
ধর্ম তো কোনও একশিলাবিশিষ্ঠ (মনোলিথিক) ধারণা নয়। সাহিত্য, কবিগান, ভজন বা মহাকাব্য ছাড়া শুধু ম্যানুস্ক্রিপ্ট দিয়ে নিশ্চয়ই তাকে বিচার করা যায় না। এই মর্মে ভেবে আশ্চর্য লাগে যে, বিদ্যাসুন্দর ও গীতগোবিন্দের দেশে প্রকাশ্য প্রেম বা বিবাহ পূর্ববতী মেলামেশা নিয়ে এতটা হিংসা ছড়ানো যায়! রোজ ডে-তে ফুল দেওয়া নিয়ে যাদের আপত্তি তারা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের নৌকাখণ্ড পড়েছে? ‘পূর্বরাগ’ বলে যে বৈষ্ণব সাহিত্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দ আছে, যার অর্থ বিবাহ বা গান্ধর্ব মতে মিলনের আগে প্রেম/যৌনতার উপলব্ধি, সেটাও কি আজ বিস্মৃত?
গ্রাফিক্স: দীপঙ্কর ভৌমিক
‘রাধিকা সন্তনাম’, তামিল কবি ও তার দেবদাসী মুদুপালান্নির লেখা কাব্য, যেখানে কৃষ্ণের নতুন বউ ইলাকে রাধা শেখাচ্ছে প্রেম বা শৃঙ্গার রসের আদবকায়দা। দক্ষিণ ভারতে যখন এটি লেখা হচ্ছে, যাকে বলা হয়– ‘erotic manual’, তখন বাংলার দিকে তাকালে পাই বিদ্যাসুন্দর। সেখানে কাঞ্চির রাজপুত্র সুন্দর বর্ধমানে এলে, তাকে দেখে রমণীদের অবস্থা বর্ণনা করা হচ্ছে:
দেখি সুন্দর, রূপ মনোহর
স্মরে জরজর যত রমণী।
কবরী ভূষণ কাঁচুলী কষণ
কটির বসন খসে অমনি॥

এই সবই অষ্টাদশ শতকে ভারতীয় সাহিত্যের টুকরো ছবি। কোথাও অজাচারি সম্পর্ভুক্ত রাধা নতুন বউকে শেখাচ্ছে যৌন মিলনের রেওয়াজ, কোথাও সুপুরুষ রাজার ছেলেকে দেখে রমণীদের যৌন উত্তেজনার কথা লেখা। এবার চলে আসুন তার ২০০ বছর পরের ভারতে। ২০০৯ সালে তাজমহলের পাশেই এক প্রেমিক-প্রেমিকাকে প্রকাশ্যে চুল কাটিয়ে দেওয়া হয়, বাগানে সেই যুগল একসঙ্গে বসেছিল ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে। কার্ড, চকলেট, গিফটের দোকান ভাঙচুরের ঘটনা একপ্রকার নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে যাওয়া, কারণ হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী একদল লোক মনে করে প্রেম নিবেদন বা প্রেমিক যুগলের মেলামেশা আমাদের দেশের সংস্কৃতি নয়। গুরগাঁওতে কিছু বছর আগেই পার্ক বা অন্যান্য পাবলিক স্পেসে নিয়মিত প্যাট্রোলিং করেছে র্যাডিকাল হিন্দু সংস্থা, যার প্রধান সতীশ মান প্রেসকে বিবৃতি দেন যে:

‘ভ্যালেন্টাইনসের মতো পশ্চিমি ধারার বিরুদ্ধে আমরা লড়ে যাব… আমাদের ভারতের সংস্কৃতি সারা পৃথিবীর মধ্যে উৎকৃষ্ট, আমরা যুবক-যুবতীদের ডেটিংয়ের মতো অশ্লীল কাজকর্মে লিপ্ত হতে দিতে পারি না।’ এই যুক্তি শুনে মনে পড়ে যায়, প্রফেসর ওয়েনডি ডনিংগার-এর গবেষণা, যেখানে সাম্প্রতিক ভারতে, কীভাবে পিউরিটান আইডিয়ার (অতিনৈতিকতার) উত্থান ঘটেছে, তার তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। ডোনিগের-এর আর্টিকেল ‘ফ্রম কামা টু করমা’-তে এই অতিরিক্ত নীতিপুলিশির সঙ্গে প্রাচীন ভারতের ইতিহাস যে একবারে সাযুজ্যপূর্ণ নয়, তা দেখানো হয়েছে। সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্পকলা, এমনকী, ধর্মীয় পুঁথিতেও যেভাবে যৌনতা, প্রেম বা অন্তরঙ্গতা নিয়ে নানা খোলামেলা আলোচনা পাওয়া যায়, তার সঙ্গে আজকের হিন্দুত্ব মবদের মতামত মেলে না। বেশিরভাগ পুলিশ রিপোর্টে দেখা যায়, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে মালা বা বিয়ের সরঞ্জাম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে কিছু উগ্র যুবকদের, প্রেম যুগলদের দেখলেই তারা নাকি ছুটে গিয়ে একপ্রকার বাগদান বা বিয়ে দিতে জোর করছে। এখানে কনসেন্ট বা সম্মতির প্রশ্ন ছেড়েই দিলাম, ভারতে এখনও বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিয়ে, যৌনতা নিয়ে কনসেন্টের বালাই নেই, কিন্তু পারিবারিক পরিসরের বাইরে, সমাজে, প্রকাশ্যে, দলবদ্ধভাবে এই ধরনের অপরাধ কীভাবে সংঘটিত হয়, তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয় না; কিছু জেলাতে পুলিশি কড়াকড়ি থাকলেও আমরা দেখি উত্তরপ্রদেশ বা গো-বলয়ের অনেক জায়গায় পুলিশরাই এই ধরনের নিগ্রহে জড়িত।
একদলের মতামত যে, দাম্পত্য প্রেমের বাইরে নাকি আর কোনও প্রেমকে হিন্দুধর্ম স্বীকৃতি দেয় না। তাহলে বলা ভালো যে, ধর্ম তো কোনও একশিলাবিশিষ্ঠ (মনোলিথিক) ধারণা নয়। সাহিত্য, কবিগান, ভজন বা মহাকাব্য ছাড়া শুধু ম্যানুস্ক্রিপ্ট দিয়ে নিশ্চয়ই তাকে বিচার করা যায় না। এই মর্মে ভেবে আশ্চর্য লাগে যে, বিদ্যাসুন্দর ও গীতগোবিন্দের দেশে প্রকাশ্য প্রেম বা বিবাহ পূর্ববতী মেলামেশা নিয়ে এতটা হিংসা ছড়ানো যায়! রোজ ডে-তে ফুল দেওয়া নিয়ে যাদের আপত্তি তারা শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের নৌকাখণ্ড পড়েছে? ‘পূর্বরাগ’ বলে যে বৈষ্ণব সাহিত্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দ আছে, যার অর্থ বিবাহ বা গান্ধর্ব মতে মিলনের আগে প্রেম/যৌনতার উপলব্ধি, সেটাও কি আজ বিস্মৃত?
কোর্টশিপ শুনে পশ্চিমি, বিদেশি বলে আক্রমণ করার রেওয়াজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে। ‘ডেটিং’ শব্দ নিয়ে হিন্দু ব্রিগেডের প্রবল আপত্তি, তাদের যদি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর পড়ানো যেত, সেটি আবার লেখা ব্রিটিশরা এখানে পাকাপাকিভাবে চলে আসার অনেকটা আগেই। বিদ্যা আর সুন্দরের মিলনের বর্ণনা, যৌন মিলনে সহায়তাকারী হীরা মালিনীর কথা, কালীর বরদানে গোপনে প্রেমিক যুগলের মিলন, এমনকী, বিবাহ-পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থা। ব্রিটিশ ভারতে বিদ্যাসুন্দর নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, যাত্রা থেকে বই, সং থেকে নাটক; ঐতিহাসিক তাপ্তি রায় বলছেন, এই গল্পের চাহিদা, বিক্রিবাট্টা অভাবনীয় ছিল। ব্রিটিশরা বিদ্যাসুন্দর নিয়ে আপত্তি করলেও এর জনপ্রিয়তা ঠেকানো যায়নি। ভারতের আরও নানা কাব্যে বা লোকগাথাতে যেভাবে অজাচার, পরকীয়া, বিবাহ পূর্ববর্তী মেলামেশার (এগুলি সবই দেবদেবীদের প্রশ্রয়ে বা নিজেরাই অর্ধদেবতা হয়ে) প্রসঙ্গ এসেছে, তার কাছে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র ডেটিং, ফুল-চকলেট দেওয়ার মতো অন্তরঙ্গতার কোনও তুলনাই হয় না।

২০২৪ সালের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে, ভারত সরকার ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘কাউ হাগ ডে’ বলে ঘোষণা করেছে। গো-মাতাকে সেবা করে যে পুণ্য অর্জন করা যায়, তা ‘পশ্চিমি’ সংস্কৃতি অনুসরণে হয় না। গো-মাতার প্রতি বজরং দল বা অন্যান্য উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর যত্ন দেখে ভাবার কোন কারণ নেই যে, পশুপাখিদের নিয়ে একরকম ইনক্লুসিভ ধারণা হিন্দুত্ববাদীদের রয়েছে। যেমন ২০১৮ সালে চেন্নাইতে, ‘ভারত হিন্দু ফ্রন্ট’ নামে একটি সংস্থা ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র দিন প্রকাশ্যে একটি গাধা ও কুকুরের বিয়ের আয়োজন করে। এই ধরনের এনিমল মোটিফ ব্যবহার করা আজকের রেওয়াজ নয়, প্রাচীন কাল থেকে সারা পৃথিবীর নানা জায়গায় পশুপাখি বা animal symbolism ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিবাদ, রাগ, কটাক্ষ বা ব্যঙ্গের রূপক হিসেবে।
মিখাইল বাখতিনের ‘কার্নিভালেস্ক থিওরি’তে গ্রটেস্ক হিউমারের অঙ্গ হিসেবে পশু-পাখির ব্যবহারের কথা এসেছে। এখানে উচ্চ বংশীয়, অ্যারিস্টোক্র্যাট বা রাজাকেও যখন পশুপাখি, মনস্টার বা ক্লাউনের ভূমিকায় নামিয়ে আনা হচ্ছে, তার মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটা আভাস পাওয়া যায়। আমাদের ভারতের লোকগাথাতেও এই ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশ শতকের শুরুতে লেখা, বীরবলের জেস্টবুকে দেখা যায়, মজা করে বিদূষক সেলিমকে গাধা বলছেন। গোপাল ভাঁড়ের গল্পেও দেখি, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রেগে গিয়ে গোপালকে ‘শুয়োর কা বাচ্চা’ বললে, উত্তরে ভাঁড় জবাব দিচ্ছে, ‘আপনিই তো মা বাপ’!
এই প্রত্যেকটি গল্পেই অ্যানিমাল মোটিফ ব্যবহার হচ্ছে একটা ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য, রাষ্ট্র, রাজা, উচ্চবংশীয় মন্ত্রীর অহংকে নস্যাৎ করার জন্য। এখানে নীতিপুলিশি, অতিনৈতিকতা বা সমাজে কে কী রকম ভাবে চলবে, সেই হেতু অনিমল প্রক্সির ব্যবহার হচ্ছে না। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে হিন্দুত্ব ফ্রন্টের বাঁদরের বিয়ে প্রতিভাত করতে চায় যে প্রেম, বা বিবাহ পূর্ববর্তী যৌনতা আসলে পাশববৃত্তির নামান্তর, তাই প্রেমিক যুগলদের গাধা বা পশুর পর্যায়ে নিয়ে আসাই এই ধরনের আয়োজনের উদ্দেশ্য। এখানে উচ্চমার্গের ক্ষমতা বা রাষ্ট্রকে ব্যঙ্গ করার মতো কোনও বিষয় নেই।

এবার ‘anti romeo’ স্কোয়াড বা হিন্দু ফ্রন্ট, এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘পিংক চাড্ডি’ ক্যাম্পেনের কথা বলা যাক। ২০০৯ সালে ‘শ্রীরাম সেনা’ নামে একটি সংস্থা ম্যাঙ্গালোরে পুরোহিত, মঙ্গলসূত্র আর গায়ে হলুদের সরঞ্জাম নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এবং ভ্যালেন্টাইন্স ডে-তে কোনও প্রেমিক যুগলকে দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে। প্রমোদ মোতালিখ নামক যুবক, রামসেনার প্রধান, এই কর্মকাণ্ডের ডাক দেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে একটি নারীবাদী দল ‘পিংক চাড্ডি’ ক্যাম্পেনের কথা ঘোষণা করেন, যাকে তারা প্রেস বিবৃতিতে গান্ধীবাদী আন্দোলন বা অহিংস পন্থায় বিশ্বাসী বলেছেন। রামসেনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকটি যুবকের বাড়িতে এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী দলের লোকজনকে ‘পিংক চাড্ডি’ ডাকে পাঠানো হয়। রঙের ব্যবহার দেখে আঁচ করা যায় যে, মহিলা গঠিত দল বলে গোলাপি রং ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন পিঙ্ক অটোর প্রবর্তন। পুরুষ অন্তর্বাস পাঠানোর কারণ হয়তো ফ্রাজাইল মাসকিউলিনিটি, বা পৌরুষত্বের লম্ফঝম্পকে বিদ্রুপ করার এক প্রয়াস। এই ক্যাম্পেনে শুধু ম্যাঙ্গালোর নয়, সারা ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রচুর লোকজন অংশগ্রহণ করে। রামসেনার বিপরীতে তৈরি হয় ‘love সেনা’।
গোলাপী অন্তর্বাস যেন হিন্দুত্ববাদী পৌরুষত্বকে অহিংস উপায় ভেঙেচুরে দেওয়ার এক অদম্য চেষ্টা। কিন্তু প্রশ্ন হল, যেখানে অপরদিক থেকে হিংসার রাজনীতি চরমে। চুল কেটে দেওয়া, দোকান ভাঙচুর করা, প্রকাশ্যে ছেলেমেয়েদের কনসেন্ট ছাড়া তাদেরকে মালা বদল, সিঁদুর দানে বাধ্য করা, এইসবের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন কতটা ফলপ্রসূ, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। ‘অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড’-এর মনোবৃত্তি, উগ্র যুবকরা যেখান থেকে এমন নিকৃষ্ট কাজ করার ইন্ধন পাচ্ছে, তার সঙ্গে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের যোগাযোগ আছে কি না, থাকলে আমাদের সকলের নিরাপত্তা কোথায়, এই প্রশ্নগুলি এড়িয়ে শুধুমাত্র সিম্বলিক প্রোটেস্টে কিছু করা যাবে কি?
শেষে এটুকুই বলার যে, ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে সমালোচনা নিশ্চয়ই হতে পারে, কিন্তু সেটা কখনও-ই ধর্ম বা নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে নয় বরঞ্চ শ্রেণি, অর্থ বা ভোগবাদের প্রশ্নে। প্রেম, ভালোবাসা বলতেই লাখ টাকার জুয়েলারি সেট, বিলাসবহুল ক্যাফে বা দামি উপহারের রমরমার বিরুদ্ধে বলাই যায় যে, ভালোবাসার দিন কি সর্বদা কনজিউমারিজমকে সঙ্গে নিয়ে চলবে? চিনেবাদাম, গড়ের মাঠ, গঙ্গার ধার বা রাস্তার ধারে চাউমিন-রোলে একসঙ্গে ভালোবাসা খুঁজলে আপত্তি কী?
…………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন সম্প্রীতি চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা
…………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved