partition and imtiyaz ali's film main vaapas aaunga | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মৃতি যখন বিশ্বাসঘাতক

ইশার সামান্য হাসেন। কিন্তু সে হাসি কাকে ফিরে পাওয়ার? কিনুকে? দেশকে? সারগোধার হারিয়ে ফেলা শৈশবকে? তার জীবনের সমস্ত নারীকে? এই সবকিছুই কি অফসানার ছবির মধ্যে বেঁচে ওঠেনি? যে বিষ ইশার লালিত করেছেন এতদিন, যে ভালোবাসা না চাইতেও পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, সেই হাসি এই সবকিছুকে ফিরে পাওয়ার। ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা ফেরায় না। তার সঙ্গে বেঁচে ওঠে একটা মহাজাগতিক আখ্যান। যার পরিধির ভিতর আপাতমৃত সমস্ত জীবনও জীবিত হয়ে ওঠে।

শেষ আপডেট: জুলাই ৩, ২০২৬, ১১:১৭   
Facebook WhatsApp Messenger

পাথরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে রক্ত। দুর্বার হাওয়া বইছে। ক্ষেতের ওপর। বুকের ভিতর। ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে স্মৃতির পাতা। একটা অস্পষ্ট কানের দুলের অন্দরে ফুটে উঠছে বিক্ষিপ্ত মানচিত্রের আদল। ইশার শুয়ে আছেন। হাসপাতালের ঘরের দেওয়ালে দেখছেন সারগোধার আলতো রোদের স্পর্শ। গাছের ছায়া। যে ছায়াতলে আলতো গোলাপি এক ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে থাকতেন তিনি। বাস্তবের মৃত্যুতে অতীতের জন্মলাভ। এ কি ভ্রম? মায়া? না কি অতৃপ্ত আত্মার নিস্তব্ধ চিৎকার?

এইসব মুহূর্তে স্মৃতিকে বিশ্বাসঘাতক মনে হয়। খুনি মনে হয়। সন্তানকে, পৌত্রকে চিনতে না পারা দু’চোখের কাল্পনিক ক্যালাইডোস্কোপে ভেসে ওঠে অবনমিত এক নারীর মুখ। একটা না দেওয়া চিঠির কথা আওড়াতে থাকেন। প্রস্ফুটিত শব্দেরা অর্থের পরিবর্তে অনুভব ব্যক্ত করে। ব্যক্ত করে এক সুপ্রাচীন ঈর্ষার ছুরিতে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের নকশা। একটা উঠোন। গোলাপ গাছ। ভেঙে যাওয়া সিঁড়ির দু’পাশে দু’জন। বুকে হাত। এ সমস্ত দৃশ্যের ভিতর, সলিলোকির ভিতর আচমকা একটা আগুন জ্বলে ওঠে।

zoom
‘ম্যায়ঁ ওয়াপস আউঙ্গা’ ছবিতে ইশার চরিত্রে নাসিরুদ্দিন শাহ

ইমতিয়াজ আমাদের সেই আগুনের আঁচে পোড়াতে চেয়েছেন কেবল। যে আগুন জর্ডনকে শান্ত হতে দেয়নি আজীবন। যে আগুন হ্যারির ব্যাকুলতাকে সন্তপ্ত করেছে অনিদ্রার প্রতিটা প্রহরে। ইশারের যন্ত্রণাও সেই আগুন নির্বাহিত সন্তান। অথচ সেই আকুতি আদতে কার প্রতি? দেশ না কি প্রেয়সী? তা অস্পষ্ট রেখেছেন তিনি। ইশার দেশের কথা বলেন। তার শৈশব। মাতৃভূমির কথা বলেন। তার মনে চলাফেরা করে কলেজবেলা। ক্রিকেট ম্যাচ। একটা সাইকেলের চাকা ক্রমাগত ঘুরতে থাকে তার স্বপ্নের ভিতর। নিজের পরিবারকে ভুলে যায়। অর্জনকে ভুলে যায়। এক অবাঞ্ছিত বিচ্ছেদের কাঁটা ফুটতে থাকে তার শরীরে। জাগিয়ে রাখে। ঘুমতে দেয় না কিছুতেই।

সেই ভোরের কথা মনে পড়ে তার। রেডিওবার্তার কথা। হঠাৎ একটা অদৃশ্য লাইন ঢুকে পড়ে তাদের জীবনের ভিতর। ঘরের ভিতর। আত্মার ভিতর। লাইনের একদিকে কিনু দাঁড়িয়ে থাকে। অন্যদিকে ইশার। ১৭ বছরের জীবনের উল্টোদিকে পড়ে থাকে কিছু টুকরো ছাইভস্ম। এই সব কিছুকে নাসিরউদ্দিন শাহ জীবন্ত করে তোলেন। মহাজাগতিক করে তোলেন। অভিনয়, যাপন হয়ে ওঠে। তার বলে চলা অর্থহীন কথার মধ্যে দিয়ে। শব্দের মধ্যে দিয়ে, চিঠির মধ্যে দিয়ে তিনি একটা দেশ তৈরি করেন। একটা অবয়ব। একটা কাঁটাতার। যার একদিকে দাঁড়িয়ে ইশার কিনুকে খুঁজে চলে। তার অন্তরের দেশভাগ তাকে দূরে ঠেলে দেয় নিজের থেকে। জীবন থেকে। ভালোবাসা থেকে। শুধু একটা অপেক্ষা, বিষ হয়ে ছুটে বেড়ায় তার শরীরের ভিতর।

সেই খুঁজে চলা যৌবনের সঙ্গে পরিচয় করাতে কিনু রূপে ভেদাং রায়না আসেন। আমাদের প্রেমের পথচারী হতে শেখান। শেখান যৌনতার সামান্য সুবাসের অছিলায় নিজেকে পাপী ভাবার সহজতা। প্রেয়সীকে নিজের অস্তিত্বের ভিতর অবিস্মরণীয় করে তোলার এক অমানুষিক জেদ। এক পবিত্র শিশুমন যে নিশ্চিন্তে বিভেদের পাঁচিলকে অস্বীকার করে। অথচ বহু বছর পর মায়ের মৃত্যুর বর্ণনা, সহোদরার নির্যাতনের কিস্‌সা তার দু’চোখে সামান্য বৃষ্টিও আনে না। ভেদাং এই প্রতিটি মুহূর্তকে আত্মস্যাৎ করেন। তার চিৎকার , তার স্তব্ধতা, তার চাহনি থেকে প্রস্ফুটিত হয় কিনুর অসহয়তা। ইশারের মনস্তাপ। শরীরকে শ্মশান মনে হয়। যার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে মানসিক উৎপীড়নের অসংখ্য সমাধি।

অফসানা সেই সমস্ত যন্ত্রণার মলম। শর্বরী তাকে সাজিয়ে তোলেন মায়া দিয়ে। আলো দিয়ে। কবিতার নির্যাস হয়ে ওঠে সম্পর্কের ভিত। অফসানা তার ভিতরের কোলাহলকে শান্ত করেন। কিনুর নাবালক মন তার স্পর্শের ছোঁয়ায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যুবক হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তকে, সেই সাক্ষাৎকে হৃদয়ে আগলে রাখেন অফসানা। অপেক্ষার চাদরতলে পোহাতে থাকেন সম্পর্কের আঁচ। যেহেতু দুই দেশ। দুই সূত্র। দু’জন মানুষ। আমার ‘পারিজাদ’ মনে পড়ে। পাকিস্তানি ড্রামা। সম্পর্কের বিষের কথা বলতে গিয়ে পারিজাদ বলে ওঠে স্মৃতির কথা। স্থানের কথা। সে জানায়, মানুষের মনে যখন অপর মানুষের প্রতি ঘৃণা জন্মায়। সেই ঘৃণা সেই মানুষের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য মানুষদের। স্মৃতিদের। স্থানের প্রতিও ঘৃণাকে লালিত করে।

zoom
‘পারিজাদ’ ছবির পোস্টার

পারিজাদের লেখা আর্তনাদ কি শুনেছিলেন অফসানা? যা কিনুর অজানা থেকে গেল আজীবন। যে মুহূর্তে কিনু, দেখা করতে এসেও অফসানার পরস্ত্রী হওয়ার বার্তা শুনে ঘৃণাকে জিতিয়ে দিলেন। ঈর্ষাকে জিতিয়ে দিলেন। তিনি কি জানতেন এর ভার তাঁকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে? কিনু বেরিয়ে যান দরজা দিয়ে। অফসানা সিঁড়িতে নামেন। দাঁড়িয়ে থাকেন। নিচে তাকান। দেখতে পান না কাউকে। ক্যামেরা ওয়াইড অ্যাঙ্গেলে স্থির। এগয় না। গোটা ফ্রেম যেন স্তব্ধ হয়ে থাকে। আর আমি শুনতে পাই পারিজাদ বলছেন, ‘যব কভি নফরত করনা হো, তো উন ইয়াঁদোসে, উন লমহোসে না করনা, যো হমনে সাথ বিতায়ে থে। যো নফরত করনা হো তো মুঝসে, বস মুঝসে নফরত করনা।’

ইমতিয়াজ এতদিন আমাদের ভালোবাসার গল্প বলেছেন। নিজেকে খোঁজার গল্প বলেছেন। ঘরের ফেরার গল্পও বলেছেন। ‘খালি হ্যায় যো তেরে বিনা ম্যায়ঁ ওহ ঘর হুঁ তেরা’। ইরশাদ কামিলের কলম থেকে বেরনো এই লাইন আমাদের অন্তরে স্থিত হয়েছে বহুদিন। অথচ ‘ম্যায়ঁ ওয়াপস আউঙ্গা’-য় এসে সেই সবকিছুকে মিলিয়ে দিলেন ইমতিয়াজ। দাদুর গল্পকে খুঁজতে এসে নিজেকেই আবিষ্কার করছে নীরভীর। দিলজিৎ তাঁর নিজস্বতায় তাঁকে আমাদের কাছাকাছি নিয়ে আসছেন। শেষ মুহূর্তে তাঁর ছুটে চলা। খোঁজের তাড়নার ভিতর থেকে ভেদের অবয়ব বেরিয়ে পড়ছে বারবার। অথচ সেই প্রশ্ন এখানে কখনও ভারী হয়ে উঠছে না। কারণ পরিচালক এখানে প্যাশনের পরিবর্তে অস্তিত্বের খোঁজ করতে চেয়েছেন। পৌঁছতে চেয়েছেন সত্যের কাছাকাছি।

zoom
ইশার-এর সঙ্গে নীরভীর, নাসিরুদ্দিন শাহ ও দিলজিৎ সিং

তাই নীরভীরের পাকিস্তান পৌঁছেও অফসানাকে জীবিত না পাওয়া সেই বিষের বিদ্যমানতার সাক্ষী বহন করে। কিনুর অপার্থিব ভালোবাসা ঈর্ষার কাছে আত্মসমর্পণ করে তাকে আজীবনের জন্য অসংলগ্ন করে দেয়। নিজেরই অস্তিত্বকে ছোঁয়া থেকে সে বঞ্চিত থাকে আজীবন। ঠিক এই শেষ মুহূর্তে এসে ইমতিয়াজ দেশ এবং প্রেয়সীকে মিলিয়ে দেন। মিলিয়ে দেন ঈর্ষা এবং ঘৃণাকে। নীরভীরের ভিডিও কলে ইশার যাকে দেখেন সে কে? প্রশ্ন জাগে। লাল, আকাশি, হলুদ পেরিয়ে এসে অফসানার পোশাক শুভ্র হয়ে ওঠে। নিশ্চিহ্ন কানের দুলের দিকে একদৃষ্টে থাকিয়ে থাকেন ইশার। নিজের অগোছালো দাড়ি সামান্য ঠিক করে নেন। আবহসংগীত হিসাবে এ আর রহমানের অতুলনীয় সৃষ্টি ‘তেরে পাস ম্যায়ঁ’ বেজে ওঠে।

ইশার সামান্য হাসেন। কিন্তু সে হাসি কাকে ফিরে পাওয়ার? কিনুকে? দেশকে? সারগোধার হারিয়ে ফেলা শৈশবকে? তার জীবনের সমস্ত নারীকে? এই সবকিছুই কি অফসানার ছবির মধ্যে বেঁচে ওঠেনি? যে বিষ ইশার লালিত করেছেন এতদিন, যে ভালোবাসা না চাইতেও পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, সেই হাসি এই সবকিছুকে ফিরে পাওয়ার। ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা ফেরায় না। তার সঙ্গে বেঁচে ওঠে একটা মহাজাগতিক আখ্যান। যার পরিধির ভিতর আপাতমৃত সমস্ত জীবনও জীবিত হয়ে ওঠে।

zoom
কিনু ও অফসানা চরিত্রে ভেদাং রায়না ও শর্বরী

আরতি বাজাজ তার সম্পাদনার ম্যাজিকে ভূত-ভবিষ্যৎকে জুড়ে দেন। জীবন অবলীলায় বর্তমান থেকে অতীতে যাতায়াত করে। ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়া দুটো দেশ। দুটো মন। দুটো আত্মা। অসংখ্য কাঁটাতার পেরিয়ে। রক্ত পেরিয়ে। যন্ত্রণা পেরিয়ে। একে অপরের কাছাকাছি আসে। তাকায়। মুহূর্ত চলে যাওয়ার আগে বিদায়ের অনুমতি চায়। অফসানা হাত নাড়েন। ইশার নামিয়ে আনেন চোখ। আর কোনও এক সমান্তরাল পৃথিবীতে, কাফকা মিলেনাকে লেখেন তার চিঠির শেষতম লাইন, ‘অ্যান্ড অ্যাকচুয়ালি ইট ইজ নট ইউ অ্যাট-অল আই লাভ, বাট র‍্যাদার দ্য এক্সিসটেন্স ইউ হ্যাভ বেস্টোড অন মি…’

A R Rahman Diljit Singh imtiaz ali main vaapas aaunga Nasiruddin Shah partition Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on