

৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৯০ বছর বয়সি দলিত ব্যক্তি সেন্নির মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার মৃতদেহটি গ্রামের সাধারণ কবরস্থানে সমাধিস্থ করতে নিয়ে যায়। প্রভাবশালী জাতের কয়েকজন বাসিন্দা তাঁদের পথ আটকে দেয়। অভিযোগ, দলিতদের সেখানে সমাধিস্থ করার অধিকার নেই বলে বাধা দেয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তবু মৃতের দুই আত্মীয়কে বাধাদানকারীদের পায়ে পড়ে শেষকৃত্যের অনুমতি চাইতে হয়। পরে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে সেই কবরস্থানেই সেন্নির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
প্রচ্ছদ: দীপঙ্কর ভৌমিক
‘প্রাণ গেলেও জাত না যায়।’ কথাটি প্রথম শুনেছিলাম আমাদের পাড়ার এক গৃহকর্মীর মুখে। পাড়ার নানা বাড়িতে তিনি কাজ করতেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ছুটে বেড়াতেন। বাসন মাজতেন, মেঝে পরিষ্কার করতেন, রান্নাঘর গুছিয়ে দিতেন। অন্যের বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব ছিল তাঁর। অথচ সেই বাড়িগুলির কোনওটিতেই তাঁকে খাওয়ার টেবিলে বসে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খেতে দেওয়া হত না। বাড়ির বাইরে কোথাও বসে তাঁর খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা হত। যে মানুষটি অন্যের ঘর পরিষ্কার রাখতেন, তাঁর নিজের শরীরটিকেই যেন ‘অপবিত্র’ বলে গণ্য করা হত।
তখন কথাটির মধ্যে কতখানি অভিমান ছিল, বুঝতে পারিনি। আজ মনে হয়, ওই কয়েকটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস। তাঁর শ্রম গ্রহণ করতে সমাজের আপত্তি নেই, তাঁর সঙ্গে এক টেবিলে বসে খেতে আপত্তি। বাড়ির পরিচ্ছন্নতা রক্ষার দায়িত্ব তাঁর, অথচ সেই বাড়ির সামাজিক পরিসরে সমান মর্যাদায় বসার অধিকার তাঁর নেই। অন্যের সংসারকে পরিচ্ছন্ন রাখার পরেও, বা বলতে পারেন ফলে, তাঁকে নিজের সামাজিক অবস্থানের দাগ বহন করতে হত।
তাঁর বলা কথাটি আজ আবার মনে পড়ছে তামিলনাড়ুর ইরোড জেলার পেরুমপল্লি গ্রামের একটি ঘটনা পড়ে। ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৯০ বছর বয়সি দলিত ব্যক্তি সেন্নির মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার মৃতদেহটি গ্রামের সাধারণ কবরস্থানে সমাধিস্থ করতে নিয়ে যায়। প্রভাবশালী জাতের কয়েকজন বাসিন্দা তাঁদের পথ আটকে দেয়। অভিযোগ, দলিতদের সেখানে সমাধিস্থ করার অধিকার নেই বলে বাধা দেয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তবু মৃতের দুই আত্মীয়কে বাধাদানকারীদের পায়ে পড়ে শেষকৃত্যের অনুমতি চাইতে হয়। পরে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে সেই কবরস্থানেই সেন্নির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

প্রাণ গেলেও জাত না যায়, কথাটির মধ্যে রয়েছে ভারতীয় সমাজের এক গভীর বৈপরীত্য। মৃত্যু মানুষের শরীরকে নিশ্চুপ করে দেয়, কিন্তু সেই শরীরের সামাজিক পরিচয়কে ঘিরে তৈরি বৈষম্য অদৃশ্য হয়ে যায় না। জীবিত অবস্থায় যে মানুষকে জাতের কারণে দূরে রাখা হয়, মৃত্যুর পরেও তাঁর পরিবারের কাছে সেই দূরত্ব বজায় রাখার দাবি ওঠে। মানুষের শেষ আশ্রয়ের অধিকারও তখন অন্যের সামাজিক ক্ষমতার অধীন হয়ে পড়ে।
এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি হল, একটি পরিবারকে তাদের শোকের মুহূর্তেও নিজেদের মর্যাদার জন্য লড়তে হয়েছে। মৃত স্বজনকে বিদায় জানানোর সময় তাঁদের কাছে থাকার কথা ছিল মৃত ব্যক্তির সুন্দর স্মৃতি। তার বদলে তাঁদের অন্য মানুষের পায়ে পড়তে হয়েছে! একটি মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়েও সমাজ তাঁর আত্মীয়দের মনে করিয়ে দিয়েছে, তাঁদের অধিকার অন্যদের সমান নয়। এই অপমানের মধ্য দিয়ে জাতের ক্ষমতা মৃত মানুষের শরীর ছাড়িয়ে তাঁর পরিবারের ওপরেও নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
এখানে প্রশ্নটি কেবল কবরস্থানে প্রবেশের অধিকার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হল, জাত কীভাবে মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয় তার সামাজিক অবস্থান, চলাফেরার পথ এবং পৃথিবীতে তার প্রাপ্য জায়গাটুকু।

আমার পাড়ার সেই গৃহকর্মীর জন্য খাবার খাওয়ার জায়গা নির্ধারিত ছিল বাড়ির বাইরে। পেরুমপল্লির দলিত পরিবারের জন্য কবরস্থানে পৌঁছনোর পথ আটকে দেওয়া হয়েছিল। একটি ঘটনা ঘটেছিল গৃহস্থের বাড়িতে, অন্যটি গ্রামের সাধারণ ব্যবহারের জমিতে। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই স্থান বণ্টনের মধ্যে জাতের ক্ষমতা কাজ করেছে। কে কোথায় বসবে, কার সঙ্গে খাবে, কোন পথে চলবে, কোথায় নিজের মৃত স্বজনকে সমাধিস্থ করবে, এই সিদ্ধান্তগুলি যখন জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তখন স্থান নিজেই বৈষম্যের বাহন হয়ে ওঠে।
সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় স্থানকে আমরা প্রায়ই একটি নিরপেক্ষ ভৌগোলিক পরিসর হিসেবে দেখি। অথচ কোনও স্থান কার জন্য উন্মুক্ত, কার প্রবেশ সেখানে স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়, আর কাকে সেখানে পৌঁছতে গিয়ে অপমানিত হতে হয়, তার মধ্যেই সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক প্রকাশ পায়। জাতপাতের ক্ষেত্রে এই বিভাজন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও গ্রামে দলিতদের বসতি আলাদা হওয়া, সাধারণ জলাশয় ব্যবহারে বাধা, শ্মশান বা কবরস্থানে প্রবেশের অধিকার নিয়ে বিরোধ, এগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলির মধ্য দিয়ে একটি সামাজিক সীমানা তৈরি হয়, যার ফলে কিছু মানুষের অধিকার স্বাভাবিক বলে গণ্য হয়, অন্যদের অধিকারকে প্রতিবার নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
ড. বি আর আম্বেদকর তাঁর ‘Annihilation of Caste’ (১৯৩৬) গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, জাতব্যবস্থা মানুষের সামাজিক সম্পর্কে জন্মের ভিত্তিতে বিন্যস্ত করে। এই ব্যবস্থার স্থায়িত্বের একটি কারণ হল, জাতের পরিচয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়। অস্পৃশ্যতা তাই কেবল কোনও ব্যক্তির মনে থাকা বিদ্বেষের প্রশ্ন নয়। এটি এমন এক সামাজিক অভ্যাস, যার মধ্য দিয়ে মানুষকে দূরে রাখা হয়, সমান অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং সামাজিক মর্যাদার একটি নির্দিষ্ট ক্রম বজায় রাখা হয়।

তামিলনাড়ুর কবরস্থান-সংক্রান্ত ঘটনাগুলি এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাদ্রাজ হাইকোর্ট জানিয়েছিল, তফসিলি জাতির মানুষকে সাধারণ কবরস্থান বা শ্মশান ব্যবহারে বাধা দেওয়া অস্পৃশ্যতার চর্চা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইরোড জেলার করুমান্ডিসেলিপালায়ম এলাকার কবরস্থান-সংক্রান্ত মামলায় আদালত জমির সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল রোধ এবং দলিতদের কবরস্থানের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালত আরও উল্লেখ করে, কবরস্থান ধ্বংস বা সমাধিস্থলের ক্ষতি মৃত মানুষের প্রতি অসম্মানের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের জীবিত সদস্যদেরও গভীরভাবে আঘাত করে।
এই বিচারিক পর্যবেক্ষণের তাৎপর্য গভীর। কবরস্থানকে সাধারণ ব্যবহারের জমি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যথেষ্ট নয়, সেখানে সকলের সমান প্রবেশাধিকারও নিশ্চিত করতে হয়। জমির সীমানা মানচিত্রে চিহ্নিত করা যায়, কিন্তু সামাজিক সীমানা ভাঙতে প্রয়োজন রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা। প্রশাসন যদি বৈষম্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে অথচ তা প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়, তবে আইনের উপস্থিতি সত্ত্বেও বৈষম্য নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

এই প্রশ্ন আমাদের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলির দিকেও তাকাতে বাধ্য করে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আইআইটি বম্বের ছাত্র সাহিল ওয়াকোড়ের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবার জাতিগত বৈষম্য ও হয়রানির অভিযোগ তোলে। ঘটনাটি নিয়ে পুলিশি তদন্ত শুরু হয় এবং জাতীয় তফসিলি জাতি কমিশনও বিষয়টি খতিয়ে দেখে। আইআইটি বম্বে অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, সাহিলের তরফে তাদের সংশ্লিষ্ট সেল বা প্রশাসনের কাছে এমন কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়েনি।
পেরুমপল্লির ঘটনা এবং সাহিলের মৃত্যুর পরিস্থিতি এক নয়। তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট আলাদা। তবু এই দু’টি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আসে: জাতের পরিচয় মানুষের সামাজিক অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে কতখানি প্রভাবিত করে? একটি ক্ষেত্রে পরিবারকে কবরস্থানে প্রবেশের অধিকার পেতে অপমানিত হতে হয়েছে, অন্যক্ষেত্রে একজন দলিত ছাত্রের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারকে বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে ন্যায়বিচারের দাবি জানাতে হচ্ছে। এই ঘটনাগুলিকে এক করে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং তাদের পার্থক্য বজায় রেখেই বোঝা দরকার, জাতপাত কীভাবে জীবনের নানা পরিসরে মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভারতীয় সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অস্পৃশ্যতার অবসান ঘোষণা করেছে। তবু সংবিধানের এই অঙ্গীকারের বহু দশক পরেও একজন দলিত পরিবারের সদস্যকে মৃত স্বজনের শেষকৃত্যের জন্য অন্যের পায়ে পড়তে হয়। এই ব্যবধান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আইনের ভাষায় সমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং সমাজে সেই সমতা অনুভব করা এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রের দায় তাই শুধু অপরাধের পরে মামলা রুজু করা নয়। মানুষের অধিকার যেন সামাজিক ক্ষমতার অনুমতির ওপর নির্ভর না করে, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আমার পাড়ার সেই মহিলার কথায় ফিরে যাই। তিনি অন্যের বাড়ি পরিষ্কার করতেন, অথচ সেই বাড়ির টেবিলে তাঁর জায়গা ছিল না। তাঁর শ্রম গ্রহণ করা হত, কিন্তু তাঁর সঙ্গে সমান সম্পর্ক গড়ে তোলার সামাজিক ইচ্ছা ছিল না। পেরুমপল্লির ঘটনায়ও দেখলাম, মৃত মানুষটির জন্য মাটি পাওয়ার অধিকারকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। একটি বাড়ির খাবার টেবিল আর একটি গ্রামের কবরস্থানের মধ্যে দূরত্ব অনেক। কিন্তু সেই দূরত্বের দুই প্রান্তেই জাতের ক্ষমতা মানুষের জন্য জায়গা নির্ধারণ করছে।
‘প্রাণ গেলেও জাত না যায়’ কথাটির মধ্যে তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি একটি বৃহত্তর সামাজিক সমালোচনা রয়েছে। জাত মানুষের জন্মের সঙ্গে তার পরিচয়কে বেঁধে রাখে, জীবনের নানা পর্বে তার চলাফেরা ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর সীমা আরোপ করে, মৃত্যুর পরেও তার পরিবারের উপর সেই সীমা চাপিয়ে দিতে পারে। জাতের স্থায়িত্বের একটি নির্মম দিক হল, এটি মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়েও সামাজিকভাবে টিকে থাকে।
একটি সমাজের সমতার দাবি যাচাই করার জন্য তার সংবিধান পড়া জরুরি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। দেখতে হয়, একজন গৃহকর্মী পরিবারের অন্য সদস্যদের পাশে বসে খেতে পারেন কি না। দেখতে হয়, একটি দলিত পরিবার কোনও বাধা ছাড়াই মৃত স্বজনকে সমাধিস্থ করতে পারে কি না। দেখতে হয়, কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয় কি না। এই সাধারণ অথচ গভীর প্রশ্নগুলির উত্তরেই বোঝা যায়, সমতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতখানি পৌঁছেছে।

মানুষের মৃত্যুতে জীবনের অবসান ঘটে। জাতের নামে তৈরি সামাজিক অপমানের অবসান ঘটে তখনই, যখন কোনও মানুষকে জন্মের পরিচয়ের কারণে দূরে বসতে হয় না, সাধারণ পথ ব্যবহার করতে বাধা দেওয়া হয় না, কিংবা শেষ বিদায় জানানোর জন্য অন্যের পায়ে পড়তে হয় না। সেই দিনই হয়তো ‘প্রাণ গেলেও জাত না যায়’ কথাটি আমাদের সমাজের দীর্ঘস্থায়ী সত্য হিসেবে উচ্চারিত হবে না। তার আগে পর্যন্ত এই বাক্য আমাদের মনে করিয়ে দেবে, মানুষের জীবনের শেষসীমা মৃত্যু হলেও জাতের ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমাজের সংগ্রাম এখনও অসমাপ্ত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved