
অন্যমনস্ক কবি আমি ধীরে ধীরে সমান্তরাল পথে গদ্যকার হয়ে উঠলাম। বয়স ত্রিশের কাছে। মোটামুটি ভালো জানি ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি আর ওড়িয়া। সন্তানকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাই মারাঠি আর বাংলায়, অফিসে হিন্দি, ওড়িয়া, ইংরেজি, বাড়িতে মারাঠি আর ইংরেজি; নানা ভাষার তির সঞ্চালনায় আমার চিত্তাকাশ আলো-অন্ধকার। এদিকে কবিতার পাশাপাশি যেসব আখ্যান-কাহিনি হয়ে গড়ে উঠছে আমার মনের মধ্যে, তাদের কোন ভাষায় লেখা যায়, বাংলা ছাড়া?
প্রচ্ছদের স্কেচ: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
কী দেয়নি আমাকে বাংলা ভাষা! যা কিছু নিয়ে আজ মাথা উঁচু করে নিজের মতো বেঁচে আছি, তার পুরোটাই। জীবনের ছ’টি দশক পার করে আজ যদি মনের শান্তিতে, আরামে, বাকি কয়েকটা বছর কাটানোর অভিলাষ মনে রাখি, তার নেপথ্যেও বাংলা ভাষা। যখন বয়স অল্প ছিল, কলকাতা ছাড়ার ইচ্ছে তীব্র হয়ে উঠেছিল নিজেকে বাঁচানোর জন্য। তখন এমন করে ভাষাকে বুঝিনি। মনে হয়েছিল, কলকাতার ছোট গণ্ডি পেরতে পারলেই সব। মুক্তি। কাজের। চিন্তার। তখন কবিতাই লিখি। পাশাপাশি কিছু গদ্য। এর তিন বছরের মধ্যেই জীবন উথাল-পাথাল। ভারত ঢুকে পড়ল আমার জীবনে, মনের ভিতর। মসূরির হিমেল জ্যোৎস্না রাত। হিমালয়ের বরফ ঢাকা বানরপুচ্ছ, কেদারনাথ আর নন্দাদেবী পর্বতশ্রেণি পিছনের দরজা দিয়ে দেখা যায়। গায়ে কাঁটা দেয়। শীতে নয়, বিস্ময়ে! ছোটনাগপুর মালভূমির বিস্তীর্ণ পিঙ্গল সবুজের প্রান্তে সারি সারি রুদ্রপলাশ। মহুয়া ঝরে পড়ার অস্ফূট শব্দ বনের ঘাসে। শালের বনে সকালের রোদ এসে ধুয়ে দিয়ে যায় রাত্রির স্মৃতি। তাদের সঙ্গে কাছে চলে এল অচেনা মানুষেরা, যাদের সঙ্গে নগরজীবনে দেখা হয়নি। কয়লা খাদানের শ্রমিক, খেত মজদুর, প্রান্তিক চাষি, দেশান্তরী ইটভাটার রমণী, বনের মধ্যে বাস করা জনজাতিরা, যাযাবর পশুপালকের দল।

নতুন স্বজনেরা এলেন জীবনেও। মহারাষ্ট্রীয় বর, তাঁর নিকটজনরা। কর্মসূত্রে বাংলা ছাড়ার সিদ্ধান্তে অশ্রু বিসর্জন করেছিলেন আমার বাবা-মা, বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্ক ছিঁড়ে যাবে বলে। তাঁদের বলেছিলাম, ভাষা যার মনে রাখার সে ভোলে না। এবার যখন মহারাষ্ট্রের কালো মাটির কার্পাস আর আখের অঞ্চলে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলাম, নীরব অশ্রু পরিণত হল হাহাকারে– হায়, আমাদের মেয়ে আর বাংলায় লিখবে না! যাঁরা আমাকে শৈশবে যত্ন করে শিখিয়েছেন বাংলা ভাষার অক্ষর, দীক্ষা দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের পাঠে, তাঁদের অশ্রু আমাকে সেদিন বিচলিত করতে পারেনি। অল্পবয়স, দারুণ সাহস, জেদও তেমন, মনে হয়েছিল– এসব কোনও সমস্যাই নয়।

দিন যায়। অন্যমনস্ক কবি আমি ধীরে ধীরে সমান্তরাল পথে গদ্যকার হয়ে উঠলাম। বয়স ত্রিশের কাছে। মোটামুটি ভালো জানি ইংরেজি, হিন্দি, মারাঠি আর ওড়িয়া। সন্তানকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাই মারাঠি আর বাংলায়, অফিসে হিন্দি, ওড়িয়া, ইংরেজি, বাড়িতে মারাঠি আর ইংরেজি; নানা ভাষার তির সঞ্চালনায় আমার চিত্তাকাশ আলো-অন্ধকার। এদিকে কবিতার পাশাপাশি যেসব আখ্যান-কাহিনি হয়ে গড়ে উঠছে আমার মনের মধ্যে, তাদের কোন ভাষায় লেখা যায়, বাংলা ছাড়া?

কিন্তু কোথায় আমার বাংলা ভাষা? সে যে কেবল বুকের মধ্যে, তাকে নিত্যদিন দেখা যায় না, যা ছিল সহজ সুলভ শৈশব-কৈশোরের সেই নিরন্তর কানে শোনা, তাও তো নেই! ভাষার রূপ আছে, ধ্বনি আছে, প্রতিদিনের সাহচর্য আছে, আমরা যেমন ভাষাকে লালন করি, ভাষাও আমাদের গড়ে। ভাষা গড়ে মানুষের ব্যক্তিচেতনা, সম্মিলিত ভাবনাকে, ভাষায় ব্যক্ত হয় জেদ, আবেগ, প্রতিজ্ঞা। বাঁধের জলাধার থেকে ছাড়া পাওয়া নদী যেমন নীরক্ত, ক্লান্ত, ক্ষীণা, ভাষা বলয়ের বাইরে দৈনন্দিন সংগ্রামের প্রতিকূল পরিবেশে ভাষারও তেমন পরাহত অবস্থা।

হয়তো ১০০ বছর আগে যখন বিদগ্ধ প্রবাসী সাহিত্যিকরা মাতৃভাষার চর্চা করতেন, তখন প্রবাসেও ঘরে ঘরে নিজ ভাষার চর্চা ছিল। কালক্রমে তা ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম– নিকটজনদের অশ্রুজলের অর্থ। দূরত্বে দাম্পত্য সম্পর্কও অমলিন রাখা যতখানি কঠিন, ভাষার চর্চা অটুট রাখাও তেমনই। আরম্ভ হল লড়াই। আমার সঙ্গে পরিস্থিতির। বাংলা অতি জঙ্গম ভাষা। কয়েক বছরের মধ্যে আর গতি, শব্দ ব্যবহার, প্রয়োগ বদলায়। কবিতার ছন্দ, রূপকল্প পরিবর্তন হয়। আমার লেখক-জীবনের ৪৫ বছরের মধ্যে ২৫ বছর কেটেছে ভাষা বলয়ের বাইরে, দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে। দুই পর্বের মধ্যে একটি দশক ছিলাম বাংলায়, যা আমার কলমে রক্ত সঞ্চালন করেছে। বাকি আড়াই দশক চলেছে এক কঠিন যুদ্ধ। যে কাছে নেই, সতত দৃশ্যমান নয়, তার সঙ্গে লিপ্ত থাকার লড়াই। বারবার ছুটে যাওয়া কলকাতায়, কিনে আনা সাম্প্রতিক লিটল ম্যাগাজিন, পড়তে থাকা বাংলা ক্লাসিক, সমসাময়িক লেখা। অস্তমিত হয়ে গেল ইংরেজি ও অন্য ভারতীয় সাহিত্যের পাঠ, আমার চিত্ত জুড়ে কেবল বাংলা। তার পাঠ। তার স্বগত উচ্চারণ।

সপ্তাহে সাতদিনই যায় কাজে আর পথে। অফিসে কাজের সময় লিখব না– এই প্রতিজ্ঞার ফলে লেখার সময় অল্প, সপ্তাহের শেষে, পথে, ট্রেনে, বিমানে। যাঁদের নিয়ে লেখা তাঁরা মহানগরের বাঙালি নন। ফলে বাঙালি পাঠকের বসার ঘরে ঢুকে আসে অচেনা বাকরীতির অপরিণত অনুবাদ। এল ছোটনাগপুরের কথ্য হিন্দি, গোণ্ড, কন্ধ, পরজাদের ভাষা। প্রথম উপন্যাস লেখা হল বিদেশে। ইংল্যান্ডের শীতে চোখের জল ফেলতে ফেলতে লেখা উত্তর ওড়িশার জঙ্গল-পাহাড়ের কাহিনি। আবার বাংলা বাঁচিয়ে দিল আমার লেখাকে। বাংলার উষ্ণ আলিঙ্গনে বাঁধা পড়ল কত মৌখিক ইতিহাস, কিংবদন্তি, স্থানীয় বিলুপ্ত গীতি ও কবিতা। অচেনা কত গ্রামীণ ডাকঘরে জমা পড়ল হাতে লেখা বাংলা গল্প-কবিতা। আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে মিশে গেল দেশ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা। মেলাল সেই বাংলা ভাষাই। এখন মনে করতে পারি ২০ বছর আগেও, কলকাতার পথে চলার সময় আমার কান উৎকর্ণ থাকত নানা ধরনের বাংলা শোনায়, ট্রামের ঘন্টি, বাসের চাকার কান্না, ট্রেনের বাঁশির শব্দে মিশে যাওয়া মুখের ভাষা, আর অন্যদিকে, বাংলার বাইরে কানে শোনা অন্য ভাষার স্প্লিনটার মিশে যেত বাংলা লেখার স্রোতপথে।

জন্মসময়ের মৃত্তিকার পুত্তলীতে প্রাণ দিয়ে বাংলা আমাকে নতুন করে নির্মাণ করেছে। বাংলাভাষা আমার জন্য কেবল ভাষা নয়, জীবন-বীক্ষণের এক বাস্তব উপাদান। বহু শতাব্দী ধরে বয়ে চলা বাংলার পরিবর্তনশীল নদীপথ, সীমান্তরেখা, প্রান্তিক জীবনের আখ্যানমালা, অত্যাচার, উচ্ছেদ, মন্বন্তরের রক্ত শুকিয়ে লেগে আছে এই ভাষার অবয়বে। আমার আগে এই ভাষায় লিখেছেন বড়ু চণ্ডীদাস, কৃত্তিবাস, মুকুন্দরাম, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, আমার আগে-পরে-সঙ্গে লিখে চলেছেন শত শত পদাতিক কবি-সাহিত্যিক, তাঁদের সংবেদন, মেধা, শ্রম, জীবনতৃষ্ণা বাংলাভাষাকে দিয়েছে অমিত প্রতিরোধ– স্পৃহা, প্রতিবাদের ভাষ্য লেখার সাহস, সময় পরিবর্তনের শঙ্খের নাদ। কেবল আবেগ দিয়ে বাংলা ভাষার শক্তি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। শৈশবেই দীক্ষা পেয়েছিলাম বলে আমার জীবনের পথ চলায় ভাষা আমাকে জড়িয়ে নিয়েছে। আজ যে আমি নিজের শর্তে বেঁচে আছি জেগে আছি জীবনে জড়িয়ে রয়েছি, তার কারণ বাংলা ভাষা আর বাংলা ভাষায় আমার আত্মপ্রকাশের অভিলাষ, যা বাংলা ও ভারতের বাস্তবের সঙ্গে আমাকে অন্বিত করে। এই অন্বয় নির্মাণ করে আত্ম-অনুসন্ধানের সজীব প্রক্রিয়া, যা লেখককে সাহস দেয়, মাথা উঁচু করে নিজের শর্তে বাঁচার। বহু পথ চলে বহু দেশ ঘুরে এক দশক হল আমি এসেছি বাংলায়। আমার সামনে এখন শান্ত সকালের সৌরভ। কেবল বাংলায় লেখা আর নানা ভাষার বই পড়া। দেশের নানা প্রান্তে মানুষের কাছে যাওয়া। জীবনে আর কোনও শর্ত নেই। মনে পড়ে, একদা ভোরের ট্রেন প্রতিবেশী রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলায় ঢুকলে ঘুমের আবেশের মধ্যেও আমি উৎকর্ণ হয়ে থাকতাম, যাত্রীদের ভাষা বদলে যাবে বাংলায়। এখন বাঙালি লেখকের জীবনে কোনও প্রতীক্ষা নেই, গন্তব্য এসে গিয়েছে। আমি পৌঁছে গিয়েছি পৃথিবীর শেষ স্টেশনে। চলা অবশ্য থামেনি।

বাংলা আমাকে দিয়েছে জীবনে যা কাঙ্ক্ষিত ছিল, তার সব। শাসকের কাল অতীত হয়, সাফল্য পরিণত হয় পুরাকীর্তিতে, ক্ষমতার খেলা শেষ হয়, বন্য উদ্ভিদ গজায় তার কঙ্কালে, রয়ে যায় কেবল অভিব্যক্তি, মুদ্রিত, আন্তর্জালে অক্ষরে লিপিবদ্ধ। অনশ্বর হয় মানুষের জীবনকাহিনি। অর্থ নয়, বৈভব নয়, সহযোদ্ধার বাড়িয়ে দেওয়া হাতের স্পর্শ পাই আমার পাঠকের হাসিতে, চোখের জলে, অনুচ্চারিত কৌতূহলে– আপনি তো লেখেন, তাই না?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved