

বুর্জোয়াবাদ একাধারে একটি ঐতিহাসিক সত্য। এবং অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক ভুল। কারণ নিজেদের পাড়ার চারদিকে উঁচু ও দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে দিয়ে বুর্জোয়ারাই প্রথম মানবসভ্যতায় একটা ‘বিচ্ছিন্ন সমাজ’ প্রবর্তন করেছিল। বৃহত্তর জনজীবন থেকে এই স্বেচ্ছা পৃথকীকরণই ছিল পৃথিবীর প্রথম বিভেদবাদ। সর্বজনীন বণ্টনব্যবস্থায় অংশ না নিয়ে, নিজেদের মুনাফা শুধু নিজেরাই উপভোগ করার স্বার্থপর মনস্কতা বুর্জোয়াদের বাড়িগুলিকে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সূতিকাগারে পরিণত করেছিল!
পাড়ায় কৌটা ঝাঁকিয়ে বন্যাত্রাণের চাঁদা তুলছিল ছেলের দল! একদম মুখোমুখি পড়ে গেলেও একটা সিকিও ঠেকালেন না তল্লাটের কুখ্যাত কিপটে অনাথবাবু। ব্যাস, পরদিন থেকে তাঁর নাম হয়ে গেলো ‘বুর্জোয়া’! রাজ্যের মেহনতি মানুষের সরকার ‘সহজ পাঠ’ উঠিয়ে দিয়ে রটিয়ে দিল রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া কবি! ‘পেজ থ্রি’ মহলের গুজব আছে, উত্তমকুমারকেও বুর্জোয়া বলে তাড়া করেছিলেন নকশালরা। সত্যজিতের সিনেমায় এক জঙ্গলের কুয়োতলায় খালি গায়ে সাবান মেখে স্নান করতে করতে রবি ঘোষ ঘোষণা করেছিলেন যে, প্রেম-ট্রেম হল বুর্জোয়া ব্যাপার!

অথচ বনিবনা তো দূরের কথা, বাঙালির সঙ্গে বুর্জোয়াদের ‘দূর সে দূর তক’ কোনও সম্পর্কই নেই। বুর্জোয়ারা হল গিয়ে জন্মসূত্রে ফরেনার, ইউরোপের পাক্কা গোরাসাহেব। লিখিত-পড়িত কিছু না-থাকলেও, স্থান-কাল-পাত্র গণনা করে এটা বলাই যায় যে, বাংলায় বুর্জোয়াদের বিধি বাম করে ছেড়েছেন বামপন্থীরাই। তাঁরাই হাটে-বাজারে খাইয়ে দিয়েছিলেন যে, বুর্জোয়ারা নিজেরা গোগ্রাসে খায়, কিন্তু গরিবদের খেতে দেয় না। এই বদনামও অবশ্য রটেছে আরেক সাহেবেরই বিরূপ বদান্যতায়। তিনি কার্ল মার্কস। তিনি রীতিমতো বই লিখে বুর্জোয়াদের ‘ভিলেন’ বানিয়ে ছেড়েছেন। কারণ তাঁরা বড়লোক। আর ‘হিরো’ হলেন প্রলেতারিয়েতরা। তাঁরা সর্বহারা। হিরো আর ভিলেনের এই ‘কল্পিত’ ফাইটটা কাজে লাগিয়েই বামবাদীরা বাঙালিদের মাথা মুড়িয়ে ছেড়েছে। অথচ বেচারা বুর্জোয়ারা তেমন নেতিবাচক কিছু করেননি। বরং ইতিহাস সাক্ষী, বামরা যে বিপ্লবের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন, তেমনই এক জব্বর রেভলিউশনের বাণিজ্যিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। নাম তার ‘ফরাসি বিপ্লব’। আর বুর্জোয়াদের বাড়ি ছিল ওই ফ্রান্সেই। আর সেই দেশে বুর্জোয়ারা যখন বাড়ি বানিয়েছেন, মার্কসের তখন জন্মই হয়নি!

বুর্জোয়াদের সেইসব বিস্ময়কর গল্প আছে ফ্রাঙ্কো মরেত্তি বিরচিত ‘দ্য বুর্জোয়াজিস’ বইয়ে। বুর্জোয়াদের আদিকাণ্ডের সূচনা একাদশ শতাব্দীতে। প্যারিসের একেবারে নাকের ডগায় হল সমুদ্দুর, ‘লা মাঞ্চে’, অর্থাৎ ইংলিশ চ্যানেল। সেই সমুদ্রসৈকতেই যমজ দুই বন্দরশহর বরদিয়াক্স ও নান্তেস। আর তাদের কোলে শুয়ে থাকা একটা ব্যস্ত শিল্পনগরী হল লিয়ন। এই এলাকাটা জুড়ে ছিল এক প্রাচীন আদিবাসী শিল্পগোষ্ঠীর বসত। তাদের মূল ব্যবসাটা ছিল হস্তশিল্পের। কালক্রমে তারা প্রথমে বাস্তুশিল্পের আঙিনায় পা রাখে। পরম্পরাগত শিল্পবোধের কারণে ওই হস্তশিল্পীদের নতুন সমষ্টিগত উদ্যোগ যথেষ্ট সফল হয়। এবং সেখানেই থেমে না-থেকে ওই শিল্পোদ্যোগীরা সংঘবদ্ধ সমাজজীবনের উদ্দেশ্যে নিজেদের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক একটা আস্ত শহরের পরিকল্পনা ছকে ফেলে। সম্ভবত সেটাই ছিল আধুনিক নগরোন্নয়ন ও হালের ‘ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন’ বিজ্ঞানের শুরুয়াত। অভিনব এই পরিকল্পিত নগরায়ণের সুবাদেই তখন থেকে ওই ব্যবসায়ীদলের নাম হয় ‘বুর্জোয়া’। নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক অর্থেই।

কেন? উল্লেখ দরকার, বাংলার এই ‘বুর্জোয়া’ শব্দটির আসল উচ্চারণ হল ‘বুর্জোয়াজি’। ফরাসি ভাষার এই শব্দটির উৎপত্তি ‘বুর্জ’ থেকে। বুর্জ মানে হল শহর, আরও নির্দিষ্টভাবে বাণিজ্যনগরী। বুর্জের বাসিন্দারা বুর্জোয়াজি! এই বুর্জের উল্লেখযোগ্য একটা বিশেষত্ব হল, শহর হবে দেওয়াল দিয়ে মোড়া। সামাজিক সুরক্ষা ও সংঘবদ্ধ জীবনের কথা মাথায় রেখেই বুর্জোয়ারা এমনটা ভেবেছিল। কাজেই এটা বলাই যায় যে, এখনের ‘গেটেড কমিউনিটি’ কনসেপ্টের ফিতে কেটেছিল বুর্জোয়ারাই। বলাই বাহুল্য, বুর্জোয়াদের এই পরিকল্পনার নেপথ্যে তথাকথিত ‘অত্যাচারী’ জমিদার বা ‘মুনাফাখোর’ সামন্তপ্রভু গোছের কোনও ব্যাপারই ছিল না। তবু কেন যে কমিউনিজমে বুর্জোয়াদের খলনায়ক বানিয়ে দেওয়া হল, সেটা বিস্ময়ের ব্যাপার বইকি! এবং দুনিয়া জুড়ে এমন একটা অবস্থা তৈরি হল যে, ‘বুর্জোয়া’ শব্দটা একটা ‘গালাগাল’ হয়ে উঠল। আরও মজার খোরাক হল, কমিউনিস্ট রাজনীতিতে সর্বক্ষণের কর্মী বা হোলটাইমারদের একাংশের ‘কমিউন’-এ প্রত্যেকে মিলে এক জায়গায় থাকা-খাওয়ার যে রেওয়াজ চালু আছে, সেটা অবিকল বুর্জোয়াদের জীবনচর্চার মতোই। ফারাক শুধু সময়টার।
বুর্জোয়াদের আবির্ভাব মধ্যযুগে। তারপর দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতক জুড়ে তারা ছড়িয়ে পড়ে মধ্য এবং পশ্চিম ইউরোপে। এর প্রায় তিন শতাব্দী পরে শ্রমিকদের সহাবস্থানের উদ্দেশ্যে কমিউনিস্টদের কমিউন প্রথা শুরু হয়। এর নেপথ্যে ছিল ফ্রান্সেরই বামপন্থী ‘প্যারি কমিউন’-এর। ১৮৭১ সালে এই ‘সরকার’ গঠিত হয়েছিল শ্রমিকদের উদ্যোগে। শুধু তা-ই নয়, বুর্জোয়াদের ‘সিন্ডিকেটেড সিটিলাইফ’-এর ধারণার সঙ্গে হুবহু মিলে যায় ১৯৫৮ সালে চিনে চালু হওয়া কৃষকদের যৌথখামার ব্যবস্থাও। তবে এটা ঠিক যে, পরিকাঠামোগত মিল থাকলেও বুর্জোয়া ব্যবস্থার সঙ্গে কমিউন ও যৌথখামারের মধ্যে একটা আর্থসামাজিক প্রভেদ রয়েছে। সেটা হল, বিত্ত ও সামাজিক অবস্থান। বুর্জোয়ারা ছিল ধনী। আর কমিউন ও যৌথখামারের শ্রমিক কৃষকরা প্রকৃত অর্থেই সর্বহারা ও মেহনতি সমাজের প্রতিনিধি।

অবশ্য এটাও বলতে হবে যে, ‘বড়লোক’ হলেও বুর্জোয়ারা কিন্তু তথাকথিত ‘শিল্পপতি’ কিংবা ‘পুঁজিবাদী’ ছিল না। ছিল ‘বাজারমুখী’ মাঝারি ব্যবসায়ী। পণ্ডিতমহলের ধারণা, বুর্জোয়ারাই পৃথিবীতে প্রথম ‘ইন্ডেজিনাস মার্কেট’ অথবা অন্তর্মুখী বাজারের প্রবক্তা। পরে এই ব্যবস্থাকে আবিশ্বে জনপ্রিয় করে তোলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ‘গুরু’ আমেরিকা, যা এখন ‘কালচারাল সারভাইভাল বাজার’ নামে বহুল পরিচিত। বুর্জোয়ারা যখন ইউরোপে এই অবরুদ্ধ অর্থনীতির বাণিজ্যব্যবস্থা চালু করে, তখন ওই মহাদেশের জনতা প্রধানত চারটি বিত্তগোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এই সারণির চরমশীর্ষে রয়েছে ভোগবাদী শিল্পপতিরা, যাদের বিত্তবৈভব বিলাস সম্পদ ও প্রাচুর্য অন্তহীন। আর পাদদেশে রয়েছে সর্বহারা মেহনতি মানুষ। শিল্পপতিদের পরের স্তরেই অবস্থান বুর্জোয়াদের, অর্থনীতির পরিভাষায় যাদের জন্য ‘উচ্চমধ্যবিত্ত’ বিশেষণটি সুপ্রযুক্ত। আর তাদের ঠিক নিচের শ্রেণিটিই হল মধ্যবিত্ত, যাদের অভিধা হল ‘পেটিট বুর্জোয়াজি’। বিদ্রূপাত্মক বাংলায় যেটা ‘পাতি বুর্জোয়া’। এটা একটা কমিউনিস্ট কটূক্তিও বটে! কারণ একটা ‘মিথ’ চালু আছে যে, মধ্যবিত্তরা বরাবরই অলস ও আপসপন্থী!

এই শ্রেণিবিন্যাসের রেখচিত্রে বুর্জোয়া ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে ‘ইউনিক’। দেরিদ্রে নান্সেন ম্যাকলস্কির লেখা বই ‘বুর্জোয়াজিজ ইক্যুয়ালিটি’ অনুযায়ী, এই অনন্যতার হেতুটি এই যে, বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যেই বহুস্তরীয় অর্থনীতির সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল। তাদের নগর বাণিজ্যবিকাশের মধ্য দিয়েই প্রাচীন পৃথিবী ক্রমশ শিল্পবিপ্লবের দিকে এগতে শুরু করেছিল। এবং সমান্তরালভাবে উঁকি দিয়েছিল পুঁজিবাদের চারাগাছও। স্বভাবতই এই একচ্ছত্র বুর্জোয়াবাদকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়েছিল আরও এক অনিবার্য সামাজিক তথা রাজনৈতিক বিপ্লব। একটা নতুন ধরনের ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল অর্থনৈতিক অসাম্য, শ্রমাধিকার এবং শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব নিয়ে। বুর্জোয়া মতবাদকে সামনে রেখেই উৎপত্তি হয়েছিল কার্ল মার্কসের সেই ‘দুনিয়া বদলে দেওয়া’ কমিউনিজমের। বুর্জোয়াদের বিপ্রতীপে জন্ম নিয়েছিল প্রলেতারিয়েত অর্থাৎ খেটে খাওয়া মানুষের। মালিকপক্ষ এবং শ্রমিকশ্রেণির এই ‘লড়াই’ বিশ্বের বাণিজ্যিক অর্থনীতিকে জোরসে ঠেলে দিয়েছিল বিবর্তন রূপান্তর এবং যুগান্তরের পথে।

কাজেই বুর্জোয়াবাদ একাধারে একটি ঐতিহাসিক সত্য। এবং অবশ্যই একটি ঐতিহাসিক ভুল। কারণ নিজেদের পাড়ার চারদিকে উঁচু ও দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে দিয়ে বুর্জোয়ারাই প্রথম মানবসভ্যতায় একটা ‘বিচ্ছিন্ন সমাজ’ প্রবর্তন করেছিল। বৃহত্তর জনজীবন থেকে এই স্বেচ্ছা পৃথকীকরণই ছিল পৃথিবীর প্রথম বিভেদবাদ। সর্বজনীন বণ্টনব্যবস্থায় অংশ না নিয়ে, নিজেদের মুনাফা শুধু নিজেরাই উপভোগ করার স্বার্থপর মনস্কতা বুর্জোয়াদের বাড়িগুলিকে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সূতিকাগারে পরিণত করেছিল! অন্য আরও অনেক কিছুর মতোই ইউরোপের এই বুর্জোয়া সংস্কৃতিটিও ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবী জুড়ে। একই মানচিত্রের অংশীদার রাষ্ট্রগুলি নিজেদের ঘিরে ফেলেছিল কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। একই একান্নবর্তী পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল অগুনতি ‘নিউক্লিয়ার স্টেটস’!
কার্ল মার্কস একজন সুদূরদ্রষ্টা দার্শনিক ছিলেন। তিনিই তো প্রথম বুর্জোয়াদের বাড়িঘরে বহিরাগতদের ‘প্রবেশ নিষেধ’ নামক বিচ্ছিন্নতার বীজ দেখতে পেয়েছিলেন। ‘দি এইটিন্থ ব্রু অব লুইস বোনাপার্ট’-এ তিনি লিখেছিলেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে দু’ বার। প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসেবে। আর পরেরবার প্রহসন হিসেবে। এই যে এখন পৃথিবীর নানা দেশের মালিকরা ক্রমাগত সীমান্ত বরাবর সুউচ্চ এবং দুর্লঙ্ঘ্য দেওয়াল তোলার হুমকি দিয়ে চলেছেন, এটা তো সেই বুর্জোয়াবাদেরই ‘রিমেক’! ইতিহাসের প্রহসন!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved