

এই যে ’৪২-এর সপ্তমীর সকাল, জামাকাপড় পরে প্যান্ডেলে যাব, হুশহুশ শব্দে ঝড়, নারকেল গাছগুলো নুয়ে পড়ছে– কিন্তু তার মধ্যেই সপ্তমীর পুজো হচ্ছে– আর আমি আমার নতুন জামা-প্যান্ট। জামা ভিজে যায় যাক, নতুন বুট জুতো নয়। এমনি চটি পায়ে দিয়ে বারোয়ারি তলার ওই মুখটায়, যেখানে বাঁশ দিয়ে ছেলে আর মেয়ে আলাদা করা– সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমি ভলান্টিয়ার বলে কথা! সবাই হাসছে, নিজেও হাসছি। এই স্মৃতিটা খুব মনে পড়ে এখনও।
ছেলেবেলায়, আমি যে বাড়িতে থাকতাম, তার অদূরেই ছিল বিশাল এক মাঠ। বারোয়ারি তলার। প্রতি বছর পুজো হত সেখানে। অন্য সময়, সেই মাঠটা খালিই পড়ে থাকত। আমরা ফুটবল খেলতাম। দেশভাগের পরে, ওই মাঠই আবার অসামাজিক লোকজনদেরও গন্তব্যস্থান হয়ে গিয়েছিল।
আমি যে সময়ের কথা বলছি, তা ১৯৪২। আমার বয়স ৮। ওই বয়সে পুজোর প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণ হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ ‘পুজো আসছে’ ব্যাপারটার মধ্যেই একটু স্বার্থ আছে। নতুন জামা-প্যান্ট হবে, মোজা-জুতো হবে। ক’টা দিন লেখাপড়া থেকে ছুটি। আমাদের বারোয়ারি তলার ওই মাঠে আস্তে আস্তে একটা বিরাট প্যান্ডেল দেখা যাবে। প্রথমদিকে একচালার ঠাকুর হত। পরে, মায়ের যৌথ পরিবারকে ভেঙে দেওয়া হল। সবাই আলাদা আলাদা হয়ে গেলেন।
বরানগরের সার্বজনীন পুজো খুব নামকরা ছিল। বহু রকমের অনুষ্ঠান হত। পুজোর সময় কখনও থিয়েটার হচ্ছে, হচ্ছে যাত্রাপালাও। একবার একটা নতুন শব্দ শুনলাম: ‘অপেরা’। ‘অপেরা’ কী, তখনও জানি না। অপেরা হল, শুনলামও। আত্মীয়স্বজন– যাঁরা পরিচিত পরিজন, তাঁরা আমাকে পুজোর উপহারস্বরূপ প্যান্ট-জামা দিতেন। সবচেয়ে ভালোবাসতেন আমার জ্যাঠামশাই। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। আমাকেই আগলে রাখতেন সন্তানস্নেহে। এই জ্যাঠামশাই আবার খানিক মডার্ন। হাতির দাঁতের পাইপে সিগারেট লাগিয়ে ধূমপান করতেন। খুবই শৌখিন মানুষ। সেসময়– ১৯৪২ সালে আমাকে একটা ছোট্ট পুস্তিকা এনে দিলেন। লম্বা ধরনের। তা হল বাকিংহাম মিলের স্যাম্পেল কাপড়ের বই। কাপড়ের টুকরো বিস্কুটের আকারে কাটা। বিস্কুটের যেমন ধারে কাঁকড়ি কাটা থাকে– ওইরকম। আমাকে বললেন, ‘দেখো, তুমি কোনটা নেবে?’ আমার চিরকালই ক্রিম কালারের ওপর খুব ঝোঁক ছিল। তাই, সেই ক্রিম কালারের প্যান্ট আর ক্রিম কালারের জামাই বাছলাম।

আমি তখন ছোট, কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে হত যে, পুজোয় ভলান্টিয়ার হব। পুজোকমিটির দাদাদের গিয়ে বললাম, ‘ভলান্টিয়ার হব।’ তারা পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, ‘আর একটু বড় হও, তখন হবে।’ খুব মনখারাপ হয়ে গেল শুনে। জ্যাঠামশাইকে বললাম। তিনি করলেন কী, একটা রিবন কাটলেন লম্বা করে। আমার জামার বুকপকেটের কাছে আটকে দিলেন। বললেন, ‘যাও, তুমি ভলান্টিয়ার হয়ে গেছ। এবার গিয়ে তুমি ডিউটি করো।’
