

গল্পে, বিশেষ করে বিদেহীদের বর্ণনার সঙ্গে জুতসই অলংকরণ থাকলে যে কোনও ভয়ের বই পড়ার আগ্রহ চড়চড় করে বেড়ে যায়। আর সে বই যদি হয় কয়েকশো বছরব্যাপী বাংলা ও বিদেশি গল্পে ভূতের অলংকরণ নিয়েই, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! ঠিক সেই কাজটাই করেছেন সন্দীপ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভয়ের গল্প, ভয়ের ছবি’ বইটিতে।
সে অনেককাল আগের কথা। এক নতুন বিয়ে-হওয়া বউ কিছুতেই শাশুড়ির সঙ্গে বনিবনা করতে পারল না। অধিকাংশ দিনই খাওয়াদাওয়া নিয়ে খিটিমিটি। শাশুড়ি সারাদিন নববধূটিকে খাটিয়ে যান, অথচ দু’বেলা খাবার দেওয়ার সময় বরাদ্দ করেন যৎসামান্য। নতুন বউ কষ্ট পেলেও প্রবল মুখচোরা, কিছু বলতে পারে না। নিয়মিত অর্ধাহারের ফলে মেয়েটি দিনদিন রোগা থেকে রোগাতর হয়ে যেতে লাগল। হঠাৎই একদিন দজ্জাল শাশুড়ি পট করে চোখ বুজলেন। সংসারের সকলেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ভাবখানা এমন– যাক, এবার তবে বউয়ের স্বাস্থ্যোদ্ধার হবে। কিন্তু কোথায় কী? অবস্থা বরং আরও খারাপের দিকে গেল। কণ্ঠার হাড় বেরনো চেহারা দেখে একদিন বউকে সবাই জিজ্ঞেস করল, তার হয়েছে-টা কী? সে খাওয়াদাওয়া করে না কেন? এখন তো আর শাশুড়ির শাসন নেই! তখন বউ যা বলল, তাতে সবার চক্ষু চড়কগাছ! মৃত শাশুড়ি না কি এখনও রোজ বউমার ওপর নজরদারি চালায়! অ্যাঁ! ভূত না কি? বউমা তখন রান্নাঘরের মাটির উনুনে গাঁথা দুটো চকচকে কড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে বাকিদের বলল, শাশুড়ি তাকে বলে গিয়েছেন ওগুলোই না কি ওঁর চোখ! মৃত্যুর পরেও সেই চোখজোড়া সমানে তার উপর নজর রেখে চলেছে– সে কোন সাহসে বেশি খাবে! শিল্পী অহিভূষণ মালিককে আদ্যিকালের এই অদ্ভুতুড়ে কাহিনি শুনিয়েছিলেন আরেক স্বনামধন্য চিত্রকর গণেশ পাইন! ঠাকুমার থেকে শোনা গল্পের মধ্যে ছবি, আর সেই ছবির মধ্যে গল্পের অলিগলি বরাবরই গণেশ পাইনকে ভাবিয়েছে। আর তার উপর এমন ভৌতিক আবহের আলো-আঁধারি হলে তো মুহূর্তে গা-ছমছম! গল্পে, বিশেষ করে বিদেহীদের বর্ণনার সঙ্গে জুতসই অলংকরণ থাকলে যে কোনও ভয়ের বই পড়ার আগ্রহ চড়চড় করে বেড়ে যায়। আর সে বই যদি হয় কয়েকশো বছরব্যাপী বাংলা ও বিদেশি গল্পে ভূতের অলংকরণ নিয়েই, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! ঠিক সেই কাজটাই করেছেন সন্দীপ দাশগুপ্ত তাঁর ‘ভয়ের গল্প, ভয়ের ছবি’ বইটিতে।

হিমশীতল ভয়ের গল্পের পাঠকদের জন্য আইসব্রেকার বা জড়তাবরফ টুকরো করতে প্রথমেই ব্যক্তিগত স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন লেখক। লেখকের অকালপ্রয়াত ঠাকুমা বিজলীবালা-র ডাকনাম ছিল ‘বিজু’। লেখক ছেলেবয়সে ভূতে বেজায় বিশ্বাস করতেন, তাই যখন তার বাবার ‘ধলামামা’ জোর দিয়ে বললেন, ‘বিজু বাপের বাড়িতে মরেছিল, তাই এখানেই শাঁখচুন্নি হয়ে পেঁপে গাছে হেলান দিয়ে সব দেখে।’ তখন লেখক ভয় না পেয়ে যান কোথা! বইয়ের এহেন বিবরণ পড়তে পড়তে পাতার বাঁ-পাশে ১৮৯৯ ও ১৯৬৩-তে ছাপা ‘একানড়ে’ ভূতের দু’রকম আঁকা ছবি দেখে শিহরন জাগে! একটি ছবির আঁকিয়ে আবার স্বয়ং কমলকুমার মজুমদার! পাতা উল্টোতেই আবার চমক! দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার শুধু “ঠাকুরমা’র ঝুলি” লেখেনইনি, তাতে রাক্ষস-খোক্কস, দত্যিদানোর গুরুত্বপূর্ণ লাইন-ড্রয়িং ছবিও তিনিই এঁকেছিলেন; ‘রূপ-তরাসী’ শীর্ষক তেমনই একটি অলংকরণ সংযুক্ত হয়েছে এ বইয়ের পাতায়। এমন ছাপাই ছবির প্রধান ‘ব্লকমেকার’ বা খোদাইকার যে ছিলেন আরেক শিল্পী প্রিয়গোপাল দাস, সে হদিশও মেলে এই কেতাবের সাবলীল গদ্যে।

পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা আর তার জননীর ছবি পষ্ট চোখে দেখতে গিয়ে ভৌতিক হাস্যরসের কারিগর সুকুমার রায়কে পাওয়ার সঙ্গে একই পর্যায়ে যে ভাষাবিদ সুকুমার সেনকেও ভূত-ছবির সমঝদার হিসেবে পাওয়া যেতে পারে, তা এ বইয়ের পাতা না উল্টোলে বোঝা শক্ত! বটতলার ছাপা ছবির অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সুকুমার সেন সবার আগে খেই ধরিয়ে দিয়েছেন যমপটের নরক দৃশ্য এবং দুর্গাঠাকুরের চালচিত্রের কথায়! পাতা উল্টোতেই ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত ‘যমপট’- লিথোগ্রাফের অনুকৃতি পাঠকের চোখ টেনে নেয়। মৃতদের পৃথিবী থেকে লোপাট করে যমালয়ে নিয়ে আসা প্রতিটি যমদূতের মাথায় একজোড়া করে শিং! পাপীদের জন্য যমলোকে বরাদ্দ বীভৎস শাস্তির চিত্রায়নে ভরপুর এ ছবির প্রতিটি ফ্রেম। অথচ দেশীয় যমদূতের ইলাস্ট্রেশনের সঙ্গে পারস্যের দানবের চেহারাগত সাদৃশ্য আমাদের চমকে দেয় নিমেষে! তবে কি দেশকাল পেরিয়ে মানুষের অবচেতন অজানা আশঙ্কা বা ভয়ের চিত্ররূপে এমন অবিকল মিল খুঁজে পেয়েছে বারবার?

ব্রহ্মদৈত্য, মামদো, পেত্নীর নাম শুনলেও ‘গলাশী’ ভূতের নাম জানে ক’জন? গলাশী হল সেই অশরীরী, যে গলায় দড়ি দিয়ে মরে ভূত হয়েছে! সুকুমার সেনের মতে, ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী’ বইয়ের অন্যতম ভূত গলাশীর ইলাস্ট্রেশনই না কি তাঁর দেখা সবচেয়ে ভয়ানক ভূতের ছবি! শুধু এই তথ্য নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ-সহ ছবিটিও দেখার সুযোগ করে দেয় সন্দীপবাবুর বই! লুই ক্যারলের ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ এবং তার সিক্যুয়েল ‘থ্রু আ লুকিং গ্লাস’-এর থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ায় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী’র অলংকরণও অনুসরণ করেছিল জন টেনিয়েলের আঁকা রেখাচিত্র! বিশেষত ‘জ্যাবারওকি’-র সঙ্গে একগাল দাড়ির খোক্কস ছানার সাদৃশ্য দেখলে এ বিষয়ে সংশয়ের অবকাশই থাকে না। যোগীন্দ্রনাথ সরকার সৃষ্ট ‘কটকটে’ যে আদতে কোয়ালার মতো দেখতে, বা ‘খুকুমণির ছড়া’র মুণ্ডহীন ‘ফটিং টিং’ আসলে গ্রিক পুরাণের ‘ব্লেমিজ’-দের জাতভাই এসব তথ্য চমকে দেয় অহরহ। লালবিহারী দে-র ‘ফোক টেলস অভ বেঙ্গল’-এ (১৯১২) ওয়ারউইক গোবলের আঁকার সঙ্গে পরবর্তী সময়ের সংস্করণে কৃষ্ণেন্দু চাকীর করা ভূতের অলংকরণ কতটা আলাদা, সেটা সার্থকভাবে ফুটে ওঠে আঁকায়-লেখায়! বিদেশি শিল্পীদের যে অনেক সময় বাংলাদেশের পোশাক পরিচ্ছদ, আকারপ্রকার নিয়ে সম্যক ধারণার অভাব ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিশদ আলোচনায়।

বিদেশি সাহিত্য পাঠ, বিদেশ সফর ও সমুদ্রযাত্রার বিপুল অভিজ্ঞতা থাকায় ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘ডমরু-চরিত’-এ ‘ভালোমানুষ ভূত’ বা ‘অশ্বাণ্ডের প্রহরী’-র কাঠখোদাই ছবি সরাসরি চেক শিল্পী কারেল লিজার আঁকা হুবহু অনুকরণ করে, তেমনই ভূতের কমিটির মেম্বারদের দেখে যেন এক লহমায় মনে পড়ে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মুখ! কথায় বলে ‘দশচক্রে ভগবান ভূত’, কিন্তু সে পরিসর যে খোদ বাংলা সাহিত্যের অলংকরণ, তা কে জানত? তাই বুঝি ‘ডমরু-চরিত’-এ হরিদাস সেনের আঁকা ‘ছেলেখেকো’ ভূত যেন দেবী চামুণ্ডার মতো দেখতে! গল্পের ছবির মেজাজ যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে, সেজন্য সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘ভূত পুরাণ’ বইয়ের অলংকরণ নিজেই করেছিলেন প্রথম সংস্করণে। একইভাবে সাহিত্যিক সুনির্মল বসুও ভূতের ছবি আঁকায় দিব্য উৎরে গিয়েছেন ‘জীবন্ত কঙ্কাল’(১৯৩৬) গল্পে।


পাতায় পাতায় ভূতের ছবি! আঁকছেন কারা? উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যতীন্দ্রকুমার সেন, সমর দে, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, ধীরেন ব্রহ্ম, পূর্ণেন্দু পত্রী, সুধীর মৈত্র, নারায়ণ দেবনাথ, বিমল দাস, ধীরেন বল, সমীর সরকার, প্রণবেশ মাইতি, অনুপ রায়, সুবোধ দাশগুপ্ত, সুব্রত গঙ্গোপাধ্যায়, শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, দেবাশীষ দেব, সুব্রত চৌধুরী এবং আরও অনেকে! কাজেই রেখায় লেখায় শিহরনে এ বই পলক ফেলতে দেয় না! এরপরও কেউ ভরসা করে বলবে ‘ভূতেরা বড় মিথ্যুক’? মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কায়াহীনের কাহিনী’ (১৯৪৫) বইয়ে সত্যজিৎ রায়ের কালিকলমে আঁকা কঙ্কালের ছবি কেমন আশ্চর্য সাঁকো গড়ে রেখেছে পরবর্তী সময়ে তাঁর নিজেরই গল্পের অলংকরণ ‘তারিণীখুড়ো ও বেতাল’-এ, তা দেখে সত্যিই বোঝা যায় শিল্পীর অটুট ছন্দ! নারায়ণ দেবনাথের ক্রসহ্যাচিং বা প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের টোনের খেলার পাশাপাশি প্রণবেশ মাইতির কাগজ কেটে করা স্টাইলাইজড মিনিমাল ছবি বৈচিত্রময় করে তোলে গোটা পাঠপ্রক্রিয়া! বইয়ের একেবারে শেষে তথ্যসূত্র এবং অসম্ভব জরুরি টীকা অংশের আগে ডাবল স্প্রেডে যতীন সেনের আঁকা রাজশেখর বসুর ‘মহেশের মহাযাত্রা’-র ছবি যেন সার্থক সমাপতন আনে। প্রণবেশ মাইতির প্রচ্ছদ আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। তদুপরি ছাপা এবং বিন্যাসের এমন পারিপাট্য, বইয়ের পুস্তানি থেকে শুরু করে ব্লিডের মোটিফ ও আগাগোড়া চমৎকার লে-আউটের জন্য ক্রমশ প্রকাশনার প্রতি পাঠকের ভরসা ক্রমশ বাড়বে বলেই আশা করা যায়।

তবে এতসব ভালোর মাঝে, কিছু খামতি কি নেই? অবশ্যই আছে। দু’-একটি তথ্য-বিভ্রান্তির দিকে নজর দেওয়া যায়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বইয়ে পৃষ্ঠা ৪৪-এ রেফারেন্স হিসেবে ছৌ-নাচের মুখোশ বলে যে ছবি ছাপা হয়েছে তা আদতে ‘গোমিরা’ নাচের মুখোশ। তেমনই পৃষ্ঠা ১৪৬-এ ছাপা হওয়া ‘ডালিমকুমার’-এর অলংকরণে শিল্পীর নাম মনোজ বসু মুদ্রিত হয়েছে, অথচ ছবিটি প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের আঁকা! নিশ্চিত কী করে হওয়া গেল? এক্ষেত্রে সন্দেহের অবকাশ নেই, কারণ প্রথমত প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেখা অননুকরণীয়, তার ওপর উনি ছবিতে অনেক সময়ই দেবনাগরী হরফে নাম সই করতেন। সে স্বাক্ষর এ ছবিতেও ঝলমল করছে। ফলে ছবির ক্যাপশনের ক্ষেত্রে এ পরিসরে লেখক এবং সম্পাদকের বাড়তি সতর্কতা কাঙ্ক্ষিত। অবিশ্যি লেখককে এ ব্যাপারে পুরোপুরি দোষ দেওয়া চলে না– ‘তেনাদের’ নিয়ে বই, ফলে আবছায়া থেকে তাঁরা যে কখন কোন কলকাঠি নাড়ছেন তা বোঝা ভারি শক্ত। তার উপর তাঁদের গোত্রের অন্যতম শরিক দল ‘ছাপাখানার ভূতেদের’ নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা এ কেতাবে জায়গা পায়নি। ফলে বিরক্ত হয়ে ইতিউতি মুদ্রণপ্রমাদের মধ্যে তাঁরা নিজেদের অস্তিত্ব জাহির করে গিয়েছেন। ছাপার খরচ, পাতার খরচ বর্তমানে আড়েবহরে বেড়েছে খুবই; তবুও ২৫৬ পাতার সাদা-কালোয় ছাপা বইয়ের জন্য ছ’শো টাকার বিনিময় মূল্য দেখে, ভূত ব্যতিরেকেই সাধারণ পাঠক হয়তো খানিক শিহরিত হবেন! যাই হোক, এসব সা-রে-গা-মা বাদ দিয়ে ‘কোথায় বা কী, ভূতের ফাঁকি’ বলে টুকরো-টাকরা পরিমার্জন সেরে নিলেই, পরবর্তী এডিশনে এইসব ভুলচুক নিশ্চিত ‘মিলিয়ে যাবে চট করে’। ভৌত অবয়বের সেই শোভন সংস্করণ হাতে নিতে আপাতত পাঠকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়!
ভয়ের গল্প ভয়ের ছবি
সন্দীপ দাশগুপ্ত
ক্রমশ
৬০০্
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved