

এই দু’টি অপরাধ একটি গভীর ভণ্ডামিপূর্ণ সমষ্টিগত সামাজিক কল্পনার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে, যা কিশোরী মেয়েদের শিশু হিসেবে গণ্য করে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে এবং তাদের পোশাক নির্ধারণ করে দিয়ে তাদের স্বাধিকারকে অস্বীকার করে; অথচ যখন তারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়, তখন তাদের দোষারোপের দৃষ্টিতে বিচার করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করে।
সাম্প্রতিক বিহারের জামুইতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এবং দিল্লির বুকে আরও একটি ধরনের ঘটনা সারা দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। দুটো ঘটনার পিছনে যে কারণটা আছে, সেটা আরও ভয়ংকর। বিহারে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে দু’জন কিশোর কিশোরীকে কিছু উন্মত্ত জনতা ঘিরে ফেলে। হিংস্রভাবে তাদেরকে প্রশ্ন করা হয় এবং শারীরিকভাবে তাদেরকে আঘাত করা হয়। শুধু আঘাত করা নয়, যে কিশোরীটি ওই ঘটনাস্থলে আক্রান্ত হয়েছে, তাকে নিগ্রহ করা হয়েছে যৌনভাবেও। যে ভিডিওটা এসেছে, তার সঙ্গে মণিপুরের ঘটনার খুব বেশি তফাৎ নেই। মেয়েটির নানান গোপনাঙ্গে হাত দেওয়া হয়েছে এবং যখন এই ঘটনাটা ঘটছে তখন ছেলেটি এবং মেয়েটি দু’জনে বারবার ক্ষমা চেয়েছে যে, আমাদের ভুল হয়ে গেছে ওখানে আসা, তা সত্ত্বেও তাদেরকে ছাড়া হয়নি।
দিল্লির ঘটনাটা শুনলে হয়তো অনেকে চমকে উঠবেন। ১৭ বছরের একটি মেয়ে তার বন্ধুর সঙ্গে পার্কে হাঁটছিল। তিনজন পুরুষ নিজেদেরকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাদেরকে আটকায় এবং ছেলেটির সামনেই তার বন্ধুকে যৌনভাবে হেনস্তা করে। যদিও পোকসো আইনে মামলা দায়ের হয়েছে ঐ পুরুষদের বিরুদ্ধে, কিন্তু এই দুটো ঘটনা দেখিয়ে দেয়– নীতি-পুলিশের নামে যে কাজগুলো করা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে, করা হচ্ছে ঐতিহ্য সংস্কৃতি রক্ষা করার নামে, তা আসলে মেয়েদেরকে ঘরে আটকে রাখার জন্য তাদের উপর ক্ষমতা, বল এবং হিংসা করার ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়।

এই দুটো ঘটনাই কিন্তু শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়। বাংলায় পরিবর্তনের পরে সিনেমা জগতের একজন পরিচিত মুখ একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। এই কলকাতা শহরে দক্ষিণ কলকাতায় পাটুলির মতো অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটছে এবং যারা ঘটাচ্ছে তারা কেউই কলকাতার মানুষ নন। এরকম ছোটখাটো বেশ কয়েকটা উদাহরণ তারপরেও এসেছে। বিষয়টা কলকাতার মানুষ করল না কলকাতার বাইরের থেকে আসা মানুষজন করল– সেটা নিয়ে নয়। আসলে এই নীতি-পুলিশী করা মানে মেয়েদেরকে আরও দমিয়ে রাখার চেষ্টা। তাদের স্বাধীনতা তাদের কথা বলার জায়গাকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
মনে পড়ছে যন্তর মন্তরের আন্দোলনের পরে, প্রধানমন্ত্রী নিজে ইনস্টাগ্রামে ভিডিও করে বলেছিলেন– মেয়েরা কেন গালাগালি দেবে? তিনি না কি খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। এই ভিডিওটার পরে বহু মানুষ উল্টে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ছেলেরা গালাগালি দিলে দোষের নয় মেয়েরা গালাগালি দিলে দোষের কেন হবে? মনে পড়ছে, ছাত্র আন্দোলনের এই সময়ের মুখ নেহা বোরা এই বিষয়ে একটা দামি কথা বলেছিলেন। উনি প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেন: ‘আপনি সমাজটাকে এমন কেন বানিয়েছেন গত ১২ বছর ধরে যে ছাত্র যুবকদের আপনারই লোকজন সারাক্ষণ হেনস্থা করে? তাদের বাড়ি খুঁজে বের করে তাদেরকে দিয়ে মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চাওয়ায়, তাদেরকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়, খুন করার হুমকি দেয়– এটা তো বন্ধ করার চেষ্টা আপনি করেননি!’ বিহারের ঘটনার পরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী আরও ভয়ংকর একটা কথা বলেছেন, এবং সেটা বলেছেন ছেলেদের উদ্দেশে। ‘যা পারো করো, কিন্তু এই রিল বানাতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে এনো না।’ কী অসম্ভব ভয়ংকর কথা! যারা শোনেননি তারা আরও একবার শুনে নেবেন।

প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কিংবা যাঁরা ওই হেনস্থা করেছিলেন– তাঁরা সবাই একটা জিনিস মনে করেন। মেয়েদের ঘরে থাকতে হয়। মেয়েদের এত সরব হতে নেই। মেয়েদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করার অনেকরকম পদ্ধতি আছে এবং সেটা করা হয় মেয়েদেরকেই সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে এই কথা বলে। মেয়েদেরকে পরিবার থেকে যে শিক্ষা দেওয়া হয়– বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদেরকে বলা হয়: ‘তোমরা একটু সাবধানে থাকো’। সেজন্য মেয়েদের তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে গুটিয়ে আনতে হয়, তাদের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়, তাদের বন্ধুত্বগুলোকেও বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু সুরক্ষা তো শুধুমাত্র নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রণ করলে আসে না। মেয়েরা যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করে সমস্ত কিছু ছেড়ে ঘরে বসে থাকে, তাহলেও কিন্তু তারা সুরক্ষিত নয়। সমাজের উচিত এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা যেখানে মেয়েরা নির্ভয়ে ঘুরতে পারবে, নির্ভয়ে বেরতে পারবে, নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে পারবে। নিজের স্বাধীনতা, সম্মান সমস্ত কিছু বজায় রেখেই তারা যাতে চলতে পারে সেটা দেখার দায়িত্ব তো এই সমাজের এবং বিশেষ করে বলতে গেলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের।

যখন স্বঘোষিত নীতি পুলিশরা, বিহার কিংবা দিল্লির মতো অবতীর্ণ হয়ে এরকম ধরনের ঘটনা ঘটান, তখন ওই হেনস্থাকারীদের মাথায় কিছু কথা ঘোরে। ওই মেয়েটি বাইরে কেন বেরিয়েছে, ওই মেয়েটির কেন একজন পুরুষ বন্ধু আছে, তার সঙ্গে ওই মেয়েটির কী সম্পর্ক? এই সীমারেখাগুলো কেন অতিক্রম করছে বা করার চেষ্টা করছে ওই মেয়েটি? আর যখন অতিক্রমই করে ফেলেছে তখন তাদেরকে নির্যাতন করার সম্পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। ভারতীয় আইন অনুযায়ী হয়তো দু’টি ঘটনায় পকসো ধারা প্রয়োগ হবে, কিন্তু তাহলে কি সমাজটা কাল থেকে শুধরে যাবে? পকসো আইন আনা হয়েছিল যাতে শিশুদের ওপরে অত্যাচারকে আটকানো যায়। কিন্তু এই দুটো ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনও আইন এনেই আসলে কিছু করা যাবে না। মিনিবাসের কন্ডাকটাররা একটা কথা বলে থাকেন। ‘পিছনের দিকে এগিয়ে চলুন’। আমরা এখন সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছি।

এই দু’টি অপরাধ একটি গভীর ভণ্ডামিপূর্ণ সমষ্টিগত সামাজিক কল্পনার নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরে, যা কিশোরী মেয়েদের শিশু হিসেবে গণ্য করে, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে এবং তাদের পোশাক নির্ধারণ করে দিয়ে তাদের স্বাধিকারকে অস্বীকার করে; অথচ যখন তারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়, তখন তাদের দোষারোপের দৃষ্টিতে বিচার করে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করে। এটি একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের অপরাধমূলক আচরণের বোঝা একটি বালিকার কাঁধে চাপিয়ে দেয়। মেয়েটিকে দোষারোপ করার এই প্রবণতা সেই নির্মম সত্যকে আড়াল করে, যা ইউনিসেফের মতো সংস্থাগুলো বারবার তুলে ধরেছে– যৌন সহিংসতা কোনও অস্পষ্ট ইঙ্গিত বা নিয়ম ভাঙার বিষয় নয়। এটি একটি পুরুষ-কেন্দ্রিক ক্ষমতা ব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত নির্ভেজাল ক্ষমতারই ফল।
আমাদের আসলে একটা আমূল পরিবর্তন করতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গিতে। কী করে আমরা আমাদের সন্তানদের বড় করব, বিশেষ করে ছেলে-সন্তানদের, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। কী করে আমাদের পরিবারটাকে দেখতে হবে সেটাও নতুন করে ভাবতে হবে। যদি কোনও অভিভাবক মনে করেন যে, তিনি তাঁর ছেলে-সন্তানকে সালমান খানের মতো গড়ে তুলবেন, ম্যাচো বানাবেন– তাহলে সালমান খান যেমনভাবে ফুটপাতে গাড়ি তুলে কোনও একজন মানুষকে মেরে দিয়েছিলেন, এই ঘটনা তার জীবনেও ঘটতে পারে। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক নীতিমালা শুধুমাত্র বাড়ির মেয়েদের জন্য থাকবে তা তো হতে পারে না। যতদিন এইরকম চিন্তাভাবনা চলবে