

কেয়া আমাকে নাটকের গান শোনাতো। যখনই অজিতেশ একটা করে নতুন গান কিছু তোলাতেন, নান্দীকারের রিহার্সালে সেদিন কী ব্যাপার হল, সেইসব নিয়ে আলোচনা হত। কেয়ার মৃত্যুর পরেও আমি বহুবার ভেবেছি কেয়ার মা’র কথা, কিন্তু আমি কিছুতেই মনস্থির করে ওই বাড়িতে আর কখনও যেতে পারিনি। পরে মনে হয়েছে যে, আমি খুব অন্যায়ই করেছিলাম, কারণ ওর মা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
আমি কেয়াকে চিনতাম, কারণ আমি স্কটিশ চার্চ কলেজে, ফিলোজফি ডিপার্টমেন্টে অল্প দিন কাজ করেছিলাম। আমি প্রথমে পড়েছি ফিলোজফি। প্রেসিডেন্সি কলেজে অনার্স এবং এমএ– দুটোই। তখন কলেজেই এমএ করা যেত। জার্মান নিয়ে পড়াশুনো পরে, শখে। কারণ ওই সময় প্রেসিডেন্সি কলেজের পড়ুয়াদের বেশিরভাগ সময় কফি হাউসেই কাটত, তো সেখানে মাঝেমাঝে কেয়াকে দেখতাম রুদ্রর (রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত) সঙ্গে। ১৯৬১ সালে নান্দীকারের অভিনয় দেখেছি, তবে তখনও বোধহয় কেয়া অভিনয় করেনি। আমার যতদূর মনে হচ্ছে “নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র” যখন ১৯৬১ বা ‘৬২-তে প্রথম হয়, সেই সময় কেয়া বোধহয় এমএ বা অন্য কোনও পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কারণ আমার মনে আছে, যে রোলটা কেয়া করত, সেটা মায়া ঘোষ করেছিলেন। মুক্তাঙ্গনে দেখেছিলাম সেই অভিনয়। তারপরে স্কটিশ চার্চ কলেজে কাজ করতে গিয়ে কেয়ার সঙ্গে আবার দেখা। প্রফেসরদের জন্য দুটো ঘর বরাদ্দ ছিল। যে ঘরে সমস্ত বয়স্ক সিনিয়র প্রফেসরেরা বসতেন, আমার তো সেখানে বসার প্রশ্নই উঠছে না। অথচ কেয়া সেই ঘরে অধিকাংশ সময়ই খুব মুখ গোমড়া করে বসে থাকত। তখন মহিলা লেকচারার ছিলেন কেউ কেউ, কিন্তু কেয়াকে এইসব কারণে আমার খুব বেশি মনে পড়ে।

আমার স্কটিশ চার্চ কলেজের সঙ্গে কোনও অ্যাসোসিয়েশন ছিল না। তবে আমি যে স্কুলটায় পড়েছি সেটা একই মিশনের আন্ডারে এবং আমাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানও স্কটিশ চার্চের হলে হত। আমাদের প্রচুর বন্ধুরা স্কটিশ চার্চে পড়েছে। স্কুল ওই পাড়ার হওয়ার সুবাদে আমাদের স্কুল ফাইনাল পাশ করার পর বন্ধুদের বেশিরভাগই হয় বেথুন, নয় স্কটিশ চার্চে ভর্তি হয়েছিল। আমিই একটু দলছাড়া হয়ে মিডলটন রো-তে লোরেটো হাউসে ভর্তি হয়েছিলাম। আর সেই সময় কেয়ার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু সে বন্ধুত্ব গাঢ় হয় কলেজে পড়ানোর সময় থেকে। যাই হোক, সিনিয়র প্রফেসরদের ঘরে আমি মোটেই জায়গা পাইনি। এদিকে আমি বেজায় অপ্রস্তুত বোধ করছি এই ভেবে যে, কেউ আমাকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন না। শেষমেশ আমায় উদ্ধার করলেন অর্থনীতির বিখ্যাত অধ্যাপক তরুণ সান্যাল। তরুণবাবু উঠে বললেন, ‘আপনি আমার ডেস্কে বসুন।’ আমি ইতস্তত করায় উনি ফের বললেন, ‘আমি একটা ব্যবস্থা করে নেব।’ তা-ই হল, তবে ওখানে বেশিদিন পড়াইনি। মাত্র মাসদুয়েক পড়িয়েছিলাম। কারণ ততদিনে আমি তখন পুণাতে ওখানকার ম্যাক্সমুলার ভবনে জার্মান পড়তে শুরু করেছি।

স্কটিশ চার্চে যাওয়াটা আমার খানিকটা বাধ্য হয়ে যাওয়া। কারণ দুটো। এক, আমার ফিলোজফি পড়ানোর কোনও ইচ্ছেই ছিল না। দুই, আমাদের এক সহপাঠী জুডিসিয়ারিতে চান্স পেয়েছিল। ও পড়াত স্কটিশ চার্চে। কলেজ ওকে বলেছিল যে, সাবস্টিটিউট না দিলে ওকে ছাড়বে না। সেই সময় আমার ছুটি ছিল, এদিকে ওর জয়েনিং ডেট পার হয়ে যাচ্ছিল, তাই ওকে অব্লাইজ করার জন্য আমি গিয়ে ওর জায়গায় বদলি হিসেবে পড়াতে শুরু করেছিলাম। সেই সময় থেকে কেয়ার বাড়িতে যাতায়াত আরম্ভ হল, এবং কেয়াদের বাড়ি ছিল ওই মানিকতলার মোড় থেকে আরেকটু এগিয়ে ব্রিজটা ক্রস করে রাজেন্দ্রলাল মিত্র স্ট্রিট বা এরকম নামেরই কোনও একটা রাস্তায়। এখন সেই বাড়িটা একেবারেই ভূতের বাড়ি হয়ে পড়ে আছে। বাড়িটা ওদেরই ছিল। ওর বাবা-মা থাকতেন। আর কেয়া ছিল ওঁদের একমাত্র মেয়ে। ওঁরা থাকতেন তিনতলায় আর নিচের দুটো তলা বোধহয় ভাড়া দেওয়া ছিল। একতলাটা নিশ্চিত মনে নেই, কিন্তু দোতলায় ভাড়া থাকতেন কোনও একটি পরিবার।

কফি হাউসে আড্ডা দেখা হওয়া বাদ দিয়েও আমি একাধিকবার তখন ওদের ‘তিন পয়সার পালা’ দেখেছি। এমনকী একবার জার্মান কনসুলেটের যিনি কালচারাল অ্যাটাশে, তখন আমি তাঁকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম যে, ব্রেশটের প্রোডাকশন আমাদের দেশে কীরকম হয়েছে দেখো! তিনি যদিও ভাষাটা জানতেন না, কিন্তু নাটকটা তো চিনতেন! ফলে দেখে উনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন! উনি প্রথম কথা বললেন যে, এঁরা সকলেই নিশ্চয়ই ইস্ট বার্লিনের ব্রেশট থিয়েটারে ‘বার্লিনার অনসম্বল’ নামের যে থিয়েটার ব্রেশট ও তাঁর স্ত্রী হেলেনে ভাইগেল চালাতেন সেখানে ট্রেন্ড হয়ে এসেছে। আমি বললাম, ‘এঁরা কোনওদিন দেশের বাইরেই যাননি।’ উনি তখন বললেন, ‘এরকম একটা প্রোডাকশন দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া বিশেষভাবে জরুরি।’ তা আমি বললাম, ‘এটা একটু দেখুন আপনি’ তারপরে অবশ্য আমিও আর কিছু পারসু করিনি, উনিও আর কোনওরকম যোগাযোগ করেননি। কিন্তু উনি ভীষণ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন ওঁদের প্রোডাকশনের।

১৯৬৫ সালে স্কটিশ চার্চে পড়াতে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আমি জার্মানিতে চলে যাই। ১৯৭০ অবধি কেয়ার সঙ্গে আমার খুবই অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব ছিল। আমাদের আরও বন্ধুত্ব থাকার কারণ অন্য। আগে স্কটিশ চার্চে পড়াতেন কেয়াদের মাস্টারমশাই চিত্তরঞ্জন ঘোষ। ওঁর ‘নটী বিনোদিনী’ নাটকও কেয়ারা করেছে। ‘বহুরূপী’ পত্রিকা সম্পাদনা এবং থিয়েটার জগতের সঙ্গে তাঁর খুব নিবিড় যোগাযোগ ছিল। আর চিত্ত ঘোষের সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল, উনি ছিলেন সবার মাস্টারমশাই– মানে অজিতেশ, রুদ্র, কেয়া সবাই ওঁকে একবারে ‘স্যর, স্যর’ করে অস্থির হত। আমি ওঁকে নাম ধরে ডাকতাম, আর ‘তুমি’ বলতাম। অবশ্যই সেটা উনি অনুমতি দিয়েছিলেন বলেই। আর আমি তো কলেজ হিসেবে কাজ করেছি, কাজেই উনি তো আমার আর মাস্টারমশাই নন। তারপরে উনি যখন স্কটিশ চার্চ ছেড়ে যাদবপুরে চলে যান তখনও আমার সঙ্গে ওঁর যোগাযোগ ছিল। শেষদিকে যখন উনি অসুস্থ, তখন আর যোগাযোগটা ছিল না। অনেক পরে শুনেছি আমার একজন আত্মীয়া আছেন, আমার শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে আমার ননদ হন, তিনি হচ্ছেন ঊর্মিমালা বসু। আমার স্বামীর পিসতুতো বোন। ঊর্মির কাছে শুনেছি চিত্ত ঘোষের না কি ক্যান্সার হয়েছিল। চিত্ত ঘোষ থাকতেন পটলডাঙা স্ট্রিটে, আর ঊর্মির বাপের বাড়ি হচ্ছে আমহার্স্ট স্ট্রিটে (অধুনা রাজা রামমোহন রায় সরণি)। একবার অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল, যদিও সেটা আজকে আলোচনার বিষয় নয়, উনি ম্যাক্সমুলার ভবনে একটা নাটক দেখতে এসেছেন। অথচ আমায় কোনও খবর দেননি। আমার সঙ্গে নিয়মিতই যোগাযোগ ছিল। আমি গিয়ে কথা বলার পর, আমার কীরকম মনে হল, উনি কেমন যেন একটু রেগে কথা বলছেন। সেই আগের বন্ধুত্বের ব্যাপারটা আর নেই। তার ওপর ওঁর বোধহয় একটু মেমরি লস মানে ডিমেনশিয়াও হয়েছিল। উনি আগে রবিবার নিয়ম করে কফি হাউসে যেতেন, আর আমি প্রত্যেক উইকেন্ডে বাপের বাড়ি যেতাম এবং ওই শনিবার থেকে রবিবার একটু বেলায় ফিরতাম। আমি ওঁকে বললাম যে, ‘তাহলে নেক্সট রবিবারে চলো, আমরা একটু কফি হাউসে আড্ডা মারি।’ বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তারপরে আমি নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে এক ঘণ্টা বসে রইলাম, উনি এলেনই না। আমার মনে হল যে, উনি নিশ্চিত ভুলে গিয়েছেন। তারপরে আর কোনওদিন দেখা হয়নি। দুঃখের কথা, তার কিছুদিন পরই উনি মারা যান। খবরটা অবশ্য টিভিতেই পেয়েছিলাম। আর যোগাযোগ আমার হয়নি ওর সঙ্গে। আর কেয়া চলে যাওয়ার পর কেয়ার মৃত্যুটা তো মানে অসম্ভব বেদনাদায়ক আমাদের পক্ষে।

আমার স্বামীর সঙ্গে পরিচয় আমার বিয়ের বহুদিন আগে থেকেই। আমরা বিয়ে করি ১৬ বছর মেলামেশা করার পর। তখন আমার বয়সটা বেশ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ১৩ মার্চ আমার স্বামী সিদ্ধার্থর জন্মদিন ছিল। তখনও আমাদের বিয়ে হয়নি, আমি একজনের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট থাকতাম রোল্যান্ড রোডে, ম্যাক্সমুলার ভবনের খুব কাছে। তো কথা ছিল সেদিন ওঁর জন্মদিনে ওঁর বাবা-মা এবং আমি আমরা সবাই একটা গাড়ি করে একটা লং ড্রাইভে যাব। সেদিন সকাল থেকে আমি তৈরি হয়ে বসে আছি, খুবই তাড়াতাড়ি বেরব। তখন সিদ্ধার্থর বাড়িতে ওঁর মা আনন্দবাজার নিতেন। আমি বললাম, ‘দেরি করলে কেন?’ আমাকে দেখে গম্ভীর মুখে ও কাগজটা এনে বাড়িয়ে দিল। আমি দেখলাম কাগজে লেখা যে, কেয়া নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে, পাওয়া যাচ্ছে না, জলে ডুবে গিয়েছে! কিন্তু তারপরে ওর যে মৃত্যু হয়েছে, সে খবরটা তখনও কেউ জানে না। তখন আমাকে সিদ্ধার্থ জিজ্ঞেস করল যে, ‘তুমি কি যাবে ওর বাড়িতে?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ আমাকে গাড়ি করে ও নিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। তখন কেয়ার বাড়ি একেবারে লোকে লোকারণ্য। পাড়ার সমস্ত লোক ভেঙে পড়েছে। তারপরে ওর মা তখন বলে চলেছেন যে, “হয়তো কোথাও সাঁতরে উঠেছে! হয়তো কোনও জায়গায় আশ্রয় পেয়েছে! হয়তো আসবে আজকে ফিরে। ও তো দু’-তিনদিন সাঁতারও শিখেছিল!” এইভাবে বলে যাচ্ছেন। আমার পক্ষে সেটা শোনাটাও যে কী অসম্ভব কষ্টের ছিল! অথচ তার মধ্যেও উনি আমাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করে দিচ্ছেন। আমার ঠাকুরদাদা একজন নামকরা গণিতজ্ঞ ছিলেন, আমাদের ওই জেনারেশনের সবাই জানত। সবাই পড়ত কে. পি. বসুর অ্যালজেব্রা। কে. পি. বসুর নাতনি বলে আমরা সেইটা ভাঙিয়ে খাচ্ছি আর কী!

কেয়ার ওই দুর্ঘটনা ঘটার পর আমি মানসিকভাবে এতটাই বিধ্বস্ত হয়ে পড়ি যে, কোনও অজুহাতেই আমি আর কখনও ওই বাড়িতে যেতে পারিনি। পরে মনে হয়েছে যে, আমি খুব অন্যায়ই করেছিলাম, কারণ ওর মা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আর আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হয় ওই বাড়িতে নয়তো আমাদের বাড়িতে আড্ডা মারতাম। আমার বিশেষ করে মনে পড়ে যে, যখন ওরা ‘তিন পয়সার পালা’-টা তৈরি করছে সেটা বোধহয় ১৯৬৯। আমার যতদূর মনে হয়, ওটা প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘৭০-এর প্রথম দিকে, বা ‘৬৯-এর শেষে। ও প্রায়ই গল্প করত যে, ‘আজকে অজিতেশ এই গানটা করলেন বুঝলে।’ আমার তো মূল নাটকটা পড়াই ছিল। তখনই আমি কলকাতা ম্যাক্সমুলার ভবনে জার্মান পড়াচ্ছি। রুদ্রকে চিনতাম তার অনেক আগে থেকে। কারণ রুদ্র আমাদের সঙ্গেই এমএ পড়েছে, যদিও অন্য সাবজেক্টে। ও ইংরেজি পড়ত, আর আমি ফিলোজফি। কিন্তু তবুও পরিচয় ছিল। তারও একটা অন্য কারণ ছিল– রুদ্রর মেজদা সত্যপ্রসাদবাবু আমার দাদাকে পড়াতেন। তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক এবং আমার এক কাকার বন্ধু। মূলত সেই সূত্রেই উনি পড়াতে আসতেন আমাদের বাড়ি। তিনি শেক্সপিয়ারের একটা জীবনী লিখেছিলেন ‘অ্যাভন নদীর তীরে’ বলে। সে বই আমাদের খুব পছন্দ ছিল। যখন শুনলাম যে, রুদ্রপ্রসাদ আমাদের সত্যপ্রসাদবাবুর ছোট ভাই, তাতে তখন যে খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল তা নয়। বরং পরে বন্ধুত্ব হয়, সেটা কেয়ার চলে যাবার পরে। রুদ্র এখনও ইনফ্যাক্ট বিবেকানন্দ রোডে আমাদের পৈতৃক বাড়ির খুবই কাছেই থাকে।

রুদ্র একবার একটা বড় আর্টিকেল লিখেছিল আনন্দবাজারে, তাতে ও আমার বিষয়ে লেখে যে, স্বাতীর সঙ্গে নান্দীকারের যোগাযোগ আমিই করে দিয়েছিলাম। স্বাতী সে কথা ভালো করে জানত না, কারণ স্বাতীর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, কিন্তু আমার পিসতুতো দিদি-জামাইবাবু ওঁরা এলাহাবাদের লোক ছিলেন। সেখানে ওঁদের একটা শখের অভিনয়ের দল ছিল। আমার জামাইবাবুরা সেদিন করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুর ‘কলকাতার ইলেক্ট্রা’ এবং সেটা দেখার জন্য ওরা আমাকে নিমন্ত্রণ করেছিল। সেখানে ওই ‘কলকাতার ইলেক্ট্রা’র মেইন চরিত্র মানে নায়ক (বা ভিলেন) হয়েছিলেন আমার জামাইবাবু, আর ওঁর বিপরীতে স্বাতীর দিদি শিপ্রা অভিনয় করেছিল। শিপ্রা খুব ভালো অভিনয় করত আর স্বাতীও তাঁর বোনের রোল করেছিল। স্বাতীকে দেখে আমার সেদিন ক্রমাগত কেয়ার কথা মনে হয়েছিল। কেয়ার মৃত্যুর পর আমি কখনও নান্দীকারে যাইনি, কেয়া থাকতে কিন্তু একবার গিয়েছিলাম। তার আগে আমার অজিতেশের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল। উনি একদিন আমি যে বাড়িতে থাকতাম সেখানে এসে অনেকক্ষণ গল্পই করেছিলেন, গল্প করতে খুবই ভালোবাসতেন। আর আমাকে একটা অনুরোধ করতে এসেছিলেন, যে অনুরোধটা আমি রাখতে পারিনি বলে, আমার চিরকাল খুব দোষী মনে হয় নিজেকে। উনি একটা নাটকের বাংলা করতে বলেছিলেন আমাকে। সেটা হচ্ছে ব্রেশটেরই নাটক, শেক্সপিয়ারের ‘কোরিওলেনাস’-এর জার্মান ভার্সন। অজিতেশ বলেছিলেন, ‘ওটা আপনি বাংলা করে দিন, ওই ভূমিকাটায় অভিনয় করার আমার ভীষণ ইচ্ছে!’ তো আমি বললাম যে, “দেখুন আমি তো ম্যাক্সমুলার ভবনে দু’বেলা পড়াই; তখন আমাদের দু’বেলাই ক্লাস থাকত। ভোরবেলা এবং সন্ধেবেলা তো কাজ শেষ করতে করতে অনেক রাত্রি হয়ে যেত। প্রায় পৌনে ন’টা পর্যন্ত ক্লাস থাকত। তারপরে আমার কোনও অন্য বাড়তি কাজ করার সময়, আর অনুবাদ করাটা তো বেশ সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমসাপেক্ষ ব্যাপার।’ উনি বললেন যে, ‘না, আমরা শুরু করি। আপনি খালি বলে যাবেন, বাংলায় আমি নিজের মতো করে লিখে নেব। তারপরে বাকি কাজটা আমি নিজে করব।’ আমরা একদিন শুরুও করলাম, কিন্তু ওই খালি গল্পই হল, বেশি কাজ হয়নি। সেই কাগজগুলো আমি একদিন কবে যেন দেখছিলাম, কিছু কিছু লেখা তাতে রয়েছে। এখন বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছি বলে সেগুলো সব ফেলে-টেলে দিলাম, আর রাখিনি।

কেয়ার মৃত্যুর পরে আমি গিয়েছিলাম নান্দীকারে বাকিদের সঙ্গে দেখা করতে। তখনও সকলেরই চোখ দিয়ে জল পড়ছে, কারওরই কথা বলার মতো অবস্থা নয়। আমার এখনও মনে আছে, অজিতেশ বারবার বললেন, ‘কাকে শেখাব? কাকে হাতে ধরে অভিনয় শেখাব যে, কীভাবে শাড়িটা রাখতে হবে, কীভাবে তাকাতে হবে!’ আর আমার দু’চোখ বেয়ে জল পড়ছিল! রুদ্র আর অজিতেশ দু’জনেই বললেন যে, ‘যদি এমন কাউকে দেখেন যে অভিনয় করতে পারে, যাকে দেখে আপনার মনে হচ্ছে যে… কেয়ার সাবস্টিটিউট বলছি না, কিন্তু কেয়ার জায়গায় আমাদের দলে আসতে পারবে…’ সেজন্য স্বাতীর কথা আমার খুব মনে হয়েছিল। স্বাতীর সঙ্গে আমার তখন ডিরেক্টলি আলাপের কোনও সুযোগ ছিল না, আমি তখন রুদ্রকে ফোন করলাম। রুদ্রকে জিজ্ঞেস করলাম যে, আমি একটা মেয়েকে দেখলাম তোমাদের দলের জন্য। তো রুদ্র বলল, ‘পাঠিয়ে দাও।’ তখন আমি আমার দিদিকে ফোন করলাম, যার মাধ্যমে আমি নাটকটা দেখতে গিয়েছিলাম। তারা যেহেতু এলাহাবাদের লোক আর ছোট থেকেই স্বাতীকে চিনত, তো আমি জিজ্ঞেস করলাম যে, ‘স্বাতীর কি ব্যাপার বল তো?’ ও বলল, স্বাতীর বিয়েটা ভেঙে গেছে, ও তাই মেয়েকে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে এলাহাবাদ। আমি বললাম যে, ‘মীরাদি (আমার দিদির নাম মীরা) ও কি অভিনয় করবে? যদি আমি নান্দীকারে ওকে আলাপ পরিচয় করিয়ে দিই?’ তখন দিদি বলল যে, ‘ও বেঁচে যাবে তাহলে।’ বুঝলাম যে ও মোটেও এলাহাবাদে ফিরে যেতে চায় না। তো তখন আমি বললাম যে, এই ফোন নম্বরে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে ও যেন আমার নাম করে যোগাযোগ করে। আমি তার বোধহয় মাসখানেক পরে জার্মানিতে আবার চলে গিয়েছিলাম একটা লম্বা কোর্স করতে। আমি ছ’মাস পরে ফিরে যখন খোঁজ করলাম, দেখলাম স্বাতী তখন বেশ ওয়েল এস্টাবলিসড। তখন ককেশিয়ান চক সার্কেলের বাংলাটা করছে ‘খড়ির গণ্ডি’ বলে। আমি দেখতে গেলাম ওই নাটক। তারপরে রুদ্রর সঙ্গে তো দেখা হলই, স্বাতীর সঙ্গেও দেখা হল। স্বাতীর সঙ্গে ওই তখনই আমার প্রথম আলাপ হল আর কী! এবার রুদ্রই পরিচয় করিয়ে দিল। তখন সোহিনী খুব ছোট। মানে চার পাঁচ বছর বা ছয় বছর এরকম। ছুটে ছুটে ছুটে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তারপরে যখন ওই ফ্রিটজ বেনেভিৎস এলেন, তখন রুদ্ররা ওদের থিয়েটারে গ্যালিলিওর অভিনয় করল, তখন আমি ওদের জন্য একটু কাজ করেছিলাম। ব্রেশটের ‘গ্যালিলিও’ নাটকের বাংলা করেছিলেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়। তবে উনি তো আর জার্মান জানতেন না, কাজেই ইংরেজি থেকেই অনুবাদ করেছিলেন। আমাকে রুদ্র অনুরোধ করেছিল যে, জার্মানটার সঙ্গে মিলিয়ে একটু দেখতে। তো সেদিন ওই সবক’টা দলের সঙ্গে রুদ্রর বাড়িতে বসে আমি পুরো নাটকটা পড়েছিলাম। মোহিতবাবু বাংলাটা পড়েছিলেন, আমি অরিজিনাল জার্মানটা নিয়ে যেখানে যা অল্পস্বল্প সাজেশন, তা বলেছিলাম। মোহিতবাবুর অনুবাদ খুবই ভালো হয়েছিল। যৎসামান্য যা কিছু ডেভিয়েশন খেয়াল করেছিলাম, সেগুলোই বলেছিলাম আর কী! আমি অবশ্য ‘চেতনা’-র অরুণ মুখার্জিকে চিনতাম। অরুণবাবুকে চিনতাম এই কারণে যে, আমি যখন পড়াচ্ছি তখন উনি একটা জার্মান ভাষার কোর্স করতে ম্যাক্সমুলার ভবনে আসতেন। আমার কাছে পড়েননি, কিন্তু পরিচয় একটু ছিল। তা বিভাসের (চক্রবর্তী) সঙ্গেও তখনই পরিচয় হয়, ওরা ছ’টা না সাতটা দল মিলে করেছিল ওই গ্যালিলিওটা।

আমি ফিরলাম ১৯৭২-এর শেষে, তারপরে বোধহয় ‘নটী বিনোদিনী’ করেছে ওরা। সময়টা মনে পড়ছে না, তখন ওরা রঙ্গনায় অভিনয় করছে। আগের মতো আমার কেয়ার সঙ্গে আর আড্ডা হত না, দেখাশোনা কমে গিয়েছিল। সে কারণেই বিবাহিতা কেয়া সম্বন্ধে আমার তেমন কোনও স্মৃতি নেই। তবে চিত্ত ঘোষের সঙ্গে যেহেতু বন্ধুত্ব তখনও ছিল, তাই কিছু কিছু খবর পেতাম। কেয়ার মৃত্যুর পরেও আমি বহুবার ভেবেছি কেয়ার মা-র কথা, কিন্তু আমি কিছুতেই মনস্থির করে ওই বাড়িতে আর কখনও যেতে পারিনি। কেয়া ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিল। কেয়া বয়সে আমার চেয়ে বছর তিনেকের জুনিয়র ছিল। ও পড়ত স্কটিশ চার্চে, আমি প্রেসিডেন্সিতে। আর তখন নানাবিধ ব্যাপার হত, যেমন, কোথায় ও ব্লাউজ করাতে যাচ্ছ, দর্জি কোথায় ওর, আমায় জানাত। আলাপও করিয়ে দিয়েছিল নিউ মার্কেটের কাছে লিন্ডসে স্ট্রিটে ওর দর্জির সঙ্গে। সেই সময় বোধহয় রুদ্রর সঙ্গে ওর সম্পর্কটা খুব ঘনিষ্ঠ কিছু ছিল না, মানে একটু ছাড়াছাড়ির মতো হয়েছিল বোধহয়। কারণ আমার মনে পড়ে না, রুদ্র সম্বন্ধে আমরা যে খুব কিছু আলোচনা করতাম বলে, অথচ রুদ্র আমাদের সমসাময়িক এবং ও তখন ইউনিভার্সিটিতে জেনারেল সেক্রেটারি ছিল। স্টুডেন্টস ইউনিয়নে রুদ্র তখন খুবই প্রতাপশালী এবং ওর সঙ্গে আমার অন্য বন্ধুদের যারা ইংরেজির এমএ ক্লাসে ওর সহপাঠী ছিল, তাদের ছিল খুবই বন্ধুত্ব।

কেয়া আমাকে নাটকের গান শোনাত, যখনই অজিতেশ একটা করে নতুন গান কিছু তোলাতেন। নান্দীকারের রিহার্সালে সেদিন কী ব্যাপার হল, সেইসব নিয়ে আলোচনা হত। একটা মজার ঘটনা মনে আছে, ও তো এদিকের, মানে পশ্চিম বাংলার বাসিন্দা ছিল। আমরা আদতে যশোরের লোক, কিন্তু যশোরের ভাষা একবর্ণও জানি না! আমি বাড়িতে কোনওদিন শুনিওনি, এমনকী ঠাকুমা পিসিমাদের মুখেও শুনিনি। কিন্তু একটা জিনিস আমরা জানতাম, পান্তাভাত খাওয়ার ব্যাপারটা। কেয়াকে বলায় ও বলেছিল যে, ও কোনওদিন পান্তাভাত খায়নি। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘পান্তা ভাত খাও না গরমকালে?’ ও বলল যে, ‘না না, পান্তাভাত খেলে কলেরা হয়।’ আমি অবাক, ‘সে আবার কী কথা! পান্তাভাত খেলে কলেরা হবে কেন?’ তারপরে মনে পড়ল, বিভূতিভূষণের একটা গল্প ছিল যে, এশিয়াটিক কলেরার সময় ভাতে সেই মাছি বসেছিল, একটি মেয়েকে উনি তা খেতে দেননি, কিন্তু মেয়েটি তা সত্ত্বেও পরের দিন কলেরায় মারা যায়। তখন উনি লিখছেন যে, ও যে মারা গেল এবং ওকে আমি ওর খিদের ভাতটা খেতে দিইনি– সেইটা মনে করে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আমার মনে হয় কেয়ার ওই অ্যাসোসিয়েশন ছিল পান্তাভাতের সঙ্গে, তাই আমি বললাম তুমি একদিন এসো তোমার কলেরা হবে না, তুমি আমাদের বাড়িতে খেতে এসো।

কেয়া খুব আবেগপ্রবণ ছিল, গল্প করতেও ভালোবাসত। সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ওদের অল্পদিন পড়িয়েছিলেন। তিনি সম্পর্কে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাদা। সুমন্ত তখন স্টেটসম্যানে কাজ করে, আর আমার এক বন্ধু ছিলেন, তিনি যদিও আর জীবিত নেই। প্রেসিডেন্সি কলেজের বন্ধু সোমদেব দাশগুপ্তও স্টেটসম্যানে কাজ করত। তখন আমি একবার কথার কথা বলেছিলাম যে, আমার বন্ধু কেয়া সুমন্তর খুব প্রশংসা করে। আমাদের একেবারে হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেত আর কী সুমন্তকে দেখলে। তা আমি বললাম, ‘তুমি কি দেখা করতে চাও? সোমদেব বললে কিছুই অসুবিধা নেই, তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাব ওকে।’ একদিন ওরকম দুপুরবেলা আমরা বোধহয় আড্ডা মারছিলাম, তো সোমদেব বলেই নিয়ে এসছিল। তা কেয়া বলল, ‘আমার বুকের মধ্যে ভীষণ প্যালপিটিশন হচ্ছে।’ আমি বললাম, ‘তুমি আর বাড়াবাড়ি কোরো না, যখন আসতে বলেছ তখন তো গিয়ে একবার দেখা করো।’ তারপরে অল্পক্ষণ বসেছিলেন, আমরা কী কথা বলেছিলাম মনেও নেই। শমীক আমাদের কলেজের চেনা ছিল, কারণ শমীক কলেজে আমার থেকে এক বছরের জুনিয়র ছিল। তবে বন্ধুত্ব ছিল না, বন্ধুত্ব পরের যুগে হয়েছে, অনেক পরে। আর ইদানীংকালে শমীককে বন্ধু বলতে পারি। এখন দেখা হলে গল্প হয় বিভিন্ন বিষয়ে। ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিল কেয়া, খুব সহজেই মানুষের সঙ্গে ইনভলভড হতে পারত। সেটা অনেক সময় ওর নিজেরই দুঃখের কারণ হত। আমি অনেকবার উপদেশ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, কারণ আমি তো বেশ উল্টো ধরনের ছিলাম, র্যাশনাল মানুষ বলেই মনে করতাম নিজেকে। অথচ কেয়া খুব সহজেই কান্নাকাটি করত, কেউ ওকে অবহেলা করছে এটা মনে করলে ও ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে যেত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved