
হাল্লারাজার মাথায় আলোর কোনও রেখা দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হয়নি। কেন হয়নি? তার কারণ রাজা তখনও কিন্তু বরফির ওষুধ খেয়ে সম্মোহিত। ফলে তাঁর মাথাটার মুক্তি এখনও হয়নি। সেই জন্য তাঁর মাথাকে আউট লাইন দিয়ে পৃথক করা হয়নি। এখানে সৌম্যেন্দু রায়ের মাস্টার টাচ যে, এখনও হাল্লার রাজার মস্তিষ্ক দাসত্ব করে যাচ্ছে, তাই মস্তিষ্কে আলোর আউটলাইন নেই। কিন্তু তাঁর হৃদয় দাসত্ব মুক্ত হয়েছে, তাই পোশাকে, বুকের কাছটায়– জানলা দিয়ে আলো এসে পড়েছে।
প্রচ্ছদ ঋণ: সত্যজিৎ রায়
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইজরায়েল প্রথম বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল গাজা স্ট্রিপে। তার পর থেকে, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ছবিতে ছেয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। নীচে সেই রকম একটি ছবি দিলাম। ছবিটা তুলেছেন সামার আবু এলুফ(Elouf)! অন্তর্লীন বেদনায় ভরে আছে এই ছবি। বেদনা কীভাবে তীব্রতর হল?

কারণ, ছবির চরিত্রদের সাদা-আলোর আউটলাইন দিয়ে যুদ্ধের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। যেহেতু সাদা আউটলাইন নেই, তাই এই ফোটোগ্রাফে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষরা মিশে আছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত পটভূমির সঙ্গে। আর মিশে আছেন বলেই মনে হচ্ছে, এই নিরন্তর যুদ্ধ থেকে ওঁদের কোনও মুক্তি নেই।
অথচ, হাল্লারাজার সেনাবাহিনীর ফোটোগ্রাফি করার সময় এই রীতি কি অনুসরণ করেছিলেন সত্যজিৎ ও সৌম্যেন্দু রায়? ওঁরা দু’জন কি পরিবেশের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন হাল্লার সেনাবাহিনীকে? নাকি, হাল্লার সেনাদের আলো দিয়ে বিচ্ছিন্ন করেছিলেন পরিবেশ থেকে?

হাল্লার কেল্লার ঠিক পিছনেই ছিল অসংখ্য মৃত সৈনিকের সমাধি। সেখানেই হেঁটে হেঁটে গান গাইছে গুপী– ‘ওরে বাবা দ্যাখো চেয়ে কত সেনা চলেছে সমরে! ঢোল বাজিয়ে সঙ্গত করছে বাঘা! মাঠে হাজির মন্ত্রীমশাই। কিন্তু রাজামশাই কোথায়? গুপীর গান আর বাঘার ঢোল কি রাজামশাইয়ের কানে যাচ্ছে? যদি কানে যায়, তাহলেই তো রাজামশাইয়ের ঘোর কেটে যাবে! আর উনিও ছুটি পেয়ে যাবেন চিরকালের মতো!

কিন্তু রাজামশাই শুনতে পাচ্ছেন কি? কঠিন ধাঁধা। কেন কঠিন? কারণ, শর্ত একটাই। এই ধাঁধার উত্তর দিতে হবে শুধু আলো দিয়ে। আলোকসম্পাতের এমন পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে বোঝা যায়, রাজামশাইয়ের কানে গান ঢুকছে কি না। কেন শুধু আলোর ওপর এই নির্ভরতা? কারণ, এই রাজার তো এখনও ঘোর কাটেনি। তাই উনি কথাও বলতে পারছেন না। তাই সত্যজিৎ রায় ও সৌম্যেন্দু রায় ঠিক করলেন– শুধু আলো দিয়েই এই ধাঁধার সমাধান করতে হবে। কিন্তু কী করে?… কীভাবে সমাধান করেছিলেন ওই দুই জাদুকর? এই সব প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করতে চলেছি আজকে।
২.
হাল্লারাজার সেনাবাহিনী তখন যুদ্ধ করতে অগ্রসর হচ্ছে শুণ্ডী রাজ্যের দিকে। কেল্লার পিছনে সমাধিক্ষেত্রে সৈন্যদল এগিয়ে চলছে। তার ফলে এবড়ো-খেবড়ো মাটি জ্যামিতিক আকৃতিবিশিষ্ট ছিল। প্রতিটা সমাধির ওপরে রোদ এসে পড়েছিল।

এই সমাধিক্ষেত্র সত্যজিৎ রায়ের এত ভালো লেগেছিল যে, ‘সোনার কেল্লা’ উপন্যাসে এই সমাধিক্ষেত্রের উল্লেখ আছে– “চারিদিক থমথম করছে। পিছন দিকে চাইলে দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের মাথায় জয়সলমীরের কেল্লা। রাস্তার উলটো দিকে খাড়াই উঠে গেছে পাহাড়। তার ঠিক পায়ের কাছে একটা প্রকাণ্ড খোলা জায়গা জুড়ে মাটিতে পোঁতা শিল-নোড়ার মতো হলদে পাথরের সারি। ফেলুদা ফিসফিস করে বলল, ‘যোদ্ধাদের কবর।’ ”
উপন্যাসটা বেরনোর তিন বছর পর, ছবি করার সময় সত্যজিৎ রায় অবশ্য যোদ্ধাদের এই কবরগুলো ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে আর দেখাননি। ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সমাধিক্ষেত্রের দৃশ্যটি শুটিং করার ফলে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হল– চৌকো চৌকো পাথর মাটি বা বালির মধ্যে গাঁথা। এই বাস্তব, রুক্ষ, অসমতল ভূখণ্ডের ওপরেই নেওয়া হয়েছে ট্রলি শট। ক্যামেরা পূর্বদিক থেকে আসা আলোর বিপরীতে এগিয়ে যায়, আর সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গুপী-বাঘার পায়ের পাতাগুলি কখনও পাথরের আড়ালে ঢেকে যাচ্ছে, আবার কখনও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

এই ‘ঢাকা পড়া’ এবং ‘উন্মোচিত হওয়া’– এক ছন্দের সৃষ্টি করেছে যেন। এটা একেবারেই সত্যজিতীয় স্টাইল। আলো, অবয়ব ও স্থাপত্য– তিনটি উপাদান মিলিয়ে এখানে তৈরি হয় গতিশীল কম্পোজিশন।
এই স্টাইলের একটি সুস্পষ্ট অনুরণন আমরা পাই ‘চারুলতা’-র বারান্দা-দৃশ্যে। সেখানে ট্রলি শটে চারু বারান্দা ধরে হেঁটে যাচ্ছে, কখনও সে থামের আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে, আবার মুহূর্ত পরেই আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়ছে। থামগুলি যেন চারুর আবেগের পর্দা। চারুর অন্তর্জগৎ যেমন আড়াল-উন্মোচনের মধ্যে দোল খায়, তেমনই এই ট্রলি শট।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর সমাধিক্ষেত্রেও পোঁতা পাথরগুলি যেন সেই থামেরই অনুরূপ। গুপী-বাঘা একবার এপারে, একবার ওপারে– কখনও পাথরের আড়ালে, কখনও সামনে। চরিত্রদের উপস্থিতি সেখানে কিছুটা বিরতিপূর্ণ হলেও সম্পূর্ণ ধারাবাহিক। এগুলোকে যথার্থই বলা যেতে পারে পরিচালকের নিজস্ব সাক্ষর। কারণ, এই ধরনের আড়াল-উন্মোচনের ছন্দ, স্থাপত্যকে সক্রিয় উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা এবং আলো-কে গতির সঙ্গে যুক্ত করা– এসবই সত্যজিতের নন্দনচেতনার পরিচায়ক।
গানের কিছুটা সময় অতিক্রম করার পর দৃশ্যত এক পরিবর্তন আসে। ফ্রেমে দেখা যায় একটি বাবলা গাছ– তার গায়ে এসে পড়েছে উজ্জ্বল, প্রায় দীপ্তিমান আলো। আমরা পাই গুপী-বাঘার ডান গালে, ডান হাতেও এসে পড়েছে সেই সাদা আলো। লক্ষণীয়, এই একই আলো এসে পড়েছে হাল্লার রাজার সেনাদের গায়েও। হাল্লার রাজ্যের যে রাজনৈতিক চাপ, ফ্যাসিস্ট চাপ, একনায়কতন্ত্রের অন্ধকার– তার থেকে সেই সৈন্যরা যেন হঠাৎ মুক্তির স্পর্শ পায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে সাদা আলোর আউটলাইন তাদের শরীরকে ঘিরে ধরে এবং তারা দৃশ্যত পরিবেশ থেকে তাদের আলাদা করে তোলে। যেন তারা অত্যাচারের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নতুন এক স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাদা আউটলাইন এখানে মুক্তির বাহক– অন্ধকার রাজনীতির বিপরীতে স্বচ্ছ মানবিকতার চিহ্ন। গুপী-বাঘা ও সেনাদের শরীরে এসে পড়া সেই আলো আসলে এক অন্তর্লীন মুক্তির মুহূর্ত।
এই সাদা আউটলাইন দিয়ে চরিত্রকে পরিবেশ থেকে পৃথক করে তোলার কৌশল পরিচালকের দীর্ঘদিনের চর্চা। সত্যজিৎ রায় ১৯৪৩-’৪৪ সাল থেকেই তাঁর ইলাস্ট্রেশন ও ভিজ্যুয়াল কল্পনায় এর ব্যবহার শুরু করেছিলেন। সাদা রং দিয়ে মুক্তি বোঝানোর আরও একটি উদাহরণ দিই। ‘প্রোফেসর শঙ্কু ও খোকা’ গল্পে অজানা কোনও কারণে খোকা জিনিয়াস হয়ে গিয়েছিল। তাই সে দৈনন্দিন গ্লানিময় জীবনযাপন থেকে মুক্ত করে নিতে পেরেছিল নিজেকে। এই মুক্তির চিহ্ন হিসেবেই, ধবধবে সাদা রং (অর্থাৎ উজ্জ্বল আলো) দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে ফোরগ্রাউন্ডে দাঁড়ানো খোকার শরীর। ‘সন্দেশ’-এ মূল ছবিটা ছাপা হয়েছিল ঘন নীল রঙে।

একইভাবে ‘সোনার কেল্লা’-তেও সাদা আউটলাইন দিয়ে চরিত্রদের পরিবেশ থেকে পৃথক করা হয়েছিল। লক্ষ করার বিষয়, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রে এই আলোর ব্যবহার আগে দেখা যায়, পরে ১৯৭১ সালে ‘সোনার কেল্লা’ উপন্যাসে সেই ইলাস্ট্রেশনের মাধ্যমে নতুনভাবে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ, একই আলোক-স্বাক্ষরের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাই।
দু’-চোখ বিস্ফারিত করে ছুটে আসছে মুকুল। মুকুলের বাঁ হাত, বাঁ পা, জামার বাঁ দিক সাদা রং দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে পরিবেশ থেকে। কারণ মুকুল বাস্তব জগতে নেই। সমকালীন বাস্তব থেকে মুকুল বিচ্ছিন্ন। সমকালীন বাস্তবের আঘাত থেকে নিজেকে ও মুক্ত করে নিয়েছে– যেভাবেই হোক। সাদা রং দিয়ে তৈরি সাদা রোদ মুকুলকে মুক্তি দিতে সাহায্য করেছে। ঠিক এই একই কারণে, যুদ্ধ থামানোর গান গাওয়ার সময়, গুপী ও বাঘার ডান হাতে আর ডান গালে ধবধবে সাদা আউটলাইন দিয়ে পরিবেশ থেকে ওদের মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
৩.
আবার ফিরে আসি হাল্লার রাজার কথায়, ‘ওরে বাবা দ্যাখো চেয়ে’ গানটার সময়ে হাল্লার রাজামশাই গুপী-বাঘার থেকে কত দূরে আছেন? সেই দূরত্ব আমরা কি অনুমান করতে পেরেছিলাম ?
কেল্লার ভিতর, জানলার পাশে তিনি শুয়ে আছেন। ফ্রেমে অন্য কোনও চরিত্র নেই, সংলাপও নেই। নৈঃশব্দ্যের ভিতর দিয়ে ভেসে আসছে গান। দৃশ্যত স্থির, অথচ আবহে এক অদৃশ্য সঞ্চালন। এই নীরবতার মধ্যেই পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং চিত্রগ্রাহক সৌম্যেন্দু রায় আলোকে ব্যবহার করেছিলেন এক সূক্ষ্ম নাট্য-ইঙ্গিত হিসেবে।

পূর্বদিকে একটি কল্পিত জানলা ধরে নেওয়া হয়— অর্থাৎ কেল্লার ভিতরে সেই দিকই আলোর উৎস। সেখান থেকে আসা আলো হাল্লার রাজার গায়ে এসে পড়েছে, বিশেষত তাঁর পোশাকের ডান দিকে। এই ডানদিক-নির্ভর আলোক-প্রক্ষেপণের পিছনে ধারাবাহিকতা রয়েছে। কারণ, এর আগেই গুপী-বাঘার শরীরেও আলো পড়েছিল ডান দিক থেকে। এবং তাদের মুখ ছিল উপরের দিকে তোলা– আকাশমুখী, যেন কোনও অদৃশ্য শক্তির দিকে নিবেদিত। একইভাবে রাজাও মুখ তুলে শুয়ে আছেন। এই সমান্তরালতা– ডান দিকের আলো, উর্ধ্বমুখী মুখ– দর্শকের অবচেতন মনে এক সেতুবন্ধন রচনা করে। যদিও ফ্রেমে গুপী-বাঘা উপস্থিত নেই, তবু আলোর ভাষা জানিয়ে দেয়– রাজা খুব দূরে নন। তিনি কাছেই আছেন এবং গুপী-বাঘার গান তাঁর কানে পৌঁছচ্ছে। দৃশ্যগত বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও আলোক-ব্যবহারের মিল দু’টি অবস্থানকে অদৃশ্যভাবে যুক্ত করে দেয়। দর্শক অনায়াসেই বুঝে নেয়– দূরত্ব যতই থাকুক, এই মুহূর্তে রাজা ও গুপী-বাঘা একই সুরের অধীন।

রাজার কেল্লায় আলোর উজ্জ্বলতা সচেতনভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। জানলা থেকে আলো কিছুটা প্রতিহত হয়ে নরম, সংযত হয়ে ঘরে ঢুকছিল। ফলে মুখে ও পোশাকে একটি হালকা ছায়ার আবরণ তৈরি হয়। অর্থাৎ, সমাধিক্ষেত্রের তুলনায় রাজার মুখে ও গায়ে আলোর তীব্রতা অনেক কম। যেন তিনি এখনও সম্পূর্ণ মুক্ত নন, তাঁর অবস্থান এখনও প্রাচীরবেষ্টিত। অর্থাৎ তিনি ক্ষমতায় আবদ্ধ। রাজার মাথায় আলোর কোনও রেখা দিয়ে আলাদা করে দেওয়া হয়নি। কেন হয়নি? তার কারণ রাজা তখনও কিন্তু বরফির ওষুধ খেয়ে সম্মোহিত। ফলে তাঁর মাথাটার মুক্তি এখনও হয়নি। সেই জন্য তাঁর মাথাকে আউট লাইন দিয়ে পৃথক করা হয়নি। এখানে সৌম্যেন্দু রায়ের মাস্টার টাচ যে, এখনও হাল্লার রাজার মস্তিষ্ক দাসত্ব করে যাচ্ছে, তাই মস্তিষ্কে আলোর আউটলাইন নেই। কিন্তু তাঁর হৃদয় দাসত্ব মুক্ত হয়েছে, তাই পোশাকে, বুকের কাছটায়– জানলা দিয়ে আলো এসে পড়েছে। এইভাবে ইম্যান্সিপেশনকে সত্যজিৎ রায় সিনেম্যাটিক ল্যাংগুয়েজে ব্যক্ত করেছিলেন।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর আউটডোর শুটিং এবং ইনডোর শুটিংয়ের মধ্যে সাত-আট মাসের একটা ব্যবধান ছিল। তাঁরা ঠিক করে নিয়েছিলেন কোনটা রাজার ঘর হবে ও ঘরের জানলাটা কেমন হবে– সেই অনুযায়ী আলো ব্যবহৃত হয়েছিল ইনডোর শুটিংয়ে।
কেল্লার দোতলার, দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একটি ঘরকে রাজার শোবার ঘর হিসেবে কল্পনা একেবারেই যুক্তিযুক্ত। কারণ, পূর্বমুখী ঘর মানেই সকালের নরম আলো, জানলা দিয়ে ঢোকা সূর্যরশ্মি, ছায়া-আলোর নাটকীয়তা– যা সত্যজিৎ রায়ের ভাবনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা অনুমান করে নিতে পারি– সালিম সিং কি হাভেলি-র এই ঘরেই শুয়ে ছিলেন হাল্লার রাজা! কেন?
এখানে চারটে শর্ত পূরণ করতে হবে–
১) যে হাভেলির ঝরোখায় পূর্ব দিকের রোদ এসে পড়ে– এই রকম যে কোনও হাভেলির ঘর হবে হাল্লারাজার শোবার ঘর।
২) সারি দিয়ে বেশ কয়েকটি ঘর থাকতে হবে।
৩) তার মধ্যে ঠিক মাঝের দুটো ঘর ব্যবহার করেন রাজামশাই।
৪) ফলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেই রাজার নাগাল পাওয়া যায় না।
এই চারটে শর্ত পূরণ করে যে হাভেলি– সেটাই হাল্লারাজার প্রাসাদ। এবার প্রশ্ন সেলিম সিংয়ের হাভেলি কি এই চারটি শর্ত পূরণ করছে? যদি করে, তাহলে ওই হাভেলিই ছিল হাল্লারাজার প্রাসাদ। কিন্তু ওই হাভেলির মধ্যে কোনও শুটিং হয়নি। তাই ওটা ফিল্ম লোকশন নয়। কলকাতায় স্টুডিওতে অন্তর্দৃশ্যগুলোর শুটিং করা হয়েছিল। কেন হাল্লা রাজামশাইয়ের ঘরে সরাসরি সকালের রোদ ঢোকেনি? এই ধাঁচের একটা ঘরে ঝুলন্ত বারান্দা এই ছবির লাইট সেট আপে কতটা গুরুত্বপূর্ণ? একটা দৃষ্টান্ত দিলেই সেটা বোঝা যাবে।

