How American Agricultural Model Harm India's Farmers। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

আশায় মরে চাষা

আমেরিকার কৃষি মূলত বিপুল পুঁজি-নির্ভর বৃহৎ-কৃষি; উল্টোদিকে ভারতের প্রায় ৮৬ শতাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, যাদের জমির পরিমাণ ২ হেক্টরেরও কম। আমেরিকার হাজার হাজার একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা ‘ফ্যামিলি ফার্ম’গুলিও যেখানে বড় কর্পোরেশন, চড়া সুদ এবং মুক্তবাজারের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার জোগাড়, সেখানে ভারতের কোটি কোটি সম্পদহীন ক্ষুদ্র কৃষককে সেই একই অনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বাজারে ছেড়ে দিলে তাদের পরিণতি কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

Published by: Robbar Digital

Posted:August 4, 2026 7:08 pm | Updated:August 4, 2026 7:18 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

মার্কিন কৃষিতে এখন এক চরম অস্থিরতা! বিশেষজ্ঞরা কৃষির এই অস্থিরতাকে ‘কৃষি সংকট’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে শস্যের রেকর্ড দাম থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের আয় আশানুরূপ ছিল, কিন্তু তারপর থেকেই সেখানকার কৃষিতে ধস নামতে শুরু করে।

এই কয়েক বছরে ভুট্টা ও সয়াবিন চাষিদের আয় প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে এবং সরকারি অনুদান বাদে সামগ্রিক কৃষি আয় হ্রাস পেয়েছে ২৬ শতাংশ। একদিকে চাষাবাদের খরচ আকাশছোঁয়া, অন্যদিকে জটিল বাণিজ্যিক নীতির ফলে তৈরি হওয়া শুল্ক সংকটের কারণে কৃষকদের বাজার হারানো– সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক জটিলতা।

২০২২ সালে আমেরিকার কৃষি রপ্তানি যেখানে ছিল ১৯৬ বিলিয়ন ডলার, পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালের শেষে তা ১৭৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসতে পারে। আবার এই সময়ের মধ্যেই আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কৃষি বাণিজ্যে ঘাটতি প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। মূলত বড় বড় কর্পোরেশনগুলির স্বার্থরক্ষাকারী সরকারি নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ ও ক্ষুদ্র কৃষকরা আজ কোণঠাসা।

zoom
শুল্ক সংকটে সমস্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাষিরা

আর্থিক এই টানাপোড়েনের সঙ্গে ঋণের বোঝা ও অন্যান্য অনিশ্চয়তা মার্কিন কৃষকদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। ২০২৬ সালের হিসেব অনুযায়ী, চাষিদের মোট ঋণের পরিমাণ সর্বকালীন রেকর্ড ছুঁয়ে ৬২৪.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তার ওপর এই ঋণের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৭৫ শতাংশে; ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষিদের পক্ষে দৈনন্দিন খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাইভেট ব্যাংকগুলির অনীহা পারিবারিক খামারগুলির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলছে, আর তার ওপর ক্রমাগত আঘাত হানছে ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

কেবল তা-ই নয়, সরকারি সহায়তার অভাব ও চিকিৎসার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় গ্রামীণ জীবন আরও বিপন্ন। পাশাপাশি নতুন ‘ফার্ম বিল’ বা কৃষি আইন পাসে অকারণ বিলম্ব চাষিদের ভবিষ্যৎকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে আর্থিক ও কাঠামোগত চাপ, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ– সব মিলিয়ে কৃষকদের মানসিক হতাশা ও উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। ফলে বড় চাষি থেকে শুরু করে ছোট চাষি– প্রত্যেকেই এখন শুধু টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

শুল্ক যুদ্ধ ও বাজার হারানো

গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে, বিভিন্ন দেশের ওপর আমেরিকার অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং তার জবাবে সেই দেশগুলির পাল্টাশুল্কের ধাক্কায় বিশ্ববাজারে মার্কিন কৃষিপণ্যের আধিপত্য অনেকটাই কমে যায়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের এপ্রিলে, চিন আমেরিকান সয়াবিনের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৪ শতাংশ করার পর মার্কিন সয়াবিন রপ্তানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এর ফলে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যেই মার্কিন চাষিরা প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক বাজার হারিয়ে ফেলে। এই ফাঁকা জায়গা দ্রুত দখল করে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে উঠে আসে ব্রাজিল। শুধু তা-ই নয়, লাতিন আমেরিকার ২৩টি বন্দরে চিনের বিপুল বিনিয়োগ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ‘COFCO’-এর মাধ্যমে সরাসরি ব্রাজিলের চাষিদের কাছ থেকে শস্য সংগ্রহ, আমেরিকার শস্য ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতায় অনেকখানি পিছিয়ে দেয়। পরবর্তীতে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চিন আগামী কয়েক বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন সয়াবিন কিনবে ঠিকই, তবে তা আগের গড় আমদানির তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ কম। উল্লেখ্য, ব্রাজিলের বাম্পার ফলন এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের কাছে মার্কিন কৃষকরা যেভাবে বাজার হারাচ্ছেন, তাতে নভেম্বরের এই নতুন বাণিজ্য চুক্তিও কৃষকদের মনে পুরোপুরি আস্থা ফেরাতে পারছে না।

zoom
চিন-ব্রাজিল কৃষিপণ্য চুক্তিতে বাজার হারাচ্ছেন মার্কিন চাষিরা

শ্রম সংকট ও খরা

২০২৬ সালের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি দেশটির কৃষিখাতকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। মার্কিন খামারগুলোতে কাজ করা প্রায় ৮.৫ লক্ষ অননুমোদিত শ্রমিকের ওপর প্রশাসনিক নজরদারি ও গ্রেফতারের ভয় বেড়ে গিয়েছে। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলো থেকে অভিজ্ঞ অভিবাসী শ্রমিকরা খামার ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশজুড়ে শ্রমিকদের এই চলে যাওয়ার হার এতটাই বেশি যে, গত ৫০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের নিট অভিবাসন হার ঋণাত্মক হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিকল্প হিসেবে সরকারি এইচ-২এ (কৃষিকাজের জন্য ঋতুভিত্তিক বিদেশি শ্রমিকদের বৈধ আইনি ভিসা ব্যবস্থা) ‘গেস্ট ওয়ার্কার প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে বৈধ শ্রমিক আনার সুযোগ থাকলেও, এঁদের উচ্চ মজুরি নিশ্চিত করা, আবাসন খরচ বহন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সামলানো ক্ষুদ্র চাষিদের সাধ্যের বাইরে চলে গিয়েছে। এই বহুমুখী চাপের মুখে টিকে থাকতে না পেরে অনেক চাষি হয় ব্যয়বহুল যান্ত্রিকীকরণের পথে হাঁটছেন, নয়তো চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন, যার ফলে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজার এখন মেক্সিকো ও পেরু থেকে আসা সস্তা আমদানিকৃত কৃষিপণ্যের ওপর ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

শ্রম সংকটের পাশাপাশি জলবায়ু বিপর্যয় চাষিদের উৎপাদনশীলতা ও বিমা সুরক্ষাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ২০২৬ সালের শুরুতে ‘বম্ব সাইক্লোন’-এর আঘাত এবং দেশের ৪৫ শতাংশ অঞ্চল-জুড়ে চলতে থাকা খরা পরিস্থিতি টেক্সাস ও কানসাসের মতো রাজ্যগুলিতে গবাদি পশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। যদিও বড় শস্য উৎপাদনকারীরা বিমা সুবিধা পান, কিন্তু ক্ষুদ্র চাষি এবং চাষে বৈচিত্র্য আনা কৃষকদের যথাযথ বিমা না থাকায় তাঁরা বেকায়দায় পড়েছেন। ‘ইউএসডিএ’ বিমা সুবিধা সহজলভ্য করতে ইতিমধ্যেই নতুন নিয়ম চালু করেছে এবং ১২ বিলিয়ন ডলারের ‘ব্রিজ পেমেন্ট’ ঘোষণা করেছে, তবে তা প্রকৃত ক্ষতির (প্রায় ৩৫-৪৩ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য, যা ভবিষ্যতে চাষিদের আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

zoom
‘বম্ব সাইক্লোন’-এর প্রভাবে বিধ্বস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অঞ্চল

নীতিগত ধাক্কা ও স্বাস্থ্যবিমা

আমেরিকার নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রচলিত ‘সাপ্লিমেন্টাল নিউট্রিশন অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ বা ‘এসএনএপি’ (মার্কিন সরকারের স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য সরকারি খাদ্য-সহায়তা কর্মসূচি) একদিকে যেমন মানবিক সহায়তার উদাহরণ, অন্যদিকে এটি মার্কিন কৃষিপণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৫ সালের ৪ জুলাই স্বাক্ষরিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ (মার্কিন বাজেট ও সামাজিক সহায়তা ছাঁটাই সংক্রান্ত একটি সাম্প্রতিক আইন) গ্রামীণ আমেরিকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে এক অভূতপূর্ব সংকট সৃষ্টি করেছে। এই আইনের ফলে আগামী ১০ বছরে ‘এসএনএপি’ কর্মসূচি থেকে প্রায় ১৮৬-২০০ বিলিয়ন ডলার কাটছাঁট করা হয়েছে, যা সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতির অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘এসএনএপি’ প্রকল্পে ব্যয় করা প্রতি ১ ডলার অর্থনীতিতে ১.৫০ থেকে ১.৮০ ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক রিটার্ন দেয়, যার একটি বড় অংশ সরাসরি কৃষি-বিপণনের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, খাদ্য সহায়তায় এই কাটছাঁট পরোক্ষভাবে গ্রামীণ বাজারের অর্থের জোগান কমিয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গ্রামীণ এলাকার প্রতি সাতটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবার এই সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

কর্মসংস্থানের কঠোর নীতি ও এই আর্থিক সংকোচনের ফলে প্রতি বছর প্রায় ছয় বিলিয়ন ‘মিল’ অভাবী মানুষের থালা থেকে হারিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তাতে কৃষকরা প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এটি কেবল মানবিক সংকট নয়, বরং কৃষকদের জন্যও এক বড় দুঃসংবাদ। কারণ, এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় স্থানীয় খুচরা বিক্রেতা ও ফার্মার্স মার্কেট এবং উৎপাদকরা নিশ্চিত বাজার হারাবেন।

zoom
খাদ্যসংকটের জেরে চিন্তা বাড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসমাজে

আভ্যন্তরীণ চাহিদার এই মন্দার পাশাপাশি ২০২৬ সালের শুরু থেকে মার্কিন কৃষি পরিবারগুলি এক ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি। ওবামা-কেয়ারে ভর্তুকি শেষ হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম গড়ে ১০৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ক্ষেত্রবিশেষে মাসিক ২,৭০০ ডলারে গিয়ে ঠেকছে, অথচ কয়েক বছর আগেও এই খরচ ছিল এর অর্ধেকেরও কম। একদিকে সয়াবিন রপ্তানির বাজারে ব্রাজিলের কাছে বাজার হারানো, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়– এই দুইয়ের চাপে এমনিতেই কৃষকদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম, তার ওপর স্বাস্থ্যখাতে এই বিশাল খরচ এখন ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল হতে যাচ্ছে, কারণ ২০২৭ সাল থেকে বিমা সুবিধার ১৫ শতাংশ ব্যয়ভার রাজ্যগুলিকে বহন করার কথা বলা হয়েছে। এই নতুন শর্তের চাপে নিউ মেক্সিকো, ওরেগন এবং লুইজিয়ানার মতো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলি এই বিমা কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। এমনকী ওকলাহোমা ও মিসিসিপির মতো উচ্চ দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলিতে খাদ্য সহায়তার ব্যয় ৩০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজেট পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

zoom
স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে প্রতিবাদী সমাবেশ আমেরিকার নিউ মেক্সিকোয়

এই আর্থিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘রিপেমেন্ট লিমিটস’ বা ভর্তুকি ফেরত সংক্রান্ত নীতি। সাধারণত কৃষকরা বছরের শুরুতে আয়ের একটি সম্ভাব্য হিসেব দেখিয়ে সরকারি সহায়তা গ্রহণ করেন। কিন্তু নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভালো ফলন বা হঠাৎ ফসলের বাজার দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে যদি কোনও কৃষি ফার্ম সামান্য বেশি লাভ করে ফেলে, তবে তাকে বছরের শুরুতে পাওয়া সরকারি ভর্তুকির পুরো অর্থই কর হিসেবে ফেরত দিতে হতে পারে। ফলে হাড়ভাঙা খাটুনির পর অর্জিত বাড়তি আয়টুকুও কৃষকের হাতে থাকছে না।

চাষের ক্রমবর্ধমান খরচ, নীতিগত জটিলতা এবং ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া– সব মিলিয়ে কৃষকরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আর সেই আগুনে ঘি ঢালছে আকাশছোঁয়া চিকিৎসা ব্যয়। সবুজ কৃষির আড়ালে মার্কিন কৃষকদের আত্মহত্যার যে পুরনো ইতিহাস, বর্তমান অনিশ্চয়তা তাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে গ্রামীণ পরিবারগুলির কাছে কৃষিকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকার অনেক কৃষক পারিবারিক চাষ ছেড়ে বিকল্প আয়ের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন, যা গ্রামীণ আমেরিকার চিরচেনা সামাজিক রূপটাকেই বদলে দিচ্ছে।

zoom
কৃষিকে ঘিরে অনিশ্চয়তার মেঘ মার্কিন মুলুকে

ভারতের জন্য শিক্ষা: কর্পোরেট মডেলের ফাঁদ

মার্কিন কৃষকদের এই সংকট থেকে বাঁচাতে সে-দেশের সরকার মরিয়া হয়ে নতুন নতুন বাজার খুঁজছে, যেখানে ভারতের মতো বিশাল সম্ভাবনাময় দেশ তাদের প্রধান লক্ষ্য। অন্যদিকে, ভারত সরকারও কৃষিখাতের আধুনিকীকরণ এবং কৃষকদের আয় বাড়ানোর যুক্তিতে মার্কিন ধাঁচের কর্পোরেট মডেলকে প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি মান্ডি ব্যবস্থার বাইরে অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি বাজার তৈরি, চুক্তি চাষ বা কনট্র্যাক্ট ফার্মিংকে উৎসাহ দেওয়া এবং কৃষি-প্রযুক্তিতে বিদেশি কর্পোরেট পুঁজির অবাধ প্রবেশের যে নীতি দেখা যাচ্ছে, তা মার্কিন কৃষি কাঠামোরই অনুকরণ। কিন্তু ভুললে চলবে না যে, দুই দেশের কৃষি-কাঠামোর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। আমেরিকার কৃষি মূলত বিপুল পুঁজি-নির্ভর বৃহৎ-কৃষি; উল্টোদিকে ভারতের প্রায় ৮৬ শতাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, যাদের জমির পরিমাণ ২ হেক্টরেরও কম। আমেরিকার হাজার হাজার একর জমি নিয়ে গড়ে ওঠা ‘ফ্যামিলি ফার্ম’গুলিও যেখানে বড় কর্পোরেশন, চড়া সুদ এবং মুক্তবাজারের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে দেউলিয়া হওয়ার জোগাড়, সেখানে ভারতের কোটি কোটি সম্পদহীন ক্ষুদ্র কৃষককে সেই একই অনিয়ন্ত্রিত কর্পোরেট বাজারে ছেড়ে দিলে তাদের পরিণতি কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

zoom
ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থের ওপর নির্ভর করে আছে ভারতের কৃষিব্যবস্থা

এখানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নীতিগত এক গভীর বৈষম্যও কাজ করছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মঞ্চে আমেরিকা একদিকে ভারতের কৃষি-ভর্তুকি ও ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ (এমএসপি)-র তীব্র বিরোধিতা করে, অথচ অন্যদিকে নিজেদের দেশের কর্পোরেট খামারগুলিকে শত শত কোটি ডলারের সরকারি সুবিধা দিয়ে পুষে রাখে। কিন্তু সেই বিপুল সরকারি সহায়তার পরও অবাধ বাজারের ধাক্কায় মার্কিন পারিবারিক খামারগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার এই পরিস্থিতি দেখার পরও ভারত যদি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাছে নতিস্বীকার করে নিজেদের ‘মান্ডি ব্যবস্থা’ ও সরকারি সুরক্ষা তুলে নেয়, তবে এ দেশের ক্ষুদ্র চাষিদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ মুছে যাবে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির বাইরেও রয়েছে পরিবেশ ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের বড় ঝুঁকি। একফসলী বাণিজ্যিক চাষ, অতি-রাসায়নিকের ব্যবহার এবং কর্পোরেট বীজের অবাধ ব্যবহারে আমেরিকার এক বড় অংশের মাটি ও ভূগর্ভস্থ জল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। ভারতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই প্রযুক্তি ও কর্পোরেট-নির্ভর কৃষি মডেল অন্ধভাবে চাপিয়ে দিলে তা আমাদের মাটির উর্বরতা নষ্ট করবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে বহুজাতিক সংস্থাগুলির হাতের পুতুলে পরিণত করবে।

zoom
প্রান্তিক চাষিদের ভাগ্যবদলের ওপর নির্ভর করছে ভারতের কৃষির ভবিষ্যৎ

কিন্তু প্রশ্ন হল– যারা নিজেদের দেশের কৃষকদের ন্যূনতম আয় ও ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না, তারা ভারতের কোটি কোটি প্রান্তিক চাষির ভাগ্যবদল করবে কীভাবে? আমেরিকার ‘রিপেমেন্ট লিমিটস’-এর মতো কঠোর নীতি ও আকাশছোঁয়া স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়াম যখন তাদের পারিবারিক খামারগুলিকে ধ্বংস করছে এবং সেখানকার কৃষকদের আত্মহননের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন সেই একই কর্পোরেট মডেল ভারতের মতো দেশে ক্ষুদ্র কৃষকদের বাঁচাবে কী করে? আমেরিকার নীতি থেকে শিক্ষা না নিয়ে সেই একই কর্পোরেট-নির্ভরতার পথে হাঁটলে তা ভারতীয় কৃষকদের জন্য সমৃদ্ধি আনবে না, বরং এক চরম ঋণের ফাঁদ তৈরি করবে।

আমাদের নীতি নির্ধারকদের বোঝা উচিত, ভারতের মতো শ্রম-নিবিড় ও ক্ষুদ্র জোতের দেশে কর্পোরেট মডেল নয়, বরং সমবায় কৃষি (কোঅপারেটিভ ফার্মিং), স্থানীয় মান্ডি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, প্রাকৃতিক চাষে সরকারি উৎসাহ এবং ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের (এমএসপি)-র আইনি নিশ্চয়তাই কৃষি বাঁচানোর মূল চাবিকাঠি। তা করতে না পারলে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চিত ও অন্ধকার হয়ে পড়বে।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন দেবাশিস মিথিয়া-র অন্যান্য লেখা

……………………….

Agriculture Agriculture Crisis Agriculture Model Climate Crisis Farming Indian Agriculture Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Trump Tariffs US Politics

Share this article on