মানুষকে বাইরে থেকে যতটা শক্ত মনে হয়, ভিতরে ভিতরে সে হয়তো ততটাই নরম। যে মানুষ হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ়কন্ঠে কথা বলেন, তিনিও একান্তে প্রিয়জনের স্মৃতিতে কাঁদেন। যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, তিনিও কখনও অসহায় বোধ করেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের জীবন আছে, যেখানে ব্যক্তিগত কান্না আর সামাজিক সংগ্রাম একাকার হয়ে যায়। ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জীবন তেমনই এক আখ্যান। তাঁর গল্পের মধ্যে রাজনীতির ইতিহাস আছে, শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস আছে, আছে ক্ষমতার উত্থান-পতন। কিন্তু তারও গভীরে রয়েছে এক সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, শোক, অপমান এবং বারবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পের্নামবুকো প্রদেশের গারানিউন্সে জন্ম লুলার। কৃষিশ্রমিক পরিবারের আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। তাঁর শৈশব কেটেছে অভাবের মধ্যে। বাবা অ্যারিস্তিদেস ইনাসিও দা সিলভা কাজের সন্ধানে দক্ষিণ ব্রাজিলে চলে গিয়েছিলেন। পরিবারের ভরণপোষণের দায় এসে পড়েছিল মা ইউরিসিদি ফেরেইরা দে মেলোর ওপর, যিনি ডোনা লিন্ডু নামেই পরিচিত। ১৯৫২ সালে সন্তানদের নিয়ে তিনি সাও পাওলোর দিকে রওনা হন। ১৩ দিনের সেই যাত্রায় তাঁদের বাহন ছিল খোলা মালবাহী ট্রাক, ব্রাজিলে যা ‘পাউ দে আরারা’ নামে পরিচিত। শহরে পৌঁছে ডোনা লিন্ডু জানতে পারেন, তাঁর স্বামী সেখানে আরেকটি সংসার গড়েছেন। সংসারের দারিদ্রের সঙ্গে এবার যুক্ত হল পারিবারিক ভাঙনের যন্ত্রণা।
মায়ের কাছে লুলা শিখেছিলেন, বেঁচে থাকার জন্য অন্যের দয়ার অপেক্ষায় থাকলে চলে না। ছোটবেলায় তিনি জুতো পালিশ করেছেন, রাস্তায় পণ্য বিক্রি করেছেন, পরে কারখানায় কাজ নিয়েছেন। নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ তাঁর জীবনে খুব বেশিদিন ছিল না। ১০ বছর বয়সের কাছাকাছি তিনি পড়তে ও লিখতে শেখেন; অল্প বয়সেই কাজের জগৎ তাঁকে গ্রাস করে। কৈশোরে ধাতব কারখানায় কাজ করতে করতে তিনি যন্ত্রের শব্দ, শ্রমিকের ক্লান্তি এবং সামান্য মজুরিতে সংসার চালানোর কঠিন হিসাব চিনতে শিখেছিলেন। সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চল তাঁকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে শ্রমিকের ঘাম উৎপাদন বাড়ায়, অথচ সেই শ্রমিকের নিজের জীবনেই নিরাপত্তার অভাব থেকে যায়। ১৯৬৪ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পর ব্রাজিলের রাজনীতি ক্রমে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে যায়। অন্যদিকে, লুলা ধাতুশ্রমিক হিসেবে নিজের কর্মজীবন গড়ে তুলছিলেন। ছয়ের দশকের শেষদিকে তিনি শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে সাও বার্নার্দো দো কাম্পু ও দিয়াদেমার ধাতুশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখন তাঁর নেতৃত্বে শ্রমিকদের মজুরি, কাজের পরিবেশ ও অধিকার নিয়ে আন্দোলন জোরালো হতে থাকে। সাতের দশকের শেষভাগে সামরিক সরকারের বাধা উপেক্ষা করে তাঁর নেতৃত্বে বৃহৎ শ্রমিক ধর্মঘট সংঘটিত হয়। যে মানুষ একদিন কারখানার শ্রমিক হিসেবে নিজের অধিকারের জন্য লড়তেন, তিনি ক্রমে হয়ে উঠলেন হাজার হাজার শ্রমিকের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর। কিন্তু লুলার জীবনের ব্যক্তিগত ক্ষতগুলিকে কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
১৯৬৯ সালে তিনি মারিয়া দে লুর্দেসকে বিয়ে করেন। ১৯৭১ সালে গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা যান; অনাগত সন্তানটিও বাঁচেনি। তখন লুলার বয়স মাত্র ২৫। এই মৃত্যু তাঁকে যে গভীরভাবে আঘাত করেছিল, তা অনুমান করা কঠিন নয়। অর্থের অভাব, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা এবং প্রিয়জনকে হারানোর অসহায়তা– এই অভিজ্ঞতাগুলি তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তবে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিটি পরিবর্তনের কারণ হিসেবে এই একটি ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। বলা যায়, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চিত জীবনকে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই চিনতেন। ১৯৮০ সালে শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার সময় লুলা গ্রেপ্তার হন। সেই বছরই তাঁর মা ডোনা লিন্ডু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কারাবন্দি ছেলের জীবনে মায়ের মৃত্যু ছিল আরেকটি গভীর আঘাত। যে নারী তাঁকে দারিদ্রের মধ্যে বড় করেছিলেন, যাঁর হাত ধরে তিনি এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়েছিলেন, সেই মা’কে শেষবারের মতো হারানোর অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাসে এক বেদনাময় অধ্যায় হয়ে রইল। রাজনীতির মঞ্চে লুলা ছিলেন শ্রমিকদের নেতা; কিন্তু মায়ের কাছে তিনি ছিলেন সেই ছোট্ট ছেলেটি, যে একদিন অভাবের পৃথিবী থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। একই সালের ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থী কর্মীদের সঙ্গে লুলা প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিটি। তাঁর লক্ষ্য ছিল শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের জন্য একটি শক্তিশালী মঞ্চ তৈরি করা। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার পথ সহজ ছিল না। ১৯৮৯, ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। তিনবারের ব্যর্থতা একজন রাজনৈতিক নেতাকে হতাশ করতে পারত। লুলা অবশ্য সংগঠন গড়ে তোলা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অবস্থানকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যান।
অবশেষে ২০০২ সালে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তিনি। একজন প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষাবিহীন ধাতুশ্রমিকের দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছনো ছিল ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তাঁর সরকারের সময় ‘ফোমে জিরো’ বা ক্ষুধামুক্তির উদ্যোগ এবং ‘বোলসা ফ্যামিলিয়া’ কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। সামাজিক সুরক্ষা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে বহু মানুষের জীবনযাত্রায় উন্নতি ঘটে। অবশ্য এই সাফল্যের পেছনে সরকারি নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক উপাদানও কাজ করেছিল। তবু দরিদ্র মানুষের জীবনকে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে আসা তাঁর প্রথম দুই মেয়াদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এরপর এল আরেকটি শোকের অধ্যায়। ২০১৭ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মারিসা লেতিসিয়া স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চার দশকেরও বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গীকে হারানো লুলার কাছে ছিল ব্যক্তিগত বিপর্যয়। সেই সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে ব্রাজিলের রাজনীতি উত্তাল। ২০১৮ সালে তিনি কারাবন্দি হন এবং প্রায় ৫৮০ দিন জেলে কাটান। তাঁর বিরুদ্ধে চলা মামলা দেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে তোলে।
রাজনীতির মঞ্চে লুলা ছিলেন শ্রমিকদের নেতা
কারাবাসের মধ্যেই ২০১৯ সালে মারা যায় তাঁর সাত বছরের নাতি আর্থার আরাউজো লুলা দা সিলভা। শিশুটির মৃত্যু হয় মেনিনগোকক্কাল সংক্রমণে। নাতির শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য লুলাকে সাময়িকভাবে কারাগার থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। একজন রাজনৈতিক নেতার পরিচয় তখন যেন মুহূর্তের জন্য মুছে গিয়েছিল; সামনে এসেছিল শোকাহত এক পিতামহের মুখ। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, জনপ্রিয়তা কিংবা ক্ষমতার সম্ভাবনা– কোনওটিই তাঁকে এই ব্যক্তিগত ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তবে লুলার আইনি লড়াইয়ের পরিণতি তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ খুলে দেয়। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মামলাগুলির বিচারিক এক্তিয়ার-সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে দণ্ডাদেশগুলি বাতিল করে। পৃথক বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। এই রায়গুলির অর্থ ছিল তাঁর রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার; তবে এর অর্থ এই নয় যে, আদালত তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগকে একযোগে মিথ্যা ঘোষণা করেছিল। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাইর বলসোনারোকে পরাজিত করে আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লুলার এই প্রত্যাবর্তনের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষের জীবনকে শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। একটি নির্বাচনে জয় তাঁকে রাষ্ট্রপতি করেছে, কিন্তু তার অনেক আগে দারিদ্র তাঁকে শ্রমিকের জীবন চিনিয়েছে, পারিবারিক বেদনা তাঁকে ক্ষতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, আর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম তাঁকে পরাজয়ের পরও কাজ চালিয়ে যেতে শিখিয়েছে। তাঁর জীবনকে নিখুঁত সাফল্যের কাহিনি ভাবারও কারণ নেই। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারের নীতি এবং দুর্নীতি-সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে সমালোচনা ও মতভেদ রয়েছে। একজন মানুষের জীবনের সত্যকে বুঝতে গেলে তাঁর অর্জনের পাশাপাশি তাঁর সীমাবদ্ধতাকেও দেখতে হয়।
সাম্প্রতিক বিজয়ের পরে
তবু এই দীর্ঘ জীবনের সবচেয়ে মানবিক দিকটি রাজনীতির বাইরেই থেকে যায়। মানুষ খুব নরম। তার ভিতরে জমে থাকে না-বলা কথা, হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি, অপূর্ণ ইচ্ছা আর ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা। যে মানুষটি জনসমক্ষে দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলেন, তিনিও নির্জন রাতে প্রিয়জনের স্মৃতি আঁকড়ে কাঁদতে পারেন। যে মানুষটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, তিনিও ক্লান্ত হন, ভেঙে পড়েন, কখনও নিজেকে অসহায় মনে করেন। কোমলতা দুর্বলতা নয়। সমস্ত আঘাতের পরেও ভালোবাসতে পারা, দুঃখের মধ্যেও অন্য মানুষের যন্ত্রণা অনুভব করা এবং বারবার ভেঙে পড়েও নতুন করে পথ চলার চেষ্টা করার মধ্যেই মানুষের শক্তি লুকিয়ে থাকে। লুলার গল্প তাই কেবল ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো উড়ে ওঠার গল্প নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি জীবনের বহু পর্যায়ে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছেন, কারাবাস করেছেন, তবু নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের চেষ্টা ছাড়েননি। তাঁর জীবনের দিকে তাকিয়ে আমরা বুঝতে পারি, শক্তিশালী মানুষ মানেই যাঁর চোখে জল আসে না, তা নয়। বরং যাঁর চোখে জল আসে, যিনি শোক অনুভব করেন, যিনি ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়েন, তিনিও আবার উঠে দাঁড়াতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত মানুষের প্রকৃত জয় হয়তো অন্যকে পরাজিত করার মধ্যে নেই। তার জয় লুকিয়ে থাকে নিজের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে, অতীতের বেদনাকে অস্বীকার না-করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে এবং ক্ষমতা বা সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও নিজের মানবিকতাকে হারিয়ে না-ফেলার চেষ্টায়। লুলার জীবনের মহাকাব্যিক তাৎপর্য এখানেই– পৃথিবী একজন মানুষকে বহুবার আঘাত করতে পারে, কিন্তু সেই আঘাতের পরেও সে যদি স্বপ্ন দেখতে পারে, ভালোবাসতে পারে এবং নতুন করে শুরু করার সাহস খুঁজে পায়; তবে তার গল্প কখনও নিছক পরাজয়ের গল্প হয়ে থাকে না। তা হয়ে ওঠে মানুষের কোমল হৃদয় আর অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছার এক দীর্ঘ উপাখ্যান।