
আদ্রিয়েঁর এই বিপ্লব ছিল বিপুল, কারণ এর আগে ফরাসি দেশে বা প্যারিতে শুধু পাবলিক লাইব্রেরি ছিল। সেখানে একমাত্র বসে বই পড়া যেত বলে, বিশ শতকের সভ্যতা এসে গেলেও কোনও সময়ই মহিলারা ঠিক সাহিত্যের পাঠক হয়ে উঠতে পারেননি। আর বেশিদূর লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না বলে তাঁরা নিজেরাও ঠিক নিজেদের বিকশিত করে উঠতে পারেননি। সাধারণ মানুষের বাড়িতেও বই থাকত না, বইয়ের এত দাম ছিল।
৫.
প্যারিতে বেশ কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্টেই জেমস জয়েস ছিলেন। কিন্তু আমরা বেছে নিয়েছি ৭১ রু দ্য কার্দিনাল লেমোইন। কারণ এখানে বসে তিনি ‘ইউলিসিস’-এর পাণ্ডুলিপি শেষ করেছিলেন। সেখান থেকে জয়েসকে অনুসরণ করে আমরা এসে পৌঁছেছি একটি বইয়ের দোকানে। ফরাসি প্যারিতে ইংরিজি বইয়ের প্রথম সম্ভার– শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি। ১৯১৯-এ সেই বুক শপ খোলেন আমেরিকা থেকে আগত আরেক অভিবাসী সিলভিয়া বিচ। আবারও বলি, ডাবলিন ও জুরিখের পরে প্যারিতে বসেই ‘ইউলিসিস’ লেখা শেষ করে তার পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন জেমস জয়েস। আর এই সিলভিয়া বিচই ১৯২২-এ প্রথম ‘ইউলিসিস’ প্রকাশ করেন। হেমিংওয়ের প্রথম বই ছাপা হওয়ার পেছনে সিলভিয়ার উৎসাহ ও সমর্থনই প্রধান। যখন আমরা সালোঁর কথাই বলছি, প্যারিতে যে বুক শপ সিলভিয়া খুলেছিলেন– সেটি সিলভিয়ার প্রেরণায় কীভাবে প্যারির অঁতেলেকত্যুয়ালদের ঝলমলে আখড়া হয়ে উঠেছিল, তা না বললে সেইনের লেফট ব্যাংকের আভাঁ গার্দ ইতিহাসের ছবি সম্পূর্ণ হবে না। যদি বোহেমিয়ান প্যারিতে গারট্রুডের সালোঁ ভিশ্যুয়াল আর্টের যতেক আইকনদের পীঠস্থান, শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি ছিল কবি ও লেখকদের জমায়েতস্থল। তবে এই ঝলমলানি ছিল বুদ্ধির, সৃজনীর। বৈভবের ছিল না কখনওই। এখানে এজরা পাউন্ড, পল ভ্যালেরি, অঁদ্রে জিদ, স্যামুয়েল বেকেট, টি এস ইলিয়ট ও আরও অনেক লেখক এসে পৌঁছতেন। এজরা পাউন্ডই তো জয়েসকে প্যারিতে ডেকে নেন। তাঁর হয়ে জোর প্রচার চালান তো বটেই, পুরনো জামাকাপড়, আসবাব দিয়েও জয়েসকে প্যারিতে থিতু হতে সাহায্য করেন পাউণ্ড। ফরাসি কবি-লেখকদের কাছে শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি খুবই আকর্ষণের ছিল। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে ইংরেজিতে কী কী নতুন লেখা হচ্ছে তাঁরা জানতে খুব উৎসুক ছিলেন। সিলভিয়ার মাধ্যমে তার হদিস এখানেই তাঁরা পেতেন ও জোর চর্চা চলত।

তবে শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি-র কথায় আগে বলে নিতে হবে ৭ নম্বর রু দ্য ওদিয়ঁ ঠিকানার বুক শপ La Maison des Amis des Livres-এর কথা। সেই বুক শপ ছিল আদ্রিয়েঁ মনিয়ের-এর। জয়েসের সঙ্গে হেঁটে আমরা যখন এসেই পড়েছি সিলভিয়ার কাছে, এইবার সিলভিয়ার পিছু নিয়ে দেখি কোথায় তিনি আমাদের পৌঁছে দেন।

সেটা ১৯১৭ সাল। সিলভিয়া তখন প্যারিতে আধুনিক ফরাসি সাহিত্য পড়েন। একটা গবেষণার কাজে তিনি মহিলা-চালিত La Maison des Amis des Livres-এর কথা পড়ে, সেখানে বই বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে বই বাড়ি নিয়ে গিয়ে পড়তেও দেওয়া হয় শুনে, ছুটে এসেছেন দোকানের মালিকের সঙ্গে দেখা করতে। নিজের একটা বইয়ের দোকান খোলা সিলভিয়ার স্বপ্ন। পরে সিলভিয়া তাঁর স্মৃতিকথায় বলবেন, ফরাসি দেশের প্রথম মহিলা-চালিত বইয়ের দোকান ছিল La Maison des Amis des Livres। আমরা আবার বেশ রগড় নিয়ে দেখছি একেবারে ফিল্মি সিচ্যুয়েশান।
“At a table sat a young woman. A. Monnier herself, no doubt. As I hesitated at the door, she got up quickly and opened it, and, drawing me into the shop, greeted me with much warmth… Although I was disguised in a Spanish cloak and hat, Adrienne knew at once that I was American. ‘I like America very much’, she said. I replied that I liked France very much. And, as our future collaboration proved, we meant it.
I was still standing by the open door when the wind blew her hat into the middle of the street. Adrienne rushed after it, going very fast for a person in such a long skirt. She pounced on it just as it was about to be run over, and, after brushing it off carefully, handed it to me. Then we both burst out laughing.”

পরিচিতির এই উষ্ণ সূচনা থেকে বিরাট এক ইন্টেলেকচ্যুয়াল কোল্যাবরেশানের শুরু। এবং সিলভিয়া ও আদ্রিয়েঁ পরস্পরের প্রেমে পড়েন। বইয়ের দোকান খোলার, যাকে বলে লজিস্টিকস বাতলে, রু দ্য ওদিয়ঁ-তে নিজের বুক শপের প্রায় উল্টোদিকের ঠিকানায় সিলভিয়ার দোকানের ব্যবস্থা করে দিয়ে ব্যবসা চালানোয় মেন্টরিং করেন। ফলে যেটা হল, তা শুধু দু’টি বুক শপ নয়, সামনের ফুটপাথ সমেত রু দ্য ওদিয়ঁ রাস্তাটাই লেখক-বুদ্ধিজীবীরা দখল করে নিলেন। যেন রু দ্য ওদিয়ঁ একটা ওপেন এয়ার সালোঁ– যেখানে ইউরোপ আর আমেরিকার ট্রান্স-অতলান্তিক আদানপ্রদান হচ্ছে। সেই আভাঁ গার্দ মণ্ডলীর নারী ও পুরুষদের কাছে সিলভিয়া ও আদ্রিয়েঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা লুকনো ছিল না। বরং জুটি হিসেবে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দুই দোকানকে একসঙ্গে একটিই প্ল্যাটফর্ম করে তুলতে পেরেছিল। ১৯৫৫-য় আদ্রিয়েঁর মৃত্যু পর্যন্ত ওঁরা একসঙ্গে এক বাড়িতেই থাকতেন।

আদ্রিয়েঁর বাবা ছিলেন পোস্টম্যান। একটা ট্রেন দুর্ঘটনায় পড়ে রেল কোম্পানির থেকে খেসারত হিসেবে যা পেয়েছিলেন, তার থেকে মেয়েকে তিনি বইয়ের দোকান খোলার জন্য একটা অংশ দেন। সেই দোকানকে শুধু বুদ্ধিজীবীর সালোঁ ভাবলে, আদ্রিয়েঁ বাড়িতে বই পড়তে দিয়ে যে মহাবিপ্লব করে ফেলেছিলেন, সেই ঐতিহাসিক ঘটনার মর্যাদা দিতে আমাদের ভুল হয়ে যাবে। আদ্রিয়েঁর এই বিপ্লব ছিল বিপুল, কারণ এর আগে ফরাসি দেশে বা প্যারিতে শুধু পাবলিক লাইব্রেরি ছিল। সেখানে একমাত্র বসে বই পড়া যেত বলে, বিশ শতকের সভ্যতা এসে গেলেও কোনও