goalkeepers: the ultimate protectors in football | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

ডানা মেলা নিঃসঙ্গ ঈগলেরা

পেশাদারি গোলকিপারের দুনিয়া কিন্তু কম কাব্যিক নয়। ব্রাজিলের গোলকিপার অ্যালিসন বেকারের মনে হয়– তেকাঠির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি শুধুমাত্র গোলই সুরক্ষিত রাখেন না, বরং আগলে রাখেন গোলের পিছনে থাকা নিজের মানুষদেরও। যেন গড়ে ওঠে এক আত্মীয়তার বন্ধন। বিশ্বকাপের ম্যাচে সমস্ত দেশের গোলের প্রহরীরও কি তেমনই মনে হয় না?

Published by: Robbar Digital

Posted:June 25, 2026 6:06 pm | Updated:June 25, 2026 7:13 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

‘লেভ ইয়াসিন! চেনেন? হ্যাঁ! ওরকম যদি হওয়া যায় না! শালা… শালা… শালা একটা চাকরি!’

শীতল দাসকে মনে আছে? ‘গৃহযুদ্ধ’ চলচ্চিত্রের অন্যতম আকর্ষণীয় এই চরিত্রের কাছে কলকাতার ডিভিশন লিগে প্রথম খেলার সুযোগ আসে। খেপ, পাড়ার ক্লাবের গণ্ডি পেরিয়ে এসে কলকাতায় ছোট দলে সুযোগ পাওয়া এই গোলরক্ষক স্বপ্ন দেখে কিংবদন্তি লেভ ইয়াসিনের মতো খেলার। অথচ দরকার একটা চাকরি! চাকরির টোপ দেখিয়ে খারাপ কাজে শীতলকে জড়িয়ে দেয় প্রভাবশালীরা। প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের ইয়াসিন হওয়ার স্বপ্ন বেহাত হতে থাকে, মেলে না চাকরিও। ছোট দলের দুর্গ আগলানো গোলকিপারের জীবনের গল্প বোধহয় এমনই। পদে পদে অনিশ্চয়তা। অলীক স্বপ্ন আর রুক্ষ বাস্তবের সংঘাত।

zoom
লেভ ইয়াসিন

তবুও স্বপ্ন দেখতে হয়। শুধু নিজের লালিত স্বপ্নই নয়। বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো আসরে গোটা দেশের স্বপ্নের ভার বইতে হয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল, পিছিয়ে থাকা দলের গোলকিপারদের। গল্পটা সবার জানা। অমোঘ নিয়তির মতোই ধেয়ে আসবে বিপক্ষের রাশি রাশি গোলা বারুদ তুল্য আক্রমণ। আর তেকাঠির নিচে বুক চিতিয়ে, লাফিয়ে, ঝাঁপিয়ে রুখে দিতে হবে সেসব। পারলে সেদিনের মতো নায়ক, আর ভুল হলে ক্ষমা নেই। এদুয়ার্দো গ্যালিয়ানোর ভাষায়, গোলকিপার আসলে ‘শহিদ’ কিংবা ‘পাঞ্চিং ব্যাগ’। তার লড়াইয়ে সে নিঃসঙ্গ। তবুও ময়দান ছাড়া চলবে না কিছুতেই।

এবারের বিশ্বকাপ হয়তো হার না-মানা গোলকিপারদেরই। মেসি-রোনাল্ডো-এমবাপে-হালান্ডের মতো তারকারা গোলের নেশায় দুর্বার গতিতে ছুটে চললেও খবরে, সোশাল মিডিয়ায় জায়গা পাচ্ছে ভোজিনহাদের অদম্য লড়াই। হ্যাঁ, গ্রুপ এইচ-এর স্পেন বনাম কেপ ভার্দের খেলার পর থেকে ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ঘুরছে ৪০ বছর বয়সি ভোজিনহার গল্প। সৌজন্যে তাঁর সাতটি ‘সেভ’ এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার স্পেনকে রুখে দেওয়া। ইনস্টাগ্রামে রাতারাতি তাঁর ১৫ মিলিয়ন ফলোয়ার ছাড়িয়ে গিয়েছে। স্বদেশের সীমানা পেরিয়ে অ্যাঙ্গোলা, সাইপ্রাস, পর্তুগালের বিভিন্ন অনামী ক্লাবে খেললেও ফুটবল-জীবনের সায়াহ্নে এসে তাঁর আজ জগৎজোড়া খ্যাতি। তবে পরের ম্যাচেই ছবিটা কিছুটা আলাদা। যদিও কেপ ভার্দে হারেনি, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ভোজিনহাকে দু’বার পরাস্ত হতে হয়েছে। তাতে অবশ্য ভোজিনহার খ্যাতিতে প্রভাব পড়েনি। তাঁকে ঘিরেই আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ স্বপ্ন দেখছে পরের রাউন্ডে পৌঁছে নজির গড়ার। শেষ ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ সৌদি আরব।

zoom
তেকাঠির নিচে দুর্ভেদ্য ভোজিনহা

আশ্চর্যের ব্যাপার, ভোজিনহার উত্থানের দিনেই চাপা পড়ে গিয়েছিল সৌদির গোলরক্ষক মহম্মদ আল ওয়াইসের কৃতিত্ব। উরুগুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে ভর করেই সৌদি রুখে দিয়েছিল লা সেলেস্তেদের। ন’বার গোলরক্ষা করেছিলেন তিনি। অবশ্য তাঁর সঙ্গে গত বিশ্বকাপেই পরিচয় ঘটে গিয়েছে ফুটবল দর্শকের। সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথম ম্যাচে যখন সৌদি আরব আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেয়, তখন তেকাঠির দায়িত্বে ছিলেন তিনিই। সেবার পাঁচটি সেভ দিয়ে ছিনিয়ে নেন ম্যাচ সেরার শিরোপা। তবে এবার স্পেনের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে আল ওয়াইসকে হজম করতে হয়েছে চার-চারটে গোল। গোলকিপারদের তো এই অনিশ্চয়তার সঙ্গেই ওঠাবসা। তাই বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের শেষ ম্যাচে যখন আফ্রিকা ও এশিয়ার দুই দেশ মুখোমুখি হবে, তখন দুই গোলের নিচে নিজেদের সেরাটা দিতে মুখিয়ে থাকবেন ভোজিনহা এবং আল ওয়াইস। পরের পর্বে কোন দেশ যাবে– তার ভাগ্য হয়তো গড়ে দেবেন ওঁরাই।

zoom
সৌদি আরবের গোলরক্ষায় অবিচল আল ওয়াইস

ভোজিনহা কিংবা আল ওয়াইসের থেকে বেশ খানিকটা আলাদা এলয় রুমের গল্প। কুরাসাওয়ের অধিনায়ক এই গোলরক্ষকের আখ্যান ফিরে আসার। গ্রুপ ই-এর প্রথম খেলায় প্রবল শক্তিধর জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে পর্যুদস্ত হতে হয়েছিল এখনও সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা না-পাওয়া ক্যারিবিয়ান দ্বীপের এই জাতীয় দলকে। অথচ পরের ম্যাচেই ইকুয়েডরের বিরুদ্ধে কার্যত প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালেন রুম। বিশ্বকাপে নজির গড়ার খুব কাছে গিয়ে তিনি থামলেন ১৫টি সেভে। তাঁর সামনে শুধুই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ড (মতান্তরে, দু’জনেই সমান)। যদিও শুধুমাত্র ৯০ মিনিট খেলার বিচার করলে রুম এগিয়ে থাকবেন। হাওয়ার্ড ২০১৪ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এক্সট্রা টাইমে চারটে সেভ করেছিলেন। তবে পরিসংখ্যানই তো শেষ কথা নয়। সাত গোল খেয়ে পরের ম্যাচে ১৫ বার গোল বাঁচানো এক কথায় ঐতিহাসিক। এবং সেটাও ৩৭ বছর বয়সে। নেদারল্যান্ডস অনূর্ধ্ব ২০ এবং পিএসভি আইন্দোভেনের মতো দলের এক সময়ের সদস্য রুম ২০১৫ থেকেই কুরাসাওয়ের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ বেছে নিয়েছেন। আর দেশকে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে এসেই তাঁর এই নজির!

zoom
কুরাসাও গোলের নিচে এভাবেই অতন্দ্র প্রহরী হয়ে উঠেছেন এলয় রুম

দার্শনিক-সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু ফুটবলকে ভালোবেসেছিলেন রেসিং উনিভার্সিতার ডি’আলজের-এর জুনিয়র দলে গোলকিপার হিসেবে খেলার সময়ে। তেকাঠির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি টের পেয়েছিলেন, বুলেটের মতো ধেয়ে আসা শটের অপ্রত্যাশিত, অনিশ্চিত গতিবিধি। এই অনিশ্চয়তার উপলব্ধিই কি গড়ে দিয়েছিল তাঁর অ্যাবসার্ড দর্শনের অভিমুখ? এ-প্রশ্নের যথাযথ উত্তর জানার উপায় নেই। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে তাঁরই জন্মভূমির হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা লুকা জিদান নিশ্চিতভাবেই ফের অনুভব করেছেন বলের এই অপ্রত্যাশিত গতিবিধি। গ্রুপের প্রথম ম্যাচে তাঁর জন্য দুঃস্বপ্নের রাত নিয়ে হাজির হয়েছিলেন লিওনেল মেসি। অনেকটা লাফিয়ে বলে আঙুল ছুঁইয়েও মেসির দূরপাল্লার শট তিনি বাঁচাতে পারেননি। এর পরে নিজের দলের ডিফেন্ডারদের আড়াল থেকে আর্জেন্টিনার ম্যাক অ্যালিস্টারের বাঁক নিতে থাকা গতিময় শটকে লুকা ঠিক মতো প্রতিহত করতে না পারায় বল ছিটকে আসে, আর ওত পাতা শিকারির ক্ষিপ্রতায় বল জালে ঠেলে দেন মেসি। লুকা তখন নীরব দর্শক। সোশাল মিডিয়ায় লুকা জিদানের সমালোচনাও হয়। অথচ বিশ্বকাপের আগে আলজেরিয়াকে বেশ কিছু ম্যাচে অপরাজিত রাখার পিছনে তাঁর ভূমিকা তো কম নয়। কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের পুত্র নিশ্চয়ই ঘুরে দাঁড়াবেন। তাঁর হয়তো মনে পড়বে বাবার এক সময়ের সতীর্থ রোনাল্ডো নাজারিও-র ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনালের গোলের কথা। রিভাল্ডোর অপেক্ষাকৃত কমজোরি শট এমন ভাবেই ঠিকরে বেরিয়ে এসেছিল জার্মান কিংবদন্তি অলিভার কানের হাত থেকে। আর সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকারের মতোই বল জালে জড়িয়ে ছিলেন ‘এল ফেনোমেনো’। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না কান! কার্যত তখনই ঠিক হয়ে গিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য। গোলকিপারের জীবন তো এমনই!

zoom
‘এল ফেনোমেনো’-র কাছে পর্যুদস্ত অলিভার কান, ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনাল

অনিশ্চয়তায় মোড়া ছিল ইরানের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান। বিবাদমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আয়োজক রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে চূড়ান্ত বৈরিতা এবং অসহযোগিতা ছাড়া তারা কিছুই পায়নি। বিশ্বকাপের আগে থেকেই মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, ফিফার হাত গুটিয়ে নেওয়া মনোভাব, ভিসা নিয়ে টানাপড়েন– সব বাধা কাটিয়ে উঠে তারা বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে। এটাই ইরানের ফুটবল সমর্থকদের জন্য একটা বড় খবর ছিল। একদিকে মাঠের বাইরে লড়াই। ম্যাচ খেলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসতে হচ্ছে, খেলার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফের ফিরে যেতে হচ্ছে অন্য আয়োজক দেশ মেক্সিকোয়। এই হয়রানিতে তাঁদের খেলায় প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। কিন্তু মাঠের লড়াইয়েও ইরান নিজেদের উজাড় করে দিচ্ছে। দলের পিছন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী বেলজিয়ামকে রুখে দিয়েছে তাঁর বিশ্বস্ত হাত। ‘রেড ডেভিলস’-এর বিরুদ্ধে তিনি সাত বার গোল বাঁচালেও আলোচনার কেন্দ্রে একটি সেভ। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় হাত বাড়িয়ে ম্যাক্সিম ডি কয়পারের শট যে দক্ষতায় তিনি আটকে দেন, তাতে স্তম্ভিত হয়ে যান বেলজিয়ামের খেলোয়াড়রা। আর এরপর থেকেই সোশাল মিডিয়ায় তৈরি হয়েছে একাধিক ‘মিম’। বলা হচ্ছে, হরমুজ প্রণালীর মতোই ইরানের গোলদুর্গকে রুদ্ধ করেছেন আলিরেজা।

zoom
বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের অসহযোগিতার জবাব যেন ইরানের আলিরেজার পারফরম্যান্স

তবে আলিরেজার কৃতিত্ব বিশ্বকাপে এই প্রথম নয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে রুখেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পেনাল্টি। এছাড়াও তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দু’টি বিশ্বরেকর্ড। ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই কিপার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে বল থ্রো করেছেন ২০০ ফিটেরও বেশি দূরে, আর তাঁর ড্রপ কিক পৌঁছেছে প্রায় ২৫৬ ফিট দূরে! দরিদ্র যাযাবর পরিবার থেকে উঠে এসে ফুটবল খেলার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন তিনি। বাবার অমতে। ছোটবেলায় পাথর ছোড়া খেলার অভ্যেস থেকেই শিখেছেন হাতের জোরে বলকে দূরের নিশানায় পাঠাতে। ফুটবল খেলার লক্ষ্যে অবিচল থেকে পেট চালাতে ধুয়েছেন গাড়ি, পিৎজার দোকানে কাজ করেছেন। রাতে ঝাড়ু নিয়ে রাস্তা সাফ করেছেন। সব প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে ফুটবলে সাফল্য পাওয়ার পরে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এবারও গোটা দেশের স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে গ্রুপ বৈতরণী পার হওয়াকে পাখির চোখ করছেন আলিরেজা। তাঁর অতন্দ্র প্রহরায় জেগে থাকছে ইরানের আশা।

zoom
বেলজিয়াম এভাবেই আটকে গিয়েছে আলিরেজার বিশ্বস্ত গ্লাভসে

আলিরেজার মতোই প্রবল লড়াইয়ের পরেও নিজেদের গ্রুপের দ্বিতীয় খেলায় হার বাঁচাতে পারলেন না লিওনেল। মেসি বা স্কালোনি নন। লিওনেল এমপাসি। ডিআর কঙ্গোর গোলরক্ষক। গোটা ম্যাচ জুড়েই আক্রমণাত্মক কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে তিনি গোল বাঁচালেন আটবার। শুধু তাই নয়, ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটের মধ্যেই করলেন পাঁচটি সেভ, যার মধ্যে অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে তাঁকে শরীর ছুড়ে গোলদুর্গ রক্ষা করতে হল। হামেস রডরিগেজ, লুইজ দিয়াজরা প্রথমার্ধে গোলের সন্ধান পেতে আর কী-ই বা করতে পারতেন! সামনে যেন দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলেছিলেন এমপাসি। যদিও শেষরক্ষা হল না। এমপাসির এই অদম্য প্রতিরোধ দ্বিতীয়ার্ধে থেমে গেল কলম্বিয়ার দলগত মুনশিয়ানার কাছে। একটা অনবদ্য আক্রমণ থেকে সুচতুরভাবে তাঁকে নড়ার সুযোগ না-দিয়ে গোল করে গেলেন মুনোজ।

zoom
কলম্বিয়া ম্যাচ জিতল, মন জিতলেন কঙ্গোর গোলকিপার লিওনেল এমপাসি

এমপাসির মতো এতগুলো সেভ না দিলেও ‘এল’ গ্রুপের খেলায় ইংল্যান্ডকে রুখে দেওয়াতে ঘানার গোলকিপার বেঞ্জামিন আসারের ভূমিকা কম নয়। তাঁর তিনটি সেভ শুধুমাত্র হ্যারি কেনদের আটকেই দিল না, পরের রাউন্ডে যাওয়ার আশা জোরদার হল ‘ব্ল্যাক স্টারস’-এর। অথচ বেঞ্জামিন আসারের হয়তো এই বিশ্বকাপে খেলাই হত না। গত ম্যাচে দলের এক নম্বর কিপার লরেন্স অ্যাটি-জিগি চোট পেতে মাঠে নামেন আসারে। দ্বিতীয় ম্যাচেও তিনিই ‘ক্লিনশিট’ বজায় রাখলেন।

zoom
বেঞ্জামিন আসারদের চক্রব্যূহে আটকে গেল হ্যারি কেনের ইংল্যান্ড

ফুটবল যত পালটেছে, তাল মিলিয়ে বদলেছে গোলকিপারের ভূমিকাও। রেনে হিগুইতার স্করপিয়ন কিকের দুঃসাহস কিংবা চিলাভার্ট বা রজারিও সেনির ফ্রি-কিক নেওয়ার দক্ষতা– গোলকিপারদের এরকম ছকভাঙা পারদর্শিতার নিদর্শন বড় বেশি নেই। তবে এখন অনেক বেশি করে চোখে পড়ে ‘বল প্লেয়িং’ কিপারদের। তাঁরা শুধুই ‘শট স্টপার’ নয়। খেলা শুরু হয় রক্ষণভাগের শেষ প্রহরীর পা থেকেই। ‘বল ডিস্ট্রিবিউশন’-এ কতটা নিখুঁত তাঁরা, কতটাই বা আক্রমণে সহায়ক ভূমিকা নেন, এসবই আধুনিক ফুটবলে গোলরক্ষকের দক্ষতা মাপার ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়। ইতিমধ্যেই আধুনিক ‘সুইপার কিপার’ ভূমিকায় আলাদাভাবে ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বজয়ী জার্মান গোলকিপার ম্যানুয়েল নয়ার। তাঁকে অনুসরণ করেছেন অনেকেই। আবার রাইনাস মিশেলস-জোহান ক্রুইফদের ছত্রছায়ায় থেকে যিনি গোলরক্ষকদের বিবর্তন নিয়ে সমানে কাজ করে গিয়েছেন, সেই ফ্রান্স হোয়েক-এর মতে, আধুনিক ফুটবলে ‘গোলকিপার’ নাম পালটে হওয়া উচিত ‘গোলপ্লেয়ার’। শুধুমাত্র গোলরক্ষাকে প্রাধান্য দিলে আজকের আধুনিক ফুটবলকে বোঝা যাবে না।

zoom
রেনে হিগুইতার বিখ্যাত স্করপিয়ন কিক

তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে গোলরক্ষার গুরুত্ব কিন্তু বরাবরই আলাদা মর্যাদা পেয়ে এসেছে। শুধুই ছোট দল নয়। গতবারের ফাইনালেও এমবাপের হ্যাটট্রিক, মেসির জোড়া গোলের থেকেও শেষ বিচারে বেশি অর্থবহ হয়ে উঠেছে এমি মার্তিনেজের শেষ মুহূর্তের একটি সেভ এবং টাইব্রেকারে অসামান্য পারফরম্যান্স। মজার ব্যাপার, উল্টোদিকে ফ্রান্সের গোলদুর্গে দাঁড়িয়ে হুগো লোরিস ম্যাচের মধ্যে এমির থেকে অনেক বেশি দলের নিশ্চিত পতন রোধ করলেও ফ্রান্সের হারের পরে তার আর গুরুত্ব থাকেনি। তাই ফুটবলের প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গোলকিপারের ভূমিকা বদলালেও হয়তো গ্যালিয়ানোর বলা কথাগুলো এখনও সত্যি। গোলকিপারের অস্তিত্বের স্বীকৃতি অনেক বেশি নির্ভরশীল এক একটা নির্ধারক মুহূর্তের ওপর।

zoom
এমি মার্টিনেজের সেভ, যা বিশ্বকাপ জিতিয়েছিল আর্জেন্টিনাকে

ভ্লাদিমির নবোকভের ভাষায়, গোলকিপার হল ‘দ্য লোন ঈগল, দ্য ম্যান অব মিস্ট্রি, দ্য লাস্ট ডিফেন্ডার’। আত্মজীবনী ‘স্পিক, মেমোরি’-তে ফেলে আসা দিনের স্মৃতিচারণায় তাঁর মনে পড়ে– কলেজ টিমে গোলরক্ষক হিসেবে গোলপোস্টে হেলান দিয়ে চোখ বুজে খেলার শব্দ শোনা আর কবিতা লেখার কথা ভাবার মুহূর্তগুলো।

zoom
ব্রাজিলের গোলকিপার অ্যালিসন বেকার

পেশাদারি গোলকিপারের দুনিয়াও কিন্তু কম কাব্যিক নয়। ব্রাজিলের গোলকিপার অ্যালিসন বেকারের মনে হয়– তেকাঠির নিচে দাঁড়িয়ে তিনি শুধুমাত্র গোলই সুরক্ষিত রাখেন না, বরং আগলে রাখেন গোলের পিছনে থাকা নিজের মানুষদেরও। যেন গড়ে ওঠে এক আত্মীয়তার বন্ধন। বিশ্বকাপের ম্যাচে সমস্ত দেশের গোলের প্রহরীরও কি তেমনই মনে হয় না? তাঁদের এক একটা সেভে তৃপ্তির হাসি হাসবেন দেশের সমর্থকেরা, আর বল জালে জড়িয়ে গেলে সবার মুখে নেমে আসবে বিষণ্ণতা। গোলকিপারদের জন্য বিশ্বকাপ বয়ে নিয়ে আসে ‘মারাকানাজো’র দুঃসহ ইতিহাস, বারবোসা-র ভুলের জীবনভর হতাশা। আবার উল্টোদিকে দু’চোখে স্বপ্ন ও সাহস নিয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকেন আজকের রুম, ভোজিনহা, আলিরেজা, আসারেরা। নিঃসঙ্গ ঈগলের মতো ডানা মেলে দেশের মানুষের স্বপ্নকে আগলে রাখতে চান তাঁরা।

এই বিশ্বকাপ কি গোলকিপারদের হয়ে উঠতে পারে না?

Al Owais Alireza Beiranvand Alisson Becker Benjamin Asare Eloy Room Emiliano Martínez Fifa World Cup FIFAWorldCup2026 lev yashin Lionel Mpasi oliver kahn Rene Higuita Ronaldo Nazário Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Vozinha

Share this article on