Harry Potter and his owl Hedwig: An interpretation | Robbar
Robbar
  • ৬ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৪ অক্টোবর ২০২৬

জাদুজগতের শুভ্রদূত

১১ বছরের জন্মদিনে হ্যাগ্রিডের হাত ধরে হ্যারির জীবনে আসে এক তুষারশুভ্র স্নোয়ি আউল– হেডউইগ। সঙ্গে আসে জাদুর জগতের দরজা খুলে দেওয়া চিঠি। যেন এতদিনের অবহেলিত জীবনে আচমকাই কেউ বলে উঠল, এই পৃথিবীতে তোমারও একটা জায়গা আছে।হেডউইগের গল্প পড়তে পড়তে আমরা শুধু হ্যারির কথা ভাবি না, নিজেদের কথাও ভাবি। হেডউইগ বাস্তবের প্যাঁচা নয়, কিন্তু তার প্রতীকী সত্যটি বাস্তবের চেয়েও গভীর। 

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১৯:৩৭   
Facebook WhatsApp Messenger

বন-জঙ্গলের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, একটা নিভৃত নীরবতা আছে, যা শহরের খাঁচায় বন্দি যান্ত্রিক মানুষ কোনওদিন টের পায় না। ঠিক তেমনই এক আশ্চর্য নির্জনতার ভাষা লুকিয়ে থাকে নিশাচর পাখিদের ডানায়। প্যাঁচা। বাঙালির চেনা সংস্কৃতিতে সে কখনও দেবী লক্ষ্মীর বাহন, কখনও ভূত চতুর্দশীর রাতে ভাঙা দেউলের কার্নিশে বসে থাকা রহস্যময় এক প্রাণী। কিন্তু এর বাইরেও যে এক মায়াবী জগৎ থাকতে পারে, যেখানে বরফ-সাদা একটি প্যাঁচা এক নিঃসঙ্গ কিশোরের পরম আত্মীয়, তার একাকী শৈশবের একমাত্র বিশ্বস্ত সাক্ষী, তা আমাদের চিনিয়েছিলেন ব্রিটিশ লেখিকা জে কে রাউলিং। হ্যারি পটার আর তার প্রিয় প্যাঁচা হেডউইগের গল্প তাই নিছক জাদু আর রূপকথার আখ্যান নয়; এ গল্প মানুষের একাকিত্ব, আত্মপরিচয়, ভালোবাসা এবং হারিয়ে ফেলার গভীর মনস্তত্ত্বের।

zoom
শিল্পী জিম কে-র আঁকা বইয়ের মলাটেও প্যাঁচা এসেছি অবধারিতভাবেই

হ্যারির জীবনের প্রথম ১১টা বছর কেটেছে প্রিভেট ড্রাইভের চার নম্বর বাড়িতে, অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্যে। সিঁড়ির তলার অন্ধকার ঘরটুকুই ছিল তার ঠিকানা। ডার্সলিদের সংসারে সে যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি, যার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আনন্দ-বেদনার কোনও মূল্য নেই। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মনে স্বাভাবিকভাবেই নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। সে ভাবতে শেখে, তার চাওয়াগুলো তুচ্ছ, তার অনুভূতিগুলো অপ্রয়োজনীয়। ঠিক সেই সময়ে, ১১ বছরের জন্মদিনে হ্যাগ্রিডের হাত ধরে হ্যারির জীবনে আসে এক তুষারশুভ্র স্নোয়ি আউল– হেডউইগ। সঙ্গে আসে জাদুর জগতের দরজা খুলে দেওয়া চিঠি। যেন এতদিনের অবহেলিত জীবনে আচমকাই কেউ বলে উঠল, এই পৃথিবীতে তোমারও একটা জায়গা আছে।

zoom
হ্যারি আর তার সতীর্থ এক তুষারশুভ্র স্নোয়ি আউল– হেডউইগ

হেডউইগ অবশ্য শুধু হগওয়ার্টসের চিঠি পৌঁছে দেওয়ার বাহন নয়। সে হ্যারির নতুন পরিচয়ের প্রথম দূত, তার নিঃসঙ্গ শৈশবের এক নীরব আশ্রয়। যে হ্যারি এত দিন অন্যের সংসারে নিজের অস্তিত্বের অধিকারটুকুও পায়নি, সে প্রথমবার এমন এক সঙ্গীকে পেল, যার কাছে তাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয় না। তাকে বিখ্যাত হতে হয় না, সাহসী হওয়ার অভিনয় করতে হয় না, নিজের দুঃখ লুকিয়ে রাখতে হয় না। হেডউইগ যেন হ্যারির জীবনের এক পশলা বৃষ্টি। সে হয়ে ওঠে নিরাপত্তা ও নির্ভরতার এক প্রতীক; যে সম্পর্কের মধ্যে মানুষ নিজেকে গ্রহণযোগ্য বলে অনুভব করতে পারে।

মানুষের অদ্ভুত স্বভাব, সে ভিড়ের মধ্যে থেকেও ভীষণ একা। শহরের রাস্তায় হাজার মানুষের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চলি আমরা, সামাজিক মাধ্যমে অসংখ্য পরিচিত মুখের সঙ্গে যুক্ত থাকি, অথচ দিনের শেষে নিজের মনের অন্ধকার কোণে দাঁড়ালে বুঝতে পারি, আমাদের না-বলা কথাগুলো শোনার মানুষ কত কম। হ্যারিও সেই নিঃসঙ্গতার বাসিন্দা। জাদুজগতে সে কিংবদন্তি; অথচ ডার্সলিদের বাড়িতে সে অবহেলিত একটি ছেলে। গ্রীষ্মের দীর্ঘ ছুটিতে যখন বন্ধুরা দূরে, চারপাশে পরিচিত জাদুময় পৃথিবীর কোনও চিহ্ন নেই, তখন হেডউইগের উপস্থিতিই তাকে অন্য এক জগতের সঙ্গে জুড়ে রাখে। সে কথা বলতে পারে না, কিন্তু তার নীরব উপস্থিতি হ্যারিকে মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সমস্ত সম্পর্ক শব্দ দিয়ে তৈরি হয় না। কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় শুধু পাশে থাকার ক্ষমতা দিয়ে।

zoom
হ্যারির ঠিকানা সম্বলিত চিঠি

হেডউইগের চরিত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, সে কোনও নিষ্প্রাণ জাদুকরী যন্ত্র নয়। তার নিজস্ব মেজাজ আছে, অভিমান আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে। হ্যারি তাকে অবহেলা করলে, কিংবা তার সঙ্গে যথেষ্ট সময় না কাটালে সে রাগ দেখায়, কখনও মুখ ফিরিয়ে বসে থাকে। এই ছোট ছোট আচরণে প্যাঁচাটি যেন এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে। উইজলি পরিবারের বুড়ো প্যাঁচা এরল চিঠি পৌঁছে দিতে গিয়ে হিমশিম খায়, আর রনের পুঁচকে প্যাঁচা পিগউইজন অতিরিক্ত উৎসাহে সবাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। প্রত্যেকের স্বভাব আলাদা। রাউলিং এই বৈচিত্রের মধ্য দিয়ে জাদুজগতের প্যাঁচাদেরও এক ধরনের জীবন্ত সত্তা দিয়েছেন। তবে হেডউইগের মধ্যে রয়েছে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য, যা তার ভালোবাসাকে আরও গভীর করে তোলে। তার অভিমানও যেন এক নীরব ঘোষণা– সম্পর্ক মানে শুধু যত্ন পাওয়া নয়, যত্ন করারও দায়িত্ব আছে।

zoom
রনের প্যাঁচা পিগউইজন

হেডউইগকে ঘিরে এত আবেগ কেন? কারণ, তার মধ্যে আমরা এমন এক সম্পর্কের ছায়া দেখি, যেখানে ভাষার চেয়ে অনুভূতি বড়। বাস্তব জীবনেও প্রাণীর সঙ্গ অনেকের একাকিত্ব কমাতে, মানসিক স্বস্তি দিতে সাহায্য করে। প্রাণীকে ভালোবাসার জন্য তার সামাজিক পরিচয় লাগে না, সাফল্যের খতিয়ান লাগে না, তার সঙ্গে মতের মিল হওয়ারও প্রয়োজন নেই। এই সম্পর্ক আমাদের শেখায়– ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের মতো করে গড়ে তোলা নয়; তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বটুকুকে মেনে নেওয়া। হেডউইগ হ্যারির সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারে না, তার অতীত বদলে দিতে পারে না, কিন্তু সে হ্যারির জীবনে এমন একটি নির্ভরতার জায়গা তৈরি করে, যেখানে একাকিত্ব কিছুটা হলেও সহনীয় হয়ে ওঠে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেও কি এমন কোনও হেডউইগ নেই, কিংবা থাকার প্রয়োজন নেই– যার সামনে নিজেকে আড়াল করতে হয় না?

কিন্তু সব জাদুরই কি সুখের পরিণতি হয়? ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোজ’-এর শুরুতে হ্যারিকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযানের সময় ডেথ ইটারদের আক্রমণে প্রাণ হারায় হেডউইগ। তার মৃত্যু হ্যারি পটারের পাঠকদের কাছে সিরিজের অন্যতম মর্মান্তিক মুহূর্ত। কারণ, এখানে হারিয়ে যায় শুধু একটি পোষ্য নয়; হারিয়ে যায় হ্যারির শৈশবের এক টুকরো নিরাপত্তা। এতদিন যে প্যাঁচাটি তার একাকিত্বের সঙ্গী ছিল, বিপদের মধ্যেও পরিচিত জগতের সঙ্গে তার সংযোগ হয়ে ছিল, তার অনুপস্থিতি হ্যারিকে এক নির্মম বাস্তবের সামনে দাঁড় করায়। এবার আর কোনও পরিচিত ডানার ছায়া নেই। এবার তাকে নিজের লড়াই নিজেকেই লড়তে হবে।

zoom
‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোজ’-এর শুরুতে ডেথ ইটারদের আক্রমণে প্রাণ হারায় হেডউইগ।

এই ঘটনাকে আসলে বড় হয়ে ওঠার এক নিষ্ঠুর মুহূর্ত হিসেবে দেখা যায়। বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়া নয়; বড় হওয়া মানে নিজের নিরাপত্তার পরিচিত অবলম্বনগুলিকে হারানোর সম্ভাবনা মেনে নেওয়া। কখনও প্রিয় মানুষ চলে যান, কখনও সম্পর্ক বদলে যায়, কখনও শৈশবের নিশ্চিন্ত পৃথিবী ভেঙে পড়ে। তখন আমরা বুঝি, ভালোবাসা কাউকে চিরকাল ধরে রাখার নিশ্চয়তা নয়। বরং তার সঙ্গে কাটানো সময় আমাদের মধ্যে যে সাহস, মমতা আর স্মৃতি তৈরি করে, তা নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হয়। বনের কোনও পুরনো গাছ কেটে ফেললে যেমন আলো-ছায়ার পরিচিত নকশা বদলে যায়, হেডউইগের চলে যাওয়াও তেমনই হ্যারির জীবনের আকাশ বদলে দেয়।

লক্ষ্মীপুজোর প্রাক্কালে হেডউইগের গল্প তাই অন্য এক অর্থে আমাদের কাছে ফিরে আসে। দেবী লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধির কথা; আর হ্যারির হেডউইগ মনে করিয়ে দেয় সেই অদৃশ্য সম্পদের কথা, যার হিসেব কোনও খাতায় রাখা যায় না। অর্থ, বাড়ি, প্রতিষ্ঠা– জীবনের জন্য সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে মানুষটি আমাদের দুঃখের সময় পাশে থাকে, যে সম্পর্ক আমাদের দুর্বলতা নিয়েও গ্রহণ করে, যে স্মৃতি অন্ধকার দিনে বেঁচে থাকার সাহস দেয়, তার মূল্যও কি কম? ঘর আলোয় ভরে উঠলেই কি মন আলোয় ভরে? নাকি প্রকৃত সমৃদ্ধি সেই অনুভূতি, যেখানে মানুষ জানে, পৃথিবীতে অন্তত একজন আছে, যার কাছে সে একা নয়?

zoom
হেডউইগ বাস্তবের প্যাঁচা নয়, কিন্তু তার প্রতীকী সত্যটি বাস্তবের চেয়েও গভীর।

হয়তো এই কারণেই হেডউইগের গল্প পড়তে পড়তে আমরা শুধু হ্যারির কথা ভাবি না, নিজেদের কথাও ভাবি। কোথাও মিশে যায় আমাদের না-পাওয়া ভালবাসা, না-বলা অভিমান, কিংবা কোনও অচেনা পৃথিবীর ডাক। হেডউইগ বাস্তবের প্যাঁচা নয়, কিন্তু তার প্রতীকী সত্যটি বাস্তবের চেয়েও গভীর। সে শেখায়, নিঃসঙ্গতা সব সময় শব্দ করে কাঁদে না; কখনও সে জানলার ধারে বসে থাকা একজোড়া চোখ, কখনও দূর আকাশে হারিয়ে যাওয়া সাদা ডানা।

এই লক্ষ্মীপুজোয় তাই শুধু প্রাচুর্যের প্রার্থনা নয়, নিজেদের অন্তরের জ্যোতিও চিনে নেওয়া যাক। আমরা বরং এমন সম্পর্কের মূল্য বুঝতে শিখি, যেখানে ভালোবাসা শর্তহীন, উপস্থিতি নির্ভরতার, আর বিদায়ের পরেও স্মৃতি নিজের আলো জ্বেলে রাখে। কারণ, জীবনের সবচেয়ে বড় জাদু হয়তো অন্ধকারকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া নয়; বরং অন্ধকারের মধ্যেও এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া, যার উপস্থিতিতে পথ চলার সাহস ফিরে আসে। আর কখনও কখনও, সেই সাহসের নামই হেডউইগ। এই পুজোয় আমাদের প্রত্যেকের জীবনে তেমন একটি হেডউইগ থাকুক। আর আমরা নিজেরাও হয়ে উঠি কারও অন্ধকারে পথ দেখানো হ্যারির সেই হেডউইগ প্যাঁচা।

Hagrid Harry Potter Hedwig J K Rowling Jim Kay Owl Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Voldermort

Share this article on