Robbar

ক্ষমতার কাছে, নয়তো কবিতার কাছে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 27, 2026 3:02 pm
  • Updated:July 27, 2026 3:02 pm  

কবে থেকেই তো নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর দরগাহ খুলে দিয়েছিলেন। আমির কেন অত পরে এসেছিলেন? দীর্ঘ ৮ বছরের রক্তক্ষয় ও তার বর্ণনা কি আমিরকে ক্লান্ত করেছিল? একটানা সুলতান ও তার ক্ষমতার খেলা। আমিরও কি চুপ করে গিয়েছিলেন? মনে হয় যেন দেখতে পাচ্ছি যুদ্ধতাড়িত, রক্তক্লান্ত আমির খুসরুর প্রথম দিন আউলিয়ার কাছে আসার মুহূর্ত। ৫৭ বছর বয়স। এখন শুধুই শব্দ সাধনা। ১৩১০ সাল। এখন এই ২০১৩ সালে আমির খুসরুর মুখে বসে যাচ্ছে সলমান দারবিশের মুখ। যুদ্ধে সুর হারানো মুখ। খোয়াজা কৃপা করো…

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাকে সলমানের সঙ্গে আলাপ করানো হল। নিজামুদ্দিনের দরগায়। ২০১১ শীত শুরুর দিল্লিতে রাত এমনিতেই বেশ মায়াবী। এই বৃষ্টিহীন শহরে একমাত্র নরম ঋতু এই শীত। তার আগমন। তার বিদায় আর মার্চ অবধি থেকে যাওয়া রেশ। হলুদ আলোয় ব্যাপিত নিজামুদ্দিন চত্তর। দরগাহ। খালি পা। সঙ্গে বিদেশি তরুণ কবি। অনেক দিনের বন্ধু সে, ভারত নামক প্রাচীনতার কাছে শিখতে এসে এদেশের নবীন জটিলতায় আক্রান্ত। আধ্যাত্মিকতা নেই আমাদের। কিন্তু আমরা তবুও চলে আসি এই নিজামুদ্দিনের দরগাহে। শীতের যে কোনও বৃহস্পতিবার। সন্ধে থেকে রাত। সাধারণত বৃহস্পতিবার সন্ধেবেলা এখানে কাওয়ালি। আমরা আসি। মজে যাই আমির খুসরু দেলহাবি নামক এক কবি ও সংগীত রচয়িতার বয়ানে। ভাবতে থাকি এই সেই দরগাহ। এই সেই অঞ্চল যেখানে আমির খুসরু আসতেন। আসতেন কি?

নিজামুদ্দিনের দরগা

হজরত নিজামুদ্দিন তো তাঁর গুরু। নিশ্চয়ই আসতেন। অন্তত আলাউদ্দিন খিলজির রাজস্থান আক্রমণের পর আর কি কোথাও যাওয়ার ছিল? আমির সেখানে রাজকবি। যুদ্ধের ধারাবিবরণী লিখছেন। রণথম্বরের যুদ্ধের না হয় কারণ ছিল। আলাউদ্দিন খিলজির কাছে গুরুত্ব না পাওয়া স্ত্রী চিমনা বেগম ও আলাউদ্দিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী সৈন্য মহম্মদ শাহ-র সঙ্গে রাজস্থানের ওই অংশের রাজা হামির দেবের সন্ধি ও চক্রান্ত। যুদ্ধ ও আলাউদ্দিনের জয়। কিন্তু মেবার? ১৩০২ সালে মেবারের রানি পদ্মিনীর সৌন্দর্যতাড়িত যে যুদ্ধ সে তো শুধুই রক্তপাত। অনেক রমণীর সতী হওয়া। কবি আমির খুসরু কি এইসব সহ্য করতেন আলাউদ্দিনের রাজকবির পদে? তিনি কীভাবে লিখতেন ধারাবিবরণী? অথচ লিখেছেন। দীর্ঘ ৮ বছর। এরই মধ্যে কি তিনি নিজের লেখাও লিখেছেন?

আমির খুসরু, মজলিশ-আল-উসাক-এর চিত্র থেকে

নানা প্রশ্নে আমি জড়িয়ে যাই। আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায় নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহে। যার দেহে শুধু মানুষের বিশ্বাসের সুতো জড়ানো। আমরা তো দুর্বলতাকেই গিঁট দিয়ে শক্ত করি। দেখি। হলুদ আলো ও সুতোয় পেঁচিয়ে যাচ্ছে সময়। আমির খুসরু এসেছেন সেই সালতানাত থেকে। শাহি দিল্লির সালতানাত। নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর প্রিয় শিষ্যগণ নিয়ে আছেন তো সেই ফজরের নামাজকাল থেকে। এসেছেন আমির প্রায় জোহরের কাল এসে গেল। সূর্য এই দিল্লির কাঁটাগাছে ভরা মার্চ মাসে তার ঝলস দেখাচ্ছে তখন। আমিরকে দেখে আউলিয়ার চোখে জল। কেউ তার মতো নেই। নাসিরুদ্দিন চিরাগ বা আকি সিরাজ কেউ নয়। আকি তো আবার গৌড়ে ফিরে যাবে। আমির একাই নিয়েছে শব্দের দায়। সে বলে– ঈশ্বর শব্দেই থাকেন। শুষ্ক সাধনায় তিনি হারিয়ে যান। নিজামুদ্দিন আউলিয়া বৃদ্ধ জ্ঞানী মাথায় চেয়ে থাকেন। তাঁর বয়স এই ১৩১০ খ্রিস্টাব্দে ৭২। আর শিষ্য আমিরের ৫৭। সেই প্রথমবার তার আসাটা মনে পড়ে তাঁর। কাউকেই ঢুকতে বাধা দেন না আউলিয়া। ঈশ্বরের দুনিয়ায় সকলে মুক্ত তাঁর বাণীর জন্য। কিন্তু আমির তার তীক্ষ্ণনাসা উপস্থিতি। সে তো রাজপুরুষ। আউলিয়া তো কবেই বলেছেন, আর যাই করো রাজপুরুষের সঙ্গে মেশা যাবে না। গরীবের কথা ভাবতে হবে।

আমির খুসরুর খামসা থেকে

হঠাৎ আমার তাল কেটে যায়। সলমান নামক ছেলেটির আগমনে। আমার বিদেশি বন্ধু আমার সঙ্গে আলাপ করায়। সলমানও বিদেশি। সে এসেছে সুদূর সিরিয়া থেকে। গৃহযুদ্ধে প্রাণ বাঁচিয়ে। আমার মুখটা নরম হয়ে এসেছে প্রৌঢ় মানুষের অতুলপ্রসাদী শোনার মুহূর্তের মতো। অকস্মাৎ যেমন কোনও কোনও মুহূর্তে মনে হয়, সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়, তেমন। মাথার পিছনে নিজামুদ্দিন আউলিয়া ও তার শব্দবাদী শিষ্য আমির খুসরু। সামনে সলমান দারবিশ। আমার সাহেব বন্ধু বলে চলে। সলমান চেলো বাজায়। সে খুব মেধাবী বাজিয়ে। ইউরোপের বৃত্তি পেয়ে ইউরোপে ধ্রুপদী বাজনা শিখেছে। তারপর ফিরেছিল দেশে। ধাপে ধাপে খুলেছিল ধ্রুপদী বাজনার ইশকুল।

আমি ভাবতে থাকি ভূমধ্যসাগরের পাড়ের সিরিয়ার কথা। আমি জানি সেখানে যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ চলছে তার পাশের অনেক দেশে। কোথাও আপাত শান্তির আড়ালে সেনানায়ক, কোথাও যুদ্ধ। এখন আর যুদ্ধ থামে না। শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে একের পর এক হতে থাকে। সলমান আমাকে বলে, সে ছোটবেলায় শুনেছিল ভারতের সুফিদের কথা। কিন্তু সে ভাবেনি কখনও এদেশে হাজির হবে এবং উপস্থিত হবে এই পীঠে। আমি তাকে প্রশ্ন করি, সে দিল্লিতে বাজায় কি না! উত্তর স্বাভাবিক নেতিবাচক। সে দেশ থেকে পালাবার সময় যন্ত্র আনতে পারেনি। সে এখানে আসার পর শুধু তার দ্বিতীয় বাজনা বেস গিটার নিয়ে বেঁচে আছে। দু’-একটা জ্যাজ বারে বাজানোর ডাক পায়। সাহেব-বন্ধুদের কল্যাণে। সে জানত না এই বৃহস্পতিবার ও ‘কাওয়ালি’ নামক সংগীত-সন্ধের কথা।

নিজামুদ্দিন দরগাহ চত্বরে আমির খুসরুর কাওয়ালি

ততক্ষণে শুরু হয়েছে গান। এ গান আমির খুসরুরই লেখা। এ দরগায় গীত সমস্ত সংগীতই প্রায় তাঁর। আমি বলি সলমানকে। সলমান, বুঝি মজে যাচ্ছে গানে। সুরে। হলুদ আলোর মায়ায় ও শিহরণে। আমি চোখ ফেরাই। নানা দেশের ট্যুর-পিপাসুদের অস্থিরতা। একেবারে পাতি ভ্রমণের রাজধানী। কন্ডাক্টেড সৌন্দর্য সফর ও তার উৎপাদিত বিরক্তি। আমার কানে তরুণ কবি বলল, গত পরশুদিন বোমায় ধ্বংস হয়েছে সলমানের বাড়ি। সেখানেই ছিল তার চেলো। তার স্বরলিপি। তারপর থেকে ছেলেটা শুধুই থম মেরে বসে থাকা ছাড়া আর কিছু করেনি। আজ জোর করে বের করা হয়েছে তাকে। মনে হয় যেন সলমানের চোখে মৃদু জল। অন্তত ছলছল করছেই।

আবার ভাবি। কবে থেকেই তো নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর দরগাহ খুলে দিয়েছিলেন। আমির কেন অত পরে এসেছিলেন? দীর্ঘ ৮ বছরের রক্তক্ষয় ও তার বর্ণনা কি আমিরকে ক্লান্ত করেছিল? একটানা সুলতান ও তার ক্ষমতার খেলা। আমিরও কি চুপ করে গিয়েছিলেন? মনে হয় যেন দেখতে পাচ্ছি যুদ্ধতাড়িত, রক্তক্লান্ত আমির খুসরুর প্রথম দিন আউলিয়ার কাছে আসার মুহূর্ত। ৫৭ বছর বয়স। এখন শুধুই শব্দ সাধনা। ১৩১০ সাল। এখন এই ২০১৩ সালে আমির খুসরুর মুখে বসে যাচ্ছে সলমান দারবিশের মুখ। যুদ্ধে সুর হারানো মুখ। খোয়াজা কৃপা করো…

অক্তাভিও পাজ

আমি চলে আসি লোদি বাগানে। সেই লোদি বাগান, যেখানে মেহিকো তথা পৃথিবীর এক গুরুত্বপূর্ণ কবি অক্তাভিও পাজ ১৯৬০-এ নিয়মিত আসতেন হাঁটতে। এই সেই লোদি বাগান যার ভিতরে থাকা গম্বুজের নীল বিষয়ে পাজ লিখেছিলেন কবিতায়– ‘গম্বুজের তর্কাতীত নীলে কে যেন পাখি উগরে দেয়’। আর এই লোদি বাগানের পাড়াতেই লেখা হয় বিশ শতকের মেহিকোর ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশ। ক্ষমতা অর্জন ও বর্জনের ইতিহাস। মনে হয় ১৯৬৮ সালে দিল্লিতে অক্তাভিও পাজের মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদত্যাগ, এক সম্পূর্ণ নতুন ইতিহাসের সূচনা করে ইস্পানো-আমেরিকার জন্য। হয়তো বা আমাদের সকলের জন্য। কবি বা সাহিত্যিকের জন্য রাজকবি হবার দিন চলে গিয়েছিল কবে। বিশ শতক দেখেছিল সরকারি সাহায্যে লেখা কবিতা। আমেরিকা মহাদেশ দেখেছিল কবিদের কূটনীতিক হতে। কিন্তু ১৯৬৮-তে মেহিকোর সরকারের ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর প্রতিবাদে অক্তাভিও পাজের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পদত্যাগ একেবারে অন্য এক ইতিহাসের সূচনা করে। কবি ক্ষমতার কাছে যাবেন কি না বা রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী হবেন কি না– এই দ্বন্দ্ব অনেকদিনের। অনেকে বলেছেন কবি তো কোনও সাধুসন্ত নন। কবিরও দরকার সামাজিক প্রতিপত্তি। অথবা দরকার রাষ্ট্রশাসনের কাব্যিক অধিকার, বা মানুষের পাশে দাঁড়ানো– যেমনটা ঘটে গেছে ফরাসি-ভাষী আফ্রিকা মহাদেশের সেনেগালে বা আমেরিকার মার্তিনিক দ্বীপে। সেখানে ফরাসি ভাষার উত্তরাধুনিক কবিতার স্তম্ভপ্রতিম কাব্য আন্দোলন নেগ্রিতুদের দুই প্রতিভূ কবি লেওপোলদ সঁগর ও এমে সেজেয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়েছেন। সঁগর সেনেগালের রাষ্ট্রপতি ছিলেন দুই দশক (১৯৬০-১৯৮০)। আর সেজেয়ার আদায় করেছিলেন তাঁর দ্বীপভূমি মার্তিনিকের জন্য ফরাসি রাজ্য-অধিকার। তিনি আমৃত্যু ছিলেন সেই দ্বীপের সাংসদ, ফরাসি সংসদে। দু’জনেই প্রবল সেরেব্রাল কবি। দু’জনেই উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের স্তম্ভ। তাঁদের কাছে ক্ষমতা এসেছিল মানুষের হাত ধরে। দু’ দেশেই তাঁদের ক্ষমতায় থাকাকালীন বিকাশ হয়েছে সম্যক। কিন্তু আমাদের মতো দেশে? দেখা যাচ্ছে, লাতিন আমেরিকায় ড্রাগ যুদ্ধের হাত ধরে ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে প্রবল। আর সেখান থেকেই কবি-লেখক-শিল্পী বা তথাকথিত বিদ্বজ্জনেররা সরে এসেছেন সরাসরি রাজনীতি থেকে। তাঁরা ঢুকে পড়েছেন নাগরিক বিক্ষোভের রাজনীতিতে। আর এই সরে আসার সূচনা হয় পাজের পদত্যাগ দিয়ে। 

কবি লেওপোলদ সঁগর

পাজ চিরকালই ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন নিয়ে সরব। সেই ১৯৪০ বা ১৯৫০-এর দশকে প্রায় সমস্ত বিদ্বজ্জন কমিউনবাদী, তখন তিনি স্তালিনের বিরুদ্ধে সরব। এমনকী এই নিয়ে তাঁর সঙ্গে পাবলো নেরুদার মহাকব্যিক-আড়ি ছিল ২০ বছর। পরে নেরুদা নিজে স্তালিনের বিরুদ্ধে বলার পরে তাঁদের আড়ি মেটে। কিন্তু আমাদের দেশে কী ঘটছে? বা আমাদের ভাষায়? স্বপ্নের বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর আমাদের বিদ্বজ্জনেরা তাঁদের সঙ্গে এমন এঁটে যান যে পার্টির দুর্বৃত্তায়ন নজরে আসে না, কেশপুর গড়বেতা আমাদের চুপ করিয়ে রাখে। ব্যতিক্রম সুভাষ মুখোপাধ্যায়। নন্দীগ্রামের পর সরকার পাল্টালেও দেখা যায় একই চিত্র। প্রতিবাদ বা ওই জাতীয় কিছু আসলে আমাদের চারিত্র্য নয়। নিরাপদ দূরত্ব, ফেসবুক ইত্যাদিই আমাদের জ্বালাময়ী ভাষণের অংশ। এতে অবশ্য অবাক হবার কিছু নেই। বাঙালির দর্শন নামক গ্রন্থের ভূমিকার মতিউর রহমান লিখছেন: ‘…তত্ত্বকথা শুনতে ভালো লাগলেও তাতে জৈব প্রয়োজন মেটে না। তাই মানুষ প্রবৃত্তি বশেই জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে আত্মকল্যাণ খুঁজেছে। বহুজন-হিতে বহুজন-সুখে যেহেতু কখনও সংঘবদ্ধ প্রয়াসের প্রেরণা মেলেনি তাই বাঙালিমাত্রেই ব্যক্তিক লাভ এবং লোভের সন্ধানে ফিরেছে কালো পিঁপড়ের মতো।”