famous bengali recipe books of sadhana mukhopadhyay | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাঙালিকে ‘লাক্সারি’ ফেলে ‘নেসেসারি’ রান্না শিখিয়েছেন সাধনা মুখোপাধ্যায়

নালে-ঝোলে বাঙালির নোলায় আরও আলো ঢালতে ‘কালিয়া পোলাও’ বইটা দারুণ বিকল্প। চটপট তরিতরকারির কালিয়া, রুই-কাতলা-ভেটকি-গলদা অথবা বাগদা চিংড়ি-পমফ্রেট মাছের কালিয়া, মাংসের কালিয়া, হাঁসের ডিমের কালিয়া, ডিমের নার্গিস কালিয়া, সব্জি পোলাও, চাইনিজ পোলাও, চিকেন-মটন-ভেজ-এগ বিরিয়ানি, মাছ-মাংস-ডিমের পোলাও নিয়ে ঢালাও মুরুব্বিয়ানা রয়েছে বইটিতে। মাত্র পনেরো মিনিটে ঘরের প্রেসার কুকারেই জিভে লালার বিস্ফোরণ ঘটানো বিরিয়ানি বানিয়ে নিতে পারবেন। কিছু কিছু করুন ট্রাই, ভাই!

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ১৬:৩৮   
Facebook WhatsApp Messenger

বাঙালি মাত্রেই ভোজনের অগ্রে আর রণের শেষে! মধ্যবিত্ত বাঙালি নিজ শ্রেণির (শত্রু?) জ্ঞাতি-ভাই-ভায়াদ সম্পর্কে এইরকম একটা ঘিয়েভাজা খোঁটা খাইয়ে যতই দেড়া মজা লুটুন আর যতই নিজের স্ট্রেসফুল জীবনে স্যাডিস্ট-মোয়া পাকান, এতে করে নির্জলা সত্যটি বদলায় না। আর সে সত্য হল দুটোই ততটা ইজি টাস্ক নয়, যতটা ইজিলি তাঁরা নিজেদের পলিটিক্যাল কারেক্ট সাজানোর ফাঁদে এইসব হ্যাজ নামিয়ে থাকেন। প্রথমত, ভোজন ও তার আয়োজন একটা প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতিনির্ভর কনডিশনাল আর্ট, সেটা সবার দ্বারা বিউটিফুলি কনডাক্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয়ত কবি তো অনুবাদ করেইছেন ‘শেষ যুদ্ধ শুরু আজ…’ ইত্যাদি। যুদ্ধের শেষটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। সেটা ঠিকঠাক না সামলাতে পারলে যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন নয় শুধু, যাহা দু’শো পঁয়ত্রিশ তাহাই শূন্য। অথচ বাঙালির ভোজনবিলাসের ইতিবৃত্ত বেশ চকচকে। সম্ভবত বাঙালি বাদে অন্য কোনও ভারতীয় জাতির এত বিনিয়োগ চুলোয় দেওয়ার পরম্পরা ও প্রবণতা নেই। স্যুপ, স্যালাড, শাক, ডাল, ভাজা, শুক্তুনি, ঘণ্ট, কষা, ঝাল, ঝোল, কালিয়া, পাতুরি, ভাপা, অম্বল, পলান্ন থেকে পরমান্ন, মণ্ডা-মিঠাই গোচ্‌ করে সাঁটিয়ে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে যদি না গাইলেন ‘কিছুই তো হল না…’, তবে আর আপনি কীসের বাঙালি? বাঙালি মাত্রেই রাষ্ট্র নিয়ে হেব্বি চিন্তিত থাকেন, এবং বিশ্ব নিয়েও। বিস্ময়করভাবে ততোধিক চিন্তিত থাকেন ব্রেকফাস্ট-লাঞ্চ-স্ন্যাক্স-ডিনারের মেনু নিয়ে। আধখাওয়া সিগারেট শত্রুপক্ষের ইগোর মতো পায়ের নিচে চটকে দিলেও ডাক্তারের রেড আইকে উপেক্ষা করে দিলের ভিলে রেড মিটের জন্যে একটুকরো জায়গা অক্ষয় না রাখে কোন শালা! সবাই কি অক্ষয়কুমার নাকি! বাঙালি মানে তো রবীন্দ্রনাথ, যিনি প্রিয়ম্বদা দেবীকে দিয়ে বিদেশ থেকে শিখে আসা আপেল আর মাংসের রেসিপি রান্না করান; বাঙালি মানে তো বিদ্যাসাগর, যিনি ‘ভোজন সভা’-র মতো খাবুটেদের ক্লাব খোলেন; বাঙালি মানে তো নজরুল, যিনি জেলখানার মধ্যে জিভ ভোলানো জেলের খানার কোঁতকায় রোগা ডিগডিগে শিবরাম চক্কত্তিকে পর্যন্ত পার্মানেন্ট হোঁতকায় পরিণত করে ছাড়েন। বাঙালির মাথায় কম চুল থাকতে পারে, কিন্তু খাওয়া নিয়ে হিমালয় সমতুল হিপোক্রসির কমতি নেই। নলে নলে অত কোলেস্টেরল নিয়ে আর খাসি খেতে হবে না রে, সেঁকো বিশ খা; আহ্‌ ইসিজি জুড়ে তো আরশোলা পোল্‌ডান্স দিয়েছেন, এবার ডিম খেলে হাট্টিমার আগেই টিমটিম দেখতে পাবি; বইমেলায় এসেছিস কি ফিসফ্রাই গিলতে… ব্লা ব্লা ব্লা। এইসব ছিঁচকে প্রবৃত্তির নিবৃত্তিও একেবারে হাতের মুঠোয় রেখেছেন বঙ্গজনতা। বাইরের সাবধানী সমালোচনায় লেটার মার্ক কুড়িয়ে ঘরে এসে সেই সাবধানতার দেদার জোঁকসমূহের মুখে নুন দিয়ে ভালো রান্নার নমকহালালি চালিয়ে গিয়েছেন। যাচ্ছেন। আর এই নোলা-পুরাণে বাঙালি হৃদয়ের স্ট্যান্ড অ্যালোনে স্কয়্যারফুট জুড়ে থেকেছে নানা রেসিপি বই।

রান্নাঘরের ছাদের তলায় মাস্টারসেফের কামাল দেখাতে গিয়ে কখনও কখনও পাকা কলায় সিঙ্গাপুর আবিষ্কারের ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যায় বটে। তবে রেসিপি বইটি যদি সহজ ভাষায়, হাতের কাছে খাবলে ধরা যাবে এমন উপকরণ দিয়ে রান্না শেখায়, তাহলে রাধার নাচ আর তেলের পোড়ার মধ্যে সাযুজ্য রক্ষে পায়। আম্বানি ফেফরা খেয়ে ব্যবসা এমন গ্লোবাল স্তরে ফাঁফিয়ে তুললেন কীভাবে সে বিষয়ে আইডিয়া না থাকলেও খাওয়া-দাওয়ার গ্লোবাল বিহারে বাঙালি পাকা। ছোট থেকে রান্নাবাড়া খেলে সেই পাকামিতে পোক্ত হওয়া বাঙালির কাছে খেয়েই মাসের প্রথম দশদিনে বেতনের সত্তরভাগ পরাবাস্তব করে তোলায় জুড়ি নেই। বাকি কুড়িটা আচ্ছে দিন চালানোর জন্যে বাঙালিকে একটু সময়ের মূল্য না বুঝলে তো চলছে না! তাই চটজলদি রান্নার নানা কৌশলের এখন চাহিদা দুরন্ত। একদিন দেখি ঘরে লেডিস কর্নারে জমেছে খানকতক রান্নার বই। বইগুলি টেনে দেখলাম সাধনা মুখোপাধ্যায়ের লেখা। চটজলদি আর সহজে রসিয়ে রাঁধার নানা ফুসমন্তরে ভরা সেসব বই। ‘৫০১ সহজ সহজ রান্না’, ‘৭৫১ রকম সহজ রান্না ও জলখাবার’, ‘কালিয়া পোলাও’, ‘মুরগি মটন’, ‘মাছ রান্না’, ‘বাচ্চাদের টিফিন’, ‘আইসক্রিম কুলফি মালাই’ এইসব নাম রেখেছেন লেখিকা। পাঠিকার উদ্দেশে বিড়বিড় করলাম নীরব কবিত্বকে রবি ঠাকুর কবি বলেই মানতে চাননি। এর আউটপুটে কেউ যদি বাড়িতে নীরবতা খোঁজেন, তবে তাঁর প্রত্যাশার গুড়ে বালি পতন হবে না, নিশ্চিত বোল্ডারই পড়বে। পড়ল। সঙ্গে মুখ লক্ষ্য করে ছুটে এল একটি বাজারের ঝোলা, নির্দেশিকা, হোয়াটস্‌অ্যাপে ফর্দ সেন্ড করা আছে, এবং সেটা নাকি আজ থেকে এক সপ্তাহ আগেই। এখন সন্টুলি মন্টুলি করতে যাওয়াও বিপদজনক বিবেচনায় পাজামা-ফতুয়ায় টান দিয়ে বাজার পৌঁছতে হল। বাকি ভূমিকা দর্শকের।

zoom
সাধনা মুখোপাধ্যায়

সাধনা দেবীর শিক্ষায় সুবর্ণ কাঁকনসজ্জিতা গৃহলক্ষ্মী তুরন্ত ঝোলা থেকে কাটা মটন, সর্ষের শাক, পালং শাক বের করে ধুয়ে আগেই রেডি রাখা পেঁয়াজ-রসুন-আদা-কাঁচালঙ্কা-টমেটো-ধনেপাতা মিশিয়ে গব্য ঘৃত ঢেলে গরমমশলা আর নুন ছড়িয়ে আমার মতোই একটি তাপসহনের ক্ষমতাযুক্ত পাত্রে রেখে মাইক্রো অভেনে ঠেলে দিলেন। তাড়াহুড়োর জামানায় এখন তো মাইক্রো ফ্যামিলির বঙ্গে ঘরে ঘরে মাইক্রো অভেন। তাতে সরাসরি রান্নার উস্কানি দেওয়া বেশ কাজের বটে। কাঁকনের ঝনঝনানি তোলা হাত ততক্ষণে অভেনের পাওয়ার অ্যাডজাস্ট করেছে ৭০ শতাংশ মিডিয়াম হিটে। এরপর শুধু কেবল হুঁহুঁ মার্কা ত্রিশ মিনিটের অপেক্ষা। অভেনের দরজা খুলে আমার ভাইরাভাই পাত্রটি ভিতরের জ্বালা নিয়ে বেড়িয়ে এলেন। তাতে পুনরায় যুক্ত হল ঘি, মশলা। এই রান্নার নাম শাক মটন। রুটি দিয়ে খানিকটা মুখে চালান করেই বুঝলাম কোন স্বাদের লোভে দেবাসুর সাগর মন্থন করেছিলেন। ওহ্‌, স্যালাইভার ক্ষরণ তো নয়, বুঝলাম মুখের ভিতরে হড়পা নেমেছে! ওই ৫০১ রাঁধার গুপ্তমন্ত্রের বইটাতে না কি এমন অভেনে সহজ রান্নার গুচ্ছের কৌশল রয়েছে। সেসব দিয়ে পার্সিয়ান এগ কারি, এগ স্যালাড, পেঁয়াজের আচার, কেক, আটার বরফি, কাজু-নারকেল হালুয়ার মতো ভূরি ভূরি রান্না করে ভুঁড়িভোজ চালিয়ে বিশ্বজয় করা যাবে। সুবর্ণ কঙ্কণ জানালেন ওই বই নাকি নিরামিষ চটজলদি রান্নার ভাণ্ডার খুলেছে। এইবার আমি একটু তর্জন করার সাহস সঞ্চার করে জানিয়ে দিলাম পূজা-পার্বণ ছাড়া যেন ওইসব ভেজ রান্নার ফন্দি ভেজায় না প্রবেশ করে। হোক না সেখানে ফ্রায়েডরাইস, পোলাও, খিচুড়ি, চাট, কোপ্তা, ভাজি, নানা সাবেকি পুজোবাড়ির রান্না কয়েক মিনিটের খেল করে দেখানো। আমার পেটে প্রথম শ্রেণির প্রোটিনের চাহিদাই বজায় থাকবে। সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই ভোট দিতে যাই। কাঁকন এই নো-কম্প্রোমাইসে হার মেনে ঠোঁটের সামনে ধরলেন কিমা টিকিয়া। এটা কিন্তু অভেনে নয়, সাদাতেল তাওয়ায় ব্রাশ করে ভাজা। ফলে তেল কম। মটন বা চিকেন কিমায় কাঁচালঙ্কা-ধনেপাতা-রসুন-পেঁয়াজ-আদা-গরমমশলা দিয়ে কষে নিয়ে সিদ্ধ আলুর লেচির পেটে ভরে তার গায়ে ব্রেডক্রাম্ব লাগিয়ে উল্টেপাল্টে ভেজে নিলেই এই পরম খাদ্যটি প্লেটে সার্ভ করা যাবে। শুধু কি তাই, আপনি চাইলে ফ্রিলড মটন, কিমা পোটলিও বানিয়ে নিতে পারবেন সামান্য সময়েই। বানাতে পারবেন এগ রাইস, চিকেন ফ্রাই, প্রন টমেটো কারি, ফ্রায়েড ফিশকেক থেকে নানা রকমের ডেজার্ট আইটেম। আমার মতো আনাড়ি পর্যন্ত এই চেষ্টায় সফল হয়েছেন। শুনেছি আপনি বিফল হলে মূল্য ফেরত পাবেন। তবে কোথায় পাবেন জানি না।

নালে-ঝোলে বাঙালির নোলায় আরও আলো ঢালতে ‘কালিয়া পোলাও’ বইটা দারুণ বিকল্প। চটপট তরিতরকারির কালিয়া, রুই-কাতলা-ভেটকি-গলদা অথবা বাগদা চিংড়ি-পমফ্রেট মাছের কালিয়া, মাংসের কালিয়া, হাঁসের ডিমের কালিয়া, ডিমের নার্গিস কালিয়া, সব্জি পোলাও, চাইনিজ পোলাও, চিকেন-মটন-ভেজ-এগ বিরিয়ানি, মাছ-মাংস-ডিমের পোলাও নিয়ে ঢালাও মুরুব্বিয়ানা রয়েছে বইটিতে। মাত্র পনেরো মিনিটে ঘরের প্রেসার কুকারেই জিভে লালার বিস্ফোরণ ঘটানো বিরিয়ানি বানিয়ে নিতে পারবেন। কিছু কিছু করুন ট্রাই, ভাই!

‘৭৫১ রকম সহজ রান্না ও জলখাবার’ বইটা একটি সটান রান্নার মাস্টারক্লাস। কী নেই এই বইটায়? স্যুপ আর স্যালাড দিয়ে শুরু, ক্রমে আপনার প্রতিদিনের রান্না, ঘরে মশলা বানানোর নানা পদ্ধতি, হারিয়ে যাওয়া নানা সাবেকি রান্না, ঘরোয়া বাঙালি নানা পদ, জলখাবারের সাতকাহন, আমার সুবর্ণ কাঁকনটিকে পায় কে! তিনি কেবল সজনের ডাঁটা ছাড়া সবই পছন্দ করছেন। আসলে রেসিপি বুকের তো অভাব নেই। কিন্তু সেসব বই বেশিরভাগ রেঁস্তোরার রান্না শেখায়। প্রতিদিন সেসব লাক্সারি তো চলে না, নেসিসিটি তো ভাতে-ভাত! মাছের কোন অংশটা বাজার থেকে আনব, ভেজালের চলচ্চিত্তচঞ্চরীর মাঝে ঘরেই মশলা বানিয়ে নেব ঝটপট কীভাবে এইগুলো কে জানায়? যাঁরা জানাতে পারতেন, তাঁরা তো আবার বাবা মা কিছুই শেখায়নি জাতীয় বেলকাঁটা ফ্রিতে গুঁজে দিতেন! এখন এঁড়ে গরু ও পোকা উভয়েই অদৃশ্য হওয়ায় এইসব বই সর্বজ্ঞ বেদ না হলেও তাঁর মেয়ে জ্যোৎস্না নিশ্চয়ই বটেন। কারণ বারো রাজ্যের রান্না, প্রতিবেশী দেশ থেকে ডলার-ইউরোর দেশের রান্না যেমন রয়েছে এখানে, তেমনি আপনার কিচেন বেসিনের পাইপ গলে নেমে যাচ্ছে যে ফ্যান অথবা পচনশীল ডাস্টবিনের পেটে সেঁধিয়ে যাচ্ছে যেসব ফেলে দেওয়া আনাজের খোসা বা চিংড়ির মাথা, সেগুলোকেও রান্নার টেবিলে ঘুরিয়ে এনে টু-পাইস সাশ্রয়ের টোটকা দিয়েছেন সাধনা ম্যাডাম। সজনে ডাঁটার সঙ্গে আড়ি করা আমার সোনার কাঁকন এই ব্যবস্থায় খুব খুশি। এভাবেই তিনি একদিন বেশি স্কঃফুঃ হাঁকানোর টাকা জমিয়ে দেখাবেন তাঁর ময়দামুখোকে। সেদিন আর একটু বেশি মুখঝামটাও একেবারে চায়না গ্রাসের গোলাপি পুডিং-এর মতো লাগবে। ট্রাই করে দেখুন। না মিললে আপনি রোববার ডিজিটাল দফতরে অভিযোগ জমা দেবেন। বাকিটা কর্তৃপক্ষ বুঝে নেবেন।

cookbook Cooking recipe books Sadhana Mukhopadhyay Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on