হাল্লার রাজামশাই ‘যুদ্ধ .. যুদ্ধ… যুদ্ধ’ বলে ছাদ ফাটিয়ে চিৎকার করতে করতে, দৌড়ে রাজসভায় ঢুকছেন। সোজা ধেয়ে আসছেন সিংহাসনের দিকে। তাঁর চিৎকারে একঝাঁক পায়রা কেল্লার ছাদ থেকে আকাশে উড়ে গেল। পায়রার ঝাঁক উড়ল কোথা থেকে? কয়েকটা ঝুলন্ত বারান্দার আড়াল থেকে। সেই সমস্ত ঝুলন্ত বারান্দার পাথর কেটে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট জানলা। এই ঝুলন্ত বারান্দার জানলার আয়তন দেখলেই বোঝা যায়– হাল্লার ঘরগুলোয় আলো কেন এত কম ঢোকে! হাল্লার সব ঘরের লাইট সেট আপ করার সময় এটাই মাথায় রেখেছিলেন সৌম্যেন্দু রায়। এখানেই সৌম্যেন্দু রায়ের অসাধারণত্ব।
বড় রিফ্লেক্টর বসিয়ে আলো বাউন্স করানো হয়েছিল। যাতে জানলার ভেতরে সফট ডিফিউজড লাইট অনায়াসে আসতে পারে। ঘরের ভিতর কম আলো ব্যবহার করে নাটকীয় ছায়া তৈরি করেছিলেন। এই কারণেই আলোটাকে এতো স্বাভাবিক ও যথাযথ মনে হয় আমাদের। এই রকম লাইটিং করার আরও একটা বিশেষ কারণ আছে। ঝুলন্ত বারান্দায় যখন জানলা কাটা থাকে, আর সেই জানলার মাথায় খিলান থাকে– তখন জানলা-বসানো সেই ঝুলন্ত বারান্দাকে বলা হয়– ঝরোখা !
ঝরোখার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতেন সত্যজিৎ রায়। তাই ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতেও ঝরোখাকে বিশেষ মূল্য দিয়েছেন সত্যজিৎ। কোন দৃশ্যে ?

বিকানির দুর্গের বারান্দা দিয়ে যখন হেঁটে এগচ্ছেন ফেলুদা, তোপস, জটায়ু আর মন্দার বোস– ঠিক সেই সময় সময় খুব মূল্যবান একটি সংলাপ বলানো হয়েছে এই রকম একটি ঝরোখায়। খিলানের ঠিক নীচে। মন্দার বোস হঠাৎ বলে উঠলেন জটায়ুকে, ‘পড়ে দেখতে হচ্ছে মশাই আপনার বই! আছে নাকি এক কপি সাহারার সীতা-হরণ?’ হতবাক জটায়ু অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বললেন, ‘সীতা-হরণ! আপনি রসিক লোক মশাই! হা-হা-হা-হা-হা…’ সবাই যোগ দিলেন জটায়ুর হাসিতে। এমনকী, ফেলুদাও।
ঝরোখার খিলানের ঠিক নীচেই বলানোর ফলে দর্শকের মন আলাদা করে গুরুত্ব দিয়েছিল এই ক্লাসিক সংলাপকে। কারণ ঝরোখার গুরুত্ব মিশে আছে ভারতের রক্তের স্মৃতিতে।
এমনকী, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এও মছলি বাবার গোপন ডেরায়, ওই নকল সন্ন্যাসীর মুখোমুখি হওয়াকে এড়ানোর জন্য ফেলুদা চট করে লুকিয়ে পড়েছিল একটা ঝরোখার আড়ালে।
ওই ঝরোখাই মছলি বাবার গোপন ডেরায় আলোর উজ্জ্বলতা কমিয়ে রেখেছিল। লুকোনোর জন্য ছায়াময় বারান্দাই দরকার।
এখানে প্রশ্ন উঠছে– ঝরোখাকে এত গুরুত্ব দিতেন কেন সত্যজিৎ রায়? বহু কারণের মধ্যে একটি মাত্র কারণ বলি উত্তর ভারতে, স্থাপত্যের ইতিহাসে এই ঝরোখা বড় বড় অনেক ভূমিকা পালন করে। তার মধ্যে একটি ভূমিকার কথা বলি– তিনজন মোগল সম্রাটকে প্রতিদিন সকালেই প্রমাণ করতে হত যে এখনও জীবিত। তাঁর মৃত্যুর খবর রটে গেলে অন্তর্কলহে সারা ভারত লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার ভয়। কিন্তু আজও সম্রাট জীবিত– এটা প্রমাণ করার উপায় কী?

সহজ উপায় ছিল একটাই। প্রতিদিন ভোরে সূর্যোদয়ের আগেই সম্রাট এসে দাঁড়াতেন এই রকম কোনও ঝরোখায়। রাজদর্শনৈর আশায় ওই ঝরোখার নীচে এসে জমায়েত হত কয়েক হাজার অনুগত প্রজা। আকবর, জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানকে তাঁদের রাজশাসনকালে এসে দাঁড়াতে হত ঝরোখায়।
এইভাবে দর্শন দিতে বেজায় ভালোবাসতেন সম্রাট জাহাঙ্গীর। নবীন সূর্যের কমলা রঙের আলো এসে পড়ত সম্রাটের পাগড়ির সামনে সূক্ষ্মভাবে গাঁথা ঝুলন্ত হিরের ওপর। ঝিকমিক করে উঠত পাগড়ির দু’পাশ থেকে ঝুলন্ত মুক্তোর সারি। ডান হাত তুলে সম্রাট অভিবাদন জানাতেন সমাগত প্রজাদের। আশীর্বাদও করতেন। একেই বলা হত ‘ঝরোখা দর্শন’।

১৯১১ সালের দিল্লি দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ যখন ভারতের সম্রাট হিসেবে নিজেকে উপস্থিত করলেন দিল্লিতে, তখন তিনিও যেন সেই প্রাচীন মুঘল আচারকেই নতুনভাবে মঞ্চস্থ করলেন। পুনরাবৃত্তি দেখা গেল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজনীতিতেও। রাজপ্রাসাদের ঝরোখায় দাঁড়িয়ে ইংরেজ সম্রাট দূর থেকে সমবেত প্রজাদের দিকে হাত নাড়লেন। সঙ্গে ছিলেন রানি মেরি। ঝলমল করছিল রাজমুকুটের রত্ন, আর নীচে বিস্তৃত জনসমুদ্র তাকিয়ে ছিল সেই ঐশ্বর্যময় দৃশ্যের দিকে।
৪.
আবার ফিরে আসি হাল্লা রাজ্যে। ঝরোখার তলাটা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে– যাতে নীচ থেকে দেওয়াল বেয়ে ওপরে উঠে, কেউ ঝরোখায় চড়তে না পারে। ফলে ঝরোখায় উঠে এসে হাল্লার রাজাকে আক্রমণ করা অসম্ভব। এই ধরনের ঝরোখার আধুনিক নাম– ক্যান্টিলিভার ব্যালকনি। যে বিমগুলো হাল্লার দুর্গের দেওয়াল থেকে বেরিয়ে এসে ঝুলন্ত বারান্দাকে ধরে রেখেছে– সেই বিম-এর নাম ক্যান্টিলিভার।
সেলিম সিং-এর হাভেলির ঝরোখার তলায়, ক্যান্টিলিভারগুলোকে এমনভাবে তৈরি যে ওইগুলো পার হয়ে রাজামশাইয়ের ঘর অবধি পৌঁছনো অসম্ভব। এই হাভেলিতে অলংকৃত ক্যান্টিলিভার থাকত অলঙ্ঘনীয় বাধা হিসেবে।
মগনলাল মেঘরাজের কাশীর বাড়িতে ঢুকতে হয় সবুজ রঙের একটা দরজা দিয়ে। সেই দরজা দিয়ে উঠোনে ঢুকলেই চোখে পড়ে মাথার ওপর একটানা ঝুলন্ত বারান্দা। সেই সবুজ বারান্দার তলায় জমজমাট কাজ করা অলংকরণ ক্যান্টিলিভার। ফলে ওই অলংকরণ ক্যান্টিলিভার পেরিয়ে, বারান্দায় উঠে, কোনও শত্রু মগনলাল মেঘরাজকে আক্রমণ করতে পারবে না।

ফলে হাল্লার রাজামশাই আর কাশীর মগনলাল মেঘরাজ– দু’জনেই একই ধরনের আর্কিটেকচারাল অবস্ট্রাকশন বা স্থাপত্যগত বাধা দিয়ে সুরক্ষিত।
সালেম সিং-এর হাভেলি তৈরি হয়েছিল জয়সলমীরের দূর্গের অনেকটা বাইরে। সুতরাং, আসলে এই হাভেলির সঙ্গে কিন্তু রাজপ্রাসাদের কোনও সম্পর্কই ছিল না। তা সত্ত্বেও এই হাভেলিকে কেন আমরা এতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? কারণ, এর ঝুলন্ত বারান্দাগুলো দেখলেই বোঝা যায়, কেন এই হাভেলির ঘরগুলোর মধ্যে সূর্যের আলো এত কম আসে। সালেম সিং-এর হাভেলির ছায়াময় ঘরগুলোর সঙ্গে হাল্লার রাজার ঘরের অন্ধকারের সাদৃশ্য আছে। যা কিনা আদপে সালেম সিং-এর হাভেলির ঘরের মতো। হাভেলির ঘরের মধ্যে যেমন ছায়ার ঘনত্বের পরিমাণ ঠিক তেমনই ছায়া তৈরি করা হয়েছিল হাল্লার রাজার ঘরে।
হাল্লার রাজপ্রাসাদের সব ঘরই ছিল আবছায়া অন্ধকার। তাই হাল্লার ইনডোর শুটিংয়ে, লাইট সেট আপের সূত্র হিসেবে সালেম সিংয়ের হাভেলিই ছিল সত্যজিৎ রায় ও সৌম্যেন্দু রায়ের কাছে আদর্শ রেফারেন্স।

হাল্লার কেল্লায় তো ঝরোখার ছড়াছড়ি। সেখানে ঝরোখা কতোটা আলো কমিয়ে দিতে পারে– সে কথা মাথায় রেখেই, হাল্লার সমস্ত অন্তর্দৃশ্যে লাইট সেট আপ করেছিলেন সৌম্যেন্দু রায়। তাই এই আলোক-সম্পাত ভীষণভাবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি। কারণ স্থাপত্যের সূত্র মেনে লাইট সেট আপ করা হয়েছিল। গল্পের সঙ্গে, আর্কিটেকচার এবং তার সঙ্গে আলোকসম্পাত– মানব জ্ঞানের এই তিনটি ধারাকে মেশানো হয়েছে। সত্যজিৎ রায়ের পরিকল্পনায়, পরস্পর বিপরীত-ধর্মী এই তিনটি ধারাকে অনায়াসে মিশিয়ে দিয়েছেন সৌম্যেন্দু রায়।
শুটিংয়ের প্রায় দু’বছর আগে লোকেশন দেখে ঘর হাল্লারাজার ঘর চিহ্নিত করে রেখেছিলেন সত্যজিৎ রায় ও সৌম্যেন্দু রায়। ফলে তাঁরা ঘর, জানলা, ঝরোখা, সূর্যের কোণ, ছায়ার চলন– সব কিছু আগেই মানসচিত্রে ছকে রাখতে পেরেছিলেন। এটাই হল ভিজুয়াল প্রি-কম্পোজিশন। কারণ এটাই ছিল ওই যুগল মূর্তির মোডাস অপারেন্ডি।

ঠিক একই কায়দায়, ‘শতরঞ্চ কে খিলাড়ী’ ছবিতে লখনউয়ের রেসিডেন্সি-তে ব্রিটিশ অফিসারদের যে পরপর ঘরের সারি– তার মধ্যে কোনটা ছিল লর্ড উট্রাম-এর আপিস ঘর– সেটা আগেই দেখে এসেছিলেন সত্যজিৎ ও সৌম্যেন্দু রায়। সেই ঘরের পশ্চিম দেওয়ালের বিরাট জানলার বাইরেই ছিল বাগান। সেই বাগানে কত বিরাট বিরাট গাছপালা ছিল– সেটাও দেখেছিলেন ওঁরা। ফলে, লখনউ শহরে, ফেব্রুয়ারি মাসে, বিকেল সোয়া চারটের আলো এত সুন্দর তৈরি করেছিলেন সৌম্যেন্দু রায়।
পশ্চিম দেওয়ালের বিশাল জানলার বাইরে বাগান ও বিরাট গাছপালা– এটিই তৈরি করে ন্যাচারাল লাইট মড্যুলেশন সিস্টেম বা প্রাকৃতিক ভাবে আলো নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি। বড় বড় গাছ আলোকে সরাসরি ঘরে আসতে দেয় না অর্থাৎ, ফিল্টারের কাজ করে এবং পাতার ফাঁক দিয়ে চলমান আলো, ছায়া ফেলে ঝিরিঝিরি। ফলে এই সবকটা মিলে তৈরি হয় সেই মেলানকোলিক গোল্ডেন ওয়াশ, যা ঐতিহাসিক বিষাদ, পতন ও স্মৃতির আবহ গড়ে তুলেছিল এত সুন্দরভাবে।
কাজেই হাল্লার রাজামশাই আর লর্ড উট্রাম-এর ঘরের লাইট সেট আপ করা ছিল বেশ দুরূহ। যে লোকশন সামনে নেই– সেটা কল্পনা করে নিয়ে ইনডোরে লাইট সেট আপ করতে পারা, একজন সার্থক সিনেম্যাটোগ্রাফারের কৃতিত্ব।
প্রতিদিনই বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে নানা বেদনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাই সমস্ত মানুষ– সাধারণ বা অসাধারণ, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে পরিবেশের সঙ্গে। তাই বাস্তবধর্মী দৃশ্যে, চরিত্রদের গালে বা চুলে আলো ফেলে পরিবেশ থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা হয় না।
কিন্তু গুপীর গানের মন-মাতানো সুর এবং বাঘার ঢোলের বোল শুনতে শুনতে হাল্লার সেনাবাহিনীর মানুষরা আকস্মিক মুক্তির স্বাদ পেল; মুক্তির আনন্দ অনুভব করল।
মুক্তির আনন্দ অনুভব করার এই মুহূর্তটাকে চিহ্নিত করা হল নতুন সূর্যের আলো গুপী আর বাঘার পূর্বদিক-মুখী গালে আলো ফেলে; সৈনিকদেরও পূর্বদিক-মুখী কাঁধে আর গালে সাদা আলোর আউটলাইন দিয়ে।