সপ্তমীর সকাল। হঠাৎ আকাশ একবারে মেঘাচ্ছন্ন। প্রবল ঝড়। দেখলাম দুটো নারকেল গাছ পরপর শুয়ে পড়ল। কী করে পুজোয় যাব! প্যান্ডেল-ট্যান্ডেল সব একাকার! কিন্তু তার মধ্যেই পুজো হচ্ছে। এই সময়ের কিছুকাল আগে জাপানিরা বোমা ফেলে গিয়েছে। হাতিবাগানে, হাওড়ার রামরাজাতলায়। কলকাতার মানুষ আতঙ্কে শহর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। সেই সময় অনেকে বাড়ি কম দামে বিক্রি করে চলে গিয়েছে দূরে। একরকম প্যানিক তৈরি হয়েছিল। সেই প্যানিকের মধ্যে পড়েছিলেন আমার মামা, আমার দাদুরাও। মামা বড় গায়ক ছিলেন। তাঁর সাত অকটেভের হারমোনিয়াম ছিল। দামি সব জিনিসপত্র নিয়ে ওঁরা কন্টাইতে চলে গিয়েছেন। এই যে ঝড়, তার কেন্দ্র ওই কন্টাই। বোধহয় একটা ভূমিকম্পও হয়েছিল। পুরো সমুদ্রটা কন্টাই শহরের ওপর এসে পড়ল। সবই তলিয়ে গেল। সমস্ত জিনিসপত্র– মামার হারমোনিয়াম-সহ সব জলের তলায়। কোনওক্রমে হারমোনিয়ামটাকে রক্ষা করেছিলেন মামা। সম্ভবত একটা কোড্যাক ক্যামেরাও বোধহয় রক্ষা পেয়েছিল। বাকি গয়নাগাটি যা ছিল, সব জলে। ওঁরা আবার কলকাতায় ফিরে এলেন। তখন, আমার বাবা বললেন, ‘দেখলেন তো, আপনারা এত ভিতু দুটো বোম পড়েছে বলে এমন জায়গায় গেলেন যেখানে গিয়ে একবারে সবই চলে গেল।’
এই যে ’৪২-এর সপ্তমীর সকাল, জামাকাপড় পরে প্যান্ডেলে যাব, হুশহুশ শব্দে ঝড়, নারকেল গাছগুলো নুয়ে পড়ছে– কিন্তু তার মধ্যেই সপ্তমীর পুজো হচ্ছে– আর আমি আমার নতুন জামা-প্যান্ট। জামা ভিজে যায় যাক, নতুন বুট জুতো নয়। এমনি চটি পায়ে দিয়ে বারোয়ারি তলার ওই মুখটায়, যেখানে বাঁশ দিয়ে ছেলে আর মেয়ে আলাদা করা– সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমি ভলান্টিয়ার বলে কথা! সবাই হাসছে, নিজেও হাসছি। এই স্মৃতিটা খুব মনে পড়ে এখনও।
ঝড় থেমে গেল। প্যান্ডেলট্যান্ডেল আবার গোছগাছ করা হল। তখন আবার যে পুজো হল, সেটাকে বলে ‘ভাঙা পুজো’। এই প্যান্ডেলের হওয়ার আগে একটা ঘটনা ঘটত। যখন বাঁশের স্ট্রাকচারটা হত তখন থেকেই আমাদের ভীষণ আনন্দ হত। কারণ আমরা বাঁশের ওপর উঠে পড়তাম। আর ওই বাঁশের ওপর দিয়ে বাঁশ থেকে বাঁশে আমরা খেলতাম। বলতাম ‘বাঁদর খেলা’। নিচে যে সমস্ত অভিভাবক এসে দাঁড়াতেন, তাঁরা বলতেন, ‘বাঁদরগুলো নেমে আয়!’ এবং ভীষণ বকাবকি করতেন। কিন্তু তাঁরা তো উঠতে পারবেন না। বকাবকি করে, শেষমেশ চলে যেতেন।
প্যান্ডেলের ওপর, ত্রিপল পড়ার পর স্ট্রাকচারটা বদলে যেত। একদম কোণের দিকে, যেখানে প্যান্ডেলের কেরামতি আছে, সেখানে একজন না একজন ঢুকে বসে থাকত। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরে যখন তাকে ধরতে যাওয়া হল, সে বাঁশের ওপর দিয়ে সাৎ সাৎ করে এদিক-সেদিক চলে যাচ্ছে। দু’-একবার পড়েও গেল নিচে। কিন্তু কিছু হল না। এই একটা ভয়ংকর আনন্দ ছিল!
এখন যা একেবারেই উঠে গিয়েছে, তা হল বিজয়া দশমীতে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার চল। আমাদের সময় এটা একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। বিজয়া দশমীর দিন, সকালবেলা, আমার পিতা এবং আমার গুরুজনেরা স্থানীয় ময়রার দোকান যেতেন। সেখানে আগের দিন রাত্রিবেলা থেকেই বিরাট ভিড়। গজা, পান্তুয়া, মিহিদানা। রয়েছে ছোট ছোট কুচো গজাও। কারণ বিজয়া দশমীর দিন সন্ধে ৭টা পর থেকে বাড়িতে একের পর এক সব প্রণাম করতে আসবে। আর কোলাকুলি হবে। তখন এইসব জুটবে। এই যে ব্যাপারটা তখন ছিল, এখন আর নেই।
এই বিজয়ার দিনেও, আমার মুখে আনন্দ মিশে ছিল, কারণ ওই যে মিষ্টি বা নোনতা– নিমকি-জিলিপি-পাপড়ি– এগুলো তাদের জুটবেই। একটা ঘরে বড়রা সব কোলাকুলি করছেন, নানা কথা বলছেন, আমরা ছোটরা, ওর মধ্যে থেকেই একটু একটু সরিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ধরাও পড়েছি কয়েকবার। ‘কী! মুখ খোল! মুখ খোল!’ হাঁ করলাম। ‘তুই-ই যদি সব খেয়ে শেষ করবি, তো আমরা বাইরের লোককে কী দেব!’
আর বাড়িতে, বিজয়ায়, একটা জিনিস হবেই হবে। তা হল ছোট ছোট নারকেল কুচি দেওয়া ঘুগনি। ঘুগনি ছাড়া বিজয়া হয় না। ছেলেবেলায়, বিজয়া করতে নানা বাড়িতে যেতাম। আমাদের যিনি পুরোহিত ছিলেন, বাবা প্রথমেই তাঁর বাড়িতে নিয়ে যেতেন। প্রথম প্রণাম তাঁকেই করা হত। প্রণামের পর, ক’টা নাড়ু, কুচো সন্দেশ, একগ্লাস জল পেতাম।

রাস্তাঘাটে তখন এত আলো ছিল না। আমাদের পুরোহিত যে পথে থাকতেন, সে পথটাও রাজপথ ছিল না। একটা গা ছমছমে পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেতাম। কানে দূর থেকে আওয়াজ আসত বিসর্জনের, ঢাকঢোলের। পুরোহিত মশাই একা, চুপটি করে, তাঁর জীর্ণ বাড়িতে বসে আছেন। তাঁর স্ত্রী, বয়স্কা– তাঁরও হাঁটুতে নানা সমস্যা। তিনি সেসব বাধা পেরিয়ে আমাদের জন্য মিষ্টি নিয়ে এলেন। কাঁসার গ্লাসে জল। এমনকী, সে জলের গ্লাসের মাথায় একটা ঝকঝকে কাঁসার ঢাকা।
অতীত বড্ড অতীত হয়ে গিয়েছে আজ। আর ফিরবে না।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved