marks of love in body or in bench or walls or trees | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খোদাই কসম জান

ক্লাস টুয়েলভের এক বেঞ্চে তা আবিষ্কার করা গিয়েছিল গত বছর সেই বছরকার ফেয়ারওয়েলের আগেভাগে, উচ্চমাধ‌্যমিকের জন‌্য সিট পেস্টিংয়ের সময়। প্রাথমিকভাবে খোদাই ছিল– A + N, তারপর, সেই N কেটে, ঠিক N-এর উপর থেকে নিচ অবধি লম্বা করে A-Z সমস্ত অক্ষর লিখেছে অন‌্য কেউ, এবং N অক্ষরকে বেশ করে কেটে পাশে বাংলায় খোদাই করা– আর সব ঠিকাছে, N শুধু আমার! বুঝা গেছে! তারপর আরেকটু নিচে আর সমস্ত অক্ষরের থেকে একটু বড় করে খোদাই করে লেখা O!

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬, ১৫:৫৬   
Facebook WhatsApp Messenger

ভোঁতা পাথর কি দেওয়ালে দাগ কাটতে পারে? আঙুলের নরম স্পর্শ দিয়ে কি আর গাছের ছালে স্মৃতি ধরা যায়? কাঠের বেঞ্চ বা বাথরুমের দরজা– আদতে অটল, দুর্ভেদ‌্য; কম্পাসের ছুঁচ, চাবির দাঁত, পয়সার প্রান্ত ছাড়া তাদের রাজি করা যায় না। স্থায়িত্ব বা চিরন্তনের দিকে ছুড়ে দেওয়া যে কোনও চিহ্নই আসলে জন্ম নেয় কোনও এক প্রান্ত থেকে, যা তীক্ষ্ণ, ধারালো– কেটে দিতে পারে, ভেদ করে যায়, ফুঁড়ে প্রবেশ করে। জরুরি নয়, তাকে হতে হবে কঠিন। কখনও কখনও কিছু নরমও আলগোছে এসে তুলে ধরে ক্ষুরধার রূপ। যেন, আঘাতেরই ভেতরে আছে স্নেহের ঘোষণা– আঘাত যা ছুঁয়ে যায়। একবার ওই দৃশ্যের দিকে তাকান– মনোযোগী, নিবিষ্ট হয়ে দেওয়াল বা বেঞ্চ কিংবা গাছের নিকটে কেউ ঝুঁকে পড়ে ঘষে চলেছে কিছু, সেখানে আছে ঘর্ষণ, আছে প্রতিরোধ– সেই দুর্ভেদ‌্য পট সে ভেদ করবে কিন্তু এফোঁড়-ওফোঁড় নয়, ছাল তুলে দেবে, রঙের পরত কিংবা পলেস্তারা, কিন্তু সুচারুভাবে বাঁচিয়ে রাখবে তাকে– এ কি নয় কোনও হিংস্র কর্ষণ? কিন্তু, ততক্ষণই যতক্ষণ না ফুটে উঠছে দুটো আদ‌্যক্ষর, তাদের মধ্যিখানে (x²+y²-1)³ – x²y³=0 সমীকরণের গ্রাফ প্লট কিংবা নিছক একখান যোগচিহ্ন। জানি, এবার পাল্টি খাবেন। দেওয়াল হয়ে উঠবে অর্থপূর্ণ, গাছ হয়ে উঠবে ঐতিহাসিক, কাঠের পাটাতন বলে উঠবে– মরিয়া প্রমাণ করিলাম, মরি নাই। তাই কথা না বাড়িয়ে আলো-অন্ধকারে যাই, রক্তনালির কাছে। চামড়ার ঠিক সমীপে, আপাত সুরক্ষিত সংবহনতন্ত্রের ওপর মাপা টান, চাপা দাঁত-ঠোঁটের কারুকাজে সূক্ষ্ম জালিকা যখন ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসে, ত্বকের আলতো গভীরে কালশিটে রূপরেখা দেয়– এবার? এবার কী বলি বলুন দিকি– হিকি!

অর্থাৎ, প্রেমও তীক্ষ্ণতা ব‌্যতিরেকে নয়, তাই তো? দাঁত কি মাংস চিনতে পারে? কম্পাসের ছুঁচ কি জানে কোনটা প্রেমিক আর কোথায় শত্রুর দেহ? ‘Tattoo be or not to be’-র দ্বন্দ্বে প্রেমিক-প্রেমিকা বদলে যাওয়ার নিত‌্যতায় যতই ঘাই মারুক না কেন, চামড়ার তলে কালি ঠিক পৌঁছে যায়, বাকিটা ‘Till Laser do us Apart’! তীক্ষ্ণপ্রান্ত– সে নীতিহীন, শুধু মাত্রার বিন‌্যাসে-সূক্ষ্মতায় ভিন্ন দিক উন্মোচন করে। আঘাত হয়, রক্তপাত ঘটে, জ্বালা চুঁয়ে পড়ে– তবে স্মৃতিকে দৃশ‌্যমান করতে যতটুকু ভাঙচুর প্রয়োজন, ততটুকু।

এই পরিমিতির উসকানিটুকু তুলে নিলে তা আমাদের দেহবুদ্ধি ঘেঁটে দেওয়ার জন‌্য যথেষ্ট! ভালোবাসা বা প্রেম– যে নামেই ডাকা হোক না কেন, সে মোটেও তত গৌরী নয়, ঠিক যতটা রাগ বিহাগে ঋষভের ছুঁয়ে যাওয়া আছে। প্রেম– সে অনুপ্রবেশকেই প্রবেশদ্বার করেছে সর্বসমুখে, অলখে। কারণ, সে জানে, সে অনিশ্চিত। উদ্বায়ী। বুঝভুম্বুল। হাস‌্যকর। এবং অসামান‌্য। আর মানুষ, নশ্বরতায় ভয়ার্ত প্রাণী, সংরক্ষণের ঊষর মাটি কামড়ে ধরতে উঠে-লেগে পড়ে। স্মৃতি সতত ভঙ্গুর, তাই খোদাইতে হয় তৎপর। নীরবতাকে একইসঙ্গে তার মনে হয় শাশ্বত এবং সন্দেহজনক, তাই সে চায় প্রতিশ্রুতির ব‌্যাপক বিন‌্যাস। এবং প্রেম, হয়ে ওঠে খোদাই গাওয়া কিংবা ‘খোদাই খিদমতগার’! হিপোক্রেটিস যতই বলুন– ‘Ars Longa, Vita Brevis’– শিল্প দীর্ঘস্থায়ী জীবন সীমিত– সমস্ত শিল্পীকে যতই লিঙ্গ-নির্বিশেষে ‘প্রেমিক’ বলে দাগানো হোক– আদপে সমস্ত প্রেমিকই প্রাথমিকভাবে ‘আনপেইড আর্টিস্ট’। তাদের গ‌্যালারি অই ক্লাসের বেঞ্চ, সুলভ শৌচালয়, গাছের কাণ্ড, কারখানার লকগেট, পাড়ার পাঁচিল, পার্কের ঢেঁকি, শক্ত পাথর, নরম মানুষ, দলা মাটি, আধলা ইট, শহিদ মিনার, শ্মশানঘাট– কাউরে সাড়ে না। এবং হালে হ‌্যাশট‌্যাগ নথিকরণও। এদের মধ্যে কেউ কেউ শেষ পাতা থেকে নামের শুধু আদ‌্যক্ষরের গোপনতা পেরিয়ে গোটা একটা খাতা উজাড় করে দেয় অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে, কেউ ভরে তোলে রং, কেউ অংকের সমীকরণ পেরিয়ে হৃদয়ের কথা বলিতে ব‌্যাকুলতায় n-th Dimension, আপেক্ষিকতার আহরণে ঘাড় চুবিয়ে দেয়। এদের মধ্যে কারও কারও কাজ শতকের পর শতক থেকে যায়, আর কারও কারও জান থাকে নতুন চুনকামের আগে অবধি কিংবা নতুন ব্রেকআপ হবে বলে খোদাই ক্ষণে ক্ষণ। 

স্বামী বিবেকানন্দ যে বলেছিলেন, ‘জন্মেছিস যখন, দাগ রেখে যা’– তাঁর এই বাণীকে সবচেয়ে সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন মনে হয় বাপি লাহিড়ী। বাচ্চাকে যতই আঁকার খাতা দেওয়া হোক, কিছুক্ষণ পরেই তার বৃহত্তর ক‌্যানভাস অনিবার্য প্রয়োজন হয়ে ওঠে– সে রং-পেনসিল নিয়ে ধেয়ে যায় বিছানার চাদরে, ঘরের দেওয়ালে, তা সে মা-বাপ যতই বারণ করুক না কেন– এবং শেষে কানমোলা ‘অবাধ‌্য বাঁদর কোথাকার, নাম খারাপ করে ছাড়বে বাপ-মার, একটুও কথা শোনে না’ র‌্যান্টিং। তেমনই বাপি লাহিড়ী এবং তাঁর সেই খোদাইয়ের গান– অলকা ইয়াগনিকের গলায় প্রেমিকা বারণ করেই চলেছে, সাবধান করে দিচ্ছে– কিন্তু বাপিদার সুরে প্রেমিক নাছোড়। সে সমুদ্রতট জুড়ে বালিতে নাম লিখে দিতে চায়, প্রেমিকা সতর্ক করে বলল– জলে ধুয়ে যাবে। এবার বাপি আরও চঞ্চল, বালি যখন হল না, হল্ট নেওয়া যাক ফুলে। প্রেমিকার অমনি আচমন– রোদে জ্বলে যাবে। এবার বাপির ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ– হৃদয়ে তোমার নাম লিখে দেব! তারপর তো প্রেমিকা লজ্জায় একেবারে মগনলাল! বাপিদাকে এ ব‌্যাপারে মান্নাদা যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে’– কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু, বদনামের ব‌্যাপারটা প্রথম ভুলিয়ে ছাড়লেন, বলা যায়, ভুলে যাওয়ার জন‌্য উত্তেজিত করে তুললেন মাননীয় রাজ চক্রবর্তী। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমায় গাড়ির মেকানিক কৃষ্ণ বড়লোকের বেটি লো পল্লবীকে যেভাবে বুকে নাম লিখিয়ে বাগে আনল– সেই দুঃসাহসিক হিরোপন্থা আমাদের সেই হাফপ‌্যান্টের দিনে এই সিদ্ধান্তে hence proved বুঝিয়ে দিয়েছিল– হয় খোদাই, নয় ভোঁদাই! কিন্তু, বুক কাটা কি মুখের কথা! তাই, কেউ হাত কাটতে শুরু করল তো কেউ পা। বাথরুমে হিসির জলে চকচক করে উঠছে ইতিউতি আধভাঙা ব্লেড। কেউ কেউ তত সাহসী নয়, ধরা পড়লে বাপের লঠ্যৌষধ ভেবে ভিরমি খাচ্ছে, কিন্তু কচিনী প্রেয়সীর জন‌্য দিল যে দিওয়ানা, শখ ষোলোআনা, বুদ্ধি আর ধরে না! সন্ধেবেলা পড়ার ফাঁকে মশাকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করার পর আটক করছে জোয়ানের ফাঁকা কৌটোয়। তারপর কালেকশন কমপিলিট হলে পর, রাতে বাপ-মায়ের ঘরে অন্ধকার জ্বলে ওঠা মাত্র একেকটাকে বের করে করে পিছন টিপে লহু ছেঁচে সে কী রক্তঝরা প্রেম কা পৈগাম! অন্তে, আঁশটে গন্ধ যাতে না ছড়ায়, তাই ড্রেসিং টেবিল থেকে টুক করে এনে একটু ডিও স্প্রে। আগামী দু’দিন কেবল কবজিতে ব‌্যান্ডেড সেঁটে অভিনয়টা সফল করতে পারলে, তৃতীয়দিনে চিঠিটা– দেওয়া যাবে করে সান্টিং টিউশন ছুটির ভিড়ে ঈষৎ নিবিড়ে, বোতলেরো খোপে উত্তর দিবি রে! এই কাটাকুটির হট্টগোলে যাদের সংশোধন হল বা শোধন, বর্তে গেল– যাদের হল না, তারা হল উচ্চাসীন– শৌচালয়ের দেওয়ালে! সঙ্গে, যত দোষ যৌনতোষ! বিবেকানন্দ এই দাগ রেখে যাওয়া দেখলে একবার কেন বহু বহু বার গরম তাওয়ায় বসে পড়তেন নির্ঘাত, রনে দেকার্ত লিখতেন, ‘I etch, Therefore we were!’ এদেরই কেউ কেউ নতুন করে সাহস জড়ো করে কলেজে গিয়ে নতুনতর দাগা খেয়ে গড়ে তুলল বয়েজ ক্লাব– তাদের অন্তরের অন্তঃস্তলস্থ গার্ল মার্কস ডাক দিয়েছেন– দুনিয়ার লউন্ডা এক হও এবং বিচিত্র চিত্র খোদো টয়লেট দেওয়ালে! ভালোবাসা না পেলে এরা যে আরও বেশি লন্ডভন্ড করবে সব, তার দৃষ্টান্তে আরেকটু গড়িয়ে গেলে যুদ্ধটা আর ফেয়ার গেম থাকবে না! 

এ প্রকোপ, এ ভায়োলেন্স হেনকালের নয় কিন্তু। সেই যে আধুনিক সভ‌্যতার অন‌্যতম নিদর্শন রোমান শহর পম্পেই, ভিসুভিয়াসের আগুনে যে-শহরের সমস্ত মানুষ গেল ঝলসে, আগ্নেয়গিরির ছাইতে যে-শহর পড়ে গেল চাপা– আরও বহুকাল পর সেই শহর যখন খনন করে পাওয়া গেল, তার এক সরাইখানার বাইরের দেওয়ালে পাওয়া গেল– জনৈক তাঁতি সাকসেসাস, সরাইখানার পরিচারিকা আইরিশ এবং জনৈক মাতাল সেভারাস– এই তিনজনকে ঘিরে অন‌্যতম প্রাচীন ত্রিকোণ প্রেম-খোদাই– কিন্তু পড়লেই বোঝা যাবে, আদপে, দুই মদ‌্যপ যুবার একতরফা ‘দাদা-বউদি’ ভাবাবেগে মার গঙ্গা ঝিলিক ঝিলিক চলছে! আন্দাজ করা যায়, তার্কিকদের শহরে ‘মুখ থাকতে হাতে কেন’-র চল-ই ছিল বেশি। তাই সমস্ত ঝগড়া-আক্রোশ ওই দেওয়ালের গায়েই খোদাইকাজে সারা। সাকসেসাস হয়তো বা কিঞ্চিৎ পাত্তা পেয়েছিল একদিন আইরিশের কাছে, সেই ক্ষোভে সেভারাস যে খোদাইলিপির আত্মপ্রকাশ ঘটাল, বাংলায় সেই তীক্ষ্ণ আক্রোশের তরজমা হতে পারে এমন– 

সাক্সেসাস, তুশ্চু এক তাঁতি, সরাইখানার দাসী আইরিসকে ভালবাসে। কিন্তু সে তাকে পাত্তাটুকুও দেয় না। তবুও তার কাছে করুণার জন্য ন‌্যাকাতাঁতির মিনতির শেষ নেই। তোর প্রতিদ্বন্দ্বী এই কথাগুলো লিখে গেল। বিদায়!
সাকসেসাস আর চুপ থাকে কেন–
রে নরাধম, হিংসায় তো জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিস। যে তোর চেয়ে তাকতঅলা, তোর চেয়ে ড‌্যাশিং, তোর চেয়ে বিছানায় অধিক সক্ষম– তার কাছে হার মেনে নিতে আবার লজ্জা কীসের!
সেভারাসের এরপর কিঞ্চিৎ নীরবতার ঘানি দিয়েই সাকসেসাস-কে পিষে দেওয়ার শেষ চেষ্টা–
আমি নিজেই কথা বলে জেনেছি রে হতভাগা। যা লেখার লিখেই দিয়েছি। তুই ভালোবাসতে পারিস আইরিশকে, কিন্তু আইরিশ তোকে ভালোবাসে না। 

এখানেই শেষ, কিংবা এরপরই হয়তো ভিসুভিয়াসের অগ্ন্যুৎপাত এই ত্রিকোণ প্রেমের জ্বালা সাঙ্গ করে। কিন্তু, তার ধিকিধিকি আগুন হালে নতুন আঙ্গিকে আমার নজর কেড়েছে আমারই স্কুলে। ক্লাস টুয়েলভের এক বেঞ্চে তা আবিষ্কার করা গিয়েছিল গত বছর সেই বছরকার ফেয়ারওয়েলের আগেভাগে, উচ্চমাধ‌্যমিকের জন‌্য সিট পেস্টিংয়ের সময়। প্রাথমিকভাবে খোদাই ছিল– A + N, তারপর, সেই N কেটে, ঠিক N-এর উপর থেকে নিচ অবধি লম্বা করে A-Z সমস্ত অক্ষর লিখেছে অন‌্য কেউ, এবং N অক্ষরকে বেশ করে কেটে পাশে বাংলায় খোদাই করা– আর সব ঠিকাছে, N শুধু আমার! বুঝা গেছে! 

তারপর আরেকটু নিচে আর সমস্ত অক্ষরের থেকে একটু বড় করে খোদাই করে লেখা O!

সেই O-এর ছিরি দেখলে স্বয়ং ইউক্লিড আরও আগে বুঝে যেতেন, একটা সরলরেখা আদপে বৃহত্তর বক্ররেখার অংশ, চিরঅনন্ত দূরে একদিন দুই প্রান্ত একে-অপরকে ছোঁবেই এবং অযথা জ‌্যামিতিতে মাথা খাটিয়ে জীবনটা সাঙ্গ করতে হত না, কম্পাসের খোঁচায় একটা প্রেম অন্তত নিঃশব্দ চরণে আসত নিশ্চিত! কিন্তু, নিঃসন্দেহে, এই নিদর্শন বলে দেয়, কালক্ষয় ঘটেছে, জমানা বদল গিয়া, কিন্তু আদিম রিপুর মৃত্যু নেই। দু’টি আদ‌্যক্ষর ও একখান যোগচিহ্নে ভালোবাসা একরাশ চিরন্তনের হাওয়া ধরে রেখেছে ওই খাঁজে। মানুষ দুটো থাকুক বা না থাকুক, অন‌্য অন‌্য রান্নাঘরে আলো জ্বলে উঠুক, অন‌্য অন‌্য সন্তানের বাবা-মা হোক তারা কিংবা ওই দু’জনের কেউ চলে যাক অকালে, কিংবা হয়তো একজনেরই মনে মনে একতরফা, কিন্তু এই চিরন্তন সমীকরণের ছাঁচ বলে দেবে– ঘটেছিল! জমেছিল‌! কিছু একটা হয়েছিল, ম‌্যাজিকের মতো, এই ধরাতলে!

দুনিয়া জুড়ে এই সমীকরণ অজস্র, হয়তো বা মানুষের সংখ‌্যার চেয়েও বেশি, কিন্তু এর সফলতম ও আশ্চর্যতম উদাহরণ পেয়েছি আমি শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখায়। ভালোবাসার এমন চারকান, এহেন হাটে হাঁড়ি, এমন জয়ঢাক এবং অক্ষয় খোদাই জন্ম-জন্মান্তরে ভুলিবার নহে এবং তার সমস্ত কৃতিত্ব শ্রীমান সুজিতকুমারের। ক‌্যানিং, ডায়মন্ড হারবার, নামখানা, বজবজ– দক্ষিণ শাখার যে ট্রেনই ধরুন না কেন, পার্ক সার্কাস ছেড়ে যখন শিয়ালদহ স্টেশনের দিকে এগচ্ছে, ধিকিরধিকির করে ক্রমশ, ডানদিকে মাথাখানি স্থির রেখে চোখ রাখবেন টানটান খোলা– পরের পর ঘেঁষাঘেঁষি আইনি-বেআইনি রংহীন বাড়িঘরের মাঝে হঠাৎই চোখে এড়িয়ে যেতে পারে সেই বাড়ি, যার শুধু উপরতলাটুকু আকাশের সঙ্গে ক‌্যামোফ্লেজে আকাশি রঙে মোড়া, ঠিক তার নিচের তলায় এক চিলতে জানলা মাত্র, কোনও সিঁড়ি নেই, পাইপ নেই, জানালারও নেই পোক্ত কোনও কাঠামো– সেই জানালার ঠিক ওপরে কীভাবে কে জানে– দেখা যাবে লেখা, আলকাতরার কালো মোটা পোঁচে লেখা– সুজিত + মালী!

এ এক বিস্ময়। আন্দাজ করা যায়, এ কাজ সুজিতেরই। কিন্তু, এমন বিপদসংকুল জায়গা সে বেছে নিল কেন তার ভালোবাসার বিজ্ঞাপনের নিমিত্তে? আর কেউ যাতে পৌঁছনোর সাহস না করে নতুন করে লেখার জন‌্য বা মুছে দেওয়ার জন‌্য? না কি সেই মালী অন‌্য কোনও বাগানে আজ? দক্ষিণ শাখার কোনও এক লাইনে কি তার রোজ যাতায়াত? সে যাতে সুজিতকে ভুলতে না পারে?

আদিম সেই গুহাজীবন ছাড়িয়ে হালের আইনি-বেআইনি প্লটে ঘাড় গোঁজার ঠাঁই ইস্তক, প্রেমের খোদকারি বিবর্তিত হয়েছে নিখাদ আখরে– শিকার সঙ্গী থেকে কাব‌্যাকাঙ্ক্ষা, অধিকার থেকে অংশীদারে, চিরন্তন থেকে চিরউচাটনে, রিলেশনশিপ থেকে সিচুয়েশনশিপে– বদলায়নি কেবল একটাই– মানুষের দাগ রেখে যাওয়ার চাহিদা। গোপন থেকে গোপনতর চুক্তিতেও একমাত্র এই প্রেম যে কেবল খোঁজে প্রকাশের পথ, প্রকাশের মধ‌্য দিয়ে সে চির আস্থা, চির স্থায়িত্ব, চির উষ্ণতার শালখানি চাপিয়ে নিতে চায়। এমনকী, চির নিন্দার উপাখ‌্যানেও। সেখানেও দাগ, এবং তা-ও আকাঙ্ক্ষিত– আমি তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী/ আমি সকল দাগে হব দাগী!

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন সুপ্রিয় মিত্র-র অন্যান্য লেখা

………………………

Love Love Sign lovebite lovers Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Valentine's Day

Share this article on