Blue Tick Off: The Problem with Silent Messages | Robbar
Robbar
  • ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টিক দিয়ে যায় চেনা

অন্য ব্যক্তি দেখেছে, তাও কেন উত্তর দিল না এখনও? অথবা দেখেছে, সেটা কেন আড়াল করে রেখেছে ধূসরে– এই প্রশ্ন দু’টিই ডিজিটাল পুঁজিবাদের অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা। ব্যস্ত মুঠোফোনের পর্দা ও আপনার অতিব্যস্ত আঙুল– আপনাকে প্রতি মুহূর্তে উৎসাহিত করেছে আপনার সবকিছুকে সারাক্ষণ সম্প্রচারিত করতে এবং করেই যেতে। সদা মগ্ন থাকতে। 

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ১৮:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

এই কিছুদিন আগে, এক বন্ধুর সঙ্গে ডিজিটাল আদানপ্রদানের একটি তুচ্ছ প্রসঙ্গ নিয়ে খানিক মতান্তর তৈরি হল। তুচ্ছ বলাটা ঠিক হচ্ছে কি না জানি না। আমার কাছে যা তুচ্ছ, তা অন্যের কাছে নাও হতে পারে, বন্ধু হলেও না।

সে জানতে চাইল: তুমি কি ব্লু-টিক বাতিল করেছ?

আমি নির্দ্বিধায় বললাম: হ্যাঁ, করলাম সম্প্রতি। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার এই দুই দাগের নীল।

এই ব্লু-টিক-হীনতা কি তোমায় মানায়? ধূসর টিকের উপকারিতা কী?

zoom

হোয়াটসঅ্যাপ-এর বার্তা যাকে পাঠানো হয়েছে, সে দেখেছে কি না সেটা যাচাইকরণের উপায় এই নীল টিকচিহ্ন। নীল টিকচিহ্ন এক সংকেত যা আমাদের নিশ্চিত করে জানায় যে, অন্য মানুষটি দেখেছে যা দেখার। ক্রেতার হাতে বিকল্প আছে সেটিকে বদলে ধূসর টিকচিহ্ন করে দেওয়ার। তাহলে আর অন্য ব্যক্তি জানতে পারবে না আমি দেখেও উত্তর দিচ্ছি না; না কি আমি দেখিইনি এখনও। আমার ইচ্ছেমতো আমি ধূসর বেছে নিয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্য। তাতে আমার বন্ধুর বিন্দুমাত্র অনুমোদন না থাকায়, সে বিরক্ত হয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে জানতে চাইল – ‘ধূসরের উপকারিতা

zoom
টিকের রকমফের

আমি তর্কে গেলাম– “ওদের এই দুই রঙের পার্থক্যই মুছে ফেলা উচিত। সেই সঙ্গে বার্তা ডিলিট করলে, সেটার বিজ্ঞপ্তিও বাদ দেওয়া উচিতযা অন্য ব্যক্তিকে উসকে দেয় এটা জিজ্ঞেস করতে যে, কী ডিলিট করা হয়েছে। আর বিনিময় করতে চাই না বলেই তো তার অপসারণ হয়েছেসম্ভবত অন্য ব্যক্তির সেটা চোখে পড়ার আগেই। অযথা সেটা জানানোর মানেটা কী? নীল টিকচিহ্ন আর এই ডিলিট বিজ্ঞপ্তিদুইই বেশ অনধিকার প্রবেশকারী।

সে এই উত্তরে তেমন প্রসন্ন হল না, “নাচতে এসে ঘোমটা পরার মতো হয়ে যাচ্ছে না ব্যাপারটা? এত আড়ালের প্রয়োজন কীসের?

অনেকক্ষণ ভাবলাম এই বিদ্ধ-করা প্রশ্নটা নিয়েএত আড়ালের প্রয়োজন কীসের? এই আড়াল কি আমার বা আপনার ন্যায্য বা কাম্য অধিকার নয়? যান্ত্রিক বা প্রযুক্তিগতভাবে সমন্বিত আমাদের বার্তালাপ, কবে থেকে এতটা তাৎক্ষণিক হয়ে উঠল? নীল দাগ পড়েছে, তৎসত্ত্বেও অন্য ব্যক্তি, এখনও এক মিনিট পরে বা এক ঘণ্টা বাদে বা একদিন পরেও উত্তর দেয়নিসে এতটাই নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বা ব্যস্ত মনে করে আর আমাকে এতটাই অবজ্ঞা? এই কল্পিত উপেক্ষার বোঝা টেনে, আমরা কোথায় চলেছি? এই আত্ম-অতৃপ্তি নিয়ে সভ্যতা ও সমাজ কোনদিকে এগচ্ছে? ভাবলাম এসব নিয়ে অনেকক্ষণ। এখনও ভাবছি, লিখতে-লিখতে।

রং প্রতীকী। সেটা কেবল একটা দৃশ্যগত সত্য নয় বরং আরও নানাভাবে অর্থপূর্ণ। এক্ষেত্রে নীল মানে: দেখেছে। নিশ্চিত দেখেছে। চূড়ান্ত নিশ্চয়তা প্রদানকারী। আর ধূসর স্বভাবতইদ্ব্যর্থক; অস্পষ্ট; যার একাধিক অর্থ হতে পারে। হয়তো দেখেছে। হয়তো না। হয়তো পরে উত্তর দেবে। হয়তো এখন ব্যস্ত। হয়তো গুরুত্বের তালিকায় আমি এতটা উপরে নেই যে সবসময় তৎক্ষণাৎ উত্তর আসবে। হয়তো ঘুমিয়ে। হয়তো অন্য কারও সাথে। হয়তো মন খারাপ। হয়তো শরীর। একাধিক অর্থ হতে পারে।

zoom

কী কী অর্থ হতে পারে, সেই সুদীর্ঘ তালিকা দীর্ঘায়িত করে লাভ নেই। কিন্তু বার্তা দেখলেই, তৎক্ষণাৎ উত্তর দেওয়ার প্রবণতা বা উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা কেন? ‘আড়ালের প্রয়োজন কীসের’– এই প্রশ্নটাকে একটু পালটে দিলে কেমন হয়? বার্তাটা দেখলেও, সেটা যে দেখেছিতা কি নীল দাগে দেখানোর আদৌ কোনও সামাজিক বা ব্যক্তিগত দায় আছে আমার-আপনার? যে বিষয়ে এতক্ষণ ভাবছি, সেটা তো লিখিত কথোপকথন। লেখনীর প্রারম্ভকাল থেকেই তো লিখিত আদানপ্রদানের মাঝে রয়েছে বিলম্ব, বিরতি, অপেক্ষাতা সে চিঠি হোক, বা ইমেল, বা এসএমএস। মৌখিক কথায় না হয়, তৎক্ষণাৎ উত্তর না-দেওয়াটা অভদ্রতা।

জবাবদিহির এই প্রত্যাশা, আমাদের কতটা ভাবায়? আমাদের বলতে, তাদের কথা বলছি যারা এই নতুন যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অভ্যস্ত। না কি, না ভেবেই, সেটাকে আমরা ইতিমধ্যেই আত্মস্থ করেছি? মেনে নিয়েছি? আপস করেছি এবং করেই চলেছি? বা চুক্কি দেওয়ার ফাঁকফোকর খুঁজে চলেছি অনবরত?

অন্য ব্যক্তি দেখেছে, তাও কেন উত্তর দিল না এখনও? অথবা দেখেছে, সেটা কেন আড়াল করে রেখেছে ধূসরেএই প্রশ্ন দুটিই ডিজিটাল পুঁজিবাদের অভ্যন্তর থেকে উঠে আসা। ব্যস্ত মুঠোফোনের পর্দা ও আপনার অতিব্যস্ত আঙুলআপনাকে প্রতি মুহূর্তে উৎসাহিত করেছে আপনার সবকিছুকে সারাক্ষণ সম্প্রচারিত করতে এবং করেই যেতে। সদা মগ্ন থাকতে। মনোযোগের বা অমনোযোগের সিংহভাগ স্ক্রিনে জমা রাখতে। এমনই এই আকর্ষণ।

zoom
কে কাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে তা নির্ণয় করছে মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপ

আর এমনই এই চিত্তবিক্ষেপ যে তার চাপে, আমার ভুলতে বসেছি, আড়াল আর আরামেরও প্রয়োজন ছিল বা আছে। মালিক, পরিবার, প্রতিবেশী, বন্ধুএদের সকলের কাছেই, সর্বদা সহজলভ্য হতে শিখিয়েছে বাড়ি-বাজার-প্রযুক্তি-র ত্রিভুজ। ইচ্ছে থাক বা না-থাক, সদা উপলব্ধ থাকতে হবে। নিজের বলে যতটুকু অবশিষ্ট, সেটাকে আর কোনও দাগ দিয়ে ঠিক চিহ্নিত করা যাচ্ছে কি?

এতটাই অসহায় ও নিরাপত্তার অভাবে বিপন্ন ও বিচ্ছিন্ন যে নীলের ধূসর হওয়াটাকে অনৈতিক মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আরেকটা মানুষ কেন সব কিছু দেখাবে না? দেখে তৎক্ষণাৎ উত্তর দেবে না; আবার দেখেছে যে সেটাও আড়ালে রাখবে? অন্যান্য নজরদারির সঙ্গে তাল মিলিয়ে, এই সদা-কৈফিয়তের ভারে, আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি নিজেদের গণ্ডি। ভুলে যাচ্ছি যে আড়ালটা স্পর্ধা নয়, নিঃসঙ্গতার অধিকার।

পালটে যাচ্ছে ধৈর্যহীন ও অস্থির আদানপ্রদানের শর্ত। তাৎক্ষণিক এবং ক্ষণস্থায়ীর দাপটে, সামান্য আত্মতৃপ্তির রং নীল আর আড়ালের অধিকার উধাও। মনোযোগের মাত্রামাত্র কয়েক সেকেন্ড। ডিজিটাল অদৃশ্যতা অস্তিত্বসংকটে পরিণতবাজারের ইচ্ছেমতো। দৃশ্যই যেখানে মূল মুদ্রা; অদৃশ্যতার সেখানে কোনও ঠাঁই নেই।

Blue Tick Digital Fortress Invisibility Politics Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Whatsapp

Share this article on