animal love and animal-human interaction| Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

প্রেম বিপ্লব হলে, পশুপ্রেম রাষ্ট্রবিপ্লব

প্রেম শুধু মানুষে-মানুষে নয়, ভাগ্যিস মানুষে-পশুতে, পশুতে-মানুষেও হয়। প্রেমের যদি কোনও বর্ণপরিচয় থাকত, সেখানে কি জায়গা পেত না পশুপ্রেম? রাষ্ট্র নিজের খটখটে শাসনে সবসময়ই দূরত্ব রেখেছে পশুর সঙ্গে। সর্বশেষ উদাহরণ, পথকুকুরদের প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা। আমাদের অমলিন ভালোবাসার অধিকার শুধুই অফুরন্ত মানুষজাতিরই? পশুদের ভালোবাসা, পশুদের ভালোভাষা আমরা তবে শিখব কবে? 


প্রচ্ছদের ছবি: উদয় দেব

Published by: Robbar Digital

Posted:February 9, 2026 7:28 pm | Updated:February 9, 2026 8:23 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

প্রাণীদের দিকে বিস্ময়ে তাকায় মানবজাতি। মুগ্ধ হয়, মজা পায়, কাণ্ডকারখানা দেখে হাসে, রেগেও যায়, বন্দি করে, কেটে খায়। সূচে গেঁথে শরীরে ঢুকিয়ে দেয় অচেনা কোনও অসুখ। মানুষ যত ভাবে– প্রকৃতি তার একার, এই প্রকৃতিকে সে-ই বাতিল করতে পারে অথবা ঢেলে সাজাতে পারে, ততই জটিল হয়ে ওঠে মানুষদের সঙ্গে না-মানুষদের সম্পর্ক।

zoom
উদয় দেবের সাম্প্রতিক বই ‘মানুষ’, আসলে পশুর চোখ দিয়ে দেখা মানুষের অপকীর্তি

এরিক অ্যানটন পল ভন দানিকেন যা বারেবারে বলেছেন, মানবজাতির বৌদ্ধিক বিকাশ আদতে বহির্জগতের জীবদের হস্তক্ষেপ– তাই যদি হয়, তবে তো এত দ্বন্দ্ব থাকে না। মানুষ থাকে উচ্চতায়। নিচে, অনেক নিচে পড়ে থাকে কীটপতঙ্গ-কুকুর-বিড়াল-বাঘ-কাক-তিমি। সম্পর্ক সেখানে একটাই– শোষক ও শোষিতের। কিন্তু প্রকৃতিরই কোন অমোঘ নিয়মে ক্ষমতার এই পিরামিড, অবিচল থাকে না কিছুতেই। হাড়-জিরজিরে মা কুকুরটির পায়ে পায়ে ঘোরা রুগনতর বাচ্চাদের দেখে চোখে জল আসে মানুষের। গাড়ির ধাক্কায় আহত ময়ূরের পালক ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে মানুষ– সে ভাইরাল ভিডিও দেখে উল্লাসের বদলে বিবমিষা হয়। আর এখানেই ওলটপালট হয়ে যায় সমস্ত হিসেব।

প্রজাতিগত সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে না-মানুষদের ভালোবাসা যায় যত, হৃদয় তত ব্যপ্ত হয়, কোমল হয়। নিজের জীবনযুদ্ধের মতোই প্রাসঙ্গিক লাগে ওদের বাঁচার অধিকারের লড়াই। পথ চলতে কুকুর-বিড়ালকে খাবার-টাবার ছুড়ে দিলেও, ঘোষিত ‘অ্যানিম্যাল লাভার’-এর তকমা সেঁটে যাক– এমনটা অবশ্য চান না বেশিরভাগই। এ যেন অনেকটা সমাজে আউটকাস্ট হয়ে পড়ার মতো ব্যাপার। বিশেষত দেশের উচ্চতম আদালতই যেখানে জানিয়ে দিয়েছেন, রাস্তা মানুষের একার। বিছিন্নতাই উৎকৃষ্টতা। এবং নিজেকে উন্নততর জীব প্রমাণ করার খেলায়, প্রথম টাস্কই হল অন্যের হকের জমি কেড়ে নেওয়া। তাছাড়া নিজেকে ‘পশুপ্রেমী’ বলে মেনে নেওয়া মানেই তো হৃদয়ের গোপনতম কুঠুরিটির হালহদিশ জানিয়ে দেওয়া সকলকে। এক পৃথিবী লোকের সামনে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানান দেওয়া যে, আমি দুর্বল। ছিঁচকাঁদুনে। শিশু।

zoom
শিল্পী: উদয় দেব

বছর দশেক আগের এক ঘটনা মনে পড়ে। রাস্তা পেরতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কায় আহত হয়েছে এক বিড়াল। তার শেষ মুহূর্ত কয়েক দেখতে হাজির উদগ্রীব জনতা। চেনা লোকেরা যারা রয়েছে উপস্থিত, বিড়াল দেখছে একবার আর একবার আমায় দেখছে। কারণ আমি তো যেকোনও মুহূর্তে কেঁদে ফেলতে পারি। ফেটে পড়তে পারি বিস্ফোরকের মতো। দেখার বস্তু আমিই। প্রিয় বন্ধু আর দূরের অচেনা কোনও অ-মানুষী প্রাণ– দুইয়ের মৃত্যুতেই সমপরিমাণ কান্না তোলা থাকে যার ভাঁড়ারে।

এ অবস্থায় এক দাদা বলল, ‘আরে, রোজ কত মানুষ মরে যাচ্ছে, এ তো বিড়াল!’ ওই প্রথম। পরের বছরগুলোয় না-জানি কতবার শুনলাম এই একই কথা। মানুষের পৃথিবী। তাই পৃথিবীর শেষ মানুষটি রোটি-কপড়া-মকান পেলে তবেই পৃথিবীর প্রথম পশুটির স্থানসঙ্কুলান সম্ভব। তার আগে পর্যন্ত মানুষ যেটুকু মাটি ছাড়ছে জগতের তামাম পশুদের, সবটাই দয়াপরবশ হয়ে। যদিও স্বজাতির মধ্যে কাদের জায়গা দেওয়া যায়, তা নিয়েও মানুষের বড় নাকউঁচু ভাব। ধর্ম, জাতি, গায়ের রং– কতখানি মিললে যে ‘নিজের লোক’ বলে কাছে টানা যায়, যুগ যুগ ধরেই সে হিসেব নিষ্পত্তির চেষ্টায় মানুষ হিমশিম।

zoom
শিল্পী: উদয় দেব

মানুষের পৃথিবী। তাই শিশুর জীবনের শুরুতেই বাংলা ব্যাকরণ বই ভাষার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে জানিয়ে দেয়, পশুপাখির ডাক ভাষা নয়। ভৌ ভৌ, গরর্, ফ্যাঁশ, পিক পিক, হাম্বা– কিস্যু না! রিডান্ডেন্ট! অর্থহীন। বরং মানুষের বাগ্মীতা থেকে কাঁচা খিস্তি– ভাষার আওতায় পড়বে সব। অথচ এই সংজ্ঞা তো একথাও বলে যে, ভাষা হয়ে উঠতে গেলে তাকে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারা চাই। মা বিড়াল সন্তানকে যে নরম, উষ্ণ শব্দে ডাকে, শত্রুর সামনে রোঁয়া ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে তো সে-ভাষা বলে না! রাতপাহারায় বেড়িয়ে কুকুর যে জোরালো ভাষায় নিজের উপস্থিতি জানান দেয়, চিরপরিচিত মনিবের বুকে দুই পা তুলে দাঁড়িয়ে তো সে ভাষা বলে না। বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে মরা সঙ্গীর দেহ ঘিরে কাকেদের যে জোরালো প্রতিবাদ, তার কর্কশ ভাব খানিক হলেও ফিকে হয়ে যায় আকাশে ওড়ার সময়ে। টুকরো টুকরো ছড়িয়ে পড়ে শূন্য জুড়ে– কা… কা… কা…

পায়রাদের খাওয়ানো যাবে না। খাওয়ালেই তাদের থেকে একশোরকমের ঝকমারি রোগ ঢুকে পড়বে। কুকুরদের খাওয়ানো যাবে না। নয়তো পথচারী মানুষ পেলেই কামড়ে দেবে। ইঁদুর কাগজ কেটে দেয়, টিয়াপাখি ফসল নষ্ট করে, বিড়ালরা তো এমনিই চোর! ভালোবাসার চেয়েও ঢের বেশি কঠিন– ভালোবাসার সপক্ষে জবাবদিহি করা। পশু নির্যাতনের ভয়াবহতা আর খাদ্যশৃঙ্খলের অনিবার্যতার মাঝে যে সূক্ষ্ম পার্থক্যের রেখা, তা বারেবারে চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো।

একটি বিশেষ কেস সিনারিও ধরা যাক। উচ্চবংশজাত পুরুষের বীর্য ব্যবহার করে গর্ভধারণ করানো হচ্ছে উচ্চবংশজাত নারীকে। ভ্রূণ তৈরি হলেই তা বিজ্ঞানের তাক লাগানো উপায়ে বের করে এনে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে নিম্নবংশের কোনও এক নারীশরীরে। যাতে শরীরের ভিতর সন্তানের বেড়ে ওঠার যন্ত্রণা থেকে দূরে থাকে উচ্চবংশের নারী। প্রস্তুত থাকে পরেরবার ব্যবহার হওয়ার জন্য। সন্তান জন্মানো মাত্রই অবশ্য তার অধিকার দুই মায়ের কেউই পাচ্ছে না– পাচ্ছে রাষ্ট্র।

শুনতে অস্বস্তিকর লাগছে কি? এ ঘটনা কিন্তু কোনও সদ্যপ্রকাশিত ‘ব্রেকিং’ ফাইলসের অংশ নয়। পদ্ধতির নাম ‘অ্যাক্সিলারেটেড ব্রিড ইম্প্রুভমেন্ট প্রোগ্রাম’। প্রাণী সম্পদ বিকাশ বিভাগের সৌজন্যে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় উচ্চজিনগত গরু তৈরিতে! আজ্ঞে হ্যাঁ, গরুই। যে গরু ‘মা’, যার দুধে সোনা ইত্যাদি। উক্ত সরকারি বিভাগটিরই নিদান অবশ্য– সম্মানে ভাটা পড়ে, তাই লেখার ক্ষেত্রে ‘পশু’ নয়, ‘প্রাণী’ শব্দটি অগ্রগণ্য।

একটি বলিউড সিনেমায় দেখানো হল (ধরা যাক, সিনেমার নাম ‘এক্স’), দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে গরিব শিশুদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে একটি সংস্থা। এই বেওয়ারিশ শিশুদের ব্যবহার করা হবে ল্যাব টেস্টিংয়ের কাজে। কারণ সম্প্রতি নিয়ম জারি হয়েছে, বাঁদর, কুকুর, গিনিপিগ– প্রভৃতির ওপর ল্যাব টেস্ট করা যাবে না। বহু নামী ব্র্যান্ডও আজকাল এড়িয়ে চলতে চায় এসব হুজ্জুতি। কসমেটিক্সের প্যাকেজিংয়েই জানিয়ে দেওয়া হয় গোটা গোটা ফন্টে ‘ক্রুয়েল্টি ফ্রি’! মানুষের এই পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত। তার হাতে ললিপপ মাত্র একটিই। একবার তা মানুষের হাত থেকে তুলে পশুদের হাতে দেওয়া চলে বড় জোর, আর একবার পশুদের হাত থেকে তুলে মানুষের!

zoom
বারবারা ড্যানিয়েলের ‘ডমিনিয়ন ওভার ম্যান’ সিরিজের একটি ছবি

আইরিশ শিল্পী বারবারা ড্যানিয়েল তাঁর ‘ডমিনিয়ন ওভার ম্যান’ সিরিজে দক্ষ শৈলীতে বদলে দিয়েছেন সমাজে মানুষ ও পশুর অবস্থান। দেখা যাচ্ছে, মানুষের চামড়া ছাড়িয়ে নিচ্ছে লোমওয়ালা শিয়াল। লাল পতাকা নাড়িয়ে মানুষে মানুষে লড়াই বাধাচ্ছে রিংয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা বড়মাথা ষাঁড়। মানবশিশুকে মায়ের বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাঁকা হাসিমুখের একদল শুয়োর।

এই প্রসঙ্গে যে বইটির কথা না বললেই নয়, তা হল স্বনামধন্য কার্টুনিস্ট উদয় দেবের ‘মানুষ’। বইয়ের নাম ‘মানুষ’ হলেও বই জুড়ে দেখা যায় পশুদের কাণ্ডকারখানা। তবে পশুরা এখানে নিকৃষ্ট নয়, বরং হয়ে ওঠে মানুষের প্রতিস্পর্ধী। দেখা যায়, রাস্তায় আচমকা মানুষ এসে পড়লে, গাড়ির চালকাসনে বসা শুয়োরটি বিরক্ত মুখে ‘মানুষের বাচ্চা’ বলে ওঠে! কালীপুজোয় মানুষের কোমরে কালীপটকা বেঁধে দিয়ে, মুখ টিপে হাসে কুকুর। কালো মানুষ পথ পেরিয়ে হেঁটে গেলে, বিড়ালরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে! দুঃখজনকভাবে বইটি কেবল মানুষদের হাতেই যাবে। অনুভূতিপ্রবণ হলে, সে-মানুষ বুঝতে পারবে যা-কিছু হিংস্র, বর্বর, নিষ্ঠুর, তা বোঝাতে হলে আমরা ‘পাশবিক’ কিংবা ‘জান্তব’ বলে থাকি ঠিকই। কিন্তু আদতে সভ্যতার আদিকাল থেকে পশুদেরকে ব্যবহার করে চলেছে মানুষই।

zoom
ছবি ও লেখা: উদয় দেব

সেখানেই অবশ্য এ প্রশ্নও থেকে যায় যে, তবে কি যতক্ষণ না চোখে আঙুল দেখানো হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ অনুধাবন করতে পারবে না তার কাজের পরিণতি? এ বইকে সে অর্থে অমানুষের পাঁচালি বলা চলে। আমরা যারা তকমাসাঁটা ‘অ্যানিম্যাল লাভার’ না হয়েও পশুদের ভালোবাসা থামাতে পারিনি কোনও মুহূর্তে, তারা এ বইয়ের মন বহন করে চলেছি বহুকাল ধরেই।

পশুপ্রেমের সবচেয়ে মুশকিল বোধহয় এখানেই যে, ভালোবাসার প্রসঙ্গে আটকে থাকার চেষ্টা করা যায় যত, তত বেশি মোড় ঘুরে যায় ওদের যাবতীয় না-পাওয়ার প্রসঙ্গে। প্রেমের সিংহভাগই ‘বিপ্লব’ হয়ে ওঠে। যদিও, অন্যজনের অপ্রাপ্তির যন্ত্রণায় নিজেও ভাগ বসানো ছাড়া ভালোবাসা আর কী-ই বা?

এ পৃথিবী ভালোবাসিতে জানে না। রাষ্ট্র কেবল বিছিন্নতাই চায়। মানুষে মানুষে, মানুষে পশুতে, সর্বতভাবেই। হয়তো তাই গ্রামীণফোনকে আলাদা করে পশুপ্রেম প্রচার করতে হয়। যেমন করে প্রচার করার প্রয়োজন পড়ে সমলিঙ্গের মানুষ অথবা প্রান্তিক লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের প্রেম, সামাজিক স্বীকৃতির আশায়।

একসময়ের জনপ্রিয় ডাইজেস্টিভ বিস্কুটের বিজ্ঞাপন বলত, ‘কুছ দূর হম আয়ে হ্যায়, কুছ দূর আপ ভি আইয়ে’। পশুদের পৃথিবী বোধহয় এমনই সামান্য কিছু দাবি করে মানুষের কাছে। সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহাবস্থান। মানুষের বাড়িঘর জঙ্গলে না-ঢুকে পড়লে, বাঘও আর হানা দেয় না লোকালয়ে। মানুষের হাইওয়ে গাছপালা তছনছ করে এগিয়ে না গেলে, গাড়ির পথও আগলে দাঁড়ায় না কোনও দাঁতাল হাতি। মানুষের মতো জটিলতার পরতে পরতে জড়ানো নয় পশুদের জগৎ। কেবলমাত্র খান দু’-তিন বিস্কুটের বদলে জীবনের সর্বস্ব মানুষের নামে লিখে দিতে পারে ওরা। ল্যাজ নাড়িয়ে জানিয়ে দিতে চায়, আমি তোমাদেরই লোক আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।

Animal animallovers barbara daniels Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Uday Deb Valentine's Day

Share this article on