
নন্দিত রঙের নিন্দিত অধ্যায়। রঙের ভিড়ে সাধারণত, পাখির চোখ নারীরাই। শরীরের বিশেষ জায়গায় আপত্তির রং– আদিম বর্বরতার কু-রূপকথা। রঙের ছুতোয় সম্মতিহীন শরীরী স্পর্শ– উৎসবের ভাষায় যাই হোক না কেন– আইনি পরিভাষায় নির্যাতন। রঙের তফাত হয়ে যায় স্পর্শভেদে। যে রঙের রেমিডি তেল-সাবান নয়। উৎসবের আছিলায় ‘দাগ আচ্ছে হ্যায়’– ট্যাগলাইনে এই অসভ্যতার অলিখিত ছাড়পত্র যেন হোলিতে সর্বজনসিদ্ধ।
আসমুদ্রহিমাচল ভারতের গণতান্ত্রিক উৎসব দোলযাত্রা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে অনুষ্ঠিত এই ক্রীড়া-কৌতুক উৎসব-এ বিবিধের মাঝে ‘রং’ মহান। ফাগুনের আগুনে রাঙা প্রকৃতি থেকে মানুষ। যে রঙে কবির কলম হয়ে যায় বীণা, প্রকৃতি হয়ে যায় প্রেম, আর মানুষ বে-ণী-আ-স-হ-ক-লা। ধর্ম-পুরাণ-দেবতা-মানুষ-ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞান-কিংবদন্তি সবেতেই আছে রং। রঙ শুধু ‘বর্ণ’ নয়। রং এখানে যাপন। সংস্কৃতি এবং সময় বিশেষে যার অর্থ আলাদা। যে রং ভালোবাসার, সেই রং-ই প্রতিবাদের। রাজনৈতিক সমীকরণে রং আবার মেরুকরণের। রঙের আমি রঙের তুমি। বিবিধ অর্থ নিয়ে রং নিজেই একটি অভিধান।
লিঙ্গপুরাণে দোল ‘ফাল্গুনিকী’। বলা হয়েছে, লোকরঞ্জনের জন্য এটি করণীয়।
ফাল্গুনে পৌর্ণ-মাস্যাজ্ঞ সদা বালবিলাসিনী।
জ্ঞেয়া ফাল্গুনিকী সা চ কার্যা লোকবিভূতয়ে॥
দোলযাত্রায় ‘জলে-স্থলে-বনতলে’-র রংছবি আপাতদৃষ্টিতে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, লিঙ্গ-নিরপেক্ষতার বার্তা দেয়। ভারতীয় সংস্কৃতিতে আলিঙ্গন, প্রণাম ইত্যাদি শারীরিক যোগ থাকে। আর দোলে সেই যোগ বেড়ে কয়েকগুণ। একটু আবিরের ছোঁয়ায় রং শরীর থেকে মনে। রঙে রঙে কত কথা– রঙেরই কথকতা। মদনদেবের জাদুতে– মনের রাগে, রঙের রাগ।

বারমাস মধ্যে মাস বিষম ফাগুন।
মলয় পবন জ্বালে বিরহ আগুন॥
সেই আপাত নিরীহ রঙের পরতেই আছে অন্য রং। ‘বুরা না মানো হোলি হ্যায়’-এর ছদ্মবেশে, রুচির লক্ষ্মণরেখা লঙ্ঘিত করে, তৈরি হয় অবাঞ্ছিত স্পর্শচরিতকথা।
অধরে অম্বর-বারি,
মনোহর পিচকারি
পয়োধরে কুমকুম প্রহার।
নন্দিত রঙের নিন্দিত অধ্যায়। রঙের ভিড়ে সাধারণত, পাখির চোখ নারীরাই। শরীরের বিশেষ জায়গায় আপত্তির রং– আদিম বর্বরতার কু-রূপকথা। রঙের ছুতোয় সম্মতিহীন শরীরী স্পর্শ– উৎসবের ভাষায় যাই হোক না কেন– আইনি পরিভাষায় নির্যাতন। রঙের তফাত হয়ে যায় স্পর্শভেদে। যে রঙের রেমিডি তেল-সাবান নয়। উৎসবের আছিলায় ‘দাগ আচ্ছে হ্যায়’– ট্যাগলাইনে এই অসভ্যতার অলিখিত ছাড়পত্র যেন হোলিতে সর্বজনসিদ্ধ।
‘চোখে আঙুল দাদা’ হয়ে ‘বর্ণ’বিশ্লেষণ-এর দরকার ছিল না। যদি না এই হুল্লোড় থাকত নিজস্ব চৌহদ্দিতে। কিন্তু সর্বজনীন প্রসঙ্গেই আসে সর্বসম্মতি। অথচ ‘রংবাজি’-র এই যথেচ্ছাচারে ‘সম্মতি’ শব্দটি ব্যাকবেঞ্চার। দোলের রঙে কলির রাখাল আর বোধ-এর আকাল একাকার। সংস্কৃতিকে ঢাল করে চলা এই ‘বর্ণান্ধতা’, ধর্মান্ধতার মতোই বিপদজনক। যে কোনও সুস্থ গণতন্ত্রের পরিচয় তার বৈপরীত্যে। যেমন বাংলার দোলযাত্রাই অন্য প্রদেশে হোলি হ্যায়। কোথাও রঙের উৎসব ভগবান শিব-পার্বতী অথবা শ্রীরাধাকৃষ্ণ কেন্দ্রিক, কোথাও বা স্রেফ প্রকৃতিপুজো। কারওর কাছে বসন্ত যেমন পূর্ণিমার পুজো-প্রসাদ। তেমনই ‘এমন বসন্তদিনে বাড়ি ফেরো মাংস কিনে।’ কারওর কাছে বসন্ত রঙিন ফাগ। কারওর কাছে গুটির দাগ। তেমনই এই রঙিন দোলে আছে বে-রঙিন কিছু সংখ্যালঘু। ‘বর্ণ’মিছিলের বিপরীতে যাদের উদ্যাপন অনুভবে, হুল্লোড়ে নয়। পাড়া-শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান-অফিস– সব জায়গার এই সংখ্যালঘুরা শুধু নারী, বা অ-হিন্দু নয়। যেই তালিকায় মানুষের সঙ্গে আছে না-মানুষীরাও।

‘…খোল দ্বার খোল/ লাগল যে দোল’ বলে সবলা-অবলা নির্বিশেষে মর্ম, কর্ম-র সঙ্গে চর্মে রং দিয়ে বর্ণবৈষম্য ঘোচানোর এই অত্যুৎসাহ নিছক নির্দোষ আনন্দ নয়। আসলে সেই ‘আমিত্ব’। এই বসন্তবাহিত যথেচ্ছাচারে আক্রান্ত দোল-সংস্কৃতি এখন দোল-বিভীষিকা। যার টীকা নেই।
বিশ্ববাংলার চূড়োয় উঠুন,
নীচে তাকান, ঊর্ধ্বে চান–
দুটোই মাত্র সম্প্রদায়
নির্বল আর বলবান।
এই দ্বন্দ্ব আসলে, সংখ্যালঘু বনাম সংখ্যাগুরুর। ক্ষমতা এবং অসহায়ের। গণতন্ত্র বনাম ‘মব’তন্ত্রের, ‘যৌনতাড়না’ এবং ‘যৌনপ্রভুত্ব’-র। নির্যাতিতের পরিচয় একটাই– সে ‘নির্যাতিত’। আর এই দোল-দৌরাত্ম্য নির্যাতনই। তর্কের খাতিরে কেউ নারী-পুরুষ প্রসঙ্গে শ্রীরাধাকৃষ্ণ-গোপিনীদের তুলনা এবং অ-হিন্দু প্রসঙ্গে– মুঘলদের মেহ্ফিল-এ-হোলি থেকে মেটিয়াবুরুজের ওয়াজেদ আলি শাহ-এর প্রসঙ্গ আনতে পারে। কিন্তু সম্মতির সহজ সমীকরণের সঙ্গে, ‘না’ মানে যে ‘না’ এই ফর্মুলা ভুললে হবে না। আদতে সংবিধান এবং সামাজিকতার পরিপন্থী এই খেলায় পৌরাণিক, ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ নেই। আছে অশ্লীলতার দায়।

রঙের দিন– সারা বছরের অবদমিত বেলেল্লাপনার দিন। আইন-শাসন-লঘু-গুরু চাপা পড়ে যায় রঙের উল্লাসে। সর্বাঙ্গে সোনালি লেপে রাস্তায় রাজা মিদাসদের ‘রং’বাজি। এলিট রং-আবির-বেলুনের সঙ্গে প্রলেতারিয়েত কালি-মোবিল-কাদা-বাঁদুড়ে রং– ‘রাস্তা কারোর একার নয়’। লাউ বা আলুর টুকরো রঙে চুবিয়ে চুপচাপ পিঠে ছাপ। মুখ থেকে শরীরে অসাংবিধানিক শব্দের পাঁচালি। আর লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট ড্রেনের জলে শুদ্ধিকরণ।
আবার হোলির দিন স্থানীয় সংবাদ– পানীয় সংবাদ। এদিনের সেফটি ভালভ্– নেশা। দোষখণ্ডন থেকে মানভঞ্জন– সব দোষ নেশার। যাতে মান না থাক কুল [cool] সেজে কুল রাখা যায়।
তবে এই রঙের সং বা সং-এর রং অর্বাচীন না। এটাই হোলির আদিম চরিত্র। সাক্ষী জোব চার্নক। গ্রাম্য কলিকাতায় ফিরিঙ্গি ছোকরারা ঘুরতে ঘুরতে গান-বাজনার শব্দ অনুসরণে আবিষ্কার করে, দিঘির পাড়ে রংখেলা, রংমেলা। শ্রীগোবিন্দজিউ এবং শ্রীরাধিকাজিকে সাক্ষী রেখে চারদিক লালে লাল। সঙ্গে নাগর-নাগরীদের (গোপিনীবেশী পুরুষ) নৃত্য-গীত। গ্রীসের ‘স্যাটারনালিয়া’ (কামোৎসব) ভেবে অনাহুত ফিরিঙ্গিরা উৎসবে অংশ নিতে চাইলে, সেই বেয়াদপিতে নেটিভদের থেকে জুটেছিল চড়-থাপ্পড়। ব্রিটিশদের এই অনধিকার চর্চা মেনে নেয়নি এই দেশীয়রা।

গবেষকদের মতে সাবেক কলকাতার দোল উৎসব ছিল প্রাচীন কালের মদনোৎসবের আদলে। গবেষক এ. এল. ব্যাসামের কথায়– ‘হিন্দু স্যাটারনালিয়া’। তিনি বলেছেন– ‘The festival still survives under the name Holi, though Love-god plays no part in it.’ যে হোলির অংশ ছিল ‘universal merrymaking and license of all kind’ এবং ‘playing all kinds of practical jokes’। কলকাতার রঞ্জিত ইতিহাসে আছে চটুলতা, আছে অত্যুৎসাহ। গবেষক প্রাণকৃষ্ণ দত্তর কথায়– ‘সেসময় কোন ব্যক্তির বেদাগ বস্ত্র থাকিত না, দলে দলে মিছিল বাহির হইতেছে, পিচকারি এবং আবীরে পথঘাট ঘরবাড়ি লালে লাল হইয়া যাইতেছে। মিছিলওয়ালারা সুশ্রাব্য এবং অশ্রাব্য গীতে পাড়া মাতাইয়া এবং নরনারী যাহাকে সম্মুখে পাইত, তাহাকে আবীর এবং পিচকারিতে ব্যতিব্যস্ত করিয়া চলিয়া যাইত। এমন অশ্রাব্য গীত এবং কুৎসিত সং প্রকাশ্যে পথে বাহির করিতেন যে, এখনকার লোকে তাহা কল্পনা করিতে পারে না।…’
হুতোম প্যাঁচার নকশায় আছে জেলেপাড়ার সঙেদের কথা। ভুললে চলবে না বাগানবাড়ির ইন্দ্রিয়বিলাসী বাবুদের। স্বামী বিবেকানন্দের ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের বয়ানে পাওয়া যায়, শোলার ‘নুটি’র মধ্যে কুমকুম ভরে রং ছোড়ার কথা। আছে উৎসাহের আতিশয্যে রক্ত-হোলি। ‘নূতন যৌবনের দূত’দের এই অতিসক্রিয়তা, সেকাল থেকে একালের সংবাদপত্রের চেনা খবর। এই ‘ব্যাকানেলিয়ান ম্যাডনেস্’ বা উন্মত্ত লীলার উত্তেজক অভিব্যক্তিই হোলির আদিম চরিত্র। সেদিনের কাহিনি আজ কিংবদন্তি। সেই কলিকাতার রং, আজকের কলকাতায় হারিয়ে যায়নি। প্রচ্ছন্ন হয়েছে শুধু।

কিন্তু বাঙালিদের এই রঙের উৎসব শুধু অর্থহীন হুল্লোড় নয়। এই দোলে আছে বসন্তোৎসব, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, ন্যাড়াপোড়া, বৈষ্ণব আকুলতা, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদি। বাঙালির এই অতি নিজস্ব দোলযাত্রা, এবং বসন্ত সুন্দর কিছুটা ব্যাকফুটে। যেখানে ‘রঙ’তন্ত্রের দাপটে গণতন্ত্র তাসের ঘর। কিন্তু এই বাঙালিকে ‘বর্ণ’পরিচয়-এর সহবত শিখিয়ে বসন্ত বিলাপ থেকে বসন্ত-বিলাসে ফেরাবে কে? উত্তর জানেন মহাকাল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved