


অনেকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে জীবনের অমূল্য সময় ‘ভীতি’ নিয়ে তথাকথিত নিরাপদ, প্রোটেক্টিভ পেট্রিয়ার্কির ফাঁদে পড়ে ‘বাড়ি’তে ফিরতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সারাজীবন ধরেই এমন কোনও বাড়িতেই ফেরেন। ‘বাড়ি ফেরা’ কথাটির মধ্যে যে নিশ্চিন্তি, নিরাপত্তার বোধ আছে– বাড়িটিই যদি ভীতির কারণ হয়, সেক্ষেত্রে বাড়ি ফেরা কি নিরাপদ হতে পারে?
মেয়েদের ফেরা।
মেয়েদের বাড়ি ফেরা।
মেয়েদের রাত করে বাড়ি ফেরা।
প্রতিটি বাক্য আলাদা অর্থ বহন করে। তৃতীয় বাক্যে এসে অধিকাংশ দর্শকের হাতে অদৃশ্য পপকর্ন। পাশাপাশি সিটে কয়েকজন ‘মঙ্গল কামনা’ করা অভিভাবক বসে পড়েন। এই দৃশ্য দেখে চোখ-মুখ কুঁচকে যায় আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। ‘দিনকাল তো ঠিক নয়। এত রাত করে যে বাড়ি ফেরে! কিছু একটা ঘটে গেলে তো হইহই রব উঠবে।’

দিনকাল ঠিক নয়। সকলে মেনে নেন এই বাক্য। দিনকাল বেঠিক হওয়ার ‘কারণ’কে অনুসন্ধান করেন না। তার চেয়ে বেশি উৎসাহ দেখা যায় দিনকাল বেঠিকের ‘অকারণ’-এর দিকে নানারকম তীর্যক মন্তব্য ছুড়ে দেওয়ার প্রতি। এ প্রসঙ্গে সুতপা সেনগুপ্তর ‘ধুতুরা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত একটি কবিতা আওড়াই:
সিনেমা ভেঙেছে, তুমি শহরের অলিগলি ছেড়ে
এসেছ মধ্য রাস্তায়
অনেক দূরের পথ যেতে হবে, রাত করে বাড়ি ফেরা
শুরু হোলো আবার তোমার
তুমি কি বিষণ্ণ হবে ট্রামরাস্তা ধরে হেঁটে যেতে
হাতে ধরা থাকবে অন্ধকার বাতি
শব্দের পেছনে পেছনে বুনো কুকুরের মতো লালা ঝরবে গোটা আত্মা দিয়ে
তোমার পায়ের ছাপ লিখে দেবে শহরের প্রতিটি বাড়ির দরজায়
তবু কেউ দরজা খুলে দেবে না তোমাকে
তুমি আঘাটায় যাবে, সেখানে বেশ্যা ভেবে লোক ঘিরবে মৌমাছির মতো
কোনও সুরসিক লোক ধাক্কা দিয়ে বলে যাবে এক্সট্রিমলি সরি ম্যাডাম
তুমি আঘাটায় যাবে, সিনেমা ভেঙেছে, তুমি আর কোথা যাবে
অনেক দূরের পথ যেতে হবে রাত করে বাড়ি ফেরা
শুরু হোলো
আবার
তোমার
‘রাত করে বাড়ি ফেরা’ আর ‘একজন নারীর রাত করে বাড়ি ফেরা’র মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে– এ কবিতাটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। রাতে একা নারী রাস্তায় থাকলে তাকে ধাক্কা দিয়ে ‘সরি’ বলে আমোদ পাওয়া যেন অনুমোদিত। কারণ সে রাস্তায় নেমেছে। রাস্তায় হাঁটছে না।
এ কবিতা পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় জয় গোস্বামীর ‘গরাদ, গরাদ’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘পথ’ শীর্ষক কবিতা। এক দেহোপজীবিনীকে উদ্দেশ্য করে লেখা, কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার প্রেক্ষিতে–
তুমি তো পথের লক্ষ্মী।
আজ কেউ তোমাকে নিয়ে অন্ধকারে বসবে ময়দানে
কাল কেউ সন্ধের পরে ওঠাবে ট্যাক্সিতে।
ক্যানিং লোকাল ধরে রাত্রিবেলা বাড়ি ফিরবে তুমি।
বাড়ির রাস্তায়
শিব মন্দিরের পাশে তখন অনেকখানি চাঁদ…
তুমি ভাববে, আজ কি কোজাগরী?
মনে পড়বে, লেডিস-এ সেদিন
একটা বউ বলছিল: ‘প্রত্যেক বেস্পতিবার
আমি তো নিয়ম করে লক্ষ্মীপুজো করি।’

এই কবিতাদু’টির মধ্যে প্রথম কবিতায় এক সাধারণ নারী শুধুমাত্র রাতে একা পথে চলে বেড়াচ্ছেন বলে তাঁকে ‘লভ্য’ ভেবে নিচ্ছে পথচারী পুরুষ। বেশ্যা ভেবে মৌমাছির মতো ঘিরে ধরছে আরও পুরুষ। দ্বিতীয়টিতে একজন দেহোপজীবিনী নিজের কাজ সেরে লোকাল ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার পথে আকাশে চাঁদ দেখে ভেবে নিচ্ছে, আজ কি কোজাগরী? এ যেন একটি অন্যটির উতোর!
মঙ্গলকামনা করা কৌতূহলী পুরুষতন্ত্রের ধারক-বাহকরা যদি দেখে ফেলেন একজন মহিলা একা একটু রাত করে বাড়ি ফিরছেন, তাঁকে অবধারিত প্রশ্ন করা হবে, এত রাতে কোথা থেকে? সঙ্গে যদি একজন পুরুষকে দেখে ফেলা যায়, তাহলে মূল প্রশ্নের সঙ্গে হয় যুক্ত হবে আরেকটি প্রশ্ন, অথবা এককভাবে দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসবে, তা হল (গলা খাটো করে): ‘সঙ্গে কে?’
এই দুই প্রশ্নের উত্তরে গম্ভীর মুখে পাল্টা প্রশ্ন ‘কেন?’ করে দেখেছি খুব কার্যকর উত্তর। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তরে ‘কেন’-র সামনে বাঘা বাঘা প্রশ্নকর্তাকেও নীরবতা পালন করতে দেখেছি।

এই সময়ের নিরিখে নারীর বাড়ি ফেরার ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। অ্যাপ ক্যাব কিংবা বাইকে করে যাতায়াত করা মহিলাদের প্রায়শই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, ভয় লাগে না? ভয়ের থেকেও বেশি আসলে সন্দেহ হয়। রাত হয়ে গেলেই, বিশেষ করে, প্রত্যেক ক্যাব চালককে সন্দেহ হয়। প্রত্যেক বাইক রাইডারকে। অথচ এত বছর ধরে এই যে অ্যাপ বাইকে করে যাতায়াত করছি– তার মধ্যে এমনও অভিজ্ঞতা হয়েছে, রাস্তায় তুমুল ঝড়, বৃষ্টি, হেলমেট ভালো করে পরতে পারছি না, কোনওক্রমে ধরে আছি, আয়নায় দেখে বুঝতে পেরে চালক একটু দাঁড় করিয়ে পরম মমতায় হেলমেট ঠিক করে পরিয়ে দিচ্ছেন। রাস্তার মোড়ে পা মচকে গিয়েছে। কোনওক্রমে একটা দোকানের সামনে বসেছি, পথচারীদের মধ্যে বুঝতে পেরে একটি ছেলে থেমে বসে পা থেকে জুতো-মোজা খুলে জল দিচ্ছে। ওদের মুখ মনে নেই, কিন্তু সেই নিরাপত্তার, মানবতার মুহূর্ত মনে থেকে গিয়েছে।
মানুষ তো অতীতচারী, তাই মনে পড়ে যায় শৈশবের অভিজ্ঞতায় প্রাঞ্জল আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে রান্না করতে আসা গৌরীদিকে। প্রত্যন্ত এক চা বাগানে তাঁর বাড়ি। অত্যাচারী স্বামীর বাড়িতে না-থাকার প্রত্যয় নিয়ে নিতান্ত নিরক্ষর তিনি বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেন। মামলার অর্থ জোগানের জন্য আসেন রান্না করতে। কোর্ট থেকে যে পরের ডেট কিংবা অন্য কোনও তথ্য লিখে দেওয়া হত, সে কাগজটুকুও তিনি পড়তে পারতেন না। তাই আমরা পড়ে দিতাম। মামলা তিনি হেরেছিলেন। কিন্তু সে বাড়িতে ফিরে যাননি কখনও। ‘সিমোন দ্য বোভয়’ কিংবা ‘বেগম রোকেয়া’ না-পড়েও তথাকথিত নারীবাদ না-জেনেও নিজের জীবনে কখনও পিতৃতন্ত্রের সঙ্গে আপস করেননি। যে যে বাড়িতে রান্না করেছেন, সে বাড়িই তাঁর অর্জিত বাড়ি। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সে বাড়ি বদলে গেলেও। অথচ বিবাহসূত্রে যে বাড়িতে তাঁর থাকার কথা, সে বাড়ি তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজের অধিকার সম্মানের সঙ্গে আদায় করে নেওয়ার মতো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পারার শিক্ষা তিনি আমায় দিয়েছিলেন। আমার শৈশবে।
পরবর্তীকালে আমি এমন এক অবমাননাকর বৈবাহিক সম্পর্কে থেকেছি কয়েক বছর, সে সময়ে অফিস থেকে বেরিয়ে ফেরার মেট্রো ধরে স্টেশনে বসে থাকতাম কিংবা রাস্তায় বেঞ্চে বসে থাকতাম। অনেক রাত হলে ফিরতাম, তথাকথিত ‘বাড়িতে’। অথচ পথ ছিল আমার কাছে বেশি নিরাপদ, পথই ছিল পথের আড়াল। তৎকালীন বাড়িটি ছিল ভীতিপ্রদ। এ অভিজ্ঞতা তাঁদের হয়ে লিখলাম, যারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে জীবনের অমূল্য সময় ‘ভীতি’ নিয়ে তথাকথিত নিরাপদ, প্রোটেক্টিভ পেট্রিয়ার্কির ফাঁদে পড়ে ‘বাড়ি’তে ফিরতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ সারাজীবন ধরেই এমন কোনও বাড়িতেই ফেরেন। ‘বাড়ি ফেরা’ কথাটির মধ্যে যে নিশ্চিন্তি, নিরাপত্তার বোধ আছে– বাড়িটিই যদি ভীতির কারণ হয়, সেক্ষেত্রে বাড়ি ফেরা কি নিরাপদ হতে পারে?

উদ্বেগের নাম করে আশপাশের পিতৃতন্ত্রের ধারক এবং বাহকেরা যখন একক অবস্থানে, একক যাপনে থাকা আমার মতো কোনও নারীকে প্রশ্ন করে, ‘ইস কী খারাপ লাগে, তোমাকে তালা খুলে বাড়ি ঢুকতে হয়, বাড়িতে অপেক্ষা করার কেউ নেই’, এবং জবাবে শোনে, ‘কে বলল কেউ নেই? আছে তো!’ তৎক্ষণাৎ প্রশ্নকর্তার মনে কয়েকটা সম্ভাব্য পুরুষের নাম ঘুরতে থাকে এবং একটু বিরতির পর শোনে আছে তো, ‘শান্তি!’ তখন তাঁরা মনে করেন, বিদ্রুপ করা হচ্ছে তাঁদের উদ্বেগকে, দুশ্চিন্তাকে।
অথচ বাধ্যত নয়, স্বেচ্ছায় একজন নারী যে একক অবস্থানে আছেন এবং আনন্দে আছেন– সেকথা তাঁদের উদ্বেগ ভেদ করে মরমে পৌঁছয় না। আরও কত বছর লাগবে পৌঁছতে, তা এখনও অনিশ্চিত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved