Robbar

অন্য জাতের গান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 21, 2026 7:37 pm
  • Updated:July 21, 2026 7:38 pm  

বাংলা গানের নাম না কি ‘দেয়ালি পি’– দেওয়ালে পেচ্ছাপ। কার পেচ্ছাপ? বোহেমিয়ানের, অর্থাৎ প্রথাবিরুদ্ধ সন্তানের– যে ‘যন্ত্রণা প্রজাতির ছেলে’। যে পরপ্রজন্ম, উঁচু জাতির প্রতি– বাধ্য, বশ্য, অনুগত নয়। সে ফুটপাথের বাসিন্দা, অর্থাৎ প্রান্তিক। কেন এই পেচ্ছাপ? নির্যাতনের যন্ত্রণা নিভিয়ে আত্মপ্রত্যয় জ্বালাতে এবং জোগাতে। এ প্রত্যয় প্রতিরোধের স্বার্থে– ঘাড়ের ওপর মাথা যাতে থাকে উঁচিয়ে; দৃষ্টি থাকে উদ্ধত। 

শ্রীদীপ ভট্টাচার্য

স্পর্শ কেন কাতর? ছুঁলে কেন জাত যায়?

‘স্পর্শ’ খুবই কাতর। দেখা, শোনা আর বোঝার মধ্যে অনুভবের আশ্লেষ থাকলেও, তারা ছোঁয়াচ-মুক্ত। ‘স্পর্শ’ শারীরিক। দৃষ্টি যেমন অসীম। বস্তু, প্রকৃতি, শহর বা মানুষের দিকে চেয়ে থাকাটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনও সীমা লঙ্ঘন করে না। আর করলেও, সেই দেখার অধিকার থেকে বিরত করতে গেলে, প্রয়োজন হয় আড়াল বা দেওয়ালের। যা দেখা যায়, বা যাচ্ছে, সেটা দেখে নেওয়াটা অপরাধ নয়। আর সেটা অপরাধ হলেও, তার বিচার এবং শাস্তির পথ দুর্গম। তাই যা দৃশ্যত– তা চোখ খুলে; চোখ আধো-খুলে; বুক চিতিয়ে; সংকোচে বা অনুতাপকে সঙ্গে করে দেখাই যায়। একইভাবে, যা শোনা যাচ্ছে, তাকেও শুনে নেওয়া যায়, কান পেতে, চুপিচুপি বা অন্য কাজ করতে করতে। যে বা যারা শোনাচ্ছে, ইচ্ছাকৃতভাবে না অনিচ্ছা সহকারে, তারা অভিযোগ করলে, বলাই যায়: আরও আস্তে বললেই হত– এত মাথাব্যথা থাকে যদি, অন্যের শুনে ফেলা নিয়ে।

অবশ্য এ যুক্তি স্পর্শের ক্ষেত্রে একেবারেই খাটে না। অন্য সকল ইন্দ্রিয়– চোখ, কান, নাক, জিভ– চাইলে বন্ধ করা যায় বা সংকুচিত করা যায়। ছুঁলে, ছোঁয়াকে অবরুদ্ধ করা অসম্ভব। এক ব্যক্তি, শারীরিকভাবে উপস্থিত আছে বলেই তাকে ছুঁয়ে দেওয়া যায় না– তার ইচ্ছে বা অনিচ্ছেকে অবজ্ঞা করে। স্পর্শের কামনাকে হতেই হবে উভয়ত। কেউ ছুঁলে ছোঁয়াকে এড়াব কীভাবে? আপত্তি দিয়ে বা তাকে অস্বীকার করে? আর সেই আপত্তি অন্য ব্যক্তি না মানলে? যৌন উত্তেজনা হোক বা শারীরিক নির্যাতন– তার মাধ্যম ‘ছোঁয়া’ বা ছোঁয়ার বিভিন্ন রকমভেদ। তাই ‘স্পর্শ’ খুবই ‘কাতর’, ‘সূক্ষ্ম’ এবং ‘সংবেদনশীল’ এক ক্ষেত্র। তা দাবি করে সচেতন সম্মতি। তা না থাকলে, সেটি উল্লঙ্ঘনের পর্যায় পড়ে। সেই উল্লঙ্ঘন অপরাধ। যদিও তার অনেক ব্যতিক্রম আছে। আর সেই ব্যতিক্রমগুলিই স্পর্শ-কেন্দ্রিক ক্ষমতার আস্ফালনের কেন্দ্র। যেমন, ছুঁয়ে দিলে জাত যায়, আবার মরে গেলেও জাত যায় না। কী অদ্ভুত তাই না! এক সেকেন্ডের ছোঁয়াতে জাত যাওয়ার মতো ঠুনকো ব্যাপারের অবসান নেই মৃত্যুতেও। 

শিল্পী: মাইকেল অ্যাঞ্জেলো

নিচু জাতের ছোঁয়া, অপবিত্র করে এসেছে উঁচু জাতের সমস্ত শরীর, খাবার, বাড়িঘর, এলাকা, ইজ্জত ও আরও কত কী! অথচ উচ্চতার ক্ষমতা ও দম্ভ প্রদর্শন করতে যখন তথাকথিত নিচু জাতের মহিলাদের ধর্ষণের স্বীকার হতে হয়– সেই কার্যে তেমন কলুষিত হয় না সবর্ণ পুরুষের শরীর, পৌরুষ বা অতৃপ্ত কামনা। বরং তা গৌরবান্বিত হয়, এমনই ক্ষমতাশালী ধর্ষক মনে করে থাকে। এমনই পরিহাস, ছোঁয়া অপবিত্রতার সূত্র হলেও, উচ্চ জাতের পবিত্রতার প্রত্যাবর্তনের জন্য স্নান, জল, গঙ্গাজল, আগুন, মন্ত্র ইত্যাদি প্রচুর সমাধান রয়েছে। অথচ কয়লার কালোর মতো যতই ঘষো না কেন, নিচু জাতের অপবিত্রতা যাওয়ার নয়। ওরা নোংরা তাই ওরা নোংরা কাজ করবে; অন্যভাবে দেখলে, ওদের দিয়ে নোংরা কাজ করানো হয় বলে ওরা নোংরাই থেকে যাবে। আমরা সমস্ত পরিষ্কার, প্রয়োজনীয়, পুরস্কারযোগ্য, প্রশাসনিক কাজ– আমাদের দখলে রেখেছি বলে, আমরা পবিত্র। ছোঁয়াকে অতিক্রম করা যায় না; তাই জাতকেও অতিক্রম করা যায় না। জাতকে আরও আরও অচ্ছুৎ করা যায়। সামাজিকভাবে অগ্রাহ্য ও আর্থিকভাবে বঞ্চিত করে রেখে দেওয়া যায় তাদের দূরে সরিয়ে রেখে– তাদের প্রতি নিস্পৃহতা বা অবিচার জারি রেখে। 

আরও অপমানিত, অবমানিত ও নির্যাতিত করার অন্যতম পন্থা তাদের শরীরে, জমিতে, বাড়িতে– মূত্র, ময়লা, মৃতদেহ ফেলে অপবিত্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি। তাদের জানিয়ে, বুঝিয়ে, দেখিয়ে দেওয়া– তাদের সামাজিক অবস্থান ও স্তরবিন্যাসের কতটা নিচুতলে তাদের বাঁচা; এবং সেই বাঁচা কাদের কৃপায় ও উচ্ছিষ্টে। ‘আমরা-ওরা’, ‘আমাদের-ওদের’– এই ধারণা ও সত্তার নির্মাণ ও নির্ধারণে– ছোঁয়া বা না-ছোঁয়ার মাধ্যমে অন্তরঙ্গতা ও দূরত্ব বজায় রাখার প্রতিনিয়ত সামাজিক কৌশলের ভূমিকা অপরিসীম। যাকে ছোঁয়া যায় না বা ছোঁয়া উচিত নয়– সে নিম্ন, লাঞ্ছিত, পতিত বা আগের জন্মের ঘোর পাপী। 

যন্ত্রণার প্রতিবাদ পেচ্ছাপ

এইটুকু ভূমিকার প্রয়োজন ছিল একটা গান আলোচনার আগে। গানটি সাত বছর আগে প্রকাশিত হলেও, আমার কানে এসেছে এক মাস আগে। সেই থেকে অগুনতিবার শুনেছি। এখনও শুনে যাচ্ছি। সুমন-অঞ্জন-নচি-শিলা-চন্দ্রবিন্দুর কৃপায় বাংলা গানে অভাবনীয় সব স্থান, সামগ্রী ও চরিত্রেরা এসেছে। এসেছে এমন সব সাধারণ মানুষজনের জীবনের আখ্যান যা আগে গানের উপাদান বলে গণ্য হত না। এসেছে এত এত টুকরো নির্দিষ্ট মুহূর্ত ও দৃশ্যকল্প, যা কাব্যময়, কিন্তু সেকেলে লিরিকাল হৃদয়-আকুতি বর্জিত। রিকশাওয়ালা, বাস কনডাক্টর, লরির হেল্পার, পাগল, কেরানি, শিশু-ভিখারি, পাশবালিশ, পাজামা, প্লাস্টিকের শিশি, প্লাস্টিকের ঘড়ি, ঘুড়ি, চশমা, চালশে, বটগাছ, রাতের কাস্তে, ঘিঞ্জি ঘেরাটোপ, ভুলে থাকার শহর, ব্রিগেডের মিটিং, মজদুরের ঘাম, ন’টার ঘড়ির শাসন, নদীর ছলাৎছল, ফিঙে, ছোট্ট মেয়ের নামতা পড়া, আত্মহত্যা, বোমা, লক-আউট, মস্তানি, বেকারত্ব, বেশ্যার দর, পেসমেকার, বৃদ্ধাশ্রম… এ তালিকা সুদীর্ঘ। সাম্প্রতিক, দৈনন্দিন ও শহুরে অস্তিত্বসংকট নিয়ে এই বৈপ্লবিক লিরিকাল জোয়ার আর কোনও ভারতীয় ভাষায় হয়েছে কি না সন্দেহ আছে; হিন্দিতে তো নিঃসন্দেহে নয়। বাংলা আধুনিক গান সমৃদ্ধ হয়েছে; ব্যাপ্তি পেয়েছে; কিছু মাত্রায় সে মুক্ত হয়েছে চিরন্তন শাশ্বত প্যানপ্যানে, ঘ্যানঘ্যানে, এলিয়ে পড়া বিরহ-কাতরোক্তি থেকে এবং লতাপাতা জোনাকির অসহ্য গেঁয়োপনা থেকে। শিরদাঁড়া সোজা করে, সে তার সময়কে এবং সেই সমাজের আশা-হতাশাকে গাইতে শিখেছে। 

বাংলা গানের ফুটপাথ বদল। ছবি: বিশু চট্টোপাধ্যায়

কিন্তু নব্বই-উত্তর গানের বিষয়গত এত ভিন্নতার মধ্যেও, স্বভাবতই বাদ গিয়েছিল একটি বিষয়– যা নিয়ে সবর্ণ বাঙালি অসচেতন। তা হল জাতপাত। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত কল্পনা, প্রগতিশীল শ্রেণি-সংঘর্ষের স্বপ্নে আপ্লুত হয়ে, লিঙ্গ-সাম্যের সম্প্রচারে শান দিয়ে– এতটাই অন্ধ যে তারা ভেবে নিতে পছন্দ করে: জাতিভেদ বাংলায় বিরাজমানই নয়। সবর্ণের প্রতাপে, মননে, চেতনায়– নিচু জাতির কোনও অস্তিত্ব নেই। তাহলে, তার প্রতিফলন গানে আসবে কী করে? তথাকথিত ‘জীবনমুখী’, তাই জীবনের বহু সমসাময়িক, সাধারণ, দৈনন্দিন জীবনবোধকে ছুঁয়ে গেলেও– জাতির জায়গায় নিশ্চুপ। কারণ, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি গায়ক ও শ্রোতা জাত-চেতনার ঊর্ধ্বে। 

তাই হয়তো ২০১৯ অবধি অপেক্ষা করতে হল, ফসিল-এর ‘দেয়ালে পেচ্ছাপ’ নামক গানটির জন্য। নামও দিয়েছে বলিহারি। বাংলা গানের নাম না কি ‘দেয়ালি পি’– দেওয়ালে পেচ্ছাপ। কার পেচ্ছাপ? বোহেমিয়ানের, অর্থাৎ প্রথাবিরুদ্ধ সন্তানের– যে ‘যন্ত্রণা প্রজাতির ছেলে’। যে পরপ্রজন্ম, উঁচু জাতির প্রতি– বাধ্য, বশ্য, অনুগত নয়। সে ফুটপাথের বাসিন্দা, অর্থাৎ প্রান্তিক। কেন এই পেচ্ছাপ? নির্যাতনের যন্ত্রণা নিভিয়ে আত্মপ্রত্যয় জ্বালাতে এবং জোগাতে। এ প্রত্যয় প্রতিরোধের স্বার্থে– ঘাড়ের ওপর মাথা যাতে থাকে উঁচিয়ে; দৃষ্টি থাকে উদ্ধত। কার দেওয়ালে এই মূত্রত্যাগ? উঁচু জাতের দেওয়ালে– ‘আমি হেঁটে গেলে গোবর জলে উঠোন ধুত’ যারা। যে উঁচু জাত, যারা একদিন তাদের গায়ে মুতেছে; তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ। এ পেচ্ছাপ বিদ্রোহী। ছেঁড়াফাটা জিন্সের জিপার খুলে এই পেচ্ছাপের মধ্যে দিয়ে আগের ও বর্তমান প্রজন্মের প্রতিনিধিরা তাদের জমানো যন্ত্রণা ভাগ করে নিচ্ছে ‘হিসু, আহ্লাদে’। চুকিয়ে দিচ্ছে ‘অপমানের সব ঋণ’। যন্ত্রণা প্রজাতির ছেলে, এই প্রতিবাদী ও প্রতিঘাতী মুহূর্তে একান্তভাবে তার মৃত বাবাকে পাশে ভেবে, তাকে আহ্বান জানাচ্ছে হাত ধরতে ও এই প্রথাভঙ্গকারী ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে; নিষ্কৃতি পেতে। এই প্রতিবাদী কল্পনালোকে তারা ডরভয়হীন ও অশালীন–  সিটবেল্ট বর্জিত সওয়ারি। 

আমি মারা গেলে বাবা তুলে নিক মৃতদেহ
যেমন একদিন আমি তার মৃতদেহ কাঁধে,
রাস্তায় নেমে রুমালে বেঁধেছিলাম মাথা
যেন যন্ত্রণা কষে ব্যান্ডেজখানি বাঁধে,
ব্যান্ডেজ বাঁধে।

দুই মৃতদেহ পটি-পেচ্ছাপ মাখামাখি
হয়ে পড়ে থাক, বাবা আর ছেলে পাশাপাশি,
দেওয়ালির বাজি-সম আমাদের পেচ্ছাপে
সাদা ফেনা কেটে খেলা করে অভিশাপ রাশি।

এই সৃজনশীল মৌলিক আচরণে বাপ-ছেলের আক্ষরিক জীবনমরণ বিলীন হয়ে নির্মিত হয়েছে যন্ত্রণা-বিরোধী একাত্ম হওয়ার সুর; নিরাময় প্রক্রিয়া খোঁজার আশ্বাস। শুনতে পাই সংহতির উচ্ছ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা। বেঁচে থাকার ঋণ চুকচ্ছে এই প্রতিবাদী প্রথাবিরুদ্ধ ক্রিয়া– যার কোনও পূর্বনির্ধারিত স্বরলিপি বা শিলালিপি নেই। এই অরাজকতা চিরাচরিত সামাজিক স্তরবিন্যাসের বিরুদ্ধে আঘাত– ‘শনি সংকেত ছাপা আছে’। 

এই গানের সব থেকে ক্ষমতাশালী পঙ্‌ক্তি উচ্চারিত হচ্ছে ঠিক এর পরেই: ‘ওই পেচ্ছাপ হাসে তোর সাবানের স্বাদে’। শুরুতে ছিল অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা: ‘বাজির মতোই পেচ্ছাপ বেরচ্ছে ছুটে, বার্বিকিউতে চিড়বিড় শব্দ হয়’। সেই রাগ পরিণত হয়েছে, প্রবাহিত হয়েছে– সাবানের স্বাদকে বিস্বাদ করতে। সাবান মানে সবর্ণ সভ্যতা ও পবিত্রতার প্রতীক। উচ্চবর্ণীয়, উচ্চশ্রেণীয় পরিচ্ছন্নতার প্রবণতার প্রতি বিদ্রুপ লিখিত হচ্ছে পেচ্ছাপের তুলিতে। পেচ্ছাপে রয়েছে বহু প্রজন্মগত অপমানের সম্মিলিত সামাজিক স্মৃতি যা একসময় বা এখনও নিক্ষেপিত হয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে– নিম্নবর্গের মানুষকে তার আওকাদ বোঝাবার জন্য। এই কল্পিত পেচ্ছাপের প্রবাহ উল্টোমুখী। তাগ করা সেই তুলির টানে, সহস্র বছরের যন্ত্রণা কিছুমাত্রায় নিষ্কৃতি লাভ করছে, যদিও হয়তো নিরাময় এখনও বহু দূরে। তবে সেই তুলির টান, ভাঙা কাচ পেরিয়ে, শুকনো গোলাপ সংগ্রহের সম্ভাবনায় ভরপুর।