Robbar

নোবেল কি ফাউ ফুচকা, চাইলেই মেলে?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 21, 2026 6:58 pm
  • Updated:January 21, 2026 6:58 pm  

নোবেল শান্তি পুরস্কার কি হোয়্যাটঅ্যাপের চুটকি? চাইলেই ফরোয়ার্ড করে দেওয়া যায়? একবাটি মুড়িঘণ্ট? এ-বাড়ি ও-বাড়ি চালান করা সম্ভব? রথের মেলায় নাছোড়বান্দা বায়না করে পাওয়া টিয়াপাখি? কলুটোলা যুবকবৃন্দের বার্ষিক প্রতিযোগিতার ট্রফি? অথবা কোনও ট্রেন্ডিং বাংলা সিরিয়াল? নোবেল কমিটি বলছে, সোনার মেডেলের মালিকানা বদল হতে পারে। কিন্তু নোবেল লরিয়েটের তালিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উঠছে না কোনও মতেই। অর্থ নয়, চেয়েছিলে রুমাল। অথচ বাপধন, বদলে পেয়েছ একখানা হুমদোমুখো বিড়াল।

রোদ্দুর মিত্র

আসলে ছড়াচ্ছি। বাংলা সিনেমায় গোয়েন্দা ছড়াচ্ছি। রাস্তাঘাটে ঘৃণা ছড়াচ্ছি। দেশে দেশে শান্তি আর গণতন্ত্র। এ-যেন সানরাইজের গুঁড়ো গরম মশলা! ভাঁড়ার একেবারে টইটুম্বুর। প্যালেস্তাইনে রুটি পাওয়া যাচ্ছে না? একটু শান্তি ছড়িয়ে দেওয়া যাক। পাকিস্তান বলেছে ভারতে বোম ফেলবে? ধ্যাত! কয়েক চিমটে শান্তি ছড়িয়ে দিই গে! এভাবেই কখনও থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ায়, কখনও আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানে, পিস পিস করে ‘পিস’ ছড়িয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অভূতপূর্ব দাবি: গোটা পৃথিবীতে আটখানা যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছেন! একা হাতে। অতঃপর? একখানা নোবেল শান্তি পুরস্কার তো বানতা হ্যায়!

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো

গোল বেঁধেছে তারপরই। যেহেতু নোবেল কমিটি, শান্তি পুরস্কারটি তুলে দিয়েছে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলনেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর হাতে। এই পুরস্কারের অন্তরালে ঘোরতর রাজনীতি উপস্থিত, সকলেই জানেন, তবুও মশাই সেটা তো নোবেল! নিরেট একটি সোনার পাত, আয়তনে গোল, ব্যাসের দৈর্ঘ্য ৬.৬ সেন্টিমিটার, ওজনে ১৯৬ গ্রাম, সম্মুখে অ্যালফ্রেড নোবেল, উল্টোপিঠে তিনজন নগ্ন পুরুষ, একে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে দৃঢ় দাঁড়িয়ে– নিদারুণ এক সৌভ্রাতৃত্বের ছাপ! ১২০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস সেই পুরস্কারের অনু-পরমাণু জুড়ে। অথচ সমস্তটাই যেন এক ফুঁ দিয়ে অথবা স্ক্রল করে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো আপন সাধের নোবেল পুরষ্কারটি উপহার দিয়ে এলেন। সটান হোয়াইট হাউসে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে। এ-হল উত্তর-আধুনিক সৌভ্রাতৃত্ব কিংবা সৌভ্রাতৃত্বের সাম্রাজ্যবাদী ভার্সান। যেন ইন্সটাগ্রামে দিব্যি আদান-প্রদান করা যায়। কিন্তু হঠাৎ উপহার?

যেহেতু বছরের শুরুতেই নিকোলাস মাদুরো সস্ত্রীক বন্দি হয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রধানমন্ত্রী। মারিয়া মাচাদোর প্রতিপক্ষ। মাদুরো আপাতত মার্কিনদেশে। ভূ-রাজনীতির যাবতীয় আইনকানুনে ব্যাকস্পেস মেরে, ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার সরকার আপাদমস্তক দুর্নীতিপরায়ণ। পৃথিবীতে মাদক পাচারই একমাত্র উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, গণতন্ত্র নেই। তাই একটু ছড়িয়েছেন। প্রয়োজনে আরও ছড়াতে পারেন। তাই উপহার এনেছিলেন মাচাদো। যেন আসন্ন বিজয়ের আনন্দে, উচ্ছ্বাসে, হরষে গদগদ বিরোধী দলনেত্রী, লিখেছেন:
এ-উপহার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে! সমগ্র ভেনেজুয়েলাবাসীর তরফ থেকে। দুর্নীতিমুক্ত ভেনেজুয়েলার উদ্দেশ্যে, গণতন্ত্রের উদ্দেশ্যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যে নৈতিক এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ– তারই স্মারকচিহ্ন।

তাহলে নোবেল শান্তি পুরস্কার কি হোয়্যাটঅ্যাপের চুটকি? চাইলেই ফরোয়ার্ড করে দেওয়া যায়? একবাটি মুড়িঘণ্ট? এ-বাড়ি ও-বাড়ি চালান করা সম্ভব? রথের মেলায় নাছোড়বান্দা বায়না করে পাওয়া টিয়াপাখি? কলুটোলা যুবকবৃন্দের বার্ষিক প্রতিযোগিতার ট্রফি? অথবা কোনও ট্রেন্ডিং বাংলা সিরিয়াল? নোবেল কমিটি বলছে, সোনার মেডেলের মালিকানা বদল হতে পারে। কিন্তু নোবেল লরিয়েটের তালিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম উঠছে না কোনও মতেই। অর্থ নয়, চেয়েছিলে রুমাল। অথচ বাপধন, বদলে পেয়েছ একখানা হুমদোমুখো বিড়াল।

এটাও সত্য যে, এহেন পুরস্কার গ্রহণের পর, অকস্মাৎ প্রত্যাহারের কোনও উপায় নেই। কোনও রকম অংশীদারিত্বের প্রশ্নও নেই। তবু, সহাস্যে নোবেল শান্তি পুরস্কারটি গ্রহণ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কী আহ্লাদ! টাঙিয়ে রেখেছেন হোয়াইট হাউসের দেওয়ালে। শান্তি ছড়িয়ে কেমন পুরস্কার বাগিয়েছি বাওয়া! ইয়ার্কি?

শুরুয়াতেই বলেছি, নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাস আছে। ওজন আছে। বিশ্বজনীন আভিজাত্য আছে। সর্বোপরি শান্তি আছে। অবশ্যই ছড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। যা নিয়ে একটা একটা জাতি গৌরবে আকুল হয়ে থাকতে পারে। ব্রহ্মাণ্ডের অযুত-নিযুত মানুষের মধ্যে কেন রবিঠাকুর অথবা অমর্ত্য সেন? সেই সিদ্ধান্তেরও যৌক্তিকতা আছে। সেই সমস্ত নামের গায়ে তৎকালীন সময়ের অভিঘাতও থাকে একপ্রকার। পাশাপাশি, শান্তি পুরস্কার প্রত্যাখানেরও একটি রাজনীতি আছে। রেজিস্ট্যান্স আছে। মনে পড়বে, ১৯৭৩ সাল। ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়নি তখনও। সেই বছরই নোবেল কমিটি, যে দু’জন শান্তি পুরষ্কার প্রাপকের নাম ঘোষণা করেছিল:
১. ভিয়েতনামের বিপ্লবী– লে ডাক থো। ২. আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট– হেনরি কিসিনজার। কিন্তু লে ডাক থো শান্তি পুরস্কারটি প্রত্যাখ্যান করেন। স্পষ্টভাষ্যে বলেছিলেন, আমার দেশ বিশৃঙ্খল। এখনও আমরা শান্তি অর্জন করতে ব্যর্থ। তাহলে কেন এই নোবেল পুরস্কার? কেনই-বা আমি?

তবু মনে হয়, এত কথা বৃথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মারিয়া মাচাদো– উভয়ের সৌভ্রাতৃত্বে নোবেল শান্তি পুরস্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা সাতরঙা পিংপং বল। লাফাতে লাফাতে স্ট্রেট ভাগাড়! আগামী বছরগুলোয়, নোবেল কমিটি যে যে নামগুলো ঘোষণা করবে, প্রত্যেকটির সঙ্গেই জুড়ে থাকবে আমাদের সন্দেহ। বাঁকা হাসি। অবিশ্বাস। তা আমরা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যেতে পারব কি? একপাশে ডোনাল্ড ট্রাম্প হো হো হাসবেন! আরও আরও শান্তি ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত হবেন বোধহয়। ছাড়পত্রখানা তো দেওয়ালে ঝুলছেই। অন্যদিকে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো– বিপুল জনসমর্থন তৈরি করে ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে সম্ভবত প্রবেশ করবেন পুনরায়। আহা! কত উদার মনের মানুষ দেখেছ! তারপরই সেই মোক্ষম মুহূর্ত। একবার ভোটে জিতলেই, দেশের রাষ্ট্রনায়ক! মধ্যিখানে আমরা ভুলে যাব নিকোলাস মাদুরোর অপহরণের কথা। বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি নিয়ে মিম বানাব।

ক্লাউন, ক্লাউন! ক্লাউনের মতোই হাঁক পাড়ব ভার্চুয়ালি।

…………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা

…………………