Robbar

বাংলা ভাষার থেকে আমি কী পেলাম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 22, 2026 4:59 pm
  • Updated:February 22, 2026 6:24 pm  

যে ভাষা জন্মগত, সে ভাষাও বড় হয়। ঘরের বাইরে পা রাখি যখন, তখন আমাদের ঘর বড় হয়ে যায়। যেহেতু এতগুলো বছর ধরে, জীবনের টানে আর কাজের প্রয়োজনে আমি অনেক জায়গায় গেলাম, অনেক মানুষের সঙ্গে মিশলাম, তাদের ভাষা শুনলাম, তাই আমার বাংলা ভাষার মানচিত্রটা অনেকটা বড় হয়ে গেল। এ আমার মস্ত প্রাপ্তি। সঙ্গে সঙ্গে সেই মানচিত্র জটিলও হল, কাঁটাতারের দাগ লেখা হল তার গায়ে, আমার ভাষা রক্তাক্ত হল। এখন আমি তাই আমার ভাষার ভিতরে সমাজ শুনতে পাই, কৌম যাপন শুনতে পাই, একাকিত্ব শুনতে পাই, শ্রেণি শুনতে পাই, ভেদবিভেদ, সম্প্রদায়, সাম্প্রদায়িকতা– এইসবও শুনতে পাই। 

প্রচ্ছদের স্কেচ: শান্তনু দে

মৌসুমী ভৌমিক

বাংলা ভাষা তো আমার ঘর। তাই আলাদা করে নিজের ঘরের বিষয়ে কী বলব? কী বলতে পারে মানুষ? যে ভাষা স্বাভাবিক, সহজাত; আরও ভালো করে বললে, যে ভাষা আমার কাছে প্রাকৃতিক– সেই ভাষার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পাওয়া-না-পাওয়া দিয়ে মাপা যায় না। একইসঙ্গে এ কথাও বলি যে, নিজের ঘর বলেই সে ঘর সম্পর্কে আমার মায়া আছে যেমন, তেমনই তার সম্পর্কে ক্রিটিকালও হতে পারি। আলো বড় কম, এক ফালি বারান্দার বড় প্রয়োজন, এভাবেও ভাবতে পারি। 

বাংলা ভাষা আমায় লেখা দিয়েছে, গান দিয়েছে, ধ্বনির একটা জগৎ দিয়েছে, একটা শব্দভাণ্ডার দিয়েছে। আর যা দিয়েছে তা হল কতগুলো বোধ। ভাষাটা আমি যে খুব জানি, প্রচুর চর্চা করেছি, আমার প্রচুর পড়াশুনো, এমন একেবারেই নয়। বিশেষ করে ব্যাকরণগত দিক থেকে আমি খুবই দুর্বল, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে পারি না, বানান ভুল হয়ে যায়, যেমন গানেও হয়। কিন্তু ছোটবেলা থেকে বাংলায় লিখতে আমার ভালোই লাগত। সহজে পারতামও। চিঠি লিখতাম আমি, এখনও লিখি। আমার পড়াশুনো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। কিন্তু বাংলাতেই আমার বেশি আরাম ছিল। আস্তে ধীরে ইংরেজিতেও একটা আরাম এসেছে, কিন্তু সে অনেক পথ চলার পর। এখন ইংরেজি লিখতেও আমার বেশ লাগে। একটা কথা আমি বুঝেছি যে, ভাষার সঙ্গে ঘর করতে পারলে, তার সঙ্গে সমাজ করতে পারলে, কান আর মন খোলা রাখলে তখন ভাষা আমাদের বাড়তি কিছু দেয়। 

মৌসুমী ভৌমিক

যে ভাষা জন্মগত, সে ভাষাও বড় হয়। ঘরের বাইরে পা রাখি যখন, তখন আমাদের ঘর বড় হয়ে যায়। যেহেতু এতগুলো বছর ধরে, জীবনের টানে আর কাজের প্রয়োজনে আমি অনেক জায়গায় গেলাম, অনেক মানুষের সঙ্গে মিশলাম, তাদের ভাষা শুনলাম, তাই আমার বাংলা ভাষার মানচিত্রটা অনেকটা বড় হয়ে গেল। এ আমার মস্ত প্রাপ্তি। সঙ্গে সঙ্গে সেই মানচিত্র জটিলও হল, কাঁটাতারের দাগ লেখা হল তার গায়ে, আমার ভাষা রক্তাক্ত হল। এখন আমি তাই আমার ভাষার ভিতরে সমাজ শুনতে পাই, কৌম যাপন শুনতে পাই, একাকিত্ব শুনতে পাই, শ্রেণি শুনতে পাই, ভেদবিভেদ, সম্প্রদায়, সাম্প্রদায়িকতা– এইসবও শুনতে পাই। 

আমার বড় হয়ে ওঠা শিলং-এ। শিশুকাল থেকে বয়ঃসন্ধি অবধি আমার মিশ্র ভাষা আর সংস্কৃতির পাহাড়ে কেটেছে। কিন্তু আমার বাড়ি খুবই ছাপোষা বাঙালি, একেবারে বাংলা ভাষাতে গড়া, এতটুকুও পাহাড়সুলভ ইঙ্গবঙ্গ নয়। ঘরের বাতাসে বাংলা ছিল, সেই ভাষাতেই দম নিয়েছি। স্কুল ছিল আর এক রকমের মোনোলিঙ্গুয়াল। সেখানে আমরা অনেক ভাষা-সংস্কৃতির মেয়ে একসঙ্গে পড়ি; কিন্তু কথা বলি, লিখি, ভাবি মূলত ইংরেজিতে। পরে বুঝেছি যে এর ফলে জরুরি অনেক কিছু বাদও পড়ে গেছে। সে কথায় পরে আসছি।

বাংলা ভাষার কথাটা বলি আগে। কীভাবে আমার ভাষা ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে বাহিরের দিকে যেতে শুরু করল, আর আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেল নানান বোধের দিকে। ছোটবেলায় ঘরে রেকর্ড চালিয়ে, রেকর্ড থামিয়ে, আবার চালিয়ে গানের কথা লিখে নিতাম। তারপর সেই গান গাইতাম, সে গানের ভাষা বুঝি বা না বুঝি। ‘ও কে গান গেয়ে গেয়ে চলে যায়/ পথে পথে ঐ নদীয়ায়/ ও কে নেচে নেচে চলে মুখে হরি বলে/ ঢলে ঢলে পাগলেরই প্রায়’, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় শুনে শুনে লিখছি। কেউ শেখাচ্ছে না আমায়, আমি নিজে নিজেই শিখছি। ফলে, সেই ১০-১২ বছরের আমি, কী বুঝি এইসব শব্দের মানে? কী জানি এই গানের ভিতরে বাংলার কোন ইতিহাস লেখা আছে? অনেক অনেক কাল পরে, সিলেটের উপশহরে দাদা-বন্ধু অম্বরীশ দত্তর ফ্ল্যাটবাড়িতে বহু শিল্পীর সমাগম হয়েছে, সেখানে রুহি ঠাকুর লিড করছেন আর সকলে মিলে গাইছেন, ‘সুরধুনীর কিনারায় সোনার নুপুর রাঙ্গা পায়ে/ নব নাগরী গো/ সুন্দর গৌরাঙ্গ রায়’। এখন ভাবলে মনে হয়, কতকাল লেগে গেল আমার ছোটবেলায় শুনে শেখা ডি এল রায়ের সেই গানের অর্থ বুঝতে! কিন্তু ইতিমধ্যে আমার বাংলা ভাষা একটুখানি বড় হয়ে গেছে বইকি। স্থানিক বাংলা, যে বাংলায় মানুষ যাপন করে, তার এমন ঐশ্বর্য, ভাবলে অবাক হয়ে যাই। আমি তার কতটুকুই বা জানি? তবু নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হয়। এই এখানে-ওখানে ঘুরলাম বলেই না এত কিছু শোনার সুযোগ পেলাম। কিছু শিখলামও তার ফলে। গত ৩০ বছরে আমার সামনে আমারই ভাষা তার শব্দ, উচ্চারণ আর অর্থের ভাণ্ডার মেলে ধরেছে যেন। 

আমার ছেলেবেলার শিলং পাহাড়ে প্রচুর সিলেটের কাছাড়ের মানুষ থাকতেন। তাঁদের ভাষা, তাঁদের উচ্চারণ– এই যে ‘ক’ আর ‘খ’-এর মাঝখানের এক ধ্বনি– একে আমরা চিরকালই একটু খাটো করে দেখে এসেছি। এগুলো নিয়ে অনেক সিলেটির মধ্যেও এক ধরনের হীনমন্যতা দেখেছি। সেইজন্য তারা ঘরের শিশুদের সঙ্গে ‘ক্যালকেশিয়ান’-এ কথা বলতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই সিলেটি ভাষা, সিলেটি ভাষাভাষী মানুষ, বিশেষ করে তাঁদের গান থেকে আমি এত কিছু পেয়েছি! সেই রস পাবার জন্য অবশ্যই আমাকে ঘরের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। আমার দাদুর বাড়ি ছিল জলপাইগুড়িতে। সেখানে ওঁরা যেভাবে কথা বলেন– ‘করবা না’, ‘খাবা না’, ‘যাবা না’ কিংবা ‘আসছ? বসো’– এই কথা বলার ধরনটা খুব মধুর, খুব আন্তরিক। এই মাধুর্যটা আমার মধ্যেও ক্রিয়া করে। জলপাইগুড়িতে গেলে আপনা থেকেই আমার মুখের কথা পালটে যায়। তখন ওইভাবে কথা বলাটাই আমার সহজাত হয়ে যায়। আশ্চর্য যে, একটা ভাষা যত ভদ্রলোকি হয়ে ওঠে তত এইসব আঞ্চলিক বাচন আর ধ্বনিকে বর্জন করে। আমার বাবা-মা দু’জনেই জলপাইগুড়ির মানুষ। কিন্তু আমাদের বাড়িতে, বলা হত ‘এসেছ? বোসো’। কিংবা ‘কখন আসলা?’ না বলে ‘কখন এলে?’। এটাই দস্তুর ছিল। আসলে আমরা ভাবি যে, নিজের ভাষাকে একরকম করে গড়েপিটে নিতে হবে। নিজের তথাকথিত ‘উত্তরণের’ সঙ্গে ভাষার এই পরিবর্তনটাও জড়িয়ে থাকে। ভাষা যেন আমাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতির সূচক। ঘরের ভাষাটাকে বাদ দিয়ে আমরা যেন আরও বেশি ‘বাবু’ হলাম, শহুরে হলাম, কলকাতার মতো হলাম।

আসলে একদিকে আমাদের ভাষার ভিতরেই অনেক শ্রেণিভেদ আছে, অন্যদিকে আমাদের ভাষা আধিপত্যদোষে দুষ্ট। এটা কেবল আঞ্চলিকতার বিষয় নয়। ঐতিহাসিকভাবে আমরা আমাদের ভাষা দিয়ে অন্য ভাষাকে অবহেলা, অবজ্ঞা করে এসেছি। শিলং-এ থাকাকালীন আমাদের চারপাশে বাঙালিরা যেমন ছিলেন, অবাঙালিরাও ছিলেন। কিন্তু সেখানে আমার জীবনে মূলত দুটো ভাষাই ছিল। বাংলা আর ইংরেজি। আমি তো খাসিয়া শিখিনি। গারোদের ভাষা শিখিনি। আমাদের শেখানো হয়নি। আমাদের ইংরেজি শেখানো হয়েছে, খানিকটা হিন্দি শেখানো হয়েছে। সামান্য অহমিয়া আমি শুনে শুনে শিখেছি। আমার অঞ্চলের অন্য সব ধ্বনি, সব শব্দ থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি। আর আমার বাংলা ভাষার আধিপত্যের জন্যেই সেখানে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষাগুলো বঞ্চিত বোধ করেছে। একসময় তারা সেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছে, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চেয়েছে। তার ফলে আবার নতুন আধিপত্য আর বহিষ্কারের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। এ বঞ্চনার গল্প চক্রাকারে চলতেই থাকে। 

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। এই ‘ওরা’রা আসলে কখনওই নির্মূল হয় না, প্রতিবারের যুদ্ধে, প্রত্যেক রাজনৈতিক পালাবদলে একদল ‘ওরা’ আরেক দলের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়; আর তার বিরুদ্ধে, মুখের ভাষাকেই অস্ত্র করে, রুখে দাঁড়ায় মানুষ। এই যে বাংলাদেশ, যেখানে বাংলা ভাষার জন্য এত রক্তক্ষরণ, ভাষা যেখানে শুধু ঘর নয়, ভাষা যেখানে দেশের অপর নাম, সেইখানেও তো কতই টানাপোড়েন আর ভাষার আধিপত্য। কলকাতার ভাষার সঙ্গে পুরনো অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব আছেই; কলকাতার ভাষা সেখানে শুধু ভাষা না, ঢাকার কাছে কলকাতা এক পার্মানেন্ট ‘ওরা’, যে লড়াই শেষ হবার নয়। একইসঙ্গে দুই প্রতিপক্ষ এক গ্রহণ-বর্জনের সম্পর্কে বাঁধাও পড়ে আছে– ফেলাও যায় না, রাখাও যায় না যেন। নৃবিজ্ঞানী সাঈদ ফেরদৌস আমায় একবার বলেছিলেন, অপ্রেমের বিবাহ ভেঙে যাওয়াই ভালো। কিন্তু এ সম্পর্ক তো বৈবাহিক নয়, এ তো, পীর মজিরের ভাষায়, ‘আদি হইতে একই মাতা’র গল্প। সম্পর্ক ভাঙলেও মাতা একই থাকে। বাংলাদেশে আমি যাই অনেককাল ধরে, যেতে যেতে অনেক নতুন-পুরনো দ্বন্দ্ব দেখি। তার অংশও হয়ে যাই। ভাষার শ্রেণিবিন্যাস তো ছিলই, অঞ্চলে অঞ্চলে ভেদাভেদ, কারও দর বেশি, কারও কম, সুশীল বনাম খেতের ভাষা দেখেছি শুরুতে, তিন দশক আগে। ধীরে ধীরে ইংরেজির আধিপত্য ছড়িয়ে পড়তে দেখলাম, গ্লোবাল বাংলাদেশে। এইসব দেখে শুনে ‘একই মাতা’র কথাটাই মনে হয়, এপারেও তো একই (দুর)দশা। অন্য দিকে, দেশের ভিতরে না-বাংলা ভাষার জন্য স্থান নেহাতই অকুলান। ঢাকার গানের দল ‘মাদল’-এর সেই বুক টান টান গান ভাবি, ‘পাখির স্বভাব পাখির মতো উড়বে বলে’। 

এই বন যতদূর ঠিক তত দূর আমার বাড়ি
এই মাটিতে পোঁতা আছে আমার নাড়ি
সেই নাড়ি ধরে কারা যেন টান দিয়েছে
তাই রুখতে পীরেন স্নাল জান দিয়েছে।

কথা হচ্ছে, পীরেন স্নাল কে ছিলেন? কিসের জন্য জান দিয়েছিলেন তিনি? তাঁর লড়াইটা তো ছিল তাঁদের নিজেদের বনের, নিজেদের ভূগোলের, নিজেদের যাপনের, নিজেদের ভাষার অধিকারের লড়াই। কিন্তু সেই লড়াই-এর গান যখন গাইছে ‘মাদল’, গাইছে বাংলায়। অর্থাৎ, যে ভাষার (অর্থাৎ সিস্টেমের) আধিপত্যকে রুখতে এই গান, সেই ভাষাতেই এই গান লেখা হচ্ছে, গাওয়া হচ্ছে। দ্বন্দ্বটা সেখানেই।

রংপুরে আমরা যখন উত্তরবঙ্গের ভাওয়াইয়া রেকর্ড করেছি, বিয়ের গান, সেখানে দু’টি মেয়ে একসঙ্গে গেয়েছে–

হলদি বাটে পঞ্চরে আইও জৈ জোগাড় করি
মেন্দি বাটে পঞ্চরে আইও জৈ জোগাড় করি

একটা চার লাইনের গান। গানটা আমাদের ট্র্যাভেলিং আর্কাইভ ওয়েবসাইটে রাখা আছে। কী করে যেন এই গানটা আমার মনে অন্য একটা ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ফেলানি খাতুন ২০১১-তে ভারতের ফুলবাড়ি-অনন্তপুরে তারকাঁটার বর্ডার পেরিয়ে রংপুরে ফিরছিল, তার বাড়ি ছিল বাংলাদেশে কুড়িগ্রামে। ফেলানির বিয়ে হবার কথা ছিল। তার বাবা পার হয়ে গেলেন, কিন্তু ফেলানির জামাটা আটকে গেল তারকাঁটায়। তাকে গুলি করা হল। সে আর পার হতে পারল না, ওখানেই ঝুলে রইল মৃত অবস্থায়। পাঁচ ঘণ্টা। একজন ফটোগ্রাফার সেই দৃশ্যের ছবি তুললেন। ছবিতে দেখা গেল, তার সমস্ত শরীর থেকে রক্ত ঝরে ঝরে পড়ছে। এই যে ফেলানি, এই যে একটা নাম, এই নামটার কথা যদি আমরা ভাবি। রংপুরের ভাষা দিয়ে হয়তো একভাবে বোঝা যেতে পারে এই নামের মানে। আমি কুড়িগ্রামের মানুষ নই, তাদের মানের কথা আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমি যদি রাজনৈতিকভাবে ভাবি, মেয়েটা যেন ‘ফেলানি’ই ছিল। সে যেন ডিসপোজেবল, সমাজে তার থাকা না-থাকা ম্যাটার করে না। সে জন্যেই সমাজে তার নাম হয়ে যায় ‘ফেলানি’। আজ তার বিয়ে হলে হলদি বাটা হতো, মেহেন্দি বাটা হত। এই যখন ‘মেন্দি’ বলছে, তখন সেই শব্দ সমাজ আর সম্প্রদায়কে চিনিয়ে দিচ্ছে। বাঙালি ঘরে মেন্দি বললে, (আজকের প্যান-ইন্ডিয়ান বাঙালির কথা বলছি না, বলিউডি বিয়ের কথাও না) বাঙালি মুসলমানই বুঝি। শব্দ দিয়ে জগৎ, সমাজ একটু-একটু করে খুলে যাচ্ছে তখন। এটাই ভাষা আমাকে শেখাচ্ছে। যখন ঢাকায় ইন্ডিয়ান হাই কমিশনের সামনের ‘ফেলানি এভিনিউ’ নামে একটা রাস্তা হয়, তখন আবার ‘ফেলানি’ শব্দের অন্য অর্থ তৈরি হয়ে যায়। যে শব্দ অবহেলা বোঝাচ্ছিল, সেই শব্দই প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠল। অর্থাৎ, এই যে একটাই শব্দ, তার অর্থের নানা স্তর, একটা স্তরের উপর আরেকটা স্তর এসে পড়ছে। এগুলো তো ছোটবেলায় বুঝতাম না। প্রাকৃতিক ভাষাটা আসলে পরিবর্তিত, বিবর্তিত হতে থাকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ শিখতে শিখতে চলি। জানা শব্দের অর্থ পালটে যায়। ভাষা বড় হয়ে চলে, ভাষা ভেঙে ভেঙেও যায়। 

আজকে বাংলা একটা রাষ্ট্রের প্রধান ভাষা যেমন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে তা প্রান্তিক ভাষায়ও পরিণত হয়েছে। শুধু প্রান্তিক হওয়ায় থেমে থাকেনি, বাংলায় কথা বলা মানুষের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনছে রাষ্ট্র, তার ভাষা তাকে বেনাগরিক করে তুলছে। অবশ্যই এখানে শ্রেণির প্রশ্ন আছে, ধর্ম আছে, সমাজ আছে– সব বাঙালির ক্ষেত্রে এমনটা হচ্ছে না। এ এক চরম নিষ্ঠুর সময়ে বাস করছি আমরা। আমি সেই কেন্দ্র এবং প্রান্তের ভাষাতেই গান গাই, লিখি, কারণ সেটুকুই করতে পারি শুধু। তাতে কিছুই প্রতিরোধ করতে পারি না। মুশকিল হল, আমাদের নিজেদের মধ্যেই এত ভেদবিভেদ। আমরা একে অপরের ভাষা বুঝি না। বুঝতে চাই না। বোঝার ক্ষমতাও রাখি না। কারণ ভাষা বুঝতে হলে তো প্রথমে যার ভাষা, তাকে বুঝতে হবে। আমার লন্ডনের সিলেটি বন্ধু আহমেদ ময়েজের দাদা, অর্থাৎ ঠাকুর্দা ছিলেন পীর মজির উদ্দীন, যিনি একই মাতার কথাটা লিখেছিলেন। তাঁর অন্য একটা গান ময়েজ গেয়ে থাকেন: 

নগরবাসী রে, আমি নগরে নগরে ঘুরিলাম
নগরে নগরে ঘুরি মীমেরে খুঁজিলাম
পাইলে তারে নয়নজলে চরণ ধুয়াইতাম

এখন, এই যে ‘মীম’– কী তার মানে? কে বলে দেবে? যার যাপনের শব্দ এই মীম, তাকেই না জানি যদি, তাহলে তার শব্দকে কীভাবে জানব? আর, শব্দ না জানলে তার অন্বেষণের অংশ/অংশীদার হবই বা কেমন করে? শব্দ আমায় খুব টানে। মানুষও টানে। নতুন শব্দ শিখতে আমার ভালো লাগে। মানুষের সঙ্গে মিশতেও ভালো লাগে। কানে কিছু ভালো লাগলে আমি যত্ন করে রেখে দিই। ঝিনুকের মতন। পরে ভুলে যাই কোথায়, কোন বালুচরে পেয়েছিলাম সেই শব্দ, কিন্তু সঙ্গে থেকে যায়। একবার একটা গান লিখেছিলাম–

এই যে আমি যে এত কথা বলি
দেওয়ালের গায়ে প্রতিহত হয়ে
কথাগুলো কেন ফিরে ফিরে আসে

এই ‘প্রতিহত’ শব্দটা আমি কোথায় পেলাম? কবে পেয়েছিলাম? আমার মনে পড়ে না। কিন্তু মনে হয়, প্রতিহত হয়েই ফিরে আসছে আমাদের সব ভাষা। শুধু মুখের ভাষা না। আমাদের যাপনের, লড়াইয়ের, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সব ভাষা নিষ্ফল মনে হয়, তার গায়ে দেওয়াল ভাঙার জোর নেই আর।