Robbar

‘X = প্রেম’ ধরে নিলেই কি অঙ্ক মেলে?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 13, 2026 5:04 pm
  • Updated:February 13, 2026 7:49 pm  

প্রেমের চিঠিতে আইনস্টাইন তাঁকে ডাকতেন ‘ডলি’ নামে। লিখতেন, ‘তুমি ছাড়া আমার চলবেই না’। সেই চিঠিতেই তিনি লিখেছিলেন ‘আমাদের আপেক্ষিক তত্ত্ব’– যে কয়েকটা শব্দ পরে এত বিতর্কের জন্ম দেয়। একটা গল্প প্রচলিত হয়– মিলেভা না কি আপেক্ষিক তত্ত্ব লিখতে সাহায্য করেছিলেন। মিলেভা নিঃসন্দেহে মেধাবী ছিলেন। স্বামীর জন্য নিজের পড়াশোনাও বিসর্জন দিয়েছিলেন। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের আবিষ্কারে তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল– এমন ধারণা আজ আর ঐতিহাসিকেরা গুরুত্বের সাথে বলেন না।

পল্লব বসু

প্রেমের সঙ্গে গণিত আর বিজ্ঞানের যে এক গভীর যোগাযোগ আছে সেটা হক কথা। সে আপনি ‘X = প্রেম’ ধরে অঙ্ক কষুন, বা দাবি করুন ‘আমি তুমি তুমি আমি’-র বিচিত্র বিটকেল কম্বিনেশন আর পারমিউটেশনই হল প্রেম। তার উপর প্রেম নাকি আবার ব্রেইন কেমিস্ট্রি– ডোপামিনের খেলা। এ পর্যন্ত ভালোই ছিল। কিন্তু মুশকিল হল যখন প্রেম আর বিজ্ঞান, বা বরং ধরুন প্রেমে প্রেমে বিজ্ঞান, এ গোছের এক লেখার ফরমায়েশ পেলাম। অর্থাৎ গভীর প্রেমের বাঁধনে জড়ায়ে, একই বৃন্তে দু’টি কুসুম হয়ে, কারা কারা একইসঙ্গে ডাকসাইটে বিজ্ঞানচর্চা করেছেন– তারই ব্যাখ্যান। কিন্তু প্রেম সম্বন্ধে তেমন কিছু বাস্তবিক জ্ঞানগম্যি না থাকাতে লেখাটা তথ্যসর্বস্ব রসকষহীন ‘পড়ি পড়ি তো পাত্থর ভয়া’ টাইপ হয়ে গেল। লেখায় প্রেমের ছিটেফোঁটাও যে নেই তা বোঝার জান্য কবীর অবধি যেতে হবে না, সাধারণ পাঠকই যথেষ্ট। অগত্যা!

অফিস-কাছারিতে প্রেম-ভালোবাসা, অন্তত এককালে খুব কমন ব্যাপার ছিল। তা বিজ্ঞানীরাও এর ব্যতিক্রম নন। মারি কুরির গল্পটা সবারই জানা। মারি স্ক্লোদোভস্কা– পোল্যান্ড থেকে আসা এক দৃঢ়সংকল্প তরুণী– সোরবনে পড়াশোনা করছিলেন চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যেও। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞানচর্চা। সেই সময়ই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় পিয়ের কুরি-র, যিনি ইতিমধ্যেই একজন প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিদ। প্রথম সাক্ষাৎ ছিল সম্পূর্ণ বৌদ্ধিক– পরিমাপের নির্ভুলতা, পরীক্ষার সূক্ষ্মতা, আর নতুন প্রশ্নের সন্ধান। কিন্তু প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে। কিন্তু খুব দ্রুতই দু’জন বুঝলেন, তাঁদের কৌতূহল এক সুরে বাঁধা। গবেষণাগারের দীর্ঘ সময়, একসঙ্গে পরীক্ষা, আর অবিরাম আলোচনা– এসবের মধ্যেই জন্ম নেয় গভীর প্রেম। বিবাহের পর তাঁদের যৌথ কাজ বিশ্বকে বদলে দেয়। তাঁরা রেডিওঅ্যাক্টিভিটির ওপর গবেষণা করে আবিষ্কার করেন পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম। ১৯০৩ সালের নোবেল পুরস্কার তাঁদের হাতে আসে। কিন্তু সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯০৬ সালে এক দুর্ঘটনায় পিয়ের কুরি রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে নিহত হন। মারির জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। তবু তিনি থামেননি। তিনি পিয়েরের অধ্যাপনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং গবেষণা চালিয়ে যান, পরে আবারও নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।

ল্যাবরেটরিতে মেরি কুরি এবং পিয়ের কুরি

পিয়েরের মৃত্যুর পর মারি কুরি প্রেমে পড়েন পিয়েরেরই এক ছাত্র ও পরে বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ পল ল্যাঞ্জাভিনের। বিবাহিত ল্যাঞ্জাভিন ছিলেন এক অসুখী বিবাহে বন্দি। কুরি লিখেছিলেন: ‘আমি জানি যখন তুমি ওর (ল্যাঞ্জাভিনের বউ) সঙ্গে থাকো, আমার রাতগুলি অসহ্য হয়ে ওঠে। আমি ঘুমতে পারি না।’ ল্যাঞ্জাভিনের স্ত্রী এই চিঠি পরে ফাঁস করে দেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমে ওঠে বিতণ্ডার ঝড়।

পিয়ের ও মারির কন্যা আইরিন। আইরিন ছোটবেলা থেকেই মায়ের ল্যাবরেটরির পরিবেশে বড় হয়েছেন। বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল স্বাভাবিক। ফ্রেদেরিক প্রথমে মারি কুরির গবেষণাগারে সহকারী হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই আইরিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। তারপর প্রেম। বিবাহের পর তাঁরা যৌথভাবে গবেষণা শুরু করেন এবং ১৯৩৪ সালে আবিষ্কার করেন কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা, যা চিকিৎসা ও গবেষণায় বিপ্লব ঘটায়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য তাঁরা ১৯৩৫ সালে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁদের জীবন ছিল গবেষণা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। মজার কথা হল, সামাজিক প্রথা ভেঙে আইরিন কুরি ও ফ্রেদেরিক জোলিও ১৯২৬ সালে বিবাহের পর পরস্পরের পদবি যুক্ত করে জোলিও-কুরি পদবি গ্রহণ করেন। অর্থাৎ, আইরিন কুরি হয়ে ওঠেন আইরিন জোলিও-কুরি, এবং ফ্রেদেরিক জোলিও হন ফ্রেদেরিক জোলিও-কুরি।

আইরিন জোলিও-কুরি ও ফ্রেদেরিক জোলিও-কুরি

আরেক নোবেলজয়ী, কুরির তুলনায় কিঞ্চিৎ অজ্ঞাত, গার্টি কোরি ও কার্ল কোরি-র গল্প শুরু হয় প্রাগের মেডিকেল কলেজে। সহপাঠী হিসেবে তাঁদের পরিচয়, আর সেখান থেকেই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব ও পরে দাম্পত্য। যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসে তাঁরা জৈব রসায়নে গবেষণা শুরু করেন। শরীরে শক্তির রূপান্তর প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অসামান্য। তাঁরা আবিষ্কার করেন ‘কোরি সাইকেল’, যা ব্যাখ্যা করে পেশিতে উৎপন্ন ল্যাকটিক অ্যাসিড কীভাবে যকৃতে গিয়ে আবার গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। বিপাকক্রিয়া ও ডায়াবেটিস গবেষণায় এই আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে তাঁরা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

যে দম্পতি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন কিন্তু পুরস্কার পাননি, তাঁদের মধ্যে ওয়াল্টার ও ইডা নোড্যাক এবং জেফ্রি ও মার্গারেট বারবিজের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওয়াল্টার ও ইডা নোড্যাক জার্মান রসায়নবিদ ছিলেন। ১৯২৫ সালে তাঁরা যৌথভাবে রেনিয়াম মৌলটি আবিষ্কার করেন। ইডা নোড্যাক ১৯৩৪ সালে প্রথম পারমাণবিক ফিশনের তাত্ত্বিক ধারণা দেন, যা তখন উপেক্ষিত হলেও পরে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয়। ১৯৩০-এর দশকে তাঁরা চারবার নোবেলের জন্য মনোনীত হন কিন্তু পুরস্কার পাননি। অন্যদিকে জেফ্রি ও মার্গারেট বারবিজ ছিলেন জ্যোতিঃপদার্থবিদ দম্পতি। ১৯৫৭ সালে তাঁরা ফ্রেড হয়েল ও উইলিয়াম ফোলারের সঙ্গে মিলে বিখ্যাত ‘বিএফএইচ’ গবেষণাপত্রটি লেখেন, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে তারার অভ্যন্তরে ভারী মৌলগুলি সৃষ্টি হয়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৬৪ সালে তাঁরা নোবেলের জন্য মনোনীত হলেও শেষপর্যন্ত ফোলার এককভাবে পুরস্কার পান। বারবিজ দম্পতি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অবহেলিত প্রতিভার উদাহরণ হয়ে রয়েছেন।

ওয়াল্টার ও ইডা নোড্যাক

সবাই নোবেল পাবেন না, সেটাই স্বাভাবিক, দরকারও নেই। ইতিহাসে এমন অসংখ্য বিজ্ঞানী দম্পতি আছেন, যাঁরা নোবেল না পেলেও একসঙ্গে ক্যারিয়ার গড়েছেন, একে অপরের গবেষণার ভিত মজবুত করেছেন। কেউ জীবনের অর্ধশতাব্দী দিয়েছেন মানবজাতির কোনও জটিল রোগ নির্মূলে, কেউ বুঝতে চেয়েছেন প্রকৃতির গভীর রহস্য, কেউ তৈরি করেছেন নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী। তাঁরা পেয়েছেন পরস্পরের হাত, পেয়েছেন একটি গবেষণাগার, পেয়েছেন কিছু বিশ্বস্ত সহকর্মী। এঁরা ছড়িয়ে রয়েছেন আমাদের আশেপাশেই। আমি ব্যক্তিগতভাবেও চিনি এরকম কিছু গবেষক দম্পতিকে, তাঁদের গল্পও অনুপ্রেরণার।

একটু আইনস্টাইনের কথা হোক। আইনস্টাইন আর তাঁর প্রথম স্ত্রী মিলেভার প্রেমের গল্পটা ঠিক সিনেমার মতো। ১৮৯৬ সালে জুরিখ পলিটেকনিকে দু’জনে সহপাঠী। ক্লাসের একমাত্র মেয়ে মিলেভাকে দেখেই পাগল হয়ে যান আইনস্টাইন। মিলেভা শুধু বুদ্ধিমতীই নন, তাঁর মধ্যে ছিল অন্যরকম এক দৃঢ়তা। প্রেমের চিঠিতে আইনস্টাইন তাঁকে ডাকতেন ‘ডলি’ নামে। লিখতেন, ‘তুমি ছাড়া আমার চলবেই না’। সেই চিঠিতেই তিনি লিখেছিলেন ‘আমাদের আপেক্ষিক তত্ত্ব’– যে কয়েকটা শব্দ পরে এত বিতর্কের জন্ম দেয়। একটা গল্প প্রচলিত হয়– মিলেভা না কি আপেক্ষিক তত্ত্ব লিখতে সাহায্য করেছিলেন। মিলেভা নিঃসন্দেহে মেধাবী ছিলেন। স্বামীর জন্য নিজের পড়াশোনাও বিসর্জন দিয়েছিলেন। কিন্তু আপেক্ষিকতা তত্ত্বের আবিষ্কারে তাঁর সরাসরি ভূমিকা ছিল– এমন ধারণা আজ আর ঐতিহাসিকেরা গুরুত্বের সাথে বলেন না। কিন্তু আইনস্টাইনের প্রেম মসৃণ ছিল না। আইনস্টাইনের বাবা-মা ছিলেন তীব্র বিরোধী। মিলেভা বয়সে তিন বছরের বড়, তাছাড়া তাঁর পঙ্গুত্ব ছিল, আর ধর্মও ছিল আলাদা। শাশুড়ি তো একেবারেই পছন্দ করতেন না তাঁকে। আইনস্টাইন কোনওমতে পাস করলেও মিলেভা ফেল করেন। তার উপর তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। বিয়ের আগে সন্তান– সে সময়ে এ বড় কলঙ্ক। মিলেভা পড়া ছেড়ে বাবার বাড়ি চলে যান। ১৯০২ সালে কন্যাসন্তান লিজার্লের জন্ম হয়। এই মেয়ের পরে কী হয়েছিল, কেউ জানে না। কোথাও তাঁর আর কোনও সন্ধান মেলে না। ১৯০৩ সালে সব বাধা পেরিয়ে বিয়ে করেন তাঁরা। কিন্তু সেই বিয়ে স্থায়ী হয়নি। প্রেমের শুরুটা যত চুম্বকের মতো তীব্র ছিল, বিচ্ছেদটা ছিল ততটাই বিষাদময়।

আইনস্টাইন এবং মিলেভা, প্রাগে

এবার আসি গণিতে। বিখ্যাত গণিতবিদ এডওয়ার্ড ফ্রেঙ্কেলের বিতর্কিত চলচ্চিত্র ২০১০-এর ‘রাইটস অফ লাভ অ্যান্ড ম্যাথ’। ছবির গল্পে ফ্রেঙ্কেল একজন গণিতবিদের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যিনি মানবজাতির সেবায় ‘প্রেমের সূত্র’ আবিষ্কার করেন। খলনায়কেরা এই সূত্র দিয়ে মানবজাতিকে ধ্বংস করতে চায়। গণিতবিদ নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় এই সূত্রটিকে আগলে রাখতে চান। তাই তিনি সূত্রটি তাঁর প্রেমিকা মারিকোর সমস্ত শরীরে উলকির কালিতে লিখে দেন। নায়িকার সারা গায়ে সেই সূত্র উলকি আঁকা হয়– গণিত আর প্রেমের মিলন। সমালোচকরা যা হয়, এসব খুব ভালো চোখে দেখেননি, আত্মমুগ্ধ ও বাণিজ্যিক বলে ফরমান দেন। কিন্তু ফ্রেঙ্কেল সম্ভবত দেখাতে চেয়েছিলেন, গণিত শুধু শুষ্ক সমীকরণ নয়; সেটিও প্রেমের মতোই গভীর ও মানবিক। পারলে নিজে দেখে বিবেচনা করুন।

কুরিদের দিন শেষ। ইদানিং কর্মক্ষেত্রে প্রেম করতে গেলে বাঁশ খেয়ে যেতে পারেন। রোমান্টিক সম্পর্ককে পেশাদার পরিবেশে অনুচিত মনে করা হয়। দু’জনেই ছাত্রছাত্রী হলে তাও ঠিক আছে‌। এসব নিয়ে রীতিমতো হোম্বাই চোম্বাই নিয়ম রয়েছে, এবং পথভুলে গলতি হয়ে গেল মেলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা বা বেশি বাড়াবাড়ি হলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু এসবের মধ্যেই আমাদের ঘরের ছেলে অভিজিৎ ব্যানার্জী ও স্ত্রী এস্টার ডুফলো পরস্পরকে কব্জা করে ফেলেন। একসময় ডুফলো MIT-র অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন আর অভিজিৎ ছিলেন প্রফেসর। গন্ডগোল হতে পারত। তাঁরা পরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আর পান নোবেল। প্রেমের জয়।

এস্টার ডুফলো ও অভিজিৎ ব্যানার্জী

সব জন্তু বরবউ ধাঁচের জুটি বাঁধার নিয়মে চলে না। ধরুন যেমন কুকুর। কুকুরের লয়ালিটি শুধু মনিবের প্রতি। চোখে জল আসা গপ্পো সিনেমা হয় মানিব-কুকুরের সম্পর্ক নিয়ে। কিন্তু কুকুর-কুকুরীর প্রেম-আখ্যান কখনও শুনতে পাবেন না– বরঞ্চ ক্রৌঞ্চক্রৌঞ্চীর গল্প শুনবেন। বাল্মীকি ক্রৌঞ্চজুটির একটার নিধন দেখে বিচলিত হয়ে শেষমেশ শ্লোক আবৃত্তি করে ফেলেছেন। মানুষের মতোই দীর্ঘমেয়াদী জোট বাঁধে অনেক প্রজাতির পাখি, যেমন– ক্রেন (ক্রৌঞ্চ), আলবাট্রস। তারা আজীবন একই সঙ্গীর সঙ্গে থাকে, জটিল প্রণয়-নৃত্যে আবদ্ধ হয় এবং সন্তান পালনের ভার সমানভাবে ভাগ করে নেয়। একজন সঙ্গী হারালে তারা প্রায়ই দীর্ঘকাল– কখনও কখনও বছরের পর বছর অপেক্ষা করে। তাই ক্রৌঞ্চ অনেকসময়ই বিরহের প্রতীক। বিবর্তনের অমোঘ নিয়মে, জোড়া বাঁধার প্রবণতা সম্ভবত শিশুদের সুরক্ষা, সম্পদ অ্যাকিউমুলেশন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার কৌশল হিসেবেই উদ্ভাবিত হয়েছে। মানুষ বাদে, সাধারণত স্তন্যপায়ী প্রাণীরা খুব একটা জুটি বাঁধে না– ব্যতিক্রম গিনিপিগের মতো গদগদে প্রেয়রী ভোল।

জুটি বাঁধার শুরু, প্রথম প্রেমের ধাক্কা। দু’জনের কানাকানি কথা, মিলন বিহ্বলতা ইত্যাদি। বলিউডের লাখ কোটি বাজেটের পয়লা, পহেলা পেয়ার। নব পরিচয়, কালিয়া বঁধুর সনে। রমকম, মাইলস বুনস, জেন অস্টিন। দেশ কি বিদেশ মুক্তি নেই। প্রেমের পরেই আবার সঙ্গে সঙ্গে বিরহ। তাজমহল, মেঘদূতের ঘ্যান ঘ্যানে যক্ষপ্রিয়া। মানব কৃষ্টির শতকরা ৫০ শতাংশই এই প্যানপ্যানে প্রেম, বিরহ– অর্থাৎ ব্রেন কেমিস্ট্রির খেলা। কখনও উঠছেন, কখনও নামছেন। আশা আর নিরাশা। তবে কেমিস্ট্রি জিনিসটা খুব একটা সুবিধের নয়, সেটা একবার ব্লিচ শুঁকেই বুঝে যেতে পারবেন– তার উপর আবার ব্রেন। সম্ভবত বিবর্তনের খেলা, কিন্তু জোট, বিচ্ছেদ এসবের মধ্যে একটা ভারিক্কি ব্যাপার আছে। জুটি বাঁধার পর বিচ্ছেদ হলে বিরহযন্ত্রণা অবশ্যম্ভাবী। যুক্তি তক্কো পেরিয়ে আপনার অস্তিত্বের একবারে কেন্দ্রবিন্দুতে হামলা চালাবে। প্রেমই হোক বা বিরহ, বড় বড় ঘাঘু পাবলিককেও দেখেছি একদম ফ্ল্যাট করে দেয়।

সব জন্তুতেই জোড় বাঁধা মোটামুটি মস্তিষ্কে ভ্যাসোপ্রেসিন, অক্সিটোসিন, ডোপামিন এবং সেরোটোনিন-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। অক্সিটোসিন ঘনিষ্ঠতা ও বিশ্বাস গঠনে সাহায্য করে, ভ্যাসোপ্রেসিন দীর্ঘমেয়াদী সঙ্গীর প্রতি সততা এবং প্রতিরক্ষামূলক আচরণ উদ্দীপিত করে, ডোপামিন আনন্দ ও আসক্তি তৈরি করে, আর সেরোটোনিন মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সব মিলিয়ে, ‘X = প্রেম’ যে ঠিক কী করে কষতে হয় সেটা এখনও বিজ্ঞানের আয়ত্তের বাইরে।