Robbar

আইসক্রিম ডল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 10, 2026 8:27 pm
  • Updated:January 10, 2026 8:27 pm  

বাড়িতে বন্ধু আসায় নিষেধ নেই। তবে বন্ধুর রান্না মীনা মাসি করে। মা নয়। মা শুধু আমার রান্না করে। তাই বন্ধুর পাতের খাবার আর আমার পাতের খাবার আলাদা। দেখতে অনেকটা এক। কিন্তু স্বাদ নিশ্চয়ই আলাদা। দু’জন একই খাবার রাঁধলেও স্বাদ আলাদা হতেই হবে। এক মাংস এক মশলা, রংও এক। তবু স্বাদ আলাদা। সবটাই আন্দাজে বুঝি। কারণ বন্ধুর পাতের খাবার একটুও চেখে দেখার জো নেই। মা পাশে মিষ্টি হেসে দাঁড়িয়ে থাকে। একচুলও নড়ে না।

সুবর্ণা মণ্ডল

আমার মা আমার ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠার গল্প খুবই অদ্ভুতভাবে বলে।
‘যে বছর আমরা প্রথম ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়িতে উঠলাম… রুমি তখনও ভাত দলা পাকাতে শেখেনি …’
‘ভালো স্কুলের খোঁজ চলছে যে বার? হ্যাঁ, ওই তো! একদিন দেখি সুন্দর গোল একগ্রাস নিখুঁতভাবে মুখে তুলল।’
‘পক্স হল আমার যে বছর… মনে নেই? রুটি ছিঁড়তে শিখেছে সবে। রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজে যত না খায় বারান্দায় পাখির উদ্দেশ্যে ছড়ায় বেশি।’
‘ওর মাসি কলেজে ভর্তি হল যেদিন… বাবা! রুমি প‌্রথমবার দুটো ভেজিটেবিল চপ খেল!’

আমার মা আমার বড় হওয়া বোঝে আমার প্লেটে ভাতের পরিমাণ দেখে, খাবার টেবিলে আমার বসার কায়দা দেখে। হাতে কাঁটা চামচ ধরতে পারি কি না দেখে। জলের গেলাসে আমার আঙুলের ছাপের আবছা আকার দেখে। মায়ের রান্না চেটেপুুটে খাওয়া আর আমার বেড়ে ওঠার মধ্যে এক অদ্ভুত যোগ খুঁজে পায় মা। পেটের ভেতরে পুষ্টির চিন্তা ছিল না। পেটের বাইরে তো নানা বিপদ। নানা লোভ। নানান বিষ।

স্কুলে বাইরের খাবার কিনে খাওয়া বারণ। আচার, ফুচকা বা আলুকাবলি সব মা বানিয়ে দেয়। টিফিন হরেক রকম হয়। পনির পরোটা, দোসা বা এগরোল বা কখনও রুটির সঙ্গে সাদা আলুর তরকারি। বন্ধুদের সঙ্গে ইচ্ছে হলেও টিফিন ভাগ করা বারণ। সবটা নিজেকে খেতে হবে। মায়ের রান্নার ভাগ অন্য কাউকে দেওয়া বারণ। আবার ইচ্ছে হলেও ফুচকা চুরমুর খাওয়া যাবে না। কারণ পকেট শূন্য। মেয়ে এখনও ছোট। সবে তো ক্লাস ফোর। ফোর ফাইভের ছাত্রীর হাতে আবার টাকা কীসের?

জয়পুর গেলাম একবার। বাবার বন্ধু হাতে ১০০ টাকা গুঁজে দিলেন। আমি তো অবাক। ১০০ টাকা! কী করব কী খাব– এই ভেবেই ট্রেনে রাতে ঘুম এল না। ঘুম না আসায় দেখলাম অন্ধকারে মা আমার ছোট ব্যাগ থেকে ১০০ টাকার নোটটা সরিয়ে নিল। পরের দিন কলকাতা ফিরে পুতুল কিনে দিল। সেই পুতুলের আবার গোলাপি চুল। তার নাম নাকি আইসক্রিম ডল। নরম। তুলতুলে। গোলগাল। ১০০ টাকার দামি পুতুল। পুতুল পেয়ে চোখ ফেটে কান্না এল প‌্রথমবার। ১০০ টাকার বাইরের আইসক্রিম খেয়ে ফেললে মায়ের তৈরি ডিপ ফ্রিজে রাখা ভ্যানিলা আইসক্রিমটা কে খাবে?

বাড়িতে বন্ধু আসায় নিষেধ নেই। তবে বন্ধুর রান্না মীনা মাসি করে। মা নয়। মা শুধু আমার রান্না করে। তাই বন্ধুর পাতের খাবার আর আমার পাতের খাবার আলাদা। দেখতে অনেকটা এক। কিন্তু স্বাদ নিশ্চয়ই আলাদা। দু’জন একই খাবার রাঁধলেও স্বাদ আলাদা হতেই হবে। এক মাংস এক মশলা, রংও এক। তবু স্বাদ আলাদা। সবটাই আন্দাজে বুঝি। কারণ বন্ধুর পাতের খাবার একটুও চেখে দেখার জো নেই। মা পাশে মিষ্টি হেসে দাঁড়িয়ে থাকে। একচুলও নড়ে না। বিয়েবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হত ঠিকই। কিন্তু আমার খাবার আলাদা। ওই এক টিফিন বাটি স্টিলের। তবে আমার খাবারও কম কিছু নয়। কখনও ফ্রাইড রাইস, চিকেন। কখনও কিমা পোলাও। বড়দের খাবারের থেকে কম সুস্বাদু কিছু নয় মোটেও। তবে লোভ তো হয়। লোভের আর কী দোষ।

আমার মা খুব সুন্দরী। খুব। একঢাল চুল। কুচকুচে কালো। চোখ দুটোয় কী মায়া। আর হাসি দেখলে মানুষ সব দুঃখ ভুলে যাবে এমন। আমার বন্ধুদেরও খুব প‌্রিয় আমার মা। অবাধ যাতায়াত তাদের আমাদের বাড়িতে। তবে নিয়ম একটাই। কোনও রকম খাবার আনা চলবে না। চিপস-চকোলেটও নয়।

সময়ের নিয়ম মেনে বড় হচ্ছি। ক্লাস সেভেনে উঠেছি। মা এখন আমাকে বিষ দেওয়ার চেষ্টা করে। খাবারে। রোজ। একটু একটু করে। আমি জানি। বুঝি। ক্লাস সিক্সের শেষ থেকেই শুরু হয় এই খেলা। শুধু আমার সঙ্গে নয়। আমার আগের পাঁচ জন ভাইবোনের সঙ্গেও এই একই খেলা খেলেছে মা। সবাই হেরেছে। আমি এখনও হার মানিনি। মা খাবার দেয় আর অপেক্ষা করে। আমি কোন খাবারটা খাচ্ছি আর কোনটা ফেলছি। কখনও গন্ধ শুঁকে বুঝি। কখনও রং দেখে। একদম আর পাঁচটা বাটিতে রাখা মাছের ঝোলের মতোই দেখতে। তাও আমার মাছের বাটি যেন আলাদা। রং যেন একটু বেশি গাঢ়। ডালের মধ্যে মাঝেমধ্যেই যেমন আলমারিতে রাখা বহু পুরনো সুতির জামার গন্ধ। বাকিটা খাই। আর বিষ মেশানো খাবারটা টেবিলে রেখে উঠে পড়ি। সবাই জিজ্ঞেস করে। রাগ করে। বলে, রুমি তুই খুব খাবার নষ্ট করিস। আগে তো সব খেতিস। হঠাৎ কী হল তোর? শুধু মা কোনও প‌্রশ্ন করে না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। রাতে বেসিনে সেই খাবার ফেলে আর কাঁদে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি। চোখের জল আর বেসিনের লাল-হলুদ এঁটো জল বিষ ধুয়ে চলে রোজ।

আমার মায়ের বড় হয়ে যাওয়া সন্তান পছন্দ নয়। ছোটবেলা কেমন পুতুল পুতুল দেখায়। ঠিক যেন আইসক্রিম ডল। আধো আধো কথা বলা। ফোলা ফোলা গাল। নরম তুলতুলে হাত পা আর মসৃণ চুল। আগের পাঁচ জন ক্লাস সিক্স বা সেভেনেই মারা গিয়েছে। সব পেটের রোগে। কেউ বাঁচেনি। একটু বড় হলে যেই চেহারা রুক্ষ হতে শুরু করে, গাল ভাঙে, গায়ের রঙ পালটে যায় অমনি তার যাওয়ার দিন আসন্ন।

বাড়ির আর কেউ এই কথা জানে না। জানার কথাও নয়। কারণ মা যেরকম যত্নে নিজের সন্তানকে ছোট থেকে রাখে সেটা অভাবনীয়। নিজের হাতে জামা সেলাই করা, চুল বেঁধে দেওয়া, খাইয়ে দেওয়া, পড়তে বসানো। আর রান্নার কথা তো আগেই বলেছি। পৃথিবীতে সন্তান ছাড়া আর যেন কেউ নেই। তার সব কিছু জুড়ে শুধুই তার শিশু।

বাড়ির সবাই খুবই স্নেহ করে মাকে। আহা এত যত্ন করে, এত সাবধানে রাখে। তাও একটাও বাঁচে না। কী কপাল মেয়েটার। আমার ছোটবেলাও একইভাবে কাটে। যত্নে। আরামে। আবার খানিক ক্ষোভে। ক্লাস সিক্সের শেষের দিকে একদিন খুব পেটে ব্যথা ওঠে। হাসপাতালে ভর্তি করে বাড়ির লোক। ছ’দিন বাদে ফিরি যখন তখন আমার হাড় বেরনো চেহারা প‌্রায়। চোখ গর্তে। হাতে চ্যানেল করার দাগ। মুখ শুকনো। বাড়ি ফিরে ঘরে শুতে যাই। ঘুমে চোখ আচ্ছন্ন। কানে যেন হালকা শুনতে পাই ‘কম হয়ে গেল। গালে টোল দুটো না থাকলে…’ আমি চোখ খুলে দেখি মা ঝুঁকে পড়েছে। আমার মুখের খুব কাছে। মায়ের নিঃশ্বাস গরম। একঢাল চুল ছায়ার মতো আমার মুখ ঢেকে দিচ্ছে প‌্রায়। বললাম, ‘মা…’ মায়া মায়া দুটো চোখ নিয়ে বলল, ‘রোগা হয়ে গেলি কত। গালের টোলও আর ভালো বোঝা যায় না।’

ওই শ্বাসের গন্ধ পাই আমি মায়ের রাঁধা খাবারে। বছর চারেক পরও। রোজ। মায়ের দৃষ্টি এখন পালটেছে অনেকটা। ঘৃণা আজকাল আর ঢেকে রাখে না সে দৃষ্টি। এখন আর রং গন্ধ বুঝতে হয় না। মা এখন অসহায় প‌্রায়। কোন খাবারটা আলাদা মায়ের বাটির দিকে তাকানো দেখেই বুঝে যাই।

আমিও এখন রান্না ধরেছি। বাড়ির সকলকে রেঁধে খাওয়াতে ভালোই লাগে। সবাই বলে বেশ রাঁধি না কি। একঢাল চুল এখন আমার মাথায়। কুচকুচে কালো। মাসিরা বলে আমার চোখ দুটোয় কী মায়া। আমার হাসি দেখে নাকি সবাই তাদের দুঃখ ভুলে যায়।

ক্লাস টেন সদ্য পাশ করেছি। মায়ের বেশ কিছুদিন ধরে বমি হচ্ছে। ডাক্তার বলল, ‘আবার প‌্রেগনেন্ট’। সবাই বলে, এবার একটা ভাই হলে নিশ্চিন্ত। মা দুর্বল হয়ে পড়েছে বেশ। বেশি বয়সের প‌্রেগনেন্সি তো। আমি রোজ মায়ের কাছে যাই। খাবার খাওয়াই। মা খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে কোন রান্নায় কী ফোড়ন, কীসে ক’চামচ তেল। নুন-মিষ্টি-মশলা নিয়ে চলে গল্প।

মায়ের চোখগুলো আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠছে। মুখ জুড়ে যেন এখন শুধুই চোখ। শরীরটা যেন ছোট হয়ে আসছে। আর পেটটা যেন শরীর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চুল উঠে যাচ্ছে। কী ভয়ংকর হয়ে উঠছে শরীরটা রোজ। আট মাসের শেষের দিকে এক সন্ধেয় মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হল। বাবা, ছোটমাসি আর কাকি ঠিক করল হাসপাতালে নিয়ে যাবে। কাগজপত্র ফাইল সব গোছাচ্ছে সবাই। আমাকে ডেকে পাঠাল মা। বাইরে হালকা আলো তখনও। পাতলা পর্দার ফাঁক দিয়ে কিছুটা আলো ঘরে ঢুকছে। ঘরের কোণগুলো অন্ধকার। মা কাছে ডাকল। গেলাম। বলল, কানটা আমার মুখের কাছে আন। আনলাম। নাগাল পেয়ে নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে আমার টুঁটি চেপে ধরল, ‘তুই না গেলে ও আসবে কী করে! ও ছোট! ও তো ছোট!’

বাইরে বাবা আর কাকি অ্যাম্বুলেন্স ডাকছে। আমি বাবার কাছে গিয়ে জানালাম, ‘আর তাড়াহুড়োর প‌্রয়োজন নেই।’ রান্নাঘরে ঢুকে বিকেলের স্যুপটা বেসিনে ফেলে দিলাম।