
সেকালে বাগবাজারে গঙ্গার ধারে ছোট-বড় নৌকা, সাহেবি জাহাজ আসা-যাওয়া করত। অন্নপূর্ণার ঘাট ছিল ব্যস্ত আর প্রাণবন্ত। সেখানে চাল, কাপড়, মশলার ব্যবসা চলত। পাশাপাশি অঞ্চলটিতে ব্যবসায়ীদের বাড়িতে ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক আচার লেগেই থাকত। নদীপথই ছিল ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের মাধ্যম। কথিত আছে, মন্বন্তরের পর বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী একাধিক মন্দির নির্মাণ করেন। অন্নপূর্ণা মন্দিরটি আজকের বাগবাজার ঘাটের একেবারেই পার্শ্ববর্তী ছিল। তাই মন্দিরের নাম থেকেই ঘাটের নামকরণ হয় ‘অন্নপূর্ণা ঘাট’।
শহরের মায়াজাল কাটিয়ে গঙ্গার ঘাটে এলে, নানা সময়ের বিষয়ীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়। সময়ের আড়ালে আটকে থাকে অমূল্য সব ঘটনা। ঘাটের সঙ্গে বাঙালির এক আত্মীয়তা আছে। গঙ্গার ধারে সিঁড়িগুলোয় নদীর জল কত গল্প বোনে! সমস্ত খণ্ড খণ্ড চিত্র ভিন্নভাবে উঠে আসে, সেখানে যেন মায়া, মমতা ছায়ার মতো পড়ে আছে। আর কোন এক নীরব দুপুরে, যখন ঘাটগুলোয় খুব একটা মানুষজন থাকে না, সেই লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে ইতিহাস হা-হুতাশ করে।
জীবনকে ব্যাখ্যা করার জন্য গল্পই শেষে পড়ে থাকে। আর সেকালের গল্পরা স্থান-কাল পেরিয়ে শাখা-প্রশাখা মেলে বৃহৎ সময়খণ্ডের জলস্তরকে ছুঁয়ে দেখে। শহরের লাগোয়া ঘাটগুলো দেখেছে কত সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, মানবজীবনের উত্থান-পতন, হাহাকার, বঞ্চনা ও পরিবর্তন। এসবের মধ্যেই ঘাটে ঘাটে মেঘ ও রোদ্দুর নিত্য খেলে যায়। নিত্যনতুন ভাঙাগড়ায় নদীতীরের পাথর বাঁধানো ঘাট তবু নীরব দর্শক।

সময়টা অষ্টাদশ শতাব্দী। একদিকে বর্গী আক্রমণ, আবার অন্যদিকে নবাবী শাসনের পতনকাল। বাংলার এক করুণচিত্র তুলে ধরলেন কবি ভারতচন্দ্র, অন্নদামঙ্গলে। চারিদিকে তখন লুঠতরাজ আর অরাজকতা। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তৎকালীন বাংলায় এল এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। কবি রামপ্রসাদ সেন অন্নদাত্রী মায়ের কাছে গাইলেন–
‘অন্ন দে, অন্ন দে, অন্ন দে মা অন্নদা।
জানি মায়ে দেয় ক্ষুধায় অন্ন।’
ক্ষুধার্ত মানুষ এক মুঠো আহারের জন্য পথে পথে ঘুরছে। দেবীর কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছে। মন্বন্তরের পর ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে জমির পরিমাপক ও আমিন বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী বাগবাজারের গঙ্গাতীরে একটি অন্নপূর্ণা মন্দির নির্মাণ করলেন। মন্দির-সংলগ্ন ঘাটটিকে লোকে বলত অন্নপূর্ণার ঘাট। সেই ঘাটের প্রতিটি ধাপে শহরের নানা কথা আজও জমে আছে।

সেকালে বাগবাজারে গঙ্গার ধারে ছোট-বড় নৌকা, সাহেবি জাহাজ আসা-যাওয়া করত। অন্নপূর্ণার ঘাট ছিল ব্যস্ত আর প্রাণবন্ত। সেখানে চাল, কাপড়, মশলার ব্যবসা চলত। পাশাপাশি অঞ্চলটিতে ব্যবসায়ীদের বাড়িতে ধর্মীয় উৎসব ও সামাজিক আচার লেগেই থাকত। নদীপথই ছিল ব্যবসায়ীদের যাতায়াতের মাধ্যম। বাবুদের বাণিজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে মন্দিরে হত পুজোপার্বণ। কথিত আছে, মন্বন্তরের পর বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী একাধিক মন্দির নির্মাণ করেন। অন্নপূর্ণা মন্দিরটি আজকের বাগবাজার ঘাটের একেবারেই পার্শ্ববর্তী ছিল। তাই মন্দিরের নাম থেকেই ঘাটের নামকরণ হয় ‘অন্নপূর্ণা ঘাট’।

ঐতিহাসিক সূত্রে, ঘাটটি আদতে ছিল ‘রঘু মিত্রের ঘাট’। সেই ঘাটেরই নামকরণ অন্নপূর্ণা হয়। রঘু মিত্র ছিলেন ‘ব্ল্যাক জমিদার’ গোবিন্দরাম মিত্রের পুত্র। সেই মন্দিরটি আজ সময়ের আবর্তে বা অবহেলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আবার কারও মতে, মন্দিরের নাম পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল। শহর ও বাংলার বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী সব মন্দির স্থাপত্যের করুণ পরিণতি সেদিকেই নির্দেশ করে। তাদের জৌলুস কমেছে। বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক ও গবেষক আচার্য সুকুমার সেন অন্নপূর্ণা দেবীকে মূলত রাঢ়-বঙ্গের দেবী বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, অন্নপূর্ণা ঘাটে চালের ব্যবসা হত। নৌকা করে বিভিন্ন জায়গা থেকে বস্তায় ভরে চাল আসত। হেস্টিংস এককালে এই বিষ্ণুরাম চক্রবর্তীকে ৫২ বিঘা জমি দান করেছিলেন। জমিজমা, মন্দির ও ঘাট নিয়ে তাঁর বিরাট প্রতিপত্তি গড়ে ওঠে।
সুকুমার সেন মহাশয় অন্নপূর্ণাকে গ্রিক ও রোমান দেবী ‘অন্নোনা’র রূপান্তর হিসেবেও গণ্য করেন। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মহাদেব কাশীতে অন্নপূর্ণা পুজো শুরু করেছিলেন। বাংলায় এই পুজোর ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। অন্নদান সর্বশ্রেষ্ঠ দান। শিবকে ভিক্ষাদান করেন দেবী অন্নপূর্ণা–
‘অন্নপূর্ণে সদাপূর্ণে
শংকর-প্রাণবল্লভে
জ্ঞানবৈরাগ্যসিদ্ধ্যর্থং
ভিক্ষাং দেহি নমস্তুতে’
লোক মতে, নদিয়ার রাজা ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় এই পুজোর প্রচলন শুরু করেন। দেবীর কৃপায় ভবানন্দ জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ১৪টি পরগনার ফরমান পেয়েছিলেন। রায়গুণাকরের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের প্রভাবেই বাংলায় পুজোর প্রসার ঘটেছিল। আজকে বাগবাজার অঞ্চলটি জুড়ে বিখ্যাত কয়েকটি অন্নপূর্ণা পুজো হয়। তারমধ্যে বাগবাজারে লক্ষ্মী দত্ত লেনে দত্ত বাড়ির অন্নপূর্ণা পুজো। স্বয়ং সারদা দেবী পুজো উপলক্ষে দত্তবাড়িতে এসেছিলেন। বাগবাজারের বিখ্যাত নাট্যকার অমৃতলাল মুখোপাধ্যায় ওরফে বেলবাবুর স্ত্রী বামাসুন্দরীর অন্নপূর্ণা মন্দিরটি আজও পুরনো স্মৃতি বহন করছে।

রঘু মিত্রের ঘাট বা অন্নপূর্ণা ঘাটের কথা ১৭৮৪ সাল থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত কোম্পানির কলকাতা ম্যাপে পাওয়া যায়। তারপর বিভিন্ন সময়ে আর সেই ঘাটের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তবে অনুমান করা হয়, বাগবাজার ঘাটের কাছে সেই জায়গাটি ছিল। আজ সেটি হয়তো অন্য ঘাটের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। খুঁজে বের করা কঠিন।
এককালে ঘাটটির সঙ্গেই ছিল কত রূপ, কত বর্ণ, কত ধরনের মানুষজন। পুরনো গাছের সারি। থাকত পাখিদের কলতান। গঙ্গা পেরিয়ে আজ আর মানুষজনকে জীবিকার টানে চাল বোঝাই করে যেতে হয় না। স্মৃতিমাখা ঘাট– স্মৃতির সোনা হয়ে জমে থাকে। চতুর্দিকের কোলাহলের মাঝে তার শান্ত ও স্নিগ্ধ অবস্থান ঐতিহ্য অনুসারী।
…………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন মুকুট তপাদার-এর অন্যান্য লেখা
…………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved