Robbar

ভালোবাসার অন্য নাম গোলাপ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 14, 2026 8:27 pm
  • Updated:February 14, 2026 8:27 pm  

শেষপর্যন্ত তাঁর গোলাপকেই ভালোবেসেছিলেন আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরি। ‘মেমোয়ার দ্য লা রোজ’ হল অনন্য এক দম্পতির কাহিনি, যাতে পুরুষটি ছিলেন মহিলার জীবনের একমাত্র জাদুকর এবং মহিলা সেই পুরুষটির রোমাঞ্চকর যাপনের নিয়ত অনুপ্রেরণা– যাঁর সঙ্গে পুরুষটি একটানা থাকতেও পারতেন না আবার তাঁকে ছাড়া বাঁচতেও পারতেন না। লং আইল্যান্ডে পুনর্মিলনের সময়ে লেখা, ‘ল্য পেতি প্রাঁস’ ছিল কনসুয়েলোর জন্য আঁতোয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার।

দময়ন্তী দাশগুপ্ত

‘খুদে রাজকুমারের যেটা সবচেয়ে আমাকে মুগ্ধ করে সেটা হল একটা ফুলের প্রতি তার অবিচল নিষ্ঠা। এমনকি ঘুমের মধ্যেও যেন গোলাপের ছবিটি তাকে দীপশিখার মতো উদ্ভাসিত করে রেখেছে…’

‘খুদে রাজকুমার’, অনুবাদ: এষা দে

‘ল্য পেতি প্রাঁস’ বা খুদে রাজকুমার-এর গল্প, যা কি না দেশবিদেশে ছাপা হয়েছে ৬৫০-রও বেশি ভাষায়, পড়েছেন অনেকেই। দুঃসাহসী বিমানচালক আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরি-র পাইলট জীবনের অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশেলের এই কাহিনিতে আছে এক গোলাপের কথা। ভিনগ্রহের বাসিন্দা খুদে রাজকুমারের প্রিয় এই গোলাপটি ছিল তার নিজের গ্রহে-ই। খুদে রাজকুমারের ভাষায় গোলাপটি, ‘ভারি দেমাক তার… বড্ড অভিমানী’। কিন্তু সে তার প্রিয় গোলাপটিকে সেই গ্রহে ফেলে রেখেই ঘুরে বেড়াত মহাবিশ্বের গ্রহে গ্রহান্তরে। সাহারা মরুভূমিতে বিমান ভেঙে পড়ায় একা এক পাইলটের সঙ্গে দেখা হয়েছিল সদ্য পৃথিবীতে আসা খুদে রাজকুমারের। তাই সেই রাজকুমারের গল্পকথা আমরা জানতে পেরেছি বৈমানিকের বয়ানে। কিন্তু গোলাপের কথা কে জানে!

আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরি

আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরির জন্ম ২৯ জুন, ১৯০০ সালে ফরাসি দেশে। সুইজারল্যান্ড ও প্যারিসে পড়াশোনার পর যোগ দেন চারুকলা বিদ্যালয়ে। ১৯২১ সালে বিমানচালনা শিখে বিমানবাহিনিতে যোগদান করেন। খেয়াল রাখার যে, বিমানযাত্রার তখন একেবারেই বাল্যাবস্থা। ১৯০৩ সালের ডিসেম্বরে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় আকাশপথে চার দফায় ৬ কিমি পথ পেরনোর পর পরিবহনের যে বিপ্লব ঘটে, সামরিক কাজে তার প্রয়োগ শুরু করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ১৯০৯ সালে, আর ফ্রান্সে সামরিক বিমানবাহিনি চালু হয় ১৯১৪-তে।

বিমান-প্রযুক্তির উন্নতি ত্বরান্বিত করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তবে বিমানচালনা আঁতোয়ার শুধু পেশা ছিল না, ছিল নেশাও। এই নেশার টানে বারবার তিনি বিপজ্জনক সব অভিযানে বেরিয়েছেন এবং প্রাণ হাতে নিয়ে ফিরেও এসেছেন একাধিকবার। ১৯৩৮ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে দশহাজার কিলোমিটার দূরের তিয়েরা দেল ফুয়েগোর মধ্যে বিমানসংযোগ স্থাপন করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। কিন্তু এতেও তাঁর উৎসাহে বিন্দুমাত্র চিড় ধরেনি। বিমানচালনার পাশাপাশি লেখক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আঁতোয়া। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলিতে (ল্যাভিয়েত, কুরিয়ে স্যুদ, ভল দ্য নুই, তের দেজোম ইত্যাদি) ফিরে ফিরে আসে তাঁর পাইলট জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথা।

১৯৪৪ সালের বসন্তে, আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন তাঁর স্ত্রী কনসুয়েলোকে আমেরিকার লং আইল্যান্ডের নর্থপোর্টে রেখে। তার পরপরই, জার্মানি-অধিকৃত ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ কর্সিকার ওপর দিয়ে এক বিমান অভিযান চলাকালীন তিনি নিখোঁজ হন। তাঁর বিমান বা তাঁকে আর কখনও-ই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর এক বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরির জীবৎকালীন শেষ রচনা ‘ল্য পেতি প্রাঁস’, যা তাঁর মৃত্যুর বছরখানেকের মধ্যে বিশ্বজুড়ে তুমুল সাড়া ফেলে দেয়।

এসব কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু গোলাপের কথা? সত্যিই দীর্ঘদিন কেউ জানত না আঁতোয়ার সেই গোলাপ, থুড়ি তাঁর স্ত্রী কনসুয়েলো দ্য স্যাঁত একজুপেরির ব্যক্তিগত জীবন আর ভালোবাসার কথা। কনসুয়েলোর মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পর উত্তরাধিকারীরা একটি পুরনো ট্রাঙ্ক খুলে দেখতে পান পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা দীর্ঘ একটি চিঠি, কনসুয়েলো লিখেছেন তাঁর স্বামীর উদ্দেশে। চিঠিটি কনসুয়েলো লিখতে শুরু করেছিলেন আঁতোয়া নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর এবং পরে সযত্নে তুলে রেখেছিলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে। এমনকী, ১৯৪৯ সালে যখন আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরির প্রথম জীবনীটি ছদ্মনামে প্রকাশ করেন তাঁর প্রেমিকা নেলি দ্য ভ্যোগয়ে, নীরবই ছিলেন কনসুয়েলো।

আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরি ও কনসুয়েলো দ্য স্যাঁত একজুপেরি

১৯৭৯ সালে প্রয়াত হন কনসুয়েলো দ্য স্যাঁত একজুপেরি। তখনও তাঁর সেই চিঠির কথা কেউই জানতেন না। ২০ বছর পরে ট্রাঙ্কের ভিতর থেকে আবিষ্কারের পর সেই চিঠিই সম্পাদিত হয়ে ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় ফরাসি বই ‘মেমোয়ার দ্য লা রোজ’– পরবর্তীতে এস্থার অ্যালেন-এর ইংরেজি অনুবাদে ‘দ্য টেল অফ দ্য রোজ’।

চার সন্তানের মৃত্যুর পর ১৯০১ সালের ১০ এপ্রিল তাঁর জন্ম হলে বাবা-মা নাম রাখেন কনসুয়েলো, ইংরেজিতে যার অর্থ কনসোলেশন অর্থাৎ, সান্ত্বনা। পরে অবশ্য তাঁর আরও দুই বোনের জন্ম হয়। কনসুয়েলোর পরিবার ছিল স্প্যানিশ, ছোটবেলা কেটেছিল এল সালভাদর-এ আগ্নেয়গিরির সন্নিধানে। শিশুকাল থেকেই অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প বানাতে আর বলতে খুব ভালোবাসতেন কনসুয়েলো। আর শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতেন সেগুলো। তাই তাঁর এই অসাধারণ লেখায় বুঁদ হয়ে যাওয়ার পরেও মনে প্রশ্ন রয়েই যায় যে, এর কতটা সত্যি আর কতটাই বা আসলে তাঁর কল্পনা? তবে এই অপরূপ কাহিনি তো প্রকৃতপক্ষে সত্যি-মিথ্যের ঊর্ধ্বে।

বড় হয়ে মেক্সিকোতে পড়াশোনা করার সময়ই এক আর্মি অফিসারকে বিবাহ করেন কনসুয়েলো। তিনি লিখেছেন যে, তার বছরখানেকের মধ্যেই মারা যান তাঁর সেই স্বামী। যদিও ইন্টারনেটের বিভিন্ন সূত্র বলছে, বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল তাঁদের। ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তরুণী কনসুয়েলো পা রাখেন প্যারিসে এবং প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হন প্যারিসের রূপে। গুয়েতেমালার খ্যাতনামা ধনী লেখক, সাংবাদিক, কূটনীতিক এবং ফ্রান্সের লিজিয়ঁ দ্য’অনার উপাধি প্রাপ্ত পঞ্চাশোর্ধ্ব এনরিকে গোমেজ কারিঅ-র সঙ্গে আলাপ ও বিবাহ এখানেই। ১৯২৭ সালে এনরিকের অকস্মাৎ মৃত্যুর কিছুকাল পর তাঁর সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে আর্জেন্টিনা সরকারের আতিথ্যে বুয়েনস আইরেসে যান কনসুয়েলো।

কনসুয়েলো সানসিন দ্য স্যান্দোভাল দ্য গোমেজ এবং আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরির প্রথম দেখা হয় বুয়েনস আইরেসে-ই, ১৯৩০ সালে। কনসুয়েলো ছিলেন এক অপরূপ সুন্দরী তরুণী বিধবা, স্বামীর সদ্য মৃত্যুতে বিপর্যস্ত আর আঁতোয়া বিখ্যাত সাহসী বৈমানিক, উত্তর আফ্রিকার মরুভূমিতে বীরত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রশংসিত। শিশুসুলভ সরল অথচ দৃঢ়চেতা, খানিক অদ্ভুত এবং ভারি কৌতুকপ্রিয় ছিলেন আঁতোয়া। প্রথম সাক্ষাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঠিক করে ফেলেছিলেন যে, কনসুয়েলোকেই পাবেন স্ত্রী হিসেবে। অন্যদিকে, কনসুয়েলো তখন মনে করতেন এনরিকের স্মৃতি এবং উত্তরাধিকার বহনই তাঁর বাকি জীবনের উদ্দেশ্য। কিন্তু আঁতোয়া তাঁদের প্রথম দেখা হওয়ার মুহূর্তটি থেকেই ছিলেন দৃঢ় বিশ্বাসী। আলাপের ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কনসুয়েলো আর তার বন্ধুদের নিয়ে বিমানে আকাশ পাড়ি দেন আঁতোয়া, ভীত কনসুয়েলোকে অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখানোর কথা দিয়ে। আর সেখানেই খানিক জোর করেই আদায় করে নেন প্রথম চুম্বন। মাত্র কয়েক ঘণ্টার আলাপে উড়ন্ত বিমানে চালকের আসনে বসেই করে ফেলেন বিবাহের প্রস্তাব।

সদ্য বিধবা কনসুয়েলো একের পর এক মনের বাধা কাটিয়ে ওঠেন আঁতোয়ার দুরন্ত ভালোবাসায়। ঘটনাচক্রে সেইসময় নেমে আসে স্থানীয় বিপ্লবও। গুলিবর্ষণের ভিতর দিয়েই তাঁরা দুজনে এক বন্ধুর হোটেলে পৌঁছন। বিপ্লবের ফলে সরকার বদলে গেলে আগের সরকারের অতিথি হিসেবে সমস্যায় পড়েন কনসুয়েলো। একদিকে পাইলট হিসেবে আঁতোয়ার কাজের ব্যস্ততা, নিজের অদ্ভুত পরিস্থিতি, বিপ্লব, একাকিত্ব– সব মিলিয়ে কনসুয়েলোকে বিভ্রান্ত করে তোলে। অন্যদিকে, অঁতোয়ানের মা না আসতে পারায় বিবাহ পিছিয়ে যেতে থাকে এবং স্থানীয় লোকজনের চোখে বিধবা কনসুয়েলোর সঙ্গে আঁতোয়ার সম্পর্ক অবৈধ বলে মনে হতে থাকে। আর্জেন্টিনার বন্ধুবান্ধবরা কনসুয়েলোকে ত্যাগ করেন। বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত কনসুয়েলো এরপর প্যারিসে ফিরে আসেন। কিন্তু আঁতোয়া তাঁর পিছু ছাড়েননি। এমনকী আঁতোয়ার পরিবারও প্রাথমিকভাবে ভিনজাতির মহিলা কনসুয়েলোকে মেনে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। শেষপর্যন্ত দক্ষিণ ফ্রান্সের নিস শহরে তাঁদের বিবাহ হয়। এই পুরো সময়টায় কনসুয়েলোর উপস্থিতি আঁতোয়াকে তাঁর ‘ভল দ্য নুই’ বা ‘দ্য নাইট ফ্লাইট’ বইটি লিখতে অনুপ্রাণিত করে।

প্রবল প্রেম এবং বিবাহ তাঁদের প্যারিস থেকে ক্যাসাব্লাঙ্কা হয়ে নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কোথাও তাঁরা স্থায়ী ঘর বাঁধতে পারেননি। অন্য অন্য মহিলাদের প্রতি আঁতোয়ার আসক্তি বারবারই তাঁদের বিবাহিত জীবনে প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্যারিসে ফিরে আসার পরই নানা জনের কথায় এবং নিজেও এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হতাশাগ্রস্ত হচ্ছিলেন কনসুয়েলো। তবু আকাশের তারা ভালোবাসা স্বামীকে তাঁর চেয়ে ভালো কেউ বুঝতেন না। বৈমানিকের চাকরি হারিয়ে যখন উপার্জনের জন্য সাধারণ কেরানির চাকরি নিতে চেয়েছিলেন আঁতোয়া, নিষেধ করেন কনসুয়েলোই। আঁতোয়ার দুঃসাহসী বৈমানিক জীবন প্রতিমুহূর্তেই তাঁকে আতঙ্কিত করত ‘মৃত্যু’ নামক বিচ্ছেদের আশঙ্কায়। তবু কখনও তাঁকে বাধা দেননি কনসুয়েলো।

‘ভল দ্য নুই’ বা ‘দ্য নাইট ফ্লাইট’ প্রিক্স ফেমিনা পুরস্কারে সম্মানিত হলে প্রকাশকের ডাকে তাঁরা ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে ফিরে আসেন প্যারিসে। লেখক হিসেবে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে আঁতোয়ার। তাঁর প্রথম দু’টি বই-ই চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়। নামীদামি ফরাসি পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে একের পর এক লেখা। তাঁর পুরনো বন্ধু খ্যাতনামা লেখক অঁদ্রে জিদ ছাড়াও লিওঁ-পল ফার্গের মতো তরুণ লেখকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। আলাপ বাড়ে পিকাসো, ম্যাক্স আর্নেস্ট, দ্যুশঁপ-এর মতো শিল্পী এবং বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে অনুগামীদের সংখ্যাও। বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। সেই দুনিয়ায় ক্রমে দূরত্ব বাড়তে থাকে কনসুয়েলোর সঙ্গে। গল্প বলিয়ে কনসুয়েলো ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকেন কর্তব্যপালক স্ত্রীর ভূমিকায়। একই বাড়িতে দু’জন লেখক থাকতে পারে না, এটাই ছিল আঁতোয়ার বক্তব্য। কনসুয়েলো ভাস্কর্য শিখতে ভর্তি হন।

দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ না থাকায় প্রবল অসুস্থতার তীব্র হতাশা থেকে কনসুয়েলো কখনও ক্ষণিক জড়িয়েছেন অন্য সম্পর্কেও। কিন্তু আঁতোয়াকে কাছে পেতেই আবার ভুলে গিয়েছেন সেইসব। মানসিক চিকিৎসার জন্য কনসুয়েলোকে সুইজারল্যান্ডে পাঠিয়ে দীর্ঘদিন খোঁজ নেননি আঁতোয়া। কনসুয়েলো কিন্তু অভাবের দিনে আঁতোয়ার সম্পাদক-প্রকাশকদের দরজায় দরজায় ঘুরে তাঁর আগামী অভিযানের জন্য অর্থ জোগাড় করেছেন। আঁতোয়ার বোনের দুর্ঘটনার পর নিজের ঘরে রেখে তাঁর যত্ন করেছেন। সেইসময়েই আঁতোয়া নিজে, তাঁর প্রেমিকা নেলি এবং বোন তাঁর সঙ্গে এমন ব্যবহার করতেন যে, তাঁর মনে হত নিজের ঘরেই তিনি অবাঞ্ছিত। আঁতোয়ার বোনের সুস্থতার পার্টিতেও তিনি ছিলেন অনাকাঙ্ক্ষিত। ক্ষোভে, অভিমানে পার্টি থেকে বেরিয়ে পথে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা কনসুয়েলোকে কেউ উদ্ধার করে একটি হাসপাতালে পৌঁছে দেন, যেখানে ভবঘুরেদের ধরে রাখা হত। পুলিশ তাঁর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তিনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার কোনও চেষ্টাই করেননি। অনেক কষ্টে কনসুয়েলো সেখান থেকে নিজের চেষ্টায় পালাতে পারেন। এরপর স্বামীর সুটকেসে তিনি অন্য মহিলাকে লেখা প্রেমের চিঠি এবং সেই মহিলারও তাঁর স্বামীকে লেখা চিঠি দেখতে পান, স্বামীকে তাই নিয়ে সরাসরি প্রশ্নও করেন। এর ছ’-মাস পরে গুয়েতেমালাতে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে একাই সমুদ্রপথে রওনা দেন কনসুয়েলো। যাত্রাপথে জাহাজেই টেলিগ্রাম নিয়ে আসেন এক ভদ্রলোক, তাতে জানতে পারেন স্বামীর ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে, গুয়েতেমালার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। চিকিৎসায় এবং কনসুয়েলোর নিয়মিত যত্নে খানিক সুস্থ হয়ে উঠেই আঁতোয়া অস্ত্রোপচারের জন্য আমেরিকা পাড়ি দেন। কনসুয়েলো সঙ্গী হতে চাইলে তিনি মনে করান যে, তাঁরা এখন আলাদা থাকছেন। আঁতোয়া চলে যাওয়ার পরই প্রবল অসুস্থ হয়ে ক্লিনিকে ভর্তি হন কনসুয়েলো। মায়ের সেবা, যত্নে সুস্থ হয়ে পৈতৃক বাড়িতেই ফিরে যাওয়া মনস্থির করেন।

অন্যদিকে, আঁতোয়া তখন আবার তাঁকে প্যারিসে ফিরে যেতে বলেন, তিনি নিজেও ফিরবেন, তা জানিয়ে। এল সালভাদরে ফিরে গেলেও বেশিদিন থাকতে পারেননি কনসুয়েলো। আঁতোয়ার অনুরোধে আবার এলেন প্যারিসে। কিন্তু সেখানেও আঁতোয়া থাকার ব্যবস্থা করলেন একই হোটেলের আলাদা তলায় দুটি আলাদা কক্ষে। কনসুয়েলোর নিজেকে অপমানিত মনে হয়। এরপরেও তিনি একত্রে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকার প্রস্তাব করলে, তা বাস্তবায়িত হয় না। অবশেষে নিজের জন্য আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করেন কনসুয়েলো। নতুন বছরের প্রাক্কালে তাঁকে প্যারিসে একা রেখেই আলজেরিয়া পাড়ি দেন আঁতোয়া। একাকী কনসুয়েলো একটা স্টুডিও ভাড়া নিয়ে ভাস্কর্যচর্চায় নিয়োজিত করেন নিজেকে। বন্ধুদের মুখে তিনি জানতে পারেন যে, আঁতোয়া প্যারিসে ফিরেছেন এবং নেলির সঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে থাকছেন। এবারে তিনি স্বামীর কাছ থেকে অর্থসাহায্য নেওয়াও বন্ধ করে দেন। রেডিও-তে স্প্যানিশ ভাষার ঘোষকের কাজ নেন। ইতিমধ্যে আঁতোয়া লিজিয়ঁ দ্য’অনারের অফিসার পদে উন্নীত হয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর নতুন বই ‘তের দেজোম’ অর্থাৎ, ‘উইন্ড, স্যান্ড অ্যান্ড স্টারস’ তাঁকে লেখক হিসেবে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।

আঁতোয়া কনসুয়েলোর জন্য গ্রামাঞ্চলে একটি বড় বাড়ি ভাড়া করলেন। নিজে প্যারিসেই থাকতেন, আর মাঝে মাঝে চলে যেতেন কনসুয়েলোর কাছে। তাঁরা দু’জনে একসঙ্গে রইলেন না, আবার ছেড়েও গেলেন না পরস্পরকে। রেডিওর ঘোষক হিসেবে কনসুয়েলো তাঁর প্রাক্তন স্বামীর পদবি আবার ব্যবহার করতে শুরু করেন, এমনকি আঁতোয়াকে বিস্মিত করে দিয়ে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও নেন রেডিও-র জন্য।

ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। আঁতোয়া কনসুয়েলোকে পো শহরে পাঠিয়ে দিলেন নিরাপত্তার জন্য। কনসুয়েলোকে দেখা করতে বলেও হোটেল থেকে ফিরে যেতে বলেন আঁতোয়া। এই সময়ে একাকিত্বের কারণে আবারও অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন কনসুয়েলো। কিন্তু সেকথা শোনামাত্রই হোটেলে বিরাট পার্টি দিয়ে তাঁকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করলেন আঁতোয়া। কিন্তু তারপরেই আবার স্ত্রীকে ফেলে রেখে আমেরিকা চলে গেলেন। কনসুয়েলো এবার ওপেদ-এ চলে আসেন। সেখানে তাঁরা কয়েকজন শিল্পী মিলে কমিউন বানিয়ে নিজেদের রান্নাবান্না ঘরকন্নার কাজ করতেন, সোয়েটার বুনতেন এবং নিয়মিত বিপদ মাথায় নিয়ে জার্মান ট্রেন থেকে খাবার সরিয়ে আনতেন। সুন্দর একটা বন্ধুত্বের পরিবেশ তৈরি হলেও, আঁতোয়ার ডাকে এবার আমেরিকা পাড়ি দেন তিনি। আমেরিকায় পৌঁছে আবারও খুব হতাশই হলেন কনসুয়েলো। কারণ আঁতোয়া কাছাকাছি অন্য একটি হোটেলে থাকছেন। ওপেদ-এর বন্ধুদের অভাব আরও বেশি করে মনখারাপ করে দিচ্ছিল। তবে ক্রমশ আমেরিকাতে বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন। আঁতোয়া  নিজের বাসার কাছেই তাঁর জন্য একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে দেন। স্থানীয় আর্টস্কুলে ভর্তি হয়ে আবার ভাস্কর্যচর্চা শুরু করেন কনসুয়েলো, সেখানে অনেক নতুন বন্ধুও হয়। কিন্তু এত কাছাকাছি থেকেও এতটা দূরত্ব কনসুয়েলো মেনে নিতে পারছিলেন না। বিষয়টি আঁতোয়াকে জানালে কনসুয়েলোকে নিজের বিল্ডিং-এর অন্য একটি অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে এলেন তিনি। স্ত্রীকে একটি টাইপরাইটার ও একটি ডিক্টাফোন উপহার দিয়ে আঁতোয়া স্বীকার করেন যে, চাইলে কনসুয়েলো স্বামীর তুলনায় বড়োমাপের লেখক হতে পারতেন। ওপেদ-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে কনসুয়েলোর লেখা স্মৃতিকথা প্রকাশ পায় ১৯৪৫ সালে।

গরম পড়তে শুরু করলে কনসুয়েলো ঠিক করলেন আঁতোয়ার স্বাস্থ্যের কারণে তাঁরা ঠান্ডা কোথাও গিয়ে বসবাস করবেন। আঁতোয়ার পরামর্শে একদিন নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনাল স্টেশন থেকে টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে পড়লেন কনসুয়েলো। কোথায় যাবেন, তা না ঠিক করেই। নামলেন লং আইল্যান্ডের নর্থপোর্ট-এ। আশ্চর্যজনক ভাবে আঁতোয়ার লেখার এক ভক্তের আরামদায়ক বাড়ি বিনা ভাড়ায় পেয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গেই। পুনরায় একসঙ্গে থাকতে শুরু করলেন দু’জনে। আর সেখানেই লেখা হল আঁতোয়ার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ল্য পেতি প্রাঁস’, চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার এক বছর আগে।

শেষপর্যন্ত তাঁর গোলাপকেই ভালোবেসেছিলেন আঁতোয়া দ্য স্যাঁত একজুপেরি। ‘মেমোয়ার দ্য লা রোজ’ হল অনন্য এক দম্পতির কাহিনি, যাতে পুরুষটি ছিলেন মহিলার জীবনের একমাত্র জাদুকর এবং মহিলা সেই পুরুষটির রোমাঞ্চকর যাপনের নিয়ত অনুপ্রেরণা– যাঁর সঙ্গে পুরুষটি একটানা থাকতেও পারতেন না আবার তাঁকে ছাড়া বাঁচতেও পারতেন না। লং আইল্যান্ডে পুনর্মিলনের সময়ে লেখা, ‘ল্য পেতি প্রাঁস’ ছিল কনসুয়েলোর জন্য আঁতোয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। আর দ্বিতীয় সন্তান ‘মেমোয়ার দ্য লা রোজ’ হল কনসুয়েলোর উত্তর– যা তিনি কখনও স্বামীকে তাঁর জীবদ্দশায় লিখে উঠতে পারেননি, তাঁদের দু’জনের একান্ত নিজস্ব উপকথা।