
‘বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা’ শেষ হয়েছে এই কথা দিয়ে ‘‘বিদেশে এমন সরলস্বভাবা স্নেহপরায়ণা শ্বশ্রূঠাকুরাণীর মা’র মত যত্ন ভালবাসা পাইয়া ইঁহার সহিত বাস করিতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু সে সম্ভাবনা কোথায়?’’ আমাদের মনে হয় বাঙালি মেয়েদের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন হরিপ্রভা। প্রথম বাঙালি হিসেবে একজন জাপানিকে বিয়ে করা শুধু নয়, অসীম কৌতূহল আর ইচ্ছেডানায় ভর করে সুদূর জাপানে যাওয়া, সেখানকার মানুষের ভালোবাসা অর্জন, অচেনা সেই দেশের কাহিনি স্বদেশবাসীকে শোনাবেন বলে বইপ্রকাশ, যুদ্ধের ভয়াবহতার ভেতরেও তাঁর কর্তব্যের দৃঢ়তা– এসবই একজন অন্যরকম আধুনিক নারীর মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।
সাল ১৯১২। তখনও পৃথিবী কোনও বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেনি। পৃথিবীর সীমিত কয়েকটি জায়গা বাদ দিলে নারীদের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই তখনও। সদ্য ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী স্থানান্তরিত হয়েছে কলকাতা থেকে দিল্লিতে। ১৫ এপ্রিল তারিখে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে একটি হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে গিয়েছে সে সময়ের সবচেয়ে বড় আধুনিক বিলাসবহুল যাত্রীবাহী জাহাজ– টাইটানিক। মারা গিয়েছেন ১৫০০ জন যাত্রী ও ক্রু। এই ১৯১২-র পয়লা নভেম্বর ইয়েটস-এর ভূমিকা-সহ রবীন্দ্রনাথের নিজের করা ইংরেজি অনুবাদ ‘GITANJALI’ (SONG OFFERINGS) প্রকাশিত হচ্ছে ‘দ্য ইন্ডিয়া সোসাইটি’ থেকে। আর এই নভেম্বরেই বাংলাদেশের ঢাকা শহরে প্রায় নীরবে ঘটছে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এই শহরের একটি ২২ বছরের বাঙালি তরুণী তাঁর জাপানি স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির দেশ দেখবেন বলে রওনা দিচ্ছে জাহাজে। তরুণীর নাম হরিপ্রভা।

জন্ম ১৮৯০ সালে একটি উন্নতমনা ব্রাহ্ম পরিবারে। বাবা শশিভূষণ বসুমল্লিক, মা নগেন্দ্রবালা। শশিভূষণের আদি নিবাস নদীয়ার শান্তিপুরে। কাজের সূত্রে তিনি ঢাকার বাসিন্দা হন। একার চেষ্টায় মহিলা, শিশু ও দুঃস্থ ব্যক্তিদের জন্য ‘উদ্ধারাশ্রম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ১৮৯২ সালে। শোনা যায়, একটি পরিত্যক্ত শিশুকে তিনি কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। শিশুটিকে কেন্দ্র করেই তিনি এবং তাঁর স্ত্রী এমন একটি মহৎ ব্রতে নিজেদের নিয়োজিত করেন। এমন নয় যে, তাঁদের আর্থিক অবস্থা ছিল বিরাট। বরং আর্থিক অনটন এবং স্থানের অভাবে ১৯০৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যেতে হয় ঢাকার অদূরে খিলগাঁয়ে। তখন এর নাম দেওয়া হয় ‘মাতৃনিকেতন’। বিজ্ঞাপন দিতে হয় আর্থিক সাহায্য লাভের আশায়। ইতিমধ্যে ১৯০৭ সালে নগেন্দ্রবালা প্রয়াত হন। আর্থিক অবস্থার উন্নতি তেমন যে হয়নি, সেটা জানা যায় ১৯১৫ সালে শশিভূষণের আরেকটি আবেদনপত্র থেকে। আসলে তাগিদ তো মনের। সেই মনের জোরেই শশিভূষণ এবং নগেন্দ্রবালা তাঁদের পুত্রকন্যাদের সঙ্গে নিয়ে ‘মাতৃনিকেতন’-এর কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছেন দীর্ঘদিন।
হরিপ্রভা এই উদারমনস্ক বাবা-মায়ের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ওই সময় ঢাকায় বসবাসকারী জাপানি কেমিস্ট ওয়েমন তাকেদার সঙ্গে এই পরিবারের ঘনিষ্ঠতা কীভাবে গড়ে ওঠে, সেটা তেমনভাবে জানা যায় না। ওয়েমন ১৯০৩ সালে ভাগ্যান্বেষণে জাপান থেকে কলকাতা আসেন। কলকাতায় উপযুক্ত চাকরি না পেয়ে চলে আসেন ঢাকায়। ‘বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরি’ নামে একটি খ্যাতনামা সাবান তৈরির কারখানায় তিনি প্রধান কেমিস্ট হিসেবে যোগ দেন। পরে ‘ইন্দো-জাপানিজ সোপ ফ্যাক্টরি’ নামে নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই কারখানার বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, এখানকার আয়ের কিছু অংশ তিনি ‘উদ্ধারাশ্রম’-এ দিতেন। এইসব সূত্রেই হয়তো বসুমল্লিক পরিবারের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গতা গাঢ় হয়। সম্ভবত তিনি বাংলা ভাষাও শিখেছিলেন। ১৯০৭ সালে নবসংহিতা অনুসারে হরিপ্রভার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ঢাকা শহরে। কোনও বাঙালি কন্যার সঙ্গে জাপানি পুরুষের বিবাহ এই প্রথম। বিবাহিত দম্পতির একটি ছবিতে দেখতে পাই তাকেদাসান তখনকার দিনের বাঙালি ভদ্রলোকদের মতো ধুতি-কোট পরে চেয়ারে বসে আছেন। মানুষটি সম্ভবত এই বাংলাকে ভালোবেসেছিলেন। দীর্ঘ নয় বছর তিনি দেশে ফেরেননি। এই সময় মা-বাবা, আত্মীয়-পরিজন এবং স্বদেশকে দেখার ইচ্ছে নিশ্চয়ই তাঁর হয়েছে। অবশেষে যাতায়াতের প্রয়োজনীয় টাকা জমিয়ে ১৯১২ সালে তিনি দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই যাত্রায় হরিপ্রভাও তাঁর সঙ্গী হন। আজকের হোয়াটসঅ্যাপ, ভিডিও কল, গুগল ম্যাপ আর উড়োজাহাজের যুগে আমাদের পক্ষে পরিস্থিতিটা আন্দাজ করা বেশ কঠিন। হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশ, জাহাজে করে সেখানে পৌঁছতেই তখন সময় লাগে মাসাধিককাল। একেবারে অজানা পরিবেশ, অচেনা মানুষজন এবং ভিন্ন এক সংস্কৃতি। ইচ্ছে হলেই দেশের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নেই। আসলে হরিপ্রভার মধ্যে নতুন কিছু করার বাসনা সবসময়ই ছিল। ওয়েমন তাকেদাকে বিবাহ করে তিনি সে পরিচয় দিয়েছিলেন। সেই ইচ্ছের জোরেই আবারও তিনি অসাধ্যসাধন করতে পারলেন।

হরিপ্রভা এই জাপান যাত্রা নিয়ে যে বই লিখেছিলেন সেটি শুরু হচ্ছে এই কথা দিয়ে– ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন কেহ মনে করে নাই যে আমি জাপান যাইব। কাহারও ইচ্ছাও ছিল না। কিন্তু আমার বড়ই ইচ্ছা হইত আমি একবার যাই।’ তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘অর্থবল সামান্য, শরীর অপটু, সম্মুখে শীতকাল, আত্মীয়গণের অনিচ্ছা, অনেকের নানা ভয় প্রদর্শন’– এইসব বাধা সত্ত্বেও তাঁর যাওয়া স্থির হল। ৩ নভেম্বর ১৯১২, ঢাকা থেকে রওনা হলেন তাঁরা কলকাতার উদ্দেশে। লিখেছেন, ‘যখনি মনে হইল, প্রিয়জনগণ হইতে কত বহুদূরে যাইতেছি, তখনই দুই চক্ষু জলে পূর্ণ হইল।’ সুদূরের আকাঙ্ক্ষা আর ঘরের টান এই দুইয়ের টানাপোড়েন বারবার তাঁর জীবনের দাবিকেই সুদৃঢ় করেছে। ৫ নভেম্বর ১৯১২ কলকাতা থেকে জাহাজে ওঠার আগে লিখছেন, ‘জাহাজে আসিবার সময় মন খারাপ ছিল। চোখের জল রাখিতে পারিলাম না।’ আর জাহাজে ওঠার পর লিখছেন, ‘এখন আর আমাদের কোন কষ্ট নাই। মন বেশ প্রফুল্ল।’ মনখারাপ আর মন ভালোর এই চলাচল হরিপ্রভা নামের তরুণীকে শতবর্ষ পরেও আমাদের কাছের মানুষ করে তোলে। খুব সম্ভব তিনি ডায়েরি লিখতেন। রেঙ্গুন, পিনাং, সিঙ্গাপুর, হংকং, সাংহাই, মোজি বন্দর হয়ে ১৫ ডিসেম্বর তাঁরা পৌঁছন জাপানের কোবে বন্দরে। এই সময়ের অনেকগুলো দিনের অনুপুঙ্খ বর্ণনা রয়েছে তাঁর লেখায়। সেই বর্ণনায় রয়েছে তখনকার জাহাজে সাধারণ যাত্রীদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থার কথা, আছে শরীরের ভালো-মন্দের কথা, যেসব বন্দরে তাঁরা নেমেছেন রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুর, হংকং, সাংহাই এবং জাপানের মোজি বন্দরের কথা। আছে এই কথা, ‘আমি মাঝে মাঝে এস্রাজ বাজাই, আস্তে আস্তে গান করি, সেলাইও এক আধটুক করি।’ যেন নিরালা আত্মমগ্ন এক নারীর ছবি। আছে সমুদ্রের কথা– ‘একেবারে নীল জল, নীল কালির মতো।… নীচে নীল জল, উপরে নীলাকাশ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য ঢেউ– কেবলই ঢেউ, পরস্পর যেন একটার গায় একটা ঢলিয়া পড়িতেছে। অসীম অনন্ত জল, কী সুন্দর! কী আনন্দ!’ পড়তে পড়তে মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘জাপান যাত্রী’। এই একই পথে তিনিও আরও চার বছর পর ১৯১৬-তে প্রথমবার কোবে বন্দরে পৌঁছন। সে বইতেও আছে, ‘এই কয়দিন আকাশ এবং সমুদ্রের দিকে চোখ ভরে দেখছি আর মনে হচ্ছে, অনন্তের রঙ তো শুভ্র নয়, তা কালো কিংবা নীল।’ নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের দেখার ক্যানভাস অনেক বড়। তাঁর ভাবনায় প্রত্যক্ষর সঙ্গে অপ্রত্যক্ষ এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যা আলাদা করা যায় না। আর হরিপ্রভা এই বাংলাদেশের একজন মেয়ে, জাপানের বধূ। তাঁর পরিসর ভিন্ন, তাঁর অভিমুখ আলাদা, তাঁর দেখা অনেক বেশি অন্দরমহলের খুঁটিনাটি অন্তরঙ্গতায় পূর্ণ। পারিবারিক চৌহদ্দিতে সমকালীন জাপানের জীবনকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সেসময় তিনি শ্বশুরবাড়ির দেশে ছিলেন চার মাস। ১৯১৩ সালের মে মাসে ভারতে ফিরে আসেন। ১৯১৫ সালে ঢাকা থেকে তাঁর লেখা বই ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ প্রকাশিত হয়। এটিই বাংলা ভাষায় লেখা জাপান-সম্পর্কিত প্রথম বই। এশীয় কোনও ভাষাতেও প্রথম বই বললে অত্যুক্তি হবে না। স্বল্পায়তন এই বইটিতে সেই সময়ের জাপানের এত বিবিধ বিষয়ের আলোচনা আছে যে, জানার জন্য তো বটেই গবেষণার জন্যও এ বই মূল্যবান। জাপানের রাস্তাঘাট, বাড়ি, ট্রেন, ট্রাম, খাওয়া-দাওয়া, সাজ-পোশাক, মন্দির, স্কুল, শিক্ষা, রীতিনীতি, মেয়েদের অবস্থা কোনও কিছুই তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। সর্বোপরি জাপানিদের সৌজন্যবোধ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। কয়েকটি প্রসঙ্গ না বললেই নয়। ‘ট্রাম বেশ সুবিধাজনক, পাঁচ পয়সার এক টিকিটে সহরের যে কোন স্থানে যাওয়া যায়। ট্রাম বদলাইতে হইলেও এক টিকিটেই চলে’… ‘স্থানে স্থানে টেলিফোন করার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘর আছে, পাঁচ পয়সা দিয়া টেলিফোনে পাঁচ মিনিট কথা বলা যায়’… ‘শিশুদের বই পড়ান হয় না। তাহাদিগকে কাগজ কাটা, ছবি আঁকা, মাটির দ্রব্যাদি প্রস্তুত করা ও গল্পচ্ছলে নীতি বিষয়ে নানা প্রকার শিক্ষা দেওয়া হয়’… ‘মটর ডাউল দ্বারা ‘তোফু’ নামক এক প্রকার ছানার মত জিনিষ প্রস্তুত করে’… ‘জাতীয় একতা পথে ঘাটেও পূর্ণরূপে অনুভব করা যায়’… ‘বাজারে, দোকানে, ষ্টেশনে, পোষ্টাফিসে, সর্বত্র মেয়েরা কাজ করে।’ এইরকম নানা পর্যবেক্ষণের তথ্যে ভরপুর এই বই। আশ্চর্যের বিষয় এমন একটি বই দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির দুর্লভ সংগ্রহ থেকে বইটির মাইক্রোফিল্ম কপি বের করে ‘সাহিত্য প্রকাশ’ থেকে সেটি নতুনভাবে ভূমিকা-সহ ১৯৯৯-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করেন বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক মনজুরুল হক। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে ড. মঞ্জুশ্রী সিংহের সম্পাদনায় হরিপ্রভার আরও কিছু রচনা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক লেখার সংকলন সহ ‘ডি. এম. লাইব্রেরী’ থেকে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা ও অন্যান্য রচনা’। ২০১২-তে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক তানভীর মোকাম্মেল হরিপ্রভার জীবনের ওপর একটি ডকুমেন্টারি বানান ‘জাপানি বধূ’ নামে। ২০২১-এ বাংলাদেশের মেয়ে এলিজা বিনতে এলাহী ‘Hariprabha Takeda: An unsung traveller of Bengal’– এই প্রামাণ্য চিত্রটি তৈরি করেন। এসবই হরিপ্রভা তাকেদা নামে এক অনন্য মানুষকে খুঁজে পাওয়ার খণ্ডপ্রয়াস। খণ্ডই, কারণ এমন একজন মানুষের জীবনের বেশিটাই আমাদের অজানা। ১৯২৪ সালে আবারও জাপানে গিয়েছিলেন হরিপ্রভা। সে সম্বন্ধে কোনও বিশদ তথ্য আমরা জানতে পারিনি। ১৯১৬-এর পর রবীন্দ্রনাথও এই ১৯২৪-এই দ্বিতীয়বার জাপান যান।

১৯৪১-এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাকেদাসান নিজের দেশে ফিরে যাওয়া মনস্থ করেন। এবার জাহাজে ওঠা বোম্বে থেকে। এই সময়ের একটি বিবরণ লিখেছিলেন হরিপ্রভা, যেটি ‘যুদ্ধ জর্জরিত জাপানে’ এই নামে দ্বিতীয় বইটিতে ছাপা হয়েছে। এটিও অমূল্য সব রোমাঞ্চকর তথ্য আর কাহিনিতে পূর্ণ। শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে লিখছেন, ‘১৭ বৎসর পরে সেই বাড়ি কত স্মৃতি ভরা। সেই গৃহে প্রবেশ করে কত আনন্দ আমার স্বামীর।’ এই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। লিখছেন, ‘বড় আশা করেছিলাম শেষ পর্যন্ত মীমাংসা হবে। যুদ্ধ হবে না। বৃদ্ধবয়সে কতকাল দুর্ভোগ ভুগতে হবে কে জানে। আচম্বিতে পার্ল হারবার আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত।’ টালমাটাল সেই সব দিনে পৃথিবীতে তখন ভিন্ন সমীকরণের আদানপ্রদান। দেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে সেসময় জাপানে রাসবিহারী বসু তৈরি করেছেন ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’। যার সেনাধিনায়কের ভার তিনি তুলে দিয়েছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে। হরিপ্রভা দেশে থাকাকালীনই যে কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সেকথা তাঁর বিভিন্ন টুকরো লেখার ভেতর একাধিকবার পাওয়া যায়। বর্তমান লেখাটিতেও পাই, ‘১৯৩০ সনে ২৬শে জানুয়ারি কলকাতায় স্বাধীনতা পতাকা উত্তোলনের দিন গোরা সৈন্যের লাঠির প্রহারে রক্তাক্ত দেহের উপর যে মহিলাগণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে আমি সুভাষ বসুর পাশে দাঁড়াবার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম।’ সেই স্বপ্নের সেনানায়কের সঙ্গে ‘সাক্ষাৎ আলাপ করার সুযোগ পেলাম। তাঁর পাশে বসে আহার ও আলাপ হল।’ আজাদ হিন্দ ফৌজের হয়ে টোকিও রেডিওতে বাংলায় খবর পড়বার ভার দেওয়া হল হরিপ্রভাকে। লিখেছেন, ‘রাসবিহারী বসুর নির্দেশে রেডিও অফিস থেকে আমায় ডেকেছেন এই মর্মে টেলিগ্রাম পেয়ে ৩রা ডিসেম্বর আমরা পুনঃ টোকিওতে যাই এবং ১৫ই ডিসেম্বর থেকে কর্মে নিয়োজিত হই।’ এটা ১৯৪৩ সনের ঘটনা। এরপর যুদ্ধের গতিবিচিত্র সব পথে গিয়েছে, সেসব বিবরণ ইতিহাস আজ। তবু সামনে থেকে এই যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পরিণাম দেখে লিপিবদ্ধ করার গুরুত্ব নিঃসন্দেহে আলাদা। নেতাজির কথা প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘যুদ্ধের অবস্থা পরিবর্তনে যে অবস্থা দাঁড়াচ্ছে তাতে অনেকে আজাদ হিন্দ যুদ্ধ সম্বন্ধে বিরুদ্ধ আলোচনা করেন। তিনি প্রথমতঃ জিজ্ঞাসা করলেন, কে বিরুদ্ধ আলোচনা করে? এবং একটু উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। অতঃপর বললেন, জাপান পরাজিত হলেও ভারত স্বাধীনতার জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করব।’ যেন দেখতে পাই অসহায়তার সামনে দৃঢ়তার প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন সেনাধিনায়ক। এরপর ‘ক্রমে রেললাইন ধ্বংস। Record প্রস্তুতের কারখানা ধ্বংস। আমাদের recording করানো বন্ধ হয়ে যায়। রাত্রি ১২ টার পর Broadcast করার ব্যবস্থা হয়। প্রতিদিন রাত্রে ভীষণভাবে raid হচ্ছে।’ সেই রাত্রির অন্ধকারে মাথার ওপর বোমারু বিমান হানার শঙ্কা নিয়ে একজন বাঙালি রমণী রেডিও স্টেশনে যাচ্ছেন, সিনেমার মতো এই দৃশ্য দায়িত্ববোধে অবিচল মানুষটির প্রতি আমাদের ভালোবাসা শ্রদ্ধা বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। সম্ভবত ১৯৪৫-এর মাঝামাঝি পরিস্থিতি একেবারেই প্রতিকূল হওয়ায় ‘আমরা চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হই। সংবাদ সমালোচনার কয়েক খানি অতিরিক্ত record করিয়ে আমরা গ্রামে ফিরি।’ ফেরার পথ সহজ ছিল না। লিখেছেন, ‘ট্রেন ট্রাম সব বন্ধ।… কোনও প্রকারে উয়েনো স্টেশন পর্যন্ত যেয়ে অতঃপর ৫ মাইল পথ হেঁটে চললাম। এ অঞ্চল সব শেষ হয়ে গেছে। পথঘাট চেনা যায় না। ছাইয়ের তলায় খুঁড়ে খুঁড়ে ছেলেমেয়েরা তাদের অবশিষ্ট জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছে। চারিদিকে দুর্গন্ধ।’ হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে ‘আণবিক বোমা পতন’-এর সংবাদও রয়েছে তাঁর লেখায়। যুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু সেই বিধ্বস্ত জাপানে শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত এই দম্পতির থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাঁরা ভারতে ফিরবেন বলে ঠিক করেন। ‘সুদীর্ঘ ৭ বৎসরের অধিককাল জাপানে থাকাকালে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে ভারতে আমার কনিষ্ঠ ভগ্নীর প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে দেশে আসার ও একবৎসর বাসের অনুমতি পেয়ে ১৯৪৮ সনের ১৬ই জুলাই আমার গ্রামের আত্মীয় বন্ধুবান্ধবের নিকট বিদায় নিয়ে টোকিও রওনা দিই।’ এই ‘আমার গ্রামের’ শব্দবন্ধ আবারও মানুষটিকে নতুন করে চেনায়।

১৯৪৮-এ জাপান থেকে ফিরে ছোট বোন ডা. অশ্রুবালা দাশগুপ্তের কাছে জলপাইগুড়িতে তাঁর দিন কাটে। ওই ১৯৪৮-এ-ই সেখানে মারা যান ওয়েমন তাকেদা। তারপরেও দীর্ঘদিন বেঁচেছিলেন হরিপ্রভা। শেষ সময়ে থাকতেন পুত্রসম বোনপো, লেখক সুরজিৎ দাশগুপ্তের কলকাতার বাড়িতে। ১৯৭২ সালে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে ৮২ বছর বয়েসে তাঁর জীবনাবসান হয়। বেঁচে থাকার এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর আশ্চর্য জীবন তাঁর বইয়ের মতোই অন্তরালে ছিল। অথচ আমরা জানতে পারি যে, অন্নদাশঙ্কর রায় বালকবয়েসে ‘প্রবাসী’-তে মুগ্ধচিত্তে তাঁর কথা পড়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘অন্য কোনোখানে’ বইতে লিখেছেন যে বাল্যকালে ‘বঙ্গমহিলার জাপান যাত্রা’ বইটি তাঁকে বিশেষ আলোড়িত করেছিল। আর আজ ক’জনই বা জানি হরিপ্রভা তাকেদার জীবন এবং বিচিত্র কর্মের কথা?
প্রথমবার জাপান থেকে ফেরার সময় হরিপ্রভার শাশুড়িমা ও এক ননদ কোবে বন্দরে এসে তাঁদের জাহাজে তুলে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিয়েছিলেন। ‘বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা’ শেষ হয়েছে এই কথা দিয়ে ‘‘বিদেশে এমন সরলস্বভাবা স্নেহপরায়ণা শ্বশ্রূঠাকুরাণীর মা’র মত যত্ন ভালবাসা পাইয়া ইঁহার সহিত বাস করিতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু সে সম্ভাবনা কোথায়?’’ আমাদের মনে হয় বাঙালি মেয়েদের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন হরিপ্রভা। প্রথম বাঙালি হিসেবে একজন জাপানিকে বিয়ে করা শুধু নয়, অসীম কৌতূহল আর ইচ্ছেডানায় ভর করে সুদূর জাপানে যাওয়া, সেখানকার মানুষের ভালোবাসা অর্জন, অচেনা সেই দেশের কাহিনি স্বদেশবাসীকে শোনাবেন বলে বইপ্রকাশ, যুদ্ধের ভয়াবহতার ভেতরেও তাঁর কর্তব্যের দৃঢ়তা– এসবই একজন অন্যরকম আধুনিক নারীর মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের। তাঁর সময়ের অনেক নারীর জীবন আজ বহুল চর্চিত। অথচ একদিন নিজের জীবন দিয়ে যিনি দেখিয়েছিলেন যে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধের সেতু কত সহজ ছন্দে গাঁথা যায়, তাঁকে কত অনায়াসে ভুলে যেতে পেরেছি আমরা, এটাই দুঃখের।
…………….
ছবিঋণ বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা ও অন্যান্য রচনা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved