

আমার কাছে কাশবন মানে অঞ্জন দত্তর মতো একা একটা আস্ত গিটার, তাল কেটে যাবার পরেও, আঙুল কেটে যাবার পরেও, যে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলতে পারে। টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইনে কল করে, কল ব্যাক করে, আমি আমার কাশবনের কথা বলতে পারি। ফড়িঙের মতো ঊড়ে বেড়াতে পারি আমার কাশবনকে ঘিরে।
কাফকা ফুলের পোকা। যখন আমার মাথায় নড়েচড়ে। তখনই আমার হেমন্তকাল।
অথচ আমি যেতে চেয়েছি শরৎকালের বিবাগী বন্দরে। লিরিক্যাল তাই আমার ব্যালাড– তাসের ঘরের ভেঙে পড়ার মতো দৃশ্যটা। হেমন্তের সুরেই আমার শরৎ ফুরুৎ করে উড়াল দেয়। জড়তা খুলতে থাকে। যেমন করে খোলে মহাকালের জটা।
পরোটার মতো ত্রিকোণ লাগে যেখান থেকে নদীটাকে, সেখানে কাশফুলের গল্প গোপন থাকে না। সাইকেল এসে জমা হয়। স্কুটি আর খালি পা। তিল তিল করে সে বুঝিয়ে দেয় বাতিল একটা আকাশের কথা– যে আকাশ কাশফুলের উড়ো পাপড়ি দিয়ে সাজানো।
জানকী যেবার পুষ্পকের উপর থেকে গয়নাগাঁটি ছড়িয়ে ফেলেছিলেন কলেজস্ট্রিটে। মৈনাক পর্বতের ডানা কেটে গিয়েছিল। বাল্মীকি মুনিকে একটু বেশিই আনমনা আর বিহ্বল লাগছিল। আমি সেই যুগেও এমনই কাশ হয়ে ফুটেছিলাম অন্য কোনও অদেবমাতৃকের চরে।
চড়ে বেড়ানো হাঁসছানা দেখার মতো আনন্দ। সে ফুর্তি একটা বয়স আরেকটা বয়সকে বিক্রি করে দিচ্ছিল। এটা দেখার পর আমি কবীর সুমনের গান শুনেছিলাম। দেখেছিলাম, আমার চোখে একটা ৪০ ভোল্টের চশমা চেপে বসে আছে। ৩৩ বছরের বোঝাটা ছিল গীতিকবিতা। আর ৪০ পেরনো বয়সে তা হয়ে যায় চালসে প্রবন্ধ। সেখানে আর কথার দ্বিধাথরথর চূড়ায় সাতটা অমরাবতী ভর করে না। সেখানেও কেউ কথা রাখে না। কথার পায়ে কাচ। ক্রাচ।
স্ক্রিনটাচ আকাশ স্ক্রল করার জন্য আমাদের তবু একটা নদীমাতৃক কাশবন সঙ্গে থাকলে মন্দ হয় না। সেখানে থরেবিথরে সাজানো রয়েছে সাতটা সমান্তরাল বিশ্ব। সেই সাতটাই স্ক্রল করতে হবে। অথচ যেখানে মেঘে ঢাকা দুর্গা দিদি আর ফিরে আসবে না, অপুদের সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার হেঁপো দৌড় কাশবনে এসেই থামবে। বিধবা নদীর অনেক দূরে আবছা যে নৌকাটা কাঁপতে কাঁপতে চলে যাবে– তার মাঝির নাম ঋতুপর্ণ ঘোষও জানতে পারেন না। ডাক দেয় রেনকোট।

ভোরের দিকে কাশফুল কুড়োতে আসে কতকগুলি বিদেহী রেনকোট। কবি সেই রেনকোটদের গল্প কুড়োতে কুসুমপুরের অপূর্ব ভোর এঁকে ফেলেন। পশ্চিমের আকাশে হাসুলির মত চাঁদ। পূর্বে জবাকুসুমশঙ্কাশং সূর্য। অদূরেই একটি বোবা মসজিদ। তার চারপাশেও কাশ ফুটেছে। ঝক্কাস!
কাশ বলতে চাষ আর আর চাষ বলতে রামপ্রসাদ বুঝি বলেই ঘাসের সঙ্গে অহৈতুকী যোগ আমার আছেই। কাশও তো একজাতীয় ঘাসই। তবু সব ঘাস কাশ হয় না। কাশ হতে গেলে ঘাসের হয়তো সেরকম কিছুই লাগে না। শুধু সাধনা লাগে। সেপ্টেম্বরের মন-কেমনের হাওয়া লাগে। অক্টোবরের বাঁশি লাগে। আর না শোনা সেই সানাইয়ের অপেক্ষা লাগে, যা বিসমিল্লা বাজান। পাকস্থলী আমাদের যেদিকে দিনরাত নিয়ে যায়, সেখানে কাশ আর ঘাসের দু’ নম্বরের পার্থক্য লিখলেই চলে, কিন্তু যে বন্দরে জ্যোৎস্না এসে বৈঠা বায়, সবুজ কাশের দেশ যখন যে চোখে দেখে, তখন তো আর ছয় আর পাঁচে এগারো, হাতে থাকল এক বললে চলে না। যা বলার তা না-বলা দিয়েই বলতে হবে। অডিও কাজ করছে না, ভিডিও চলছে। সেখানে সোনার তরীর বিনির্মাণ– জীবন দেবতা এলেন, সব কাশ তুলে নিলেন টাইটানিকে, বললাম আমাকেও নিন, আমাকে শূন্য কাশবনে রেখে চলে গেল সোনার টাইটানিক।
টাইটানিক বলতে আমি কোনও কোনও মানুষকেও বুঝি। সন্ত টাইটানিক হলেন কবীর। ফকির টাইটানিক হলেন লালন। বাউল টাইটানিক হলেন শাহ্ আব্দুল করিম। আমার খেলনা নদীগুলোয় আমি এরকম অনেক টাইটানিক সাজিয়ে রেখেছি। ওই টাইটানিকগুলো ডুবেছে বলেই আমি এখনও ভেসে আছি। আর আমার উপর ভেসে আছে স্মৃতির শ্যাওলা।

কাশবনের স্মৃতি বলতে এরকমই পরাবাস্তব উঠোন। সাঁকোর উপর থেকে দেখা জলের জিলিপি। লিপি আবিষ্কারের অনেক আগের আলতামিরায় সেই সব আমি ছুঁয়ে এসেছি। এই পৃথিবীর ফোটা প্রথম কাশই আমার প্রথম ক্রাশ। ক্যান্ডিক্রাশের মতো তখনও আমি গিরগিটি হয়ে যাইনি, তবু বহুরূপে সামনে এসেছে কাশবন। কৈশোরের কাশবন মানে একটি পুরুষ সাইকেলের পিঠে আর একটি মহিলা সাইকেল পিঠ ঠেকিয়ে পড়ছে জসীমুদ্দিনের নকশী কাঁথার মাঠ। যৌবনের কাশবন মানে শিলং পাহাড় থেকে শুনছি ‘হে বন্ধু বিদায়’। আরও একটু বুড়িয়ে গেলে শুনছি পডকাস্টে প্রিয় বন্ধু। অঞ্জন দত্ত।
আমার কাছে কাশবন মানে অঞ্জন দত্তর মতো একা একটা আস্ত গিটার, তাল কেটে যাবার পরেও, আঙুল কেটে যাবার পরেও, যে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলতে পারে। টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইনে কল করে, কল ব্যাক করে, আমি আমার কাশবনের কথা বলতে পারি। ফড়িঙের মতো ঊড়ে বেড়াতে পারি আমার কাশবনকে ঘিরে। ড্রোন থেকেও পারি, মন থেকেও পারি আমি আমার কাশবনকে ধরে রাখতে। টেলিগ্রাম, টেলিফোন, টেলিপ্যাথি সমস্তটা নিয়েই তার প্রকাশ। অপ্রকাশও।
স্লাইড শো। ততক্ষণই জীবিত যতক্ষণ সে ভেসে চলে। কিন্তু যখন সে মৃত, তখনও এক আশ্চর্য চিত্রনাট্য রেখে যায় সে। বলে দুই বন্ধুর গল্প। এক বন্ধু শ্মশান। আরেক দোস্ত কবর। শ্মশান বলেছে তার চিতা কাশগাছ দিয়ে সাজাতে। কবর বলেছে তার মাটিতে কাশফুল ফোটাতে। পাশে খোলা থাকবে কাফকা কবীর লালন শাহ্ আব্দুল করিম। কাছেই আড্ডা দেবে দুই বন্ধু সুমন ও অঞ্জন। উড়ে আসবে বাল্মীকির শ্লোক। ককিয়ে ঊঠবে বোবা মসজিদ। ভেসে ঊঠবে টাইটানিক। উদোম পায়ে ছুটবে নকশি কাঁথার মাঠ। আর মহিলা সাইকেলটি উঠে দাঁড়িয়ে পুরুষ সাইকেলকে চলতি হাওয়ার পন্থী করে নেবে।

ভোরের আকাশ। নদীর পশ্চিমে আশিক চাঁদ, পূর্বে ভানু (সিংহের পদাবলি)। নদীটাকে সানাই করে বাজাচ্ছেন বিসমিল্লা।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved