
নিপুণ রাজনৈতিক কৌশলে বাঙালি আর বাংলাদেশী, পরিযায়ী শ্রমিক আর উদ্বাস্তু, বাংলাদেশী আর অনুপ্রবেশকারী, এসআইআর আর নাগরিকত্ব– প্রত্যেকটা বিষয়কে একেবারে ঘুলিয়ে-ঝালিয়ে একসা করে দেওয়া হল, যার নিট ফল– মানুষ দিশেহারা, বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত। এই ‘আতঙ্ক’-ই ভোটের বাক্সে কেরামতি দেখাবে বলে বিজেপির বিশ্বাস। অর্থাৎ তারা এই বয়ানটাই তৈরি করতে চাইছে যে তোমাদের বাঁচালে একমাত্র আমরাই বাঁচাতে পারি। কারণ নির্বাচন কমিশন আমাদের হাতে, সীমান্তরক্ষী বাহিনীও। রাজ্য সরকারের এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই।
সবথেকে বড় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ কী জানেন? একটা ঘৃণা। বিত্ত-নিরপেক্ষভাবে (মানে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত যা-ই হোক না কেন) আমরা, মানে হিন্দু-বাঙালিরা সেই ঘৃণাটাকে বড় যত্নে ধারণ করি, লালন করি নিজেদের অন্তরে। তারপর সময়মতো সেটা তুলে দিই পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, কোনও স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি নয়, সেই ‘ঘৃণাটাই’ আমাদের সকলের সেই একমাত্র সম্পদ, যা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে আসছি। এর ক্ষয় নেই, লয় নেই, বিনাশ নেই।
যুদ্ধজয়ের ব্যাপারে বিজেপি বরাবরই বড় নির্মম। ভোটের প্রশ্নে তারা ন্যায়-নীতি, মূল্যবোধ কিচ্ছুটির পরোয়া করে না। সচরাচর দুটোই প্রধান অস্ত্র তাদের– সম্প্রদায়িক বিভাজন আর দেশপ্রেম, যা প্রতিবার ভোটের আগে তারা আস্তিন থেকে বার করে থাকে। খেয়াল করে দেখবেন, প্রত্যেকবার ভোটের আগে হয় কোথাও না কোথাও বড়সড় দাঙ্গা বাঁধে, নতুবা একটা জঙ্গী-হামলা হয়। তারপর কিছুদিন ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক গোছের কিছু একটা শো-বিজনেস চালানো হয় পুরোদমে। ওটাই ওই দলের ভোটের বিজ্ঞাপন। ওদের কাছে ভোট মানেই হয় ‘উগ্র দেশপ্রেম’, নয় ঘৃণার চাষবাস।
কিন্তু অতি ব্যবহারে সব অস্ত্রই খানিক ভোঁতা হয়ে যেতে বাধ্য। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে একটা অন্য সমস্যাও আছে। দীর্ঘদিন ধরে বামপন্থার চর্চায় অভ্যস্থ এবং মোটের ওপর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি হওয়ায় বাঙালিকে সস্তা সাম্প্রদায়িকতা বা দেশপ্রেমের বড়ি গেলানো একটু মুশকিল। দু’একটা মন্দিরে গরুর হাড় ফেলে, মুহররমের মিছিলে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে ঝামেলা বাঁধিয়ে, একটা-দুটো ধুলাগড় বা বেলডাঙা ঘটিয়ে দেখা গেল এ রাজ্যে ও জিনিস চলে না। ফলে অন্য স্ট্র্যাটেজি খুঁজতে হল।

বেশি খোঁজাখুঁজি অবিশ্যি করতে হয়নি। বিজেপির বেতনভুক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হিন্দু-বাঙালির হৃদয়ের সবচেয়ে নরম জায়গাটার সন্ধানও পেয়ে গেল অচিরেই। তার নাম– বাংলাদেশ। সেই সাতচল্লিশ সাল থেকে এই একটা ক্ষত, একটা ঘৃণা আমরা বড় যত্নে লালন করে এসেছি। তিন-চারটে প্রজন্ম পেরিয়ে গেল– সেই ক্ষত একটুও শুকোয়নি আমাদের, তাই ঘৃণার পরিমাণও তাই এক বিন্দুও কমেনি। এ ঠিক স্টিরিওটাইপড সাম্প্রদায়িকতা নয়, বিধর্মীকে কচুকাটা করার উত্তর-ভারতীয় মর্দানী-স্টাইল নয়। এ হল সেই কাটা-ঘা, যেখানে স্পর্শ করলেই গোটা শরীর ব্যথায় ঝনঝন করে ওঠে।
দেশভাগ হিন্দু-বাঙালির কাছে সেই স্পর্শকাতর দগদগে ক্ষত– মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পের পাঁচুর মতো যাকে সে কোনওদিন শুকোতে দিতে চায় না। কারণ সেটাই তার বেঁচে থাকার পুঁজি। একদিন সর্বস্ব হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে সীমান্ত পার হয়ে আসতে হয়েছিল তাদের একবস্ত্রে– নিজেদের কয়েক পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে। শুধু ওপার বাংলার ছিন্নমূল মানুষগুলোই নয়, যারা এপারের মানুষ, তাদেরও রেহাই দেয়নি সেই ঘৃণার বিষ। দেশভাগ শুধু যে তাদের চোখের সামনে এ রাজ্যের ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাসকে ধ্বস্ত করে দেয় তা-ই নয়, খুব কাছ থেকে সেই ছিন্নমূল মানুষগুলোর অপরিসীম জীবনযন্ত্রণা দেখার ফলে কোনওভাবে তার সঙ্গে একাত্মও বোধ করতে শুরু করেছিলেন তাঁরা, কারণ ‘অরিজিন’ যেখানেই হোক, দু’-দলই তো শেষমেশ বাঙালি। ফলে ‘বাংলাদেশ’– এই নামটাই স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত হিন্দু বাঙালির কাছে হয়ে দাঁড়ায় ঘৃণা আর আতঙ্কের সমার্থক। সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কেই তাঁরা দেশভাগের জন্য চিরকাল দায়ী করে এসেছেন, যা– বলাই বাহুল্য– আদৌ সত্যি নয়।
এবার ভেবে দেখুন বিজেপির স্ট্র্যাটেজিটা। চিরচারিত হিন্দু-মুসলমান নয়, এমনকী ভারত-পাকিস্তানও নয়, বিজেপির শুরু থেকেই যে তাসটা এবার খেলেছে, তার নাম ‘বাংলাদেশ’। মনে করে দেখুন, প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর মতো কী করা হয়েছিল? কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎই কিছু সংখ্যালঘু বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিককে ‘বাংলাদেশী’ আখ্যা দিয়ে রাতের অন্ধকারে তাদের পুশ-ব্যাক করে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশে। এই ঘটনা বিজেপি-র এক বিরাট গেমপ্ল্যানের অংশমাত্র।

যথারীতি এ নিয়ে মিডিয়া ইত্যাদিতে প্রচুর হইচই হল। বিজেপিও সেটাই চাইছিল। তার উদ্দেশ্যই তো ছিল এই ভয়টা আপামর হিন্দু বাঙালির মনে চারিয়ে দেওয়া যে– তারা চাইলে আইন-আদালত কিচ্ছুটির তোয়াক্কা না করে, আধার কার্ড ভোটার কার্ড ইত্যাদি যাবতীয় পরিচয়পত্রকে নস্যাৎ করে দিয়ে রাতারাতি কাউকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে পারে। দেয়ও। সুনালী বিবি এবং তার মতো আরও কিছু গরিব মানুষের অকারণ হেনস্তা আমাদের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দিল, আর সেই পুরনো ভয় আর ঘৃণাটাকে মনের গভীর গোপন তলদেশ থেকে বার করে আনল। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে কোনও পুরনো ‘ট্রমা’-কে ‘ট্রিগার’ করা।
বীজতলা তৈরি করে এবারে ময়দানে নামানো হল নির্বাচন কমিশনকে। হইহই করে এসে গেল এসআইআর। ভোটার লিস্ট সংশোধনের মতো একটা অত্যন্ত ‘সাধারণ’ সরকারি কাজকে শুধুমাত্র নিবিড় গোয়েবলসীয় প্রচার কৌশল দিয়ে ‘নাগরিকত্ব যাচাই’-এর পরীক্ষার চেহারা দেওয়া হল। সেই পরীক্ষায় ধড়াদ্ধড় ফেলও করানো হতে লাগল মানুষজনকে। গাদা গাদা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বেরতে লাগল, গোছা গোছা বিলি হতে লাগল শুনানির নোটিশ। ভয়ে, আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ সব কাজ ফেলে শুধু পুরনো কাগজের বান্ডিল হাতড়াতে লাগল।
খোঁজ নিয়ে দেখুন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যে ক’টা আত্মহনন বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সব ক’টার পিছনে মানসিক তাড়না ছিল একটাই– বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেওয়ার আতঙ্ক। উদ্বাস্তু জনবসতিতেই তো বড় হওয়া, তাই চারপাশের মানুষগুলোর চোখেমুখে এই আতঙ্ক দেখে তাকে চিনে নিতে ভুল হয়নি আমাদের। অবাক বিস্ময়ে যখন জিজ্ঞেস করেছি, ‘ধরে নিলাম এসআইআর-এ প্রমাণিত হল যে তুমি বৈধ ভোটার নও, তাহলেও কি তোমাকে আদৌ বাংলাদেশে পাঠানো যায়? বড়জোর তোমাকে জেলে ভরা যেতে পারে, ডিটেনশন সেন্টারে রাখা যেতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশই কেন?’ প্রতিবারই উত্তর পেয়েছি, ‘কেন, পাঠানো হচ্ছে তো…। খবরে দেখোনি?’

এইভাবেই নিপুণ রাজনৈতিক কৌশলে বাঙালি আর বাংলাদেশী, পরিযায়ী শ্রমিক আর উদ্বাস্তু, বাংলাদেশী আর অনুপ্রবেশকারী, এসআইআর আর নাগরিকত্ব– প্রত্যেকটা বিষয়কে একেবারে ঘুলিয়ে-ঝালিয়ে একসা করে দেওয়া হল, যার নিট ফল– মানুষ দিশেহারা, বিভ্রান্ত, আতঙ্কিত। এই ‘আতঙ্ক’-ই ভোটের বাক্সে কেরামতি দেখাবে বলে বিজেপির বিশ্বাস। অর্থাৎ তারা এই বয়ানটাই তৈরি করতে চাইছে যে তোমাদের বাঁচালে একমাত্র আমরাই বাঁচাতে পারি। কারণ নির্বাচন কমিশন আমাদের হাতে, সীমান্তরক্ষী বাহিনীও। রাজ্য সরকারের এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পোড়-খাওয়া রাজনীতিক। তিনি কিন্তু এই ভয় দেখানোর রাজনীতিটাকে মোক্ষমভাবে চিনে ফেলেছেন। তাই তিনি পালটা শুরু করেছেন একটা ‘অভয় দেবার’ রাজনীতি। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতোই, কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে হাজির হয়েছেন সুপ্রিমকোর্টে, নিজে দাঁড়িয়ে এসআইআর বন্ধ করার পক্ষে সওয়াল করেছেন। এইভাবেই তিনি তাঁর ভোটারদের বুঝিয়ে দিতে চাইছেন যে, ‘আমি আছি। আমি বেঁচে থাকতে একজনের নামও ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিতে দেব না।’ আসলে উনি বলতে চাইছেন, ‘একজনকেও বাংলাদেশে পাঠাতে দেব না।’
আগামী বিধানসভা নির্বাচন এ রাজ্যে এই ‘ভয় দেখানো’ বনাম ‘অভয় দানের’ রাজনীতির লড়াই হতে চলেছে। সেটা বড় কথা নয়। সে নির্বাচন একদিন মিটেও যাবে। তাতে আমাদের রাজ্যের শাসকের রং বদলে যেতেও পারে, নাও পারে। বড় কথা হল, যদি আমরা আমাদের অবচেতন থেকে সেই ঘৃণা এবং ভয়টাকে শিকড়-সুদ্ধ তুলে না ফেলে দিতে পারি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে তাকে সঞ্চারিত করে দেবার মানসিক জ্বালাপোড়া থেকে নিজেদের মুক্ত করতে না পারি, তাহলে বারবার এই নোংরা রাজনীতির লড়াইতে বোড়ে বানানো হতে থাকবে আমাদের।

কোনও নির্বাচন কমিশন নয়, কোনও রাজনৈতিক দল নয়, এমনকী সুপ্রিমকোর্টও নয়, আমাদের সু-নাগরিকত্বের চাবিকাঠি তাই রয়েছে আমাদেরই হাতে। প্রশ্ন হল, সেই চাবি আমরা আমাদের মুক্তির কাজে ব্যবহার করব কি না!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved