

জীবনের প্রথম লক্ষ্য ছিল, নাকবোঁচা বাসের হ্যান্ডেলম্যান হবেন। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে বাসের এনজিন স্টার্ট দেবেন। সেই বাস গিয়েছে। হ্যান্ডেলম্যান পেশাও বিলুপ্ত। তাই প্রচ্ছদ করেন তিনি। ১১ বার জাতীয় সেরা প্রচ্ছদশিল্পী। ২৫ হাজারের বেশি প্রচ্ছদ করেছেন। তিনি ধ্রুব এষ।
সুনামগঞ্জের কথা মনে পড়ে?
মনে পড়ে কী, আমি তো সুনামগঞ্জেই থাকি। এই পুরানা পল্টন লাইনেও থাকি, সুনামগঞ্জের উকিল পাড়াতেও থাকি। সেখানে আমার ঘরের পাশে ডোবা, ডোবা ভরা জারমনি (কচুরিপানা)। জারমনির ফুল ডোবায় ফুটে থাকে। বাবা একদিন সেই ডোবা থেকে একটা ডাহুক পাখি ধরে ফেললেন। সেই দিনের রংটাই বদলে গিয়েছিল।
আপনার পিতা ভূপতিরঞ্জন এষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করে বাবা স্কুল থেকে রাসটিকেট হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে কংগ্রেস সুনামগঞ্জ মহকুমা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন কিছুদিন। এসব আমি অল্প কিছুদিন আগে মাত্র জেনেছি– সুনামগঞ্জের তরুণ গবেষক কল্লোল তালুকদারের বই পড়ে। এসব বিস্ময়কর এবং অচিন্ত্যনীয়। আমাদের শহরের পুরনো মানুষরা ‘ভালোমানুষ’ জানতেন বাবাকে। বাবা মদখোর ছিলেন। ঠান্ডা মদখোর। জীবনে টলতে দেখি নাই, হইহল্লা করতে দেখি নাই। নিঠান্ডা মানুষ। ওষুধের ব্যবসা করতেন, ফার্মেসি ছিল। সেই ফার্মেসির নাম ‘ন্যাশনাল ফার্মেসি’– স্বদেশি চেতনাজাত হয়তো। স্পষ্টভাবে সেসব কিছু জানার উপায় নাই আর।

আপনার প্রথম স্কুল সুনামগঞ্জের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়?
আমার প্রথম স্কুল রাজগোবিন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। মানুষজন ‘পাঠশালা ইশকুল’ বলত। নদীর পাড়ে ছিল বলে ‘গাঙপাড়ের ইশকুল’ বলত। মান্না, খোকন, পিঙ্কু, হরেকৃষ্ণ, মৃদুল, সুধাংশু, হরিধন, আমি– ছিলাম গাঙপাড়ের ইশকুলের ছাত্র। ওয়ান-টু পড়েছি। পরে আমরা জুবিলী স্কুলে ভর্তি হই। সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত। আসাম বেঙ্গলের প্রথম স্কুল ম্যাগাজিন আমাদের স্কুল থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। বাবা এই স্কুলে পড়েছেন, আমরা চার ভাই-ই পড়েছি। আমাদের বোন নাই। ওহ, সুধাংশু জুবিলী স্কুলে ভর্তি হয় নাই। সে ছিল একটা ছোট ইন্দ্রনাথ। টু-তে যখন পড়ে, বিড়ি ধরেছিল। ধরা পড়ে বেজায় মারধোর খেয়েছিল। কাজ হয় নাই। বরং লেখাপড়ার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে লেখাপড়াই ছেড়ে দিয়েছিল সে। আমরা যখন সিক্স-সেভেনে পড়ি, মদ ধরে ফেলেছিল, ‘মদখোর’ হিসেবে নাম করেছিল টাউনে। বেশিদিন বাঁচে নাই। নদীর পাড়ের সুপারিবাগানে মরে পড়ে ছিল এক জোছনা ও হিমের রাতে। আমি তখন চারুকলায় পড়ি। গাঙপাড়ের ইশকুলের বন্ধুদের মধ্যে হরেকৃষ্ণ, হরিধন, মৃদুলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ নাই। পিঙ্কুর সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ। মান্না ও খোকনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। রোজ সকালে, ঘুম থেকে উঠেই আমি একবার মান্নার সঙ্গে কথা বলি। দর্শনের অধ্যাপক মান্না। আর কিছুদিন পর রিটায়ার করবে। জুবিলী স্কুলের বেশিরভাগ বন্ধুর সঙ্গেই যোগাযোগ অব্যাহত আছে এখনও। ফরিদ, বাপি, শামীম, নাসের, অঞ্জন, রুমেন, তুষার, লিখন, সজল, কৃষ্ণ, রতন, মুস্তফা, কাওসার…। আমাদের মধ্যে একমাত্র রুমেন সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে কারাগারে আছে।

আপনার দুই মামা মুক্তিযোদ্ধা। সমীর কুমার সোম একাত্তরে শহিদ হয়েছেন। আরেকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহনলাল সোম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপনার লেখা বেশ কয়েকটি কিশোর উপন্যাস রয়েছে। এসব লেখার ভেতরে মামাদের কি কোনও ছায়া রয়েছে?
আমার মামাবাড়ি শ্রীমঙ্গল। স্কুল লাইফ, কলেজ লাইফে গিয়েছি। পরে আর যাওয়া হয় নাই। সে এক আশ্চর্য দৃশ্যপটের শহর। এই মনে হবে শহর কিছুটা অরণ্যের ভেতর ঢুকে পড়েছে, এই মনে হবে অরণ্য কিছুটা শহরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। রাস্তার ধারে প্রচুর কাঞ্চন ফুলের গাছ। আমার মা লীলা দাদুর বড় মেয়ে। শীতকালে দাদু জিপ গাড়ি পাঠাতেন। মেজমামা বা ছোটমামা আসত। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স তিন-সাড়ে তিন বছর। তার আগেও কি শ্রীমঙ্গল গিয়েছিলাম একবার? বড়মামা, মেজমামা নিয়ে গিয়েছিল? মনে পড়ে, মনে পড়ে না। সত্যি-মিথ্যা বলতে পারব না, শ্রীমঙ্গলের মানুষদের একটা কমন গল্প ছিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে নিয়ে। আইয়ুব খান শ্রীমঙ্গলের কোনও এক মাঠে ভাষণ দিয়েছিল– শ্রী মতলব সুন্দর, মঙ্গল মতলব হাম নেহি জানতা হ্যায়। মঙ্গল মতলব আইয়ুব খানের খুব জানার কথা আর কী! আমার দাদু সুধীরকুমার সোম। ছোটদাদু মানিকলাল সোম। শ্রীমঙ্গলে কেরু কোম্পানির গোডাউন আছে। দাদু কেরু কোম্পানির এজেন্ট ছিলেন। ছোটদাদু স্কুল শিক্ষক, কপালে রক্তলাল তিলক পরতেন, চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা, সেরকম দাড়ি-গোঁফ থাকলে কাপালিক মনে করতে পারতাম। বড়মামা দাদুর ছেলে, মোহনমামা ছোট দাদুর ছেলে। সমীরকুমার সোম, মোহনলাল সোম। বড়মামার ডাকনাম ছিল শিমুল। তারা দুই ভাই যুদ্ধে গিয়েছিল। মোহনমামা ফিরেছে, বড় মামা ফিরে নাই। রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েছিল। রাজাকাররা বড় মামার হাত টেনে ছিঁড়ে নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিশোর উপযোগী চারটা উপন্যাস আমি লিখেছি। আর কিছু গল্প। বড়মামা, মোহনমামা সব গল্প উপন্যাসে আছে। কোনও না কোনওভাবে আছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মায়ের সঙ্গে আমরা সিংলাছড়া চা বাগানে চলে গিয়েছিলাম কাকুমণির কাছে। বাবা যতটা পারেন ওষুধপত্র নিয়ে শরণার্থী শিবিরে থেকে গিয়েছিলেন। সিংলাছড়া চা বাগানে আখখেত ছিল। বড় বড় গাছ ছিল। শিয়াল ও কটার (কাঠবিড়ালি) আধিক্য ছিল। জয়বাংলার আরও মানুষ সিংলাছড়া চা বাগানে ছিলেন। আভাদি না রেবাদি মনে নাই– নদীতে আত্মাহুতি দিয়েছে শুনেছিলাম। খরস্রোতা নদীর পাড়ে তার গামছা-সাবান ইত্যাদি পাওয়া গিয়েছিল। আত্মাহুতি হতে পারে, স্নান করতে নেমে ভেসে গিয়েছিল হয়তো। কোনওটাই না। সেই আভা বা রেবাদি পালিয়ে গিয়েছিল তার প্রেমিকের সঙ্গে। ততদিনে আমারা জেনে গিয়েছি বড়মামা, মোহনমামা যুদ্ধে চলে গিয়েছে। মাকে চোখ মুছতে দেখি বারবার। গণকের খবর পেলে ধরে আনান, গণক যদি ভাইদের খবর দিতে পারে। গণকের সংখ্যা সেসময় বেড়ে গিয়েছিল। সেজদা (বাদল ভদ্র) একদিন এক গণক ধরে আনল। ইনি গণনা করেন কালিপোড়া দিয়ে। আমার হাতে কালিপোড়া দিলেন। সেই কালিপোড়ার মধ্যে আমি স্পষ্ট বড়মামাকে দেখলাম। কাঠের একটা চেয়ারে বসে আছে। চেয়ার ধরে এক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। শুধু আমি দেখলাম আর কেউ দেখল না। ‘আপনার এক ভাই আটকা পড়েছেন মা! ছাড়া পেয়ে যাবেন। আরেক ভাই নিরাপদে আছেন।’ গণক মাকে সান্ত্বনা দিয়ে দুই টাকা দক্ষিণা নিয়ে বিদায় হলেন। এই ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা আমার কাছে নাই। হুমায়ূন আহমেদকে বলেছিলাম। হুমায়ূন আহমেদ বিরক্ত হয়েছিলেন, ‘ব্যাখ্যা তোমার কেন দরকার? পৃথিবীর অধিকাংশ জিনিসেরই ব্যাখ্যা নাই, মানুষ ব্যাখ্যা করতে পারে নাই। বলছ তোমার বয়স তখন তিন বছর-সাড়ে তিন বছর, ওই বয়সে তুমি অবশ্যই তোমার মামাকে বানিয়ে দেখো নাই।’
আপনার মা লীলা এষ গার্লস স্কুলের শিক্ষক ছিলেন?
আমার মা তার ভাইবোনদের বড়দি। শ্রীমঙ্গলের একটা মেয়েদের স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন। এই সময় বেচারির বিয়ে হয়ে যায়। ১৯৬৫ সাল সেটা। দুই বছর পর আমি হয়ে যাই। চোখ-টোক ফোটার পর থেকে মাকে গল্পের বই পড়তে দেখেছি। দুপুরে গল্পের বই, রাতে গল্পের বই। আমাদের শহরের পাবলিক লাইব্রেরি– শহিদ জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সদস্য হলে বই বাসায় নিয়ে পড়া যায়। মা জগৎজ্যোতির সদস্য ছিলেন, পরে আমিও। তার আগে থেকেই মায়ের জন্য বই আনতে যেতাম জগৎজ্যোতিতে। মা বইয়ের নাম লিখে দিতেন। লাইব্রেরিয়ান মনোদা আলমারি ও র্যাকের নাম্বার বলে দিতেন। রেজিস্টার খাতায় এন্ট্রি করে বই নিয়ে আসতাম। বিচিত্র ধরনের বই পড়তেন মা। রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, শরদিন্দু, অবধূত, শঙ্কু মহারাজ, পরশুরাম, ত্রৈলোক্যনাথ। করোনা অতিমারির সময় আমি প্রোজেক্ট নিয়েছিলাম মা যেসব বই পড়তেন, সেসব কিছু বই পড়ব। পাব কোথায় তখন? ঘরে অবধৃতের ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ছিল, সেটা পড়েছি। মাত্র ৪১-৪২ বছর বয়সে ব্রেনস্ট্রোক হয়ে মা মারা যান। এটা আমি কখনওই মেনে নিতে পারি নাই। এখন আরও বেশি পারি না। আমার মায়ের আয়ু মাত্র ৪১-৪২ বছর! এটা একটা কথা!

আপনার কৈশোরে সুনামগঞ্জ শহরে সাহিত্যচর্চার পরিবেশ কেমন ছিল?
আলোকবর্ষ দূর অতীত মনে হয়– আমাদের শহরের অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ বই পড়ত। আমরা দলবেঁধে বই পড়তাম। ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ ছিল, রোমেনা আফাজ লিখতেন। সারা দেশের পোলাপান পড়ত, রোমেনা আফাজ এদেশের পোলাপানের ‘আপা’ ছিলেন। ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের বই আমরা দু’-তিনজন একসঙ্গে মিলে পড়তাম। রাশিয়ান বই সুলভ ছিল দেশে। ‘সেবা প্রকাশনী’র বই ছিল, ফেলুদা, কিরীটি, কাকাবাবু, গোগোল, কিকিরা ছিল, শারদীয় আনন্দমেলা, শারদীয় শুকতারা ছিল, সাপ্তাহিক কিশোর বাংলা ছিল– আমাদের জগৎটা ছিল রঙিন। আমাদের পাড়ার মিন্টু মামা ছিল কবি– জীয়ন কুমার দাস। মিন্টুমামার বইয়ের আলমারিতে শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, আল মাহমুদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার বই ছিল। আবুল হাসানের কবিতার বই ছিল। হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস ছিল। সেসব পড়েছি। চৌমোহনাকে আমরা বলি ‘পয়েন্ট’। উকিলপাড়ার পয়েন্ট, গার্লস স্কুলের পয়েন্ট এরকম। বাজারের পয়েন্টে বিউটি বুক হাউস ছিল। প্রোপ্রাইটার সোলেমান মিয়া। বিউটি বুক হাউস থেকে আমরা সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বই কিনতাম। সোলেমান ভাই কাগজে মুড়ে একদিন বাড়তি বই দিয়ে দিল। ‘এইটা কী বই? বাসায় গিয়া দ্যাখ, বাবু।’ বাসায় ফিরে সেই বই দেখে আমার অবস্থা গুরুচরণ! এটা কী বই? পিনআপ করা। খুলে পাতা ওল্টানোর সাহস হল না। গোপনে মৃদুলকে দেখালাম। মৃদুলদের বাসায় কোঠাঘর আছে। এক বিকেলে তাদের কোঠাঘরে বসে মৃদুল সেই ‘ভয়ংকর’ বই পাঠ করল, শামীম, আবেদীন, আমি শুনলাম। আমাদের কান গরম হল, শরীর শিনশিন করল। পিনআপ সেই বইয়ের নাম ছিল ‘নাভির নিচে কস্তুরী।’

সুনামগঞ্জ থাকাকালীন সময়েই লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন?
লেখক হিসাবে আত্মপ্রকাশ! করুণ ঘটনা। জুবিলী স্কুলে অ্যানুয়াল স্পোর্টস হত, বার্ষিক সাহিত্য, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হত। খেলাধুলা কিছু পারি না, দৌড়ে লাস্ট হই। ভূতে ধরল কি না– সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় গল্প-কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে জমা দিলাম। জুনিয়র গ্রুপ। তিনটেতেই ফার্স্ট হয়ে যাব, ভাবি নাই। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হল, মঞ্চে ডাকল, কবিতাটা পড়ে শোনাতে হবে। কী সর্বনাশ! মনে হল আমি কোনওখানে নাই। গলা শুকিয়ে কাঠ, বুক ধড়ফড়। মনে হল, স্কুলের সব ছাত্র চোখ গোল করে আমাকে দেখছে। কোনওরকমে কবিতা পড়ে নামলাম। আর এইসবে কোনওদিন না বাবা! কবিতা লিখব না! মঞ্চে উঠব না। আমার মঞ্চভীতি ভয়াবহ পর্যায়ের– সোশাল ফোবিয়া গুরুতর, অচেনা পরিমণ্ডলে স্বস্তি পাই না। কোনওদিনই না, এখনও না। তবে আমাদের শহরে কিছু আশ্চর্য মানুষ ছিলেন। তাঁরা আমাদের শহরের কবিকূল। মিন্টুমামার কথা বলেছি। আরও ছিলেন মুতাসিম আলী, মমিনুল মউজদীন, ইকবাল আহমদ কাজী, আশরাফ আহমদ, রোকেস লেইস প্রমুখ। ইজাজ আহমদ (ইতু) ছিলেন গল্পকার। এঁরা একটা সংগঠন করতেন– ‘আমরা কতিপয় তরুণ সাহিত্যসেবী’। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ‘আমরা কতিপয়’ সংকলন প্রকাশ করত– ‘আসুন শানিত হই’। বাদল সরকারের নাটক ‘অমর্ত্য বেদনা’ এঁরা মঞ্চস্থ করেছিলেন। দর্শনীর বিনিময়ে কবিতা সন্ধ্যা আয়োজন করেছিলেন এক মফস্সল শহরে। আমরা এঁদের প্রশ্রয় পেয়েছিলাম। ‘কিশোর শিবির’-এর জন্ম হয়েছিল! বিদ্যুৎকান্তি রায়, আপ্পাদা, ‘কিশোর শিবির’ পরিচালনা করতেন। ‘কিশলয়’ নামে আমরা নিয়মিত দেওয়ালপত্রিকা প্রকাশ করতাম। সাহিত্যসভা, স্টাডি সার্কেল হত। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘অভিযান’ আমরা মঞ্চস্থ করেছিলাম। মৃদুল, শামীম, নাসের, রুবিনারা অভিনয় করেছিল। মঞ্চে আমি কোনওখানেই নাই। দেয়ালিকা, পোস্টার এসব করতাম। কিশোর শিবির করতে করতে আমরা বড় হয়ে গিয়েছিলাম। কিশোর শিবিরের সভাপতি মৃদুল, সাধারণ সম্পাদক শামীম, সাংগঠনিক সম্পাদক নাসের, আরও কেউ কেউ প্রেমে পড়ে-টড়ে শ্যাষ! কিশোর শিবিরও শ্যাষ আর কী। ততদিনে পুঁজি, কমরেড লেনিন, সমাজতন্ত্র আমাদের মাথায় ঢুকে গিয়েছে, আমি যদিও কখনওই সক্রিয় রাজনৈতিক মানুষ না, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গিয়ে মনে করি ভালো হয় নাই। এটা আমার ভালো লাগে নাই। গর্বাচভকে নিকৃষ্ট ও বদমায়েশ লোক মনে হয়েছিল। প্রগতি প্রকাশন, রাদুগা প্রকাশনের দুয়ার এঁটে দিল হারামজাদা!

বইয়ের প্রচ্ছদের মতো আপনি গান রচনা করেছেন হাজার খানেক। এর মধ্যে কয়েকটি গান বেশ জনপ্রিয়। যেমন বন্ধুত্ব নিয়ে: ‘তুমি আমার পাশে বন্ধু হে, বসিয়া থাকো’। শৈশব নিয়ে ‘আয় মেঘ আয় ছেলেবেলা’। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েও গান লিখেছেন। সন্জীদা খাতুনকে নিয়ে: ‘তুমি দাঁড়াও আমার পাশে’ এবং ‘আজম খান’।
‘তুমি আমার পাশে বন্ধু হে’ কি আমার লেখা গান? গান মনে করে আমি লিখি নাই। এমনিই লিখে কনক আদিত্যকে দিয়েছিলাম। কনক আদিত্য সুর দিল। গান শুনলাম। ‘তুমি আমার পাশে বন্ধু হে’ গান। সেই গান প্রকাশ হল। মানুষজন শুনল। কনক আদিত্য পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিল। চারুকলার ছবির হাটে বসে তারা বানিয়েছে গানটা। তাতে কিছু সর্বনাশ হয় নাই। ঠিকই তো আছে। পরের সব গানও এইভাবে বানানো। শ’চারেক। সৌর বাপ্পা সুর করেছিল। সেসব বছর দশেক আগে তো হবেই। আরও আগেও হতে পারে। পথিক নবী এখন একটা গান করছে:
মায়ার মাগো মায়ার মা
তোমারে আর পাইলাম না
তুমি কি মেলার মাঠের ঘাস হইছো নি
তুমি কি ডাহুক পাখি ঘাস হইছো নি…
এই তো।
প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের পাঠক-লেখকদের কাছে আপনি সবচেয়ে জনপ্রিয়।
আমি শিল্পী না। দিনমজুর। প্রচ্ছদ বানিয়ে দুইটা ভাত খাই। আর কিছু পারলে সেটা হয়তো করতাম। আমার প্রথম এইম ইন লাইফ ছিল, নাকবোঁচা বাসের হ্যান্ডেলম্যান হব। হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে বাসের এনজিন স্টার্ট দেব। সেই ধরনের বাসই আর পৃথিবীতে নাই। হ্যান্ডেলম্যান পেশা বিলুপ্ত হয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদ বানানো ছাড়া আমি পেশাদারভাবে আর কিছু পারি না। প্রচ্ছদ বানানোর ধারণা কি আমি আমার শৈশব-কৈশোরের ভূগোল থেকে পাই? বৃষ্টির জন্মভূমির উষ্ণ হাওয়ার দিন থেকে পাই? পাই হয়তো।

চারুকলায় পড়ার বিষয়ে পরিবারের সায় ছিল?
মেট্রিক পাশ করেছিলাম বিজ্ঞান নিয়ে। কলেজে পড়তে চাই নাই। চারুকলায় পড়ব। ভূপতিবাবু ঢাকায় আসতে দিলেন না। বাধ্য হয়ে দুই বছর কলেজে পড়েছি। বাণিজ্য বিভাগ। ক্লাস-টাস করতাম না, নন কলেজিয়েট হয়েছিলাম, ফাইন দিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পাশ করেছিলাম। থার্ড ডিভিশন। ভূপতিবাবু আর বাধা দেন নাই, চারুকলায় ভর্তির অনুমতি মিলেছিল। টুপুরমামা পরে বলেছিল, ‘দাদার ধারণা ছিল তুমি ঢাকা গেলে হারিয়ে যাবে।’ ভূপতিবাবু আমার ছেলে হলে আমিও তার ব্যাপারে এভাবে ভাবতাম। এবং ঢাকায় আসতেই দিতাম না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে নিজের পছন্দের বিষয়ে পাঠ শুরু করলেন?
পছন্দ না, হিসাব করে ছাপচিত্র বিভাগে পড়েছি। নিজস্ব বিরাট বদমায়েশি ও ফাঁকিবাজি ছিল এর নেপথ্যে। কখনও যদি সময় পাই, লিখব। শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদ, কিবরিয়া স্যর, আলভী স্যর, মাহমুদুল হক স্যর, রোকেয়া সুলতানা লাভলী আপা সেসময় ছাপচিত্র বিভাগে ছিলেন। আলভী স্যরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। ওরে বাবা! আলভী স্যর না-থাকলে আমি বিএফএ পাশই করতে পারতাম না। কিন্তু স্যর আমার একটা বই এঁকে দিচ্ছেন না! পাণ্ডুলিপি দিয়ে রেখেছি। বাসায় গিয়ে একদিন ধরব এর মধ্যে। ছোটদের জন্য লেখা বইটা ‘ভুতু এষ’। আলভী স্যর এঁকে না-দিলে কোনও দিনই বই করব না।
আপনার সময় ক্যাম্পাসের পরিবেশ কেমন ছিল?
চারুকলার ক্যাম্পাসে যারা বিচরণ করে বেড়ায়, দ্বিতীয়বার শৈশব ফিরে পায় তারা। একথা আমি বহুবার বলেছি। এত মায়া পরতে পরতে। দল, রাজনীতি সব যার যার আছে, কিন্তু চারুকলায় ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই সব। উদাহরণস্বরূপ আলাউদ্দিন ভাই, রুস্তম ভাইয়ের কথা বলি। এই দু’জন মানিকজোড় বন্ধু– আলাউদ্দিন ভাই চারুকলা শাখা আওয়ামী ছাত্রলিগের সভাপতি, রুস্তম ভাই চারুকলা শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ছিল। কামাল ভাই এদিকে জাসদ ছাত্রলিগ। শ্যামলদা, অশোকদা ছাত্র ইউনিয়ন। অসুবিধা তো কিছু হয় নাই। বিশেষত শহিদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসে আমরা ছিলাম একান্নবর্তী পরিবারের মতো। দিবারাত্রি ফার্মেসির মতো দিবারাত্রি হোস্টেল ছিল শাহনেওয়াজ। কোনও না কোনও দল-উপদল সারারাত শাহনেওয়াজে সজাগ তো থাকবেই। আমি তিন নম্বর রুমে থাকতাম। শ্যামলদা, তুহিন ভাই, ডাবলু ভাই, মুকুল ভাই ছিল সিনিয়র, বিপুল, সন্তু, আমি বন্ধু। জুনিয়র ছিল মিলন, পরে সোহেল। বিখ্যাত রাজু ভাস্কর্যের ভাস্কর শ্যামলদা। তুহিন ভাই ভাস্কর ও গণসংগীত শিল্পী। হারমোনিয়াম বাজিয়ে রোজ গানের আসর বসাত সন্ধ্যায়:
ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না
নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন…
নিষ্কৃতি পেতে আলাউদ্দিন ভাই রুস্তম ভাইরা ষড়যন্ত্র (!) করে একদিন ককটেল মেরেছিল আমাদের রুমের সামনে। শহিদ শাহনেওয়াজ ভবন তিনতলা। ককটেল ফুটেছে তাতে তুহিন ভাই মোটেও বিচলিত হয় নাই। হারমোনিয়াম রেখে হনহন করে এক দুই তিনতলা টহল দিয়েছিল। অপরাধী শনাক্ত করতে পারে নাই। ফিরে আবার বসে গান ধরেছিল:
ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না
নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন..

আপনার প্রিয় খাবার?
খাবারদাবার নিয়ে অত বাছবিচার আমার কোনও কালেই নাই। যা পাই, তা খাই। মাত্রাতিরিক্ত প্রিয় ছিল একমাত্র শুঁটকি। ঢাকায় এসে সেই ’৮৬-’৮৭তে শুঁটকির জন্য প্রাণ আইঢাই করত, ঢাকার হোটেল-রেস্টুরেন্ট অত চিনতাম না, শুঁটকিও সহজলভ্য ছিল না। পিঙ্কুর বোন সেজদি এই সময় বিয়ে হয়ে এল ঢাকায়। আমার শুঁটকি ক্রাইসিস মিটল। কিছুদিন পর সেজদিরা চলে গেল কানাডায়। আমীরুল ভাই, মাযহার ভাই, শিরিন আপার সঙ্গে ততদিনে আমার খাতির হয়েছে। শুক্রবারে মাযহার ভাই শিরিন আপার বাসায় আমরা একত্রিত হই। সারাদিন থাকি, খাওয়া-দাওয়া করি। শুধু আমার জন্য শিরিন আপা শুঁটকি রান্না করতে শিখেছিল। মাযহার ভাই, শিরিন আপা এখন থাকে আমেরিকায়। আর শুঁটকি! আমার জন্য এখন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ শেষ হওয়ার পর, ঢাকার আবাস পর্বটা কেমন ছিল?
আমি পড়ালেখা শেষ করি নাই। মাস্টার্স ক্লাস দুই মাস করে হাওয়া হয়ে গিয়েছিলাম। এই সময় শামীম ভাই, তারা ভাই আর আমি বাসা নিই এলিফ্যান্ট রোডে। ৩৬৮ এলিফ্যান্ট রোড। চারতলা বিল্ডিং। পাগলামি– আমরা সেই বিল্ডিংয়ের ছাদও ভাড়া নিয়েছিলাম। আমরা ছাড়া কেউ ছাদে উঠতে পারবে না। এক্ষেত্রে বাড়িঅলা মামার ছেলে তানজিমের সহযোগিতা ছিল অপার। তানজিম, সামিহা– দুই ভাইবোনের সঙ্গে মহাভাব ছিল আমাদের। মিলিতা আসতেন। তারা ভাইয়ের পত্রপ্রেমিকা ছবি ‘আপা’ উপস্থিত হয়েছিলেন একদিন। রাতে ৩৬৮-র গেট পার হতে গিয়ে টুকু একদিন ফুটো হয়ে গিয়েছিল। তারা ভাই নিয়ে গিয়েছে হাসপাতালে, মহিলা ডাক্তার দেখে টুকু প্যান্ট খুলে ফুটো দেখাতে চায় না। কিন্তু না দেখিয়ে উপায় আছে না কি? সেসময় টুকুর নাম কিছুদিন ‘ফুটা টুকু’ ছিল।
শামীম ভাইয়ের কিছু লেখায় ৩৬৮-র বর্ণনা আছে। পৃথিবীর কত যুবা সেখানে তারা ভাইয়ের হাতের রান্না খেয়ে গিয়েছে। আমরা রেস্তোরাঁ দেব মনস্থ করেছিলাম, কিন্তু তারা ভাই যখন ডিমান্ড দিল রেস্তোরাঁয় ছয়টা এসি তো লাগবেই– আমাদের রেস্তোরাঁ স্থাপনার আগেই ভেঙেচুড়ে লীন হয়ে গিয়েছে ভূগর্ভে।
৩৬৮-তে অনেকে আসতেন। সাহিত্য জগতের, চিত্রকলা, নাটক, পত্রিকা জগতের। বাপি আসত, সায়ীদ ভাই আসত। বাপি, সায়ীদ ভাই ডাক্তার। বাপি আমার বাল্যবন্ধু। সায়ীদ ভাই বাপির সূত্রে আমাদের বন্ধু। বাপির সঙ্গে তারা ভাইয়ের প্রগাঢ় সখ্য হয়েছিল। ভানু গঙ্গোপাধ্যায়ের কৌতুকী আছে– ভাগনে গগনের বিয়ে দিতে যাচ্ছেন মামা। আমরা ক্যাসেট প্লেয়ারে শুনতাম। সর্বসম্মতিক্রমে তারা ভাইকে মামা, বাপিকে গগন হিসাবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছিল। ৩৬৮-র আমরা, এখনও যখন বাপির কথা আলোচনা করি, বাপি বলি না– ‘গগন’ বলি। সায়ীদ ভাই তার খণ্ডকালীন প্রেমিকাকে ডাকত, ‘প্রাণোনাথ’। প্রাণোনাথকে বসিয়ে রেখে চলে গিয়েছে একদিন দুপুরে। শামীম ভাই, তারা ভাই অফিসে। আমি একটা বই আঁকছিলাম। ‘প্রাণোনাথ’ দেখছিল বা দেখছিল না। সায়ীদ ভাই দেড়-দুই ঘণ্টা পর ফিরল, প্রাণোনাথের লগে কুছতা করছস না তুই? ‘কিতা করতাম?’ ‘আরে, ব্যাটা তাইরে তোর লগে রাখি গেলাম কেনে? তুই রে! একটা উটুল্লা!’

১৯৮৬ সালে, প্রথম প্রচ্ছদ মোশতাক আহমেদের ছড়ার বই ‘ছুটোছুটি’। আপনার করা দ্বিতীয় বইয়ের প্রচ্ছদ কোনটি?
দ্বিতীয় প্রচ্ছদের কথা মনে নাই। সম্ভবত ‘আক্কেল গুডুম’। আবরার হোসেনের ছড়ার বই। তিতু চৌধুরী একজন লেখক ছিলেন, তাঁর কয়েকটা বইয়ের প্রচ্ছদও একই সময়ে করেছিলাম। বইমেলায় তিতু চৌধুরী একক স্টল নিতেন। সৌম্যকান্তি মানুষ।
বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণের বিবর্তন, পরিবর্তনের আপনি একজন সাক্ষী। হাফটোন যুগ পার করে ব্লক যুগ। এরপর অফসেট যুগ থেকে কম্পিউটার গ্রাফিক্স। এখন এআই যুগ। কোন সময়কাল আপনার পছন্দের?
কাঠের ব্লক থেকে সিটিপি– এই আমার গণ্ডি। এআইকে হিসাবে নিতে চাচ্ছি না। এআই ফর ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বলে, আমার মনে হয় এআই ফর ‘এন্টি ইন্টেলিজেন্স’। কিছু বেকুব এআই দিয়ে পরাবাস্তব ছবি বানিয়েছে। দুয়েকটা দেখেছি। জঘন্য হয়েছে! আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায় গায়ের জোরে এসব সম্ভব হতে পারে, কিছু লোকাল গাধা এআই-কে সৃজনশীলতার ধর্মবাপ ডেকে বসে আছে বটে। কিছু হবে না। সৃজনশীল মৌলিক গ্রাফিক্স ডিজাইন এআই দিয়ে কোনও দিনই হবে না। সৃজনশীল কিছুই হবে না। না কি সৃজনশীল কৃত্রিমতা হবে? আরে! এআইকে একটা প্রশ্ন করলেই যেখানে পৃথিবীর এক ফোঁটা জল কমে যাচ্ছে, মানুষজনকে কি ভূতে ধরেছে, আমরা কোনওভাবেই আমলে নিচ্ছি না, পৃথিবীর কী সর্বনাশ আমরা করছি! মূল্য দিতে হবে। মূল্য সংযোজন কর-সহ মূল্য চুকিয়ে দিতে হবে এর।
আপনার প্রিয় প্রচ্ছদশিল্পী পূর্ণেন্দু পত্রীর সঙ্গে আপনার কখনও দেখা হয়েছে?
সেভাবে দেখা হয়েছে বলা যাবে না, তবে পূর্ণেন্দু পত্রীকে আমি দেখেছি। ঢাকায় এসেছিলেন। চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ’ প্রদর্শনী হয়েছিল। কথা বলতে সাহস পাই নাই। বাংলা গ্রন্থচিত্রণের জীবন্ত কিংবদন্তি পত্রীকে দেখছিলাম মাথায় ‘উলঙ্গ রাজা’র প্রচ্ছদ নিয়ে, ‘একা এবং কয়েকজন’-এর প্রচ্ছদ নিয়ে। ‘একা এবং কয়েকজন’ আমার সব সময়ের প্রিয় একটা প্রচ্ছদ। শুধু কিছু টাইপ আশ্চর্যজনকভাবে একা এবং কয়েকজন মানুষ হয়ে উঠেছে। অভিনব স্পাইন। কাইয়ুম স্যর, নবী স্যর, হাশেম স্যর, আলভী স্যর, কাজী হাসান হাবিব, খালিদ আহসান, কালাম মাহমুদ, সৈয়দ এনায়েত হোসেন, সমর মজুমদার, আফজাল হোসেন, প্রাণেশ মণ্ডল– এঁদের কাজ দেখেছি শিখেছি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলেন! পটুয়া কামরুল হাসানও! তুল্যমূল্য আছে সেসবের? আমার সব সময়ের প্রিয় আরেকটা প্রচ্ছদ ‘নকশী কাঁথার মাঠ’। পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের বিখ্যাত বই। প্রচ্ছদ: জয়নুল আবেদীন। আরেকটা প্রিয় প্রচ্ছদ ‘তিতাস একটি নদীর নাম।’ প্রচ্ছদ: খালেদ চৌধুরী।
সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, প্রণবেশ মাইতি, কৃষ্ণেন্দু চাকী, সুব্রত চৌধুরী, দেবব্রত ঘোষ– প্রচুর কাজ দেখেছি এঁদের। আমার মতো কম দক্ষতা নিয়ে মনে হয় আমার পূর্বসূরিরা কেউ হাত-পা ছড়িয়ে বইয়ের প্রচ্ছদ করতে বসে পড়েন নাই!

সেরা প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ১১ বার পুরস্কার পেয়েছেন। প্রথম ও দ্বিতীয়বার পুরস্কার পান ‘ফাগুনের গান’ ও ‘ইস্টিশনের মিষ্টি কূল’ বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য। দুটোই ছোটদের বই।
পুরস্কারের কথা থাক। অস্বস্তি লাগে। আমার ভয়াবহ মঞ্চ ভীতি, সোশাল ফোবিয়ার কথা বলেছি। কে হায় হৃদয় খুঁজে সেই ‘ভীতি’ জাগাতে ভালোবাসে?
আপনি এ পর্যন্ত প্রায় তিরিশ হাজার বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন?
সংখ্যাটা ২৫ হাজারের মতো হবে।
আমাদের জনপ্রিয় লেখকদের প্রকাশিত বইয়ের প্রায় সব প্রচ্ছদই আপনার করা। শুধু হুমায়ুন আহমেদেরই আড়াইশোর অধিক বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। এরকম আর লেখক আছেন?
ইমদাদুল হক মিলন। মিলন ভাইয়েরও আড়াই শতাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ আমি করেছি। আর কারও এত হয়তো করি নাই, তবে আমাদের সময়ের অধিকাংশ লেখকের অধিকাংশ বইয়ের প্রচ্ছদই আমি করেছি। কেউ হয়তো ২০টা বই লিখেছেন, আমি তাঁর ১৩টা বইয়ের প্রচ্ছদ করেছি, কেউ হয়তো ৫০টা বই লিখেছেন আমি তাঁর ৩২টা বইয়ের প্রচ্ছদ করেছি।
টানা চার দশক ধরে প্রচ্ছদ করছেন। দীর্ঘ এই জার্নির নেপথ্যে কোন রহস্য রয়েছে?
চরৈবেতি। জার্নি মাত্রই রহস্যময়। আমি জানি না, কীভাবে কী!
আপনার প্রিয় লেখকদের নিয়ে কিছু বলুন?
আমার প্রিয় লেখকের সংখ্যা অনেক। মাহমুদুল হকও প্রিয়, রসময় গুপ্তও প্রিয়। জীবনানন্দ, এলান পো অবসেশন পর্যায়ের। এলান পো আমি অনুবাদ পড়েছি। অনেকবার পড়েছি। জীবনানন্দ। আমার দুইবার হার্ট অ্যাটাক হল। মরে যেতে পারতাম, মরি নাই, মনস্থির করেছিলাম আর যে-ক’টা দিন আছি কেবলমাত্র জীবনানন্দের গল্প এবং উপন্যাস পড়ব। বারবার পড়ব। ‘পৃথিবীটা শিশুদের নয়’ ১১২-১৩ বার পড়ব।

রোমেনা আফাজের জনপ্রিয় ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের কথা বলেছি, আমাদের কৈশোরের প্রিয় পাঠ্য। একটু বড় হয়ে ‘মাসুদ রানা সিরিজ’ কাজী আনোয়ার হোসেনের স্পাই থ্রিলার। এরকম থ্রিলার বাংলাভাষায় আর লেখা হয় নাই। হুমায়ুন আহমেদের সব বই আমি পড়েছি। মুদ্রিত প্রতিটা অক্ষর।
আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এরই মধ্যে অর্ধশত ছাড়িয়েছে। আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা রয়েছে?
না। আমি কে? আমি কেন আত্মজীবনী লিখব? তবে আত্মজীবনী পড়ি। প্রিয় একটা আত্মজীবনী হল ‘সবারে আমি নমি’।

ঢাকাকে কি শিল্পসহায়ক নগরী মনে করেন?
অবশ্যই। দ্বিতীয় কথা নাই।
ঢাকা শহরে আপনার আপনজন ছিলেন কথা সাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী। আর কাদের কথা বলবেন?
আমাদের বইপাড়া বাংলাবাজার। বুলবুল ভাই থাকতেন একদিন থেকে বাংলাবাজারের দোরগোড়া বা প্রবেশপথের কাছে। বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গ ও আহ্লাদ পেয়ে আমার ছাত্রজীবন থেকে অধিকাংশ সময়ই পুরান ঢাকার নানা আবহে কেটেছে। পরিতোষ সেনের ‘জিন্দাবাহার’ বইয়ের ছিটেফোঁটা পুরান ঢাকা আমি দেখেছি– মাহবুব রেজা বলে গাড়া-গল্পর। আমার একটা ফিকশন আছে, ‘আমার একজন মানুষ’। বুলবুল ভাইকে নিয়ে লিখেছি। বলতাম বুলবুল ভাই আমার বাপ, মা, খালা, চাচা, ফুফা, ফুফু, মামা, দাদা– সবকিছু। বুলবুল ভাই ‘টুকা কাহিনী’র লেখক। ‘টুকা কাহিনী’ গল্পগ্রন্থ। বাংলাদেশের গ্রামের এক নিবিড় আশ্চর্য কথন। বাংলাদেশের গ্রাম, কেঁচোখোড়া মাটি, কুইচ্চার মাংসের সোয়াদ আছে ‘টুকা কাহিনী’ বইয়ের গল্প-গল্পান্তরে।
বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে কতখানে গিয়েছি। পাড়ায়, মেলায়। মায়ার মাকে দেখেছি। শওকত আলী স্যরের ছাত্র বুলবুল ভাই। শওকত আলী স্যরের বাসায় বহুবার গিয়েছি। শওকত আলী স্যর একদিন একটা মোটা বই উঠিয়ে আমাকে মারতে নিয়েছিলেন। শওকত ওসমান, এখলাস উদ্দিন আহমেদ, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, দ্বিজেন শর্মা, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, ইমদাদুল হক মিলন, হেলাল হাফিজ, সেলিনা হোসেন, রফিক আজাদ, আনোয়ারা সৈয়দ হক, বেলাল চৌধুরী– নাম করে শেষ করতে পারব না, যাদের দেখেছি এবং নৈকট্য পেয়েছি।
বিপ্রদা (বিপ্রদাশ বড়ুয়া) কলকাতায় পড়ে আছেন। ডিমেনশিয়া। বিপ্রদাকে আমরা বলতাম ‘বৃক্ষদাদা’, ‘গোত্রপিতা’। এখন আর বলি না? কত ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা তার বুকপকেটে আমরা জমা করে রেখেছি আমাদের গোত্রপিতা মনে করতে পারেন না আর।

মাসুক হেলাল, উত্তম সেনের সঙ্গে আমার সখ্য দীর্ঘদিনের। মাসুক ভাই করিৎকর্মা, উত্তমদা করিবকর্মা। তবে উত্তমদা মনে হয় অবতার-টবতার। তরলদা রূপে বিরাজমান আমাদের মধ্যে। বুলবুল ভাইয়ের বন্ধু হাকিম ভাই। রহস্য লেখক শেখ আবদুল হাকিম। আমাদের একটা তাসের আড্ডা ছিল। বুলবুল ভাই, হাকিম ভাই, মাহবুব রেজা, আমি- শুক্রবারে তাস খেলতাম। বুলবুল ভাই নাই, হাকিম ভাই নাই, আমরা আর তাসের প্যাকেট কিনি না।
হরিহর আত্মা ছিলেন বুলবুল ভাই, হাকিম ভাই। বুলবুল ভাই যেদিন সকালে মারা যান, হাকিম ভাই সেদিনই দুপুরে মারা যান। হার্ট অ্যাটাক হয়ে আমি যখন দ্বিতীয় দফা হাসপাতালে ছিলাম বুলবুল ভাইকে পরোক্ষভাবে দেখেছি স্বপ্নে। ধারাবাহিক ছিল স্বপ্নটা। তিনবারে দেখেছি। প্রথমবার: সাদা রঙের একটা একশোতলা বিল্ডিং। নির্জন বিল্ডিং। একদম একশতলার পুব কোনার ঘরটা আমি দেখছিলাম। দ্বিতীয়বার: ছোট ছোট ঢেউঅলা এক নদীর পাড়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি। নদীর ওপারে বন। মনে হচ্ছিল বনের ধারে কাছে কোথাও সেই কুঞ্জলতায় ছাওয়া সাদা বিল্ডিংটা আছে। তৃতীয়বার: আমি সেই বনে দাঁড়িয়ে আছি। স্নিগ্ধ সবুজ বড় অনেক গাছ। সত্যি মনে হয়েছিল সেই কোনও একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে স্টিক বা জয়েন্ট বানাচ্ছেন বুলবুল ভাই, এখনই প্রকাশিত হয়ে বলবেন, ‘লন মিয়া, ধরান।’
কাজী আনোয়ার হোসেন ও সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?
কলকাতার অনেক গোয়েন্দা আছেন, ব্যোমকেশ, কিরীটী, ফেলুদা, কর্নেল, কিকিরা, গোগোল। আমাদের ছিল স্পাই মাসুদ রানা। একমেবাদ্বিতীয়ম। এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের একমাত্র স্পাই থ্রিলার সিরিজ। স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন। আমাদের কাজীদা। সেবা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, রহস্যপত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ১৯৮৭-র অক্টোবরে আমি রহস্য পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হই। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলাম। বিযুক্ত হয়েছি। সেই সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে আমার আর সম্পর্ক নাই। কাজীদা নাই। সেবা প্রকাশনী সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে আছে শুনেছি। এটা খুবই হৃদয় বিদারক। বাংলা পেপারব্যাক প্রকাশনার সেরা উদাহরণ অবশ্যই সেবা প্রকাশনীর বই। প্রোজেক্ট করে না, এটা সেটা বুলি কপচে বিদেশি ফান্ড জোগাড় করে না, কাজী আনোয়ার হোসেন পেপারব্যাক প্রকাশনা সংস্থা করেছিলেন, সস্তায় ভালো বই পড়াবেন পাঠককে। আজীবন সেই কাজটা করে গিয়েছেন। সেবার যে কোনও বইতে লেখাই থাকত, সেবা বই প্রিয় বই অবসরের সঙ্গী। যদিও অবসরের সঙ্গীর চেয়েও বেশি কিছু ছিল সেইসব বই। সব গিয়েছে বা আছে। কী একটা বাহাদুরি আমার ছিল– কাজী আনোয়ার হোসেন, হুমায়ুন আহমেদ দুই জনেরই স্নেহধন্য আমি, আমার মতো কেউ আর আছে? সব গিয়েছে।
আজম খান কীভাবে আপনাকে প্রভাবিত করেন?
আজম খান আমার ‘ইনফ্লুয়েন্সার’। সব সময়। আমাদের সময়ের ‘গুরু’। মুক্তিযোদ্ধা, গায়ক। পপসম্রাট, রক সম্রাট। খাঁটি বাংলাদেশি সৃজনশীলতার বৃক্ষরোপণকারীদের একজন। ২০-২১ বছর বয়সের একজন তরুণ, মুক্তিযুদ্ধ করে ফিরেছে, গান করত, তার হঠাৎ কেন মনে হবে গিটার ড্রামস বাজিয়ে সে বাংলা গান করবে। এবং এভাবে: ওরে সালেকা/ওরে মালেকা/ওরে ফুলবানু পারলি না বাঁচাতে। এবং এভাবে: আলাল ও দুলাল/ আলাল ও দুলাল/তাদের বাবা হাজী চান। একদম নতুন এই ব্যাপারটা। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের হৃদয় হতে উঠে আসা উচ্ছ্বাসের মতো। এই মানুষটার মূল্যায়ন এখনও বিন্দুমাত্র হয় নাই। লিট্ল ম্যাগ করেন দুই-একজন বন্ধুর সঙ্গে আমি কথা বলেছি, আজম খানকে নিয়ে সংখ্যা করেন। তারা বলেছেন, লিখবে কে? কেউ না কেউ একদিন নিশ্চয়ই লিখবে।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। তাঁর একটি কবিতার বই আপনাকে উৎসর্গ করেছেন। এবং আপনি তাঁর একটি সিনেমার পোস্টার ডিজাইন করেছেন।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ঢাকায় এসেছিলেন। ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ ছবি নিয়ে। জাতীয় জাদুঘরের অডিটোরিয়ামে শো ছিল। পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। টোকন (কবি টোকন ঠাকুর) ওঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রেখেছিল। পরদিন সকালে আমরা কারওয়ান বাজারের লা ভিনচি হোটেলে উপস্থিত হই। বুদ্ধদা আমাদের জন্য ১৫ মিনিট সময় বরাদ্দ রেখেছিলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ১৫ মিনিটে সেই ‘১৫ মিনিট’ অতিক্রান্ত হয়েছিল। বুদ্ধদার জীবদ্দশায় প্রকাশিত তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ভূতেরা কোথায় থাকে’– আমীরুল ইসলাম এবং আমাকে উৎসর্গ করেছেন। বুদ্ধদার ছবি ‘উড়োজাহাজ’-এর আন্তর্জাতিক পোস্টার আমি করেছি। বুদ্ধদার যে কোনও ছবি আমি অনেকবার দেখি। সবচেয়ে বেশি দেখেছি ‘চরাচর’। লখার অন্য গ্রহের পাখিতত্ত্ব মাথা থেকে যায় না। সর্বশেষ ‘আনোয়ার কা আজব কিস্সা’ দেখেছি। হাট্টিমাটিম টিম গেঁথে আছে মাথায়। আবার দেখব।

অমর একুশে বইমেলার মাঠে সচরাচর আপনাকে দেখা যায় না। কারণ কী?
বইমেলার শেষদিন পর্যন্ত প্রচ্ছদ বানাই। বহু বছর ধরে মেলার মাঠে যাই না।
হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে প্রথম কবে দেখা হয়েছিল?
দিন-তারিখ মনে নাই। অবসর প্রকাশনা সংস্থার স্বত্ত্বাধিকারী আলমগীর রহমানের বাসায় দেখা হয়েছিল। আমার বন্ধু শুভ আর আমি আলমগীর ভাইয়ের কাছে গিয়েছিলাম। আলমগীর ভাই স্বহস্তে হুমায়ুন আহমেদকে কফি বানিয়ে দিতে ব্যস্ত ছিলেন। হুমায়ুন আহমেদ আমাদের নাম পরিচয় ইত্যাদি জিগ্যেস করেছিলেন। কাজ করি, টাকা পাই কি না– এসব।
হুমায়ুন আহমেদ আপনাকে ‘শুভ্র’ নামে ডাকতেন…
এটা খেয়াল। কিছুদিন ‘শুভ্র’ বলে ডাকতেন। ‘শুভ্র’ ওঁর কিছু বইয়ের একটা চরিত্র।
হুমায়ুন আহমেদের জীবদ্দশাতেই তাঁর আড়াইশতাধিক বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন?
তিন শতাধিক। নির্বাচিত রচনা, রিপ্রিন্ট এসব মিলিয়ে।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর ‘পিপলী বেগম’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি পড়তে দিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কি পিঁপড়া আঁকতে পারো?
পিঁপড়া আঁকা কি সহজ? এজন্য হয়তো। আসলে তা না। আসলে আলমগীর ভাই, হুমায়ুন আহমেদের বন্ধু প্রকাশক, হুমায়ুন আহমেদকে বলেছিলেন, এখনকার ছেলেপিলেরা ড্রয়িং পারে না। ড্রয়িং বিষয়ে আমাদের এখানে বিচিত্র ধারণা আছে মানুষের। স্কুল লাইফে আম ড্রয়িং করার ব্যাপারটা সম্ভবত অনেকের মাথা থেকে যায় না।
হুমায়ুন আহমেদের কিছু প্রচ্ছদ করেছিলেন। যে বইগুলো লেখা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয় নাই।
কয়েকটা প্রচ্ছদের কথা মনে করতে পারি। ১. রুমিং হাউস ২. তুচ্ছ কথামালা ৩. কী সর্বনাশ! ৪. এই ছেলেটা ভেলভেলেটা আমাদের বাড়ি যাবি ৬. পিঙ্গল আকাশ। তৃতীয় ও চতুর্থ বইটা ছোটদের জন্য লেখার কথা ছিল। হুমায়ুন আহমেদের ছোটদের লেখা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না। সেরা সব লেখা লিখে রেখে গিয়েছেন।
আগুনের পরশমণি সিনেমার মূল চরিত্রে আসাদুজ্জামান নূর অভিনয় করেছেন। সেই চরিত্রে অভিনয় করার জন্য হুমায়ূন আহমেদ প্রথমে আপনাকে নির্বাচন করেছিলেন।
আমার ফোবিয়ার কথা বলেছি। হুমায়ুন আহমেদ যখন অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে ‘আগুনের পরশমণি’ ছবির বদিউল আলম চরিত্রে অভিনয় করার কথা আমাকে বললেন আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। ‘স্যর, আমি কখনও অভিনয় করি নাই!’ হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘তাতে কী? আমিও কখনও সিনেমা বানাই নাই।’ ‘কিন্তু আপনি যখন লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন বলবেন, আমি অজ্ঞান হয়ে যাব!’
লিখিত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: কামরুল হাসান মিথুন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved