

মহাকাশে যখন আবর্জনার টুকরো পৃথিবীর চারদিকে চক্কর কাটার সময় কোনও রকেট বা স্যাটেলাইটের সঙ্গে টক্কর লাগে, তখন ছোটখাটো টুকরো ছিটকে পড়তে পারে। কারণ কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর কক্ষপথে ঘোরার গতিবেগ প্রচণ্ড বেশি। সেকেন্ডে (ঘণ্টায় নয়) প্রায় দশ কিলোমিটার! ফলে সেক্ষেত্রে দুর্ঘটনার মাত্রাও হয় মারাত্মক। এই গতিতে একটি এক-সেন্টিমিটার মাপের স্টিলের স্ক্রু এসে কোনও স্যাটেলাইটের গায়ে এসে পড়লে যা হবে তা একটা ছোটো গ্রেনেড ছোড়ার সমান!
দেড় বছর আগেকার কথা। দুপুরবেলা। কেনিয়ার এক ছোট গ্রামের লোকজন বিশ্রাম করছিলেন। হঠাৎ জোর আওয়াজ এল ধপাস করে কিছু একটা পড়ার। বাইরে বেরিয়ে লোকজন দেখেন গনগনে লাল একটা বিশাল জিনিস পড়ে আছে নদীর তীরের শুকনো মাটিতে। বুঝতে পারছিলেন যে বস্তুটা গরম, তাই লাল। কয়েক ঘণ্টা পর ঠান্ডা হয়ে গেলে তাঁরা এগিয়ে গিয়ে দেখেন আড়াই মিটার ব্যাসের সেই গোলাকার জিনিসটা লোহার তৈরি। বিশাল কোনও যন্ত্রের কলকব্জার মতো দেখতে। হঠাৎ কোথা থেকে এল জিনিসটা– এই ভেবে তাঁরা আকাশ থেকে পড়েছিলেন!
আসলে আকাশ থেকেই পড়েছিল বস্তুটা! প্রায় ৫০০ কেজির সেই জিনিসটা যে একটা রকেটের অংশ তা বোঝা গেলেও ঠিক কোন রকেট থেকে খুলে পড়েছে, তা এখনও জানা যায়নি। হাল আমলে এরকম ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। আজকাল গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় হাজার কেজি ওজনের রকেটের বিভিন্ন সাইজের টুকরো পৃথিবীতে এসে পড়ে। টুকরোগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় উল্কার মতো পুড়তে থাকে। যেটুকু বাকি থাকে তার বেশিরভাগই সাগরের জলে পড়ে ডুবে যায়, কারণ পৃথিবীপৃষ্ঠের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাগর-মহাসাগর। কিন্তু কেনিয়ার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মতো মাটিতে এসে পড়ার ঘটনাও আখছার ঘটে।

এর কারণ হল মহাকাশে জঞ্জালের ভিড়! দূর মহাকাশ নয়, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঠিক বাইরের অঞ্চলের কথা বলছি। ভূপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি ৭৫০-২০০ কিলোমিটার উপরে। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক পাঠানোর সময় থেকেই এই অঞ্চলে নানান ধরনের লোহালক্কড়ের কলকব্জা জড়ো হতে শুরু করেছে। জড়ো হওয়ার অর্থ এই নয় যে চুপচাপ বসে আছে। সেগুলোও এক একটি ছোট মাপের ‘উপগ্রহ’। ফলে সেগুলোও নিউটনের নিয়মে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে। বলি, মহাকর্ষের ঘোর কি আর এমনি কাটে? ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক-১ যে রকেটে করে পাঠানো হয়েছিল সেটির উপরের অংশটুকু এখনও পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে। তখন থেকেই শুরু। তারপর থেকে যেসব রকেট পাঠানো হয়েছে সেগুলোর কোনও না কোনও অংশ জঞ্জালের এই সুদূর আসমানে ভাসমান হয়ে ঘুরছে। ভেবে দেখুন একবার– পৃথিবীর চারদিকে একটা বিশাল ধাপার মাঠ পরিমাণ আবর্জনা ঘুরছে। না, ভুল হল– কারণ মহাকাশের আবর্জনার পরিমাণ ধাপার তুলনায় অনেক বেশি– প্রায় এক কোটি কিলোগ্রাম!
অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। শহর থাকলে তার আশেপাশে আবর্জনার স্তূপ থাকবে। শুধু কি শহরের বাইরে? আজকাল তো এভারেস্টের চারপাশেও জঞ্জালের স্তূপ! সাগরের জলে এত রাবিশ যে সেখান থেকে মাইক্রপ্লাস্টিক ফিরে এসে আমাদের শরীরে ঢুকছে। পৃথিবীর কোন অংশটা আর আমরা আবর্জনা-মুক্ত রাখতে পেরেছি? সুতরাং অন্তরীক্ষে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের পড়শি অঞ্চলেও যে আবর্জনা– যাকে আজকাল ‘space junk’ বলে– জমা হবে না, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই।

এই মহাকাশ জঞ্জালে হরেকরকমের জিনিস মজুত। অকেজো কৃত্রিম উপগ্রহের বহর রয়েছে সেখানে, যেগুলোর মেয়াদ পেরিয়ে গিয়েছে। রয়েছে এই যন্ত্রগুলো যেসব রকেটে করে পাঠানো হয়েছিল সেগুলোর বিভিন্ন অংশ। এই জঞ্জালের মধ্যে কী নেই? ক্যামেরার লেন্সের ঢাকনা যেমন রয়েছে, তেমনই আছে স্যাটেলাইটকে রকেটের সঙ্গে বেঁধে রাখার ধাতব রিং। এই আংটির মতো জিনিসটি কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার সময় লাগে। উপগ্রহটিকে খুলে কক্ষপথে বসানোর পর আর প্রয়োজন থাকে না। ফলে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়। আছে পুরনো ব্যাটারি। রকেটের ঢাকনা থেকে খসে পড়া পেন্টের টুকরো। তাছাড়া আছে অ্যাস্ট্রোনটদের হাত থেকে খুলে পড়ে যাওয়া গ্লাভস। স্ক্রু, যন্ত্রপাতি ধরার হাতল, আরও কত কী! ২০০৭ সালে সুনীতা উইলিয়ামসের একটা আস্ত ডিজিটাল ক্যামেরা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এর আগে ১৯৬৫ সালে আমেরিকান নভোচর এড হোয়াইটের হাত থেকে খসে পড়েছিল গ্লাভস। সেটি এখনও একটা খুদে উপগ্রহের মতো চক্কর কাটছে পৃথিবীর চারদিকে।
স্পেস জঞ্জালের সাইজও হরেকরকমের। দশ সেন্টিমিটারের বড় জঞ্জালের সংখ্যা গত কয়েক দশকে প্রায় ৪০ হাজার পেরিয়ে গিয়েছে। আরও ছোট– এক সেন্টিমিটারের ছোট মাপের জঞ্জালও রয়েছে এই আবর্জনার নাগরদোলায়। সেগুলোর সংখ্যা দশ কোটির উপর। প্রশ্ন হল, এত ছোট জঞ্জালের টুকরো এল কোত্থেকে? আসলে মহাকাশে যখন আবর্জনার টুকরো পৃথিবীর চারদিকে চক্কর কাটার সময় কোনও রকেট বা স্যাটেলাইটের সঙ্গে টক্কর লাগে, তখন ছোটখাটো টুকরো ছিটকে পড়তে পারে। কারণ কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর কক্ষপথে ঘোরার গতিবেগ প্রচণ্ড বেশি। সেকেন্ডে (ঘণ্টায় নয়) প্রায় দশ কিলোমিটার! ফলে সেক্ষেত্রে দুর্ঘটনার মাত্রাও হয় মারাত্মক। এই গতিতে একটি এক-সেন্টিমিটার মাপের স্টিলের স্ক্রু এসে কোনও স্যাটেলাইটের গায়ে এসে পড়লে যা হবে তা একটা ছোটো গ্রেনেড ছোড়ার সমান! এক মামুলি স্ক্রু-র গুঁতোয় স্যাটেলাইটের আবরণ ফুটো হয়ে যাবে। স্ক্রু-র বদলে আঙুলের ডগায় ধরা যায় এমন এক টুকরো পেন্টের ধাক্কাও মনে হবে বিরাশি সিক্কার চড়। স্যাটেলাইটের গায়ে সেটিও একটা বড় গর্ত তৈরি করবে। ছিটকে পড়বে হাজারো ছোট টুকরো, যেগুলো জঞ্জালের মধ্যে মিশে যাবে। সেগুলোও আবার এক সময়ে অন্য কোনও রকেট বা উপগ্রহের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। তৈরি হবে এত্তা জঞ্জাল।

নাসা-র এক ইঞ্জিনিয়ার ডোনাল্ড কেসলার ১৯৭৮ সালে এই ধরনের দুর্ঘটনার হিসেব করে সাবধান করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, জঞ্জালের টক্করে জঞ্জাল বাড়ে! যেমন হয়েছিল ২০০৯ সালে। আমেরিকার একটি কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে টক্কর লেগেছিল রাশিয়ার একটি পুরনো এবং মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া কসমস স্যাটেলাইটের। সেই ধাক্কায় প্রায় হাজার খানেক দশ সেন্টিমিটারের চেয়ে বড় মাপের টুকরো ছিটকে পড়েছিল। এক ধাক্কাতেই এই! আর এরকম ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে দিনদিন। স্পেস স্টেশন তো অনেক বড় মাপের জিনিস। তাই সেটির গায়ে এসে ঠোকর খেতে পারে ছোটবড় রকমারি জঞ্জাল। সুতরাং সাবধানে থাকতে হয়। সামনে কোনও অসংলগ্ন জিনিস ধেয়ে আসছে দেখতে পেলে স্পেস স্টেশনকে একটু সরিয়ে দিতে হয়। আগে থেকে দেখতে না পেলে সর্বনাশ হতে পারে এরকম ক্ষেত্রে!
এইসব জঞ্জালের টুকরো নিজেদের কক্ষপথে ঘোরে ঠিকই, তবে সেই কক্ষপথ বদলাতে থাকে। মাটি থেকে দু’হাজার কিলোমিটার উপরে বাতাস বলে প্রায় কিছু নেই ঠিকই, কিন্তু জায়গাটা একেবারে শূন্যও নয়। সেই হালকা হাওয়ার মধ্য দিয়ে যখন এই জঞ্জালের টুকরোগুলো ধেয়ে যায়, তখন আলতো হলেও ঘষা লাগে। বছরের পর বছর এই ঘষা লেগে টুকরোগুলোর শক্তিক্ষয় হয়। গতিবেগ কমতে থাকে। তখন সেগুলো আর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টান সামলাতে পারে না। নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরার অর্থ হল গতিবেগের সাহায্যে মহাকর্ষকে সামলে রাখা। কিন্তু গতিবেগ কম হলে ধীরে ধীরে কক্ষচ্যুত হতে থাকে জঞ্জালের টুকরো। নামতে থাকে নিচে। ছোট টুকরোগুলো বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময়ই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু বড় টুকরোগুলো– যেমন এসে পড়েছিল কেনিয়ার সেই ছোট গ্রামে– পুরোপুরি পোড়ে না। অবশিষ্ট অংশটি এসে পড়ে পৃথিবীতে।

স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর সব ধরনের জঞ্জালের মতো স্পেস জঞ্জালও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকাল আমাদের যন্ত্রনির্ভর জীবনে কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর ভূমিকা অনেক বড়। কোথাও যাওয়ার সময় আমরা হরদম জিপিএস ব্যবহার করি। এই জিপিএস-এর সংকেত আসে মহাকাশে ঘুরতে থাকা একরাশ স্যাটেলাইটে থাকা যন্ত্র থেকে। স্যাটেলাইটের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বেড়ে চলেছে মহাকাশের আবর্জনার পরিমাণ। ছোট একটা জঞ্জালের টুকরো এসে ধাক্কা দিলেই তো জিপিএস সিগনাল হাওয়া হয়ে যাবে! ফলে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকা যন্ত্রপাতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদও মহাকাশ প্রযুক্তিবিদদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
তাঁরা তাই ভাবতে বসেছেন জঞ্জাল সরানোর কথা। তবে মোটেই সহজ হবে না মহাকাশে ঝাড়পোঁছ করার কাজ। লেজারের সাহায্যে ছোটখাটো জঞ্জালের টুকরো পুড়িয়ে ফেলার কথা ভেবেছেন অনেকে। আবার বিশাল চুম্বক দিয়েও লোহালক্কড় জড়ো করা যেতে পারে। অথবা রোবট-হাত দিয়ে মুঠো করে ধরার কথাও ভাবা হয়েছে। কিছু নিয়মকানুনের কথাও ভেবেছেন বিজ্ঞানীরা। যেমন, মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে স্যাটেলাইটকে জোর করে কক্ষচ্যুত করে এমনভাবে নিচে নামিয়ে আনা– যাতে সেটা আগে থেকে নির্ধারিত জায়গায় এনে ফেলা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন হল, মহাকাশের ডাস্টবিন পরিষ্কার করার মতো কাজ করতে এগিয়ে আসবে কোন দেশ? বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved