twenty first century kolkata in the vision of hutom pyacha | Robbar
Robbar
  • ৮ কার্তিক ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৬ অক্টোবর ২০২৬

হুতোমি কলকেতা, একুশ শতক

হুতোম। রসিক বাঙালির আরেক পেঁচা। কালীপ্রসন্ন সিংহ। তিনি আজ বেঁচে থাকলে কীভাবে দেখতেন কলকাতাকে? কী লিখতেন নকশায়?

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১৯:১৬   
Facebook WhatsApp Messenger

এবার যাব না আমরা কার্নিভালে? কার্নিভাল যাব না আমরা?

চিকমিকে জরির পাখিজামায়, শিউলিফুল প্রিন্ট বেলাউজের সঙ্গে লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে, চোখে একলাখি রোদ চশমা এঁটে? যাব না, সপরিবার, গোলাপি ছাতা নিয়ে, বেগুনি রুমালে ঘাম মুছতে মুছতে? যাব না, বাঙালি এস্থেটিক নামের ওই কী একটা খায়-না-মাথায়-মাকে মেকেটেকে, লালসাদা রূপে এক্কেবারে চমচম ডগমগ কর্ত্তে কর্ত্তে?

ও মা! মরে যাই! কার্নিভাল কী গা? এবার তো ওইসব বন্দো। প্যান্ডেলের নিচে কুর-আন পাঠ বন্দো, প্যান্ডেলের পাশে নিষিদ্ধ কুক্কুটাণ্ড ভোজন বন্দো, প্যান্ডেলের চতুর্দিকে লাল শালুতে মুড়ে মার্ক্স-লেলিনের পুজো বন্দো, কান্নিভালও বন্দো। সব বন্দো, এবার তো সব শুদ্ধমতে গা! আধার চেক না করে দর্শনার্থী থেকে ভাসানের তক্তা ধরার লোক পজ্জন্ত অ্যালাউ দিচ্চেনে।

তা, দিদি গেছেন, তাতে কী, ভাই তো এসেচেন। দিদি কত্তেন পুজোর পরে, লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন, ভাই করেছেন মহালয়ার মেগা ইভেন্টে ইডেন গার্ডেনে হাজার ঢাক… সে আওয়াজে পাড়া মাত– মাত কচ্চে… তা, পুজো বলে কথা। তায় আবার বাঙালির। ওহো, ভুল বানান লিকব না। বংগালির পুজো এবার। পশ্চিমি মতে। ইউপিবিহারের ঠ্যাঞাড়েসমাহারে।

zoom

এক্ষণে হাজার ঢাক, লক্ষকণ্ঠে চণ্ডীপাঠ, শতমাইকে রামগান, পঞ্চাশোত্তর শত শিবমহিমাকেত্তনের যুগ এসেছে। যত বড় ডিজে যন্ত্র, তত বড় ভক্তি। কাড়ানাকাড়া, দেশি ও ইংরেজি বাজনা, বাঙালি ও সাওঁতাল বাজনা, ফোক ও লোক বাজনা ওসব ছিল আগের আমল। মাও সেতুং সরণি, হো চি মিন সরণির মতোন এইসব বিচ্ছিরি বদভ্যেস ছিল গা, তোমাদের। লোক আর ফোকের তুষ্টি করে, গুষ্টির পিণ্ডির ছেরাদ্ধ করে এ বছর সব বিশুদ্ধরূপে সনাতনি এবং ডিজে-কেন্দ্রিক। বিশাল, বড়, সর্ববৃহৎ পূজার আয়োজনে ডেসিবেলের কম্পিটিশন না দিলে আর কীসের আনন্দছয়লাপ, কীসের শ্রেষ্ঠহনুমত্তা। এর পর একে একে সেরার সেরা পুরস্কার প্রাপ্ত প্রতিমারা প্যান্ডেলে ছয়লাপ হলেন। আর সেজেগুজে মেয়েমদ্দ রাস্তায় বাহার দিয়ে বেড়াতে লাগবেন। তখন ‘কার প্রতিমা উত্তম’ ‘কার সাজ ভালো’– ‘কার সরঞ্জাম সরেস’ প্রভৃতির প্রশংসারই প্রয়োজন হচ্চে, কিন্তু হায়! ‘কার ভক্তি সরেস’ কেউ সে বিষয়ে অনুসন্ধান করে না– কর্ম্মকর্তাও তার জন্য বড় কেয়ার করেন না। অথচ, করার না কি কথা ছিল! তা কোন কতাই বা কে রাখে। কবি বলিয়াছেন, কেউ কতা রাখলেনি কো।

কত প্যান্ডেলের কত ঢং দেখলুম। একটা প্যান্ডেলের চিকচিকে পেলাস্টিকের বাড়বাড়ন্তে এতটুকু অগ্নি আশঙ্কা ছিল, কিন্তু কেটেই গেল তন্মধ্যে এআই নির্মিত ভিডিওর রিল প্রোজেক্ট করে বাজানো দেকে। সুবিশাল ফ্লেক্সে মাসল ফ্লেক্সিং করা হর হর মহাদেব। বাঙালি কাঁদুনে ভক্তিগীতির চল কবেই কি উঠে গিয়েচে। একন শুধু মার্চিং সং কচ্চে, আই গিরিনন্দিনী রম্যকপর্দিনী শৈলসুতে গাইচে। মস্ত মস্ত ত্রিস্তর ডিজেযন্ত্রে পাড়াকাঁপানো হৃৎকম্প উপস্থিতকারী তালবাদ্য ধুমাদ্ধুম বাজচে, যেন অস্ত্র ঝংকারসহ মা যুদ্ধে যাওয়ার আগে কুচকাওয়াজ কচ্চে। মায়ের যুদ্ধং দেহি রূপখানি এবার বেশ বর্ত্তেছে দেকা যাচ্চে।

এই সমস্তটায় প্যানপেনে নাকেকাঁদুনে, নভেম্বরের উত্তুরে হাওয়া বইলেই মাংকিক্যাপ পরা বাঙালি কোতাও নেই। যে বাঙালি পুজোর শুরুতে কাঁদে, শেষেও কাঁদে, তার স্থান এখন বুলডোজার দিয়ে ঠেলে ময়লার ভ্যাটে।

তাই তো, বাঙালির আগমনী গান নেই। সেই যে একশো বছর পূর্বে ছিল, গরিব গায়ক ঘুরে ঘুরে গাইত–

আমার আনন্দিনী উমা আজও এল না তার মায়ের কাছে।
হে গিরিরাজ! দেখে এসো কৈলাসে মা কেমন আছে॥
মোর মা যে প্রতি আশ্বিন মাসে
মা মা ব’লে ছুটে আসে,
‘মা আসেনি’ ব’লে আজও ফুল ফোটেনি লতায় গাছে।

একনের পুজোয় দুর্গা মাতৃমূর্তিতে নেই। বরং যোদ্ধারূপী রাম আছেন, নীলবর্ণ সুবিশাল তালঢ্যাঙা মূর্তিতে রাগি চক্ষু! ফ্লেক্সে ফ্লেক্সে মা মাঝেমাঝে অবতীর্ণা হন, কখনও এগারোটা কখনও তেরোটা হাত। বাঁদিক ডানদিকে বিষমবাহু হাতের সংখ্যা গুনতে গুনতে চক্ষুবিভ্রম। গান, রিল, ছবি সবই এক্ষণে এআই। একালে তাই এই দুর্গামা এআই সহযোগে ত্রয়োদশপ্রহরণধারিণী হলে কুনো দোষ নাই।

মহালয়ার সেই হাজার ঢাকের টরেটক্কায়, চারদিন রেড রোড বন্দো করে গাড়ি চলাচলের এক্কেবারে বিপর্যয় করে, উৎসব সূচনা। তারপর থেকে সব দিন, সব রাস্তায় ট্রাফিকজামের হদ্দমুদ্দ। নেতারা চলেচেন উদবোধনে, আর নেতার সাঙ্গোপাঙ্গোরা চলেচেন অ-সনাতনি বইয়ের দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। রামোজি ফিলিম সিটির থেকে ভাড়া করে এনেচেন গুন্ডা ও মোটা লাঠি। অমন লগুড় লাঠি বাঙালির ধম্মে ছিল না। দিশিবন্দুক, চাপার চপাতি খুনোখুনি আমাদের চৌত্রিশ প্লাস ১৫ বছরে জলভাত বইকি তা বলে বইয়ের দোকানের ফ্লেক্স ছিঁড়তে আর প্লাস্টিকের চেয়ার ভাঙতে মোটা বাঁশ আর লাঠি, বই টেনে টেনে মাটিতে ফেলা এ যে নতুন খেলে না নতুন খেলা। ছেলেপিলেরাও নতুন, সব এসেছে দূর দেশ থেকে কোমরে গামছা বেঁদে। ও মা, কোতায় যাব, বলে কি না পুলিশও এসেচে সঙ্গে বুলডোজার, ময়লা ফেলার ভ্যাট নিয়ে। বইদোকানে না কি কেবল কাগজে ছাপা ‘গন্দে গন্দে বাত’ বিক্কিরি হয়, লোকে কিনে কিনে পড়ে। প্রথম সনাতনি দুর্গাপূজায় প্যান্ডেলের চৌহদ্দিতে মেলা করে তাতে গোলগাপ্পা, কাশ্মীরি কাহয়া, শিক্ষিত আলুভাজা আর রাজস্থানি কাটিং কুলফি বিক্কিরি করো না বাপু, টুকড়ে টুকড়ে বুদ্ধির দিমাগি বই কেন! শরৎ চাটুজ্জের পথের দাবি টাবি তো এক্কেবারে টুকরো করেই ফেলতে লাগে। ওসব সেই ইংরেজ বাহাদুরের সময় থেকে ব্যান দিয়েচেল। একনও ব্যানই থাকুক। সঙ্গে বিভূতি-সুভাষ, বিবেকানন্দ-রামকেষ্টো, লেনিন-মার্ক্স, উলবোনা-রান্নাবই, রুশ রূপকথা! ছ্যা ছ্যা। আমাদের কি নিজেদের মাথায় গোবর কম আছে না কি যে এসব বিদেশি গোবর দিয়ে নির্মিত বুকিস্টলে মাথা গুঁজব? বিবেকানন্দ রামকেষ্টো বিভূতি সুভাষ অবশ্যি অন্য সময়ে আমাদের পূজ্য হন, কিন্তু বই ব্যাপারটাই তো মেলেচ্ছো সঙোস্কিতি। আর আমাদের তো বলেই দিয়েছিল লাল সালু দেখলেই ঢুঁশোবি। বাংলা অক্ষর দেখলে এমনিও ম্যাগো কিছু বুঝতে পারিনেকো। হিন্দিবলয়ের লৌন্ডাগুলো লাল সালু দেখলেই ঢুঁশিয়ে দিল তাই।

zoom

তা হিন্দিগোবলয় কি শুধুই বইদোকান ভাঙতে লাগে? তারা তো সর্বত্রগামী। কলকেতাটা যে ভালো ভালো জিনিসে ভরে দিয়েছে মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরাই সে কতা কি আলাদা করে মনে করাবার। তবু যাহোক, ফের মনে এসেচে, কারণ কাগজে এইয়া এইয়া বিজ্ঞাপন টাঙিয়ে, দশেরার রাবণপোড়ানো হল। নেতানেত্রীসহ, সঙ্গে ছিনামা থেকে নেমে মর্ত্ত্যে অবতরিত সত্যকার রাম, ঢুলু ঢুলু চক্ষু ফিলিমস্টার। রামলীলায় হেবি মারদাংগা নাচনকোঁদন হল। বিশাল মাঠে এইসব আয়োজনে ত্রুটি রাখে কার সাধ্যি, আয়োজনে হদ্দ উপকণ্ঠনগরীর সাংস্কৃতিক সংসদ। চিরাগ নিয়ে ঢুঁঢলেও বংগালি একটি নেই কমিটিমধ্যে, এঁরাই আজ জেনুইন বঙ্গ সংস্কৃতির ধারক বাহক বর্ত্তেচেন। সে তালিকাটি মুগ্ধকারীই বটে, ধোনা, কান্দোই, বেরিওয়ালা, মাক্স কোজীগ্রুপখ্যাত টোডিজি থেকে গ্রাম স্টিল রড উৎপাদক টেরিওয়ালাজি সবাই উপস্থিত। ডিংডং গ্রুপ, হুম বাজার গ্রুপ, লোহালক্কড় থেকে মানুষ বেচে দেওয়া গ্রুপ সবাই উদ্যোক্তা তবে বাঙালি নাম একটিও না থাকায় মালুম পড়ে দুই হাজার ছাব্বিশের সুবিশাল বিজ্ঞাপনে মুখ্যমন্ত্রী ব্যতীত কেহই বংগালি নহে। তাইতে কী আসে যায় ভাই? আনন্দ তো ছয়লাপ হচ্চে।

তাই তো বংগালিবর্গ শিরদাঁড়াটি ভাঁজ করে সযত্নে পকেটে রেকে, প্রাণটি হাতে নিয়ে, অন্ধকূপসম থিমপুজো প্যান্ডেলে ঢোকেন আর মোবাইল তুলে ছবি নেন, সঙ্গে থাকে রুলের গুঁতো, পিছন দিকে এগিয়ে চলুন, নইলে প্যান্ডেল ভেঙে পতন।

পতনের পর কোন কোন দুর্ভাগা যে বাড়ি ফেরে নাই তার হিসাব কে দেয়? কে দেয়, কে দেয়? যে দুর্ভাগারা ফিরল না তাদের জন্য বরাদ্দ শববাহী গাড়ি, আর অনুদানের গেরেন্টি। তৎপর সরকার বাহাদুরের মন্দ গায় কার সাধ্যি। দ্রুততার সঙ্গে মর্গে ও শ্মশানে পাঠানোটুকুনি করে হ্যাপি হয়েচেন বটে।

তাই তো বিজয়ার গান গাইলেন হুতোমকবি:

বিদায় হও মা ভগবতি এ সহরে এসো নাকো আর।
দিনে দিনে কলিকাতার মর্ম্ম দেখি চমৎকার৷৷
জষ্টিসেরা ধর্ম্মঅবতার, কায়মনে কচ্চেন সুবিচার।
এদিকে ধুলোর তরে রাজপথেতে চেঁচিয়ে চলা হল ভার।

তবে দোষ তোমাদেরই বাপু হে। বাঙালির বড় নোলা। খালি খায়। আর ভিতু। খালি কাঁদে। কেঁদে কেঁদে পুজো শুরু কল্লে, কেঁদে কেঁদেই শেষ কব্বে। মধ্যে ক’টা বাচ্চা বাঙালি অবিশ্যি তরে গেল, তাদের এখন নয়া খাদ্যনীতি হয়েছে পনির রাজমা ছাড়া কথা কয় না তারা।

এই তো ষাটোর্ধ্ব আন্টির কাছে ভাতিজার মেসেজ আসে:

নো আনিওন নো গার্লিক পনির চাই আন্টি, সঙ্গে ভেজ বিরিয়ানি। অর্ডার প্লেস করে দিও। আমরা ক্যালেন পার্ক দেখেই আসছি।

নব্যনিরামিষাশী ভাতিজাবর্গ টেক্সট কত্তে কত্তে গাড়ির স্টিয়ারিং ধল্লে। আন্টির দ্বিপ্রাহরিক শান্তি বিঘ্ন হল, তিনি সবে নবমীর দুপুরে, কালই পুজো শেষ, এবার কাতান সিল্কটা আর ভাঙাই হল না, ভেবে, এক থালা ভাত দিয়ে কাতলা মাছের পেটি আর পাবদা মাছের সরষে ঝোল খেয়ে গা এলাবেন ভাবছেন বিছানায়, এমন সময় বিকাল চারটের হুজুগে লাঞ্চ করতে চেয়ে ভাগনে-ভাগনিদের আক্রমণে, জুইগিটোমাটোর অ্যাপ খুলে নো আনিওন নো গার্লিক লিখে সার্চ দিতে বসলেন।

zoom

পুজো চলেচে। এআই দিয়ে তোয়ের করা শিবঠাকুরের আঁখি হতে অগ্নিবর্ষণ হচ্চে ক্যালেন পার্কে। কী বিশাল বিশাল পুজো হচ্চে সব।

সব দেখে মুগ্ধ ভাতিজাবর্গ এসে, নুডল স্ট্র্যাপ ব্লাউজ আর জরিপাড় জর্জেট শাড়ি-সহ বান্ধবীর হাত ধরে, ভেজ লাঞ্চ করে পরিতৃপ্ত হলেন।

ধীরে ধীরে বিজয়া এসে পল্লে। এখন কই সেই কুচো নিমকি, কই সেই নারকেল নাড়ু। এখন হো-য়া মেসেজে একের পর এক ফরওয়ার্ড করা মেসেজ বিনে, দশমীর রং ঢং তুড়ুকসোয়ার, নিশেন, আভূমিপেন্নাম কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ, আদর, আপ্যায়ন কিচ্ছুটি নেই। তা সেই মেসেজ টাইপ করতে গিয়েই এবার আন্টি দেখলেন, সময় পালটেছে বটেক। তাঁর নিজের হাতেও কিছুতেই ঠিক টাইপ হওয়ার জো নেই এবার! নতুন মডেলের ফোনে, যতবার লেখেন ভুল লিখে ফেলেন। বিজয়া শব্দটাই আর লেখা হয়ে উঠলে না আন্টির মোবাইল ঘাঁটা অসাড় আঙুলে। তার ওপর আছে অটোকারেক্টের হ্যাংগাম! বারে বারে লিখেও তিনি পাল্লেন না। হাল ছেড়ে দিলেন। বন্ধু আত্মীয়রা তত্ত্ব পেলেন,

শুভ বজয়া, শুভ বিজ্যা, শুভ বিজাতীয়া!

Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোম প্যাঁচার নকশা

Share this article on