সময়ই মহিলারা ঠিক সাহিত্যের পাঠক হয়ে উঠতে পারেননি। আর বেশিদূর লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না বলে তাঁরা নিজেরাও ঠিক নিজেদের বিকশিত করে উঠতে পারেননি। সাধারণ মানুষের বাড়িতেও বই থাকত না, বইয়ের এত দাম ছিল। সিলভিয়ার স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়– আদ্রিয়েঁ প্রচার করতে পেরেছিলেন যে, বই কিনতে হলে আগে পড়ে নিতে হয়, তারপরে সেটা সংগ্রহ করতে হয়। আর আদ্রিয়েঁ তাঁর দোকান-কাম-লাইব্রেরিতে বহু সংখ্যক ফরাসি মহিলাকে শুধু বই নিতে ও ফেরত দিতে জড়ো করে ফেলেছিলেন।

কাজেই সিলভিয়া যখন তাঁদের বইয়ের দোকান-কাম-লাইব্রেরিকে বলেছিলেন ‘রিপাবলিক অফ লেটারস’, তা ১৭-১৮ শতকের ইউরোপ আমেরিকা জুড়ে রিপাবলিক অফ লেটারসের মহিলাবিহীন প্রজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিল। তেমনই ঘরোয়া মহিলাদের বইয়ের পাঠক করে তুলে সেই রিপাবলিকের একটা নিশ্চিত নতুন নারীবাদী সংজ্ঞা তৈরি হয়েছিল।
এত এত বইয়ের মাঝখানে আমরা এখন দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর একটা রিড বিটউইন দ্য লাইনস এসে হাজির হবে না– এ তো হতে পারে না। সিলভিয়ার দোকান থেকে ‘দ্য লিটারারি রিভিয়্যু’-র শেষ সংখ্যাটা নিয়ে গারট্রুড যেই না রুই দ্য অদিওঁ থেকে লুক্সেমবুর্গ গার্ডেনের পথ ধরেছেন, আমরাও চট করে সিলভিয়ার দোকান থেকে ১৯৩৩-এ লন্ডনে ছাপা হওয়া গারট্রুডের লেখা ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ এ বি টোকলাস’ বইটা কিনে হাঁটতে শুরু করেছি। অ্যালিস টোকলাসের আত্মজীবনী বলে গারট্রুডের লেখা অ্যালিসের জীবনী ব্যাপারটাই কথকের স্বর নিয়ে কথকের অবস্থান নিয়ে খেলা। অ্যালিসের চোখ থেকে গারট্রুড নিজেকে ও প্যারির অন্যদের দেখেছেন। এখনই পড়তে শুরু করার দরকার নেই। একটু পা চালিয়ে গেলে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ২৭ নম্বর রিউ দ্য ফ্লিয়ুরুসে গারট্রুডের সালোঁয় পৌঁছে যাওয়া যাবে। আমাদের হাতে সিলভিয়ার আত্মকথা ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’-ও রয়েছে কিন্তু।

গারট্রুডের সালোঁয় ঢুকে আমরা কিন্তু একটু অপ্রস্তুতই হয়ে গেলাম। এতক্ষণ রিয়ু দ্য ওদিয়ঁ-য় ছিলাম। রাস্তার এই পারে শেক্সপিয়রে সিলভিয়া নতুন নতুন ইংরিজি বই জোগান দিচ্ছেন, লন্ডন আমেরিকায় ছোট প্রেস থেকে বেরনো মডার্নিজম বিষয়ক আভা গার্দ জার্নাল এনে রাখছেন। অন্য পারে আদ্রিয়েঁর দোকানে ফরাসি নিরীক্ষামূলক আধুনিক সাহিত্য– সিম্বলিস্ট কবিতার সদ্য-বেরনো পাতলা বইটি যেমন আছে, তেমনই রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ অপ্রাতিষ্ঠানিক জার্নাল। তার মধ্যে সবাই ঘুরে ঘুরে নিজের মনোমত বই পছন্দ করছেন। আদ্রিয়েঁর সেই অনুযায়ী ইস্যু করে মেমো কেটে দিচ্ছেন। এই জমায়েত থেকে গারট্রুডের সালোঁয় এসে আমরা খানিক থিতিয়েই যাই। দেখি একদিকে পিকাসো, হেমিংওয়ে, মান রে থেকে শুরু করে তাবড় বোহেমিয়ান মডার্নিস্ট জিনিয়াসদের সঙ্গে টেবিলে বসে গারট্রুড স্বভাবসিদ্ধ বহুব্যঞ্জক দীর্ঘ দীর্ঘ বাক্য বলছেন। আর দূরে আর একটা টেবিলে জিনিয়াসদের বৌদের সঙ্গে এক জায়গায় বসে আছেন অ্যালিস। এটাই দস্তুর ছিল। সিলভিয়া যখন দেখা করতে যেতেন সালোঁ সময়ের বাইরে, অবশ্যই গারট্রুড ও অ্যালিস একত্রে বসেই কথা বলতেন। কিন্তু হেমিংওয়ে থেকে নাতালি বার্নে, বা এই জমায়েতে আসা যে লেখকরা এই দু’জনের কথা লিখেছেন যখন, তাঁরা গারট্রুডের সেক্রেটারি, কুক ও হাউসকিপার হিসেবে অ্যালিসের ‘সারাক্ষণ ছায়াসঙ্গী’র মতো উপস্থিতির থাকার কথাই বলেছেন।

এই সালোঁ নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেছেন, তাঁরা বার বার দেখিয়েছেন, মেধাদীপ্ততায় গারট্রুড নামক যে জ্যোতিষ্ক, তার ছায়ায় অ্যালিসের দায়িত্ব ছিল সবার আতিথেয়তা করা ও সালোঁ আইকনদের স্ত্রীদের সঙ্গে বাক্যালাপ। যেখানে পারফিউম, হ্যাট ও গাউনের ডিজাইন নিয়ে কথা বলতে বলতে অ্যালিস হাঁপিয়ে পড়তেন। সবচেয়ে অবাক হয়ে যেতে হয় ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি অফ এ বি টোকলাস’ বইটা পড়তে পড়তে। সেখানে অ্যালিসের জবানি ব্যবহার করে যখন নিজের বা গারট্রুডের বিষয়ে কোনও ঘটনা বর্ণনা করেছেন, গারট্রুড সেখানে যেন অ্যালিস নিজের কোনায় পড়ে যাওয়া পরিস্থিতি উপলব্ধি করছেন আর সেটাই বলছেন। কথকের স্ব-উক্তির মধ্যে যেন অ্যালিসের নিজের পরিস্থিতির প্রতি হতাশা গোপন থাকছে না। কিন্তু, মনে রাখতে হবে এইটা রচনা করেছেন গারট্রুড নিজে, লেখক হিসেবে। যিনি বাস্তব মানুষ হিসেবে বাস্তবের সালোঁতে অ্যালিসের জন্য এই কোণঠাসা অবস্থা নিজে তৈরি করেছেন। কিন্তু অবাক লাগে এই দেখে যে গারট্রুড নিজে অ্যালিসের হতাশা দেখতে পেলেও সেই অবস্থা বদলাচ্ছেন না। বরং কোথাও যেন অ্যালিসের চাপা পড়া একটা তির্যক ভঙ্গিতে রেলিশ করে চলেছেন। এইটা দুই বাক্যের মাঝের না বলা কথা পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয় না। অনেকটা স্পষ্টই থাকে। একসঙ্গে ৩৩ বছর থাকার পর লেখা হয়েছে এই বই।

আমি জানি নারীবাদ ও ভিন্ন যৌনতার আইকন গারট্রুড। তার সম্বন্ধে এই কথাগুলো ঠিক ভালো শোনাবে না। কবিতা, গদ্য লেখার, শিল্প সমালোচনার নতুন ভাষা ও দর্শন এনে দেওয়ায় মডার্নিজমের তার্কিক মেধায় অবিসম্বাদী গারট্রুড। বিশ শতকের শুরুর অর্ধে গারট্রুড-অ্যালিস প্যারির সবচেয়ে নন্দিত লেসবিয়ান কাপল। এখনও অবধি সম্ভবত এরকম মেধাবি লেসবিয়ান কাপল আইকন আর একটাও পাওয়া যায়নি প্যারিতে। কিন্তু ঐ, স্যার ফ্রান্সিসের ছবিতে যেমন, তেমনই এঁদের জীবনে কে অগ্রে কে পশ্চাতে, বা কী অগ্রে আর কী পশ্চাতে– তার একটা ক্ষমতার হিসেব অটুট থেকে গেছে বলেই মনে হয়। আর সত্যি কথা বলতে কী, জিনিয়াসের বৌ-রা শুধু হ্যাট ও গাউন নিয়ে কথা বলেন, এই সাধারণীকরণ কি লেখক গারট্রুডের মেধার অহং নয়? প্রসঙ্গত এই বইটা ছাপা হলে, মডার্নিস্ট পুরুষরা যেমন গারট্রুডের তীক্ষ্ণ তির্যক নতুন বাক্যবন্ধ, তেমনই তাঁর বক্রোক্তির শৈল্পিক কৌশলকে সাদরে বরণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের স্ত্রীরা যখন দেখলেন তাঁরা এই বুদ্ধিদীপ্ততার কাছ ঘেঁষতে না পেরে রান্নাঘরে গিয়ে মেধাহীন গুলতানি করছেন– এইটা সর্বসমক্ষে পেশ করা হয়েছে, কোনও লিখিত বয়ান না থাকলেও, আমাদের ধারণা এতে তাঁদের খারাপ লেগেছিল। অন্য এক প্রসঙ্গে সিলভিয়া তাঁর বইতে বলেছিলেন, ঘরোয়া কাজকে গারট্রুড উঁচু নজরে দেখতেন না।
গারট্রুড লিখছেন যে অ্যালিস বলছেন,
‘Fernande was the first wife of a genius [Picasso] was to sit with. The geniuses came and talked to Gertrude Stein and the wives sat with me. How they unroll, an endless vista through the years. I began with Fernande and then there were Madame Matisse and Marcelle Braque and Josette Gris and Eve Picasso and Bridget Gibb and Marjory Gibb and Hadley and Pauline Hemingway and Mrs. Sherwood Anderson and Mrs. Bravig Imbs and the Mrs. Ford Madox Ford and endless others, geniuses, near geniuses and might be geniuses, all having wives, and I have sat and talked with them all the wives and later on, well later on too, I have sat and talked with all. But I began with Fernande.’

এইখান থেকে আমরা আবার পিকাসোর তৎকালীন প্রেমিকা ও মডেল ফারনান্দ অলিভারকে নিয়ে উৎসুক হয়ে পড়ি। তাঁর পিকাসোকে নিয়ে লেখা মেমোয়ার ১৯৩৩-এ প্যারির ‘Le Petit Parisien’ পত্রিকায় ধারাবাহিকের কয়েক কিস্তি ছাপা হতে না হতে, পিকাসো মামলা করে ছাপা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ততদিনে তাঁদের সম্পর্ক শেষ। পিকাসো যশের চূড়ায়। আর ফারনান্দ অনটনের যে তিমিরে, সেই তিমিরেই। কিন্তু আমাদের সব প্রলোভনে সাড়া দিলে হবে না। সম্পাদক সালোঁর কিছু ডালপালা অবধি মেনে নিতে পারবেন। তারপরে আমাদের মোচড় মেরে মূল থিমে ফিরে আসতেই হবে। জিনিয়াসদের স্ত্রী-প্রেমিকা-মিস্ট্রেসরা দেশে দেশে কী লিখে গেছেন, সেই প্যান্ডোরার বাক্স অন্য উপলক্ষে খোলা যাবে না হয়।
আপাতত আমাদের প্রিয় ঠেক ওদিয়ঁর দিকে আমরা ফিরে যাই। সেই সময়ের অন্যতম ফোটোগ্রাফার ছিলেন প্যারির দাদা ও স্যুররিয়ালিস্ট দলের অন্যতম ফিলাডেলফিয়ার মান রে। গারট্রুডের সালোঁ থেকে ওদিয়ঁর বইঘর আড্ডায়, চুরুটের ধোঁয়া ও বইয়ের ভিড়ে বোহেমিয়ানদের যাপন থেকে কোকো শানেলের স্টাইলাইজড ভঙ্গিমার ছবি তুলে, হাই ফ্যাশনের ছবিতে আভা গার্দ কায়দা এনে তিনি একেবারে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর তোলা প্যারির বোহেমিয়ানদের অজস্র ফোটোগ্রাফ সিলভিয়ার শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানির দেওয়ালে টাঙানো থাকত। এতে আভা গার্দ কবি লেখক ও মান রে, দুই পক্ষেরই প্রোমোশন হত। মান রে মারফত সিলভিয়ার ‘হল অফ ফেম’-এ জায়গা পাওয়া প্যারির অঁতেলেক্ত্যুয়াল মহলে একটা বিশেষ ‘কামিয়াবি’ বলে ধরা হত। সিলভিয়া মেমোয়ারে বলেছেন, “The walls of my bookshop were covered with their photographs [of the writers], and to be ‘done’ by Man Ray meant you were ‘rated as somebody’.”
মান রে-র পোর্টফোলিও ওলটাতে গিয়ে এইবার জোসেফিন বেকারের একটা দারুণ গ্ল্যামারাস ছবি পাই। দেখি উনিও ‘লস্ট জেনারেশান’-এ-ই পড়েন। প্যারির Théâtre des Champs-Élysées-তে La Revue Nègre মিউজিক্যালে পারফর্ম করার জন্য তিনি ১৯২৫-য়ে প্যারিতে পৌঁছন। জ্যাজ ও নিগ্রো স্পিরিচ্যুয়াল তখন মূল ধারার প্যারিতে বিরাট জায়গা করে নিচ্ছে। জোসেফিনের উত্থান ব্ল্যাক পারফর্মেন্স ইস্থেটিক্সকে ফরাসি কসমোপলিটান আর্টের অঙ্গ করে নেয়। তারপর তো জোসেফিন কিংবদন্তি। ইউরোপ ও উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকায়ই তাঁর ট্যুরগুলি ইতিহাসের পাতায় জায়গা পেয়েছে।

সেই সময়ের পোস্টার-শিল্পে জোসেফিন খুবই আকর্ষণীয় জায়গা পেলেও, বলাই বাহুল্য, শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানির দেওয়ালে জোসেফিন বেকারের থাকার কথা নয়। জোসেফিন ছিলেনও না। তার জায়গা ছিল প্যারির চমকপ্রদ পারফর্মেন্স শিল্পে, ঝলমলে বিনোদনে। আর আমাদেরও বিষয় হল সালোঁ। আর বেশিক্ষণ এখানে থাকলে সালোঁ থেকে আমরা কাফেতে উপনীত হব আর সার্ত্রে, সিমোন দ্য বোভায়া আমাদের ধরে ফেলবেন। তাই প্যারির প্রলোভন কাটিয়ে আমরা পাড়ি দিচ্ছি যেই পথ ধরে জোসেফিন এসেছিলেন, তার উল্টো মুখে, অতলান্তিক ধরে পশ্চিমে। নিউ ইয়র্কের হারলেম পাড়ায়। সেখানে ১৯২০-৩০-এর দশকে ব্ল্যাক-আমেরিকান কাব্য সাহিত্য সংগীত নাচ ফ্যাশন দর্শন থিয়েটার রাজনীতি মননের যে বিপুল জাগরণ, সেই হারলেম রেনেসাঁসের সালোঁ এবার আমাদের ডেকে নিয়েছে।
… পড়ুন চিন্তামহল-এর অন্যান্য লেখা …
পর্ব ১: চলতি পরিবার ধারণার বাইরের মেয়েদের বেঁচে থাকার জমকালো মঞ্চ প্যারির সালোঁ
পর্ব ২: এনসাইক্লোপিডিয়ার বিপুল কাজ জিন জুলির সালোঁতেই রমরম করে চলতে শুরু করেছিল
পর্ব ৩: মাদাম জারমেইনের বই-ই ইতিহাসে প্রথম, যার পাণ্ডুলিপি নষ্ট করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল শাসক
পর্ব ৪: মাতিস আর পিকাসোর ইগোর লড়াই
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved