হার্জগ অ্যান্ড হিগিনস

জন ম্যাকেঞ্জি তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য এম্পায়ার অফ নেচার’-এর শুরুতেই বলেছেন যে উনিশ ও বিশ শতকের সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে শিকারের ভূমিকা যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, বিষয়টি ততটা গুরুত্ব দিয়ে কখনও আলোচনা করা হয়নি। বরং এই ব্যাপারটিকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সুকৌশলে। কারণ, সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের সমগ্র ইতিহাস জুড়েই জঙ্গল ধ্বংস ও বন্যপ্রাণীদের নির্মম হত্যা, বনজ সম্পদ লুঠ ও শোষণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে রয়েছে। বিশ্বের বহু অঞ্চলে ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের সীমান্ত যেমন গড়ে উঠেছিল, তেমনই সেই সীমান্তই শিকার-উদযাপনের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছিল; আর সেই অঞ্চলের প্রাণীসম্পদ ছিল সাম্রাজ্য বিস্তারের অন্যতম প্রেরণা ও আকর্ষণ। প্রাণীসম্পদ সংগ্রহের লোভ ও বন্যপ্রাণ হত্যার সুযোগ ঝুঁকিপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদী উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অপরিহার্য সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। পরে, সাম্রাজ্য যখন তার অভীষ্ট শিখরে পৌঁছেছে, তখন শিকার কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা শ্বেতাঙ্গদের ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রদর্শনের জাঁকজমকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। ইউরোপীয় বিশ্ব-আধিপত্যের চূড়ান্ত সময়কালই ছিল বন্যপ্রাণ হত্যার ও শিকারের নিষ্ঠুর অধ্যায়। বন্দুক-গুলি ও গাড়ি নিয়ে তারা ভারতের জঙ্গলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। মরা বাঘ স্টাফ্ড্ করার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, শিকারির পোশাক ও তাঁবু বিক্রি বেড়েছে, গুলি-বন্দুকের নতুন নতুন দোকান খুলেছে। ‘শিকার ইন্ডাস্ট্রি’ কী ভয়ংকরভাবে বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল– তার অন্যতম প্রমাণ ইংরেজদের লেখা সেকালের শিকার-সাহিত্য হলেও উনিশ ও বিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতে যে ক’টি শিকারের ফোটোগ্রাফ দেখা যায় সেগুলির বিশ্লেষণ করলে ইংরেজ প্রভুর দম্ভ ও সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবটি বোঝা যায়।

শিকার করা বাঘের মৃতদেহের সঙ্গে লর্ড ও লেডি কার্জন, ১৯০২, সূত্র: ইন্টারনেট

অভিযাত্রীদের ভ্রমণবৃত্তান্ত, মিশনারিদের কর্মকাণ্ড, সামরিক অভিযানের বিবরণ, জীবনী বা আত্মস্মৃতিকথা– সবক্ষেত্রেই সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে শিকারের অসংখ্য বর্ণনা ছড়িয়ে রয়েছে। পাশাপাশি সৈনিক, ঔপনিবেশিক প্রশাসক, পেশাদার শিকারি এবং ধনী পর্যটকেরা শিকার-বিষয়ক বিপুল সংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার অনেকগুলোই প্রাকৃতিক ইতিহাসের ছদ্মবেশের আড়ালে প্রকাশিত হয়েছিল।

শিকার সাহিত্য নিয়ে মুশকিল হল বন্য রোমান্সের প্রচার করার বাসনা ও কৃতিত্ব পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার জটিল বুননের কারণে সত্যমিথ্যে গুলিয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে আলোআঁধারি। আফ্রিকায় হাতির দাঁতের ব্যবসা, ভারতে ট্রফি সংগ্রহ আর শিকারের প্রতিযোগিতার গল্প ও বাস্তব মিলেমিশে গেলেও বাঘ-শিকারের ফোটোগ্রাফ দেখে ও পড়ে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। ইংরেজ প্রভুর পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকা মৃত বাঘের ছবিগুলি আজ নৃশংস বাঘ হত্যার মনস্তাত্বিক দিকটি তুলে ধরে।

ওয়েলস যুবরাজের বাঘ শিকার, ১৮৭৬, সূত্র: ইন্টারনেট

ব্রিটিশ ভারতের সেরা সময়ে রাজপরিবারের পছন্দের আলোকচিত্রী ছিলেন লালা দীনদয়াল। ভাইসরয় লর্ড কার্জনের (১৮৯৮-১৯০৫) ভারতবাসকালে তাঁকে গৌরবমণ্ডিত করার জন্য বিভিন্ন শিকারের সময় একই ধরনের ভঙ্গিতে তাঁর ছবি তুলেছিলেন। দীনদয়ালের তোলা একটি ছবিতে দেখতে পাই লর্ড কার্জন ও গোয়ালিয়রের মহারাজা মাধব রাও সিন্ধিয়া একটি ঘরের ভেতরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটি ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত “Lord Curzon’s First Tour in India, 1899” শীর্ষক একটি অ্যালবামের অংশ। ছবিতে দু’জনেই নিজেদের হাতের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাঁদের প্রত্যেকের একটি করে পা সামনে ছড়িয়ে রাখা দু’টি মৃত বাঘের দেহের ওপর রাখা। মজার বিষয় দু’জনের কেউই শিকারের পোশাক পরেননি। কার্জন পরেছেন আনুষ্ঠানিক ইউরোপীয় কোট-টাই, আর গোয়ালিয়রের মহারাজা পরেছেন দেশীয় পোশাক ও পাগড়ি। তাহলে এখানে বাঘ কেন? পরাজিত মৃত বাঘটি রাজকীয় ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে রাখা।

লালা দীনদয়ালের তোলা কার্জন ও মাধব রাওয়ের ছবি

উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের সূচনায় ঔপনিবেশিক বাঘ শিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র-নথিকার লালা দীনদয়াল (১৮৪৪-১৯০৫)। তিনি পরবর্তীকালে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত হন। ব্রিটিশ ভাইসরয়, দেশীয় রাজা-মহারাজা এবং নিজামদের আনুষ্ঠানিক আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি অসংখ্য রাজকীয় শিকার অভিযানের ছবি তিনি তুলেছেন। তাঁর তোলা ছবিতে শিকার শিবির, সুদৃশ্য মাচান, রাজকীয় শিকারদল এবং নিহত বাঘকে ঘিরে বিজয়োল্লাসে দাঁড়িয়ে থাকা শিকারিদের দেখা যায়। এই আলোকচিত্রগুলি কেবল শিকারের দৃশ্য নয়; বরং ঔপনিবেশিক ভারতের ক্ষমতা, রাজকীয় আড়ম্বর এবং বৃহৎ বন্যপ্রাণ শিকারের সংস্কৃতির এক অনন্য দৃশ্য-নথি।

১৯০২ সালে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন এবং তাঁর পত্নী লেডি কার্জন-এর হায়দ্রাবাদ সফর উপলক্ষে আয়োজিত রাজকীয় বাঘ শিকারের ছবি তুলে দীন দয়াল বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি হায়দ্রাবাদের ষষ্ঠ নিজাম, মাহবুব আলী খান, আসিফ জাহ ষষ্ঠ-এর রাজসভারও ফোটোগ্রাফার ছিলেন এবং ১৮৮৫ সালে দীনদয়াল ভারতের ভাইসরয়ের ফটোগ্রাফার হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৮৬৬ সালে দীনদয়াল জীবন শুরু করেছিলেন ইন্দোরের পূর্ত সচিবালয় অফিসে প্রধান এস্টিমেটর এবং ড্রাফটসম্যান হিসেবে। এর পাশাপাশি তিনি ফটোগ্রাফিও শুরু করেন। ইন্দোরে তাঁর প্রথম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ইন্দোর রাজ্যের মহারাজা তুকোজি রাও দ্বিতীয়, যিনি তাঁকে স্যার হেনরি ডেলির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ডেলি ছিলেন মধ্য ভারতের গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট এবং ডেলি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা, যিনি তাঁর কাজে উৎসাহ দেন। স্বয়ং মহারাজাও তাঁকে ইন্দোরে তাঁর স্টুডিও স্থাপন করতে উৎসাহিত করেন। শীঘ্রই তিনি মহারাজা এবং ব্রিটিশ রাজের কাছ থেকে কাজ পেতে শুরু করেন। পরের বছর তিনি গভর্নর-জেনারেলের মধ্য ভারত সফরের ছবি তোলার জন্য নিযুক্ত হন।

আলোকচিত্রী দীনদয়াল

তাঁর বেশ কিছু আলোকচিত্রের পটভূমি হায়দরাবাদের ওয়ারাঙ্গল জেলার একটি সাফারি শিবির। তিনি এখানেই লর্ড ও লেডি কার্জনের ছবি তোলেন। একই অভিযানের সময় পরপর দুই দিনে তোলা এই ছবিগুলোর মধ্যে দু’টি আশ্চর্যজনকভাবে একইরকম। উভয় ছবিতেই একটি বটগাছ এবং ডোরাকাটা তাঁবু দেখা যায়; একটি ছবিতে দম্পতিকে একটি বাঘের ঠিক পেছনে এবং অন্যটিতে একজোড়া বাঘের পেছনে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে।

দু’টি ছবিতে কার্জনের ভঙ্গি এক। দুই হাতই জ্যাকেটের পকেটে। তাঁর বাম পা সামনের দিকে বাড়ানো, যেন বাঘটির দিকে ইঙ্গিত করছে। এই ভঙ্গিটি মৃত বাঘের প্রতি তাঁর মালিকানা বা দখলের ইঙ্গিত। কিন্তু লেডি কার্জনের ভঙ্গিতে সেই আগ্রাসনের কোনও চিহ্ন নেই। বরং তাঁর নরম উপস্থিতি কার্জনের পৌরুষ ও আগ্রাসনকে তুলে ধরেছে। শুধু হুপার বা দীনদয়াল নয়, বোর্ন ও শেপার্ডের মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানও পিছিয়ে ছিল না। ১৮৭৫ সালে তোলা একটি আলোকচিত্রে ওয়েলসের যুবরাজ আলবার্ট এডওয়ার্ড (যিনি পরবর্তীতে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড হন) তাঁর শিকারি দল এবং ভারতে তাঁর প্রথম শিকার করা বাঘের সঙ্গে ‘পোজ’ দিয়েছেন। ছবিটি ভারতীয় উপমহাদেশে যুবরাজের রাজকীয় সফরের সময় বিখ্যাত আলোকচিত্র প্রতিষ্ঠান ‘Bourne & Shepherd’ তুলেছিল। সেদিনের শিকারির পায়ের কাছে পড়ে থাকা মৃত বাঘ ঘিরে লাগাতার প্রচারের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল। এইসব ফোটোগ্রাফ ক্ষমতা ও ক্ষমতাধরকে দৃশ্যমান করেছে।

দি প্রিন্সেস ফার্স্ট টাইগার, ১৮৭৫, সূত্র: ইন্টারনেট

অন্যদিকে আজও বাঘ মানে বাণিজ্য। বাঘ মানে মনোযোগের কেন্দ্রে থাকা। কোনও ট্রাভেল এজেন্সি, এনজিও-র নাম ও তাদের বিজ্ঞাপনী প্রচার, ওয়াইল্ড লাইফ পত্রিকার প্রচ্ছদ, ওয়াইল্ড ফোটোগ্রাফারের সাফল্য, সাফারির হাতছানি বা অভয়ারণ্যের বিজ্ঞাপন, বনবিভাগের বিজ্ঞাপনী প্রচার পুস্তিকা– সবখানেই বাঘের ছবির ব্যবহার করা হয়। বিড়ির বিজ্ঞাপন বা ব্যথা কমানোর ওষুধের প্রচারে আজও বাঘের ছবি সমান জনপ্রিয়। সোশাল মিডিয়ায় রোজ বিপুল সংখ্যক ফোটোগ্রাফার বাঘের ছবি পোস্ট করেন। বাঘ নিয়ে জনপ্রিয় সব গ্রুপ চলে। ভ্রামণিক জঙ্গল ভ্রমণের সার্থকতা খুঁজে পান বাঘের দেখা মিললে। ভারতে ১৮টি রাজ্য জুড়ে মোট জঙ্গল বরাদ্দের ৭০ শতাংশ ৫৮টি বাঘবনের জন্য বরাদ্দ করা হয় আর ৩০ শতাংশ জোটে ৫৬৭টি সংরক্ষিত এলাকার জন্যে।

বর্তমান সময়ে বিভিন্ন বাঘবনে তোলা বাঘের আলোকচিত্র হল মানুষের সঙ্গে প্রাকৃতিক পরিবেশের সম্পর্কের সূচক। যদিও পুঁজির দাপট ও কৌশলী প্রচারে ‘বাঘের ছবি’কে একটি মূল্যবান পণ্যে পরিণত করার চেষ্টা চলে– ‘ট্রফি ফটোগ্রাফ’ হিসেবে দেখার চেষ্টাও থাকে, তবে বাঘ ঘিরে বন্যপ্রাণ সচেতনতার কারণে (পুঁজিবাদী শক্তি সংরক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলেও) সবসময় একমাত্র নির্ধারক শক্তি হয়ে উঠতে পারছে না। ২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে সূচনা হয় আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসের। সমগ্র বিশ্বে বাঘের সংরক্ষণের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রতি বছর ২৯ জুলাই তারিখে পালন করা হয়। এই দিবস পালনের মুখ্য উদ্দেশ্য হল বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সুরক্ষিত করা এবং বাঘের সংরক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। কৈলাশ সাংখলা, ফতেহ সিং রাঠোর, বাল্মিক থাপার, ড. উল্লাস করন্থ, বিলি অর্জুন সিং, বেলিন্ডা রাইট, রতনলাল ব্রহ্মচারী, সরোজ রাজচৌধুরীদের দীর্ঘ লাগাতার লড়াই যেন আমরা ভুলে না যাই।

তথ্যসূত্র:

১. Hannavy, John (ed.), Encyclopedia of nineteenth-century photography, New York: Routledge, Howe, Cathleen (2013), ‘Hooper, Colonel Willoughby Wallace (1837-1912)’

২. Johnson, William S. (1990), Nineteenth-Century Photography: An Annotated Bibliography, 1839-1879, Boston: G. K. Hall

৩. Thomas, G. (1981), History of photography, India, 1840-1980, Andhra Pradesh State Academy of Photography

৪. ‘Portrait of a photographer’, The Tribune, 8 February 2004

৫. Photography and the Hunt During the British Raj Aileen Blaney, Film Studies

৬. The Empire of nature, John M. Mackenzie, Manchester, 1988

৭. Sir Edward Brandon, Thirty years of Shikar, Edinburgh, 1895

চিত্রসূত্র: The British Library