এই সাদা আলোর আউটলাইনের সাহায্যেই প্রাত্যহিক জীবনের গ্লানি থেকে তারা মুক্ত হয়ে গেল। সুতরাং, গ্লানি-মুক্তির শৈল্পিক হাতিয়ার হচ্ছে গালে আর চুলে-ফেলা উজ্জ্বল আলো। মুক্তির মুহূর্তটা চিহ্নিত করাই সাদা আলোর কাজ।
কাজেই, আলো কেবল দৃশ্যমানতার জন্য নয়, তা ভাবনার নির্মাণও। যেমন, ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ উজ্জ্বল সাদা আলো ব্যবহার করে গুপী-বাঘাকে পরিবেশ থেকে আলাদা করে তোলা হয়েছে। পিছন দিক থেকে আসা সেই আলোর সরু প্রান্তরেখা তাদের শরীরকে অন্ধকার বা কুয়াশাময় পটভূমির ওপর স্পষ্ট করে তোলে। ফলে চরিত্ররা হয়ে ওঠে এক ধরনের রূপক– অবাস্তবের ভিতরেও আলাদা, দৃশ্যের ভিতরেও কেন্দ্রস্থ। ওই সাদা আলো এক নায়কোচিত দূরত্ব তৈরি করে। সেখানে চরিত্ররা ঘটনার ভেতরে থাকলেও, ঘটনাকে ছাড়িয়ে দাঁড়ায়।

আধুনিক যুদ্ধ-ফোটোগ্রাফির ভাষা দেখে নেওয়া যাক। প্যালেস্টাইনের ফোটোগ্রাফার সামার আবু এলুফ (Samar Abu Elouf), যিনি মূলত ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর জন্য কাজ করেন। বিশেষত ২০২৫ সালের যুদ্ধ-পরিস্থিতির ছবি তিনি তুলতে গিয়ে, কোনও চরিত্রের মাথার পিছনে উজ্জ্বল আলোর রেখা দিয়ে বিচ্ছিন্নতাকে এড়িয়েছেন। যার ফলে তাঁর ছবিতে মানুষ কখনই পরিবেশ থেকে আলাদা হয়ে ওঠেনি। বরং ধ্বংসস্তূপ, ধুলো, ধোঁয়া, ভাঙা কংক্রিট– সব কিছুর সঙ্গে একাকার হয়ে থেকেছে।

মাথার পিছনে উজ্জ্বল আলোর অনুপস্থিতি এই ছবিগুলোকে নান্দনিকভাবে কম আকর্ষণীয় করেনি বরং আরও নির্মম করে তুলেছে। কারণ, আলাদা করে চিহ্নিত না হওয়ায় মানুষটি আসলে যুদ্ধের পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির অংশ। তাঁরা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে এখন শ্বাস নিতে থাকা অবশিষ্ট কয়েকটা শরীর মাত্র। এটি এমন এক বাস্তব, যেখানে মানুষ ও ধ্বংসস্তূপ– দুটোই একই আলোর, একই ধুলোয় ঢাকা। সাধারণ মানুষ কোনওভাবেই নিজেকে সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারছে না। তাই সেখানে মুক্তির আলো ভ্রান্ত।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন সুদেষ্ণা গোস্বামী-র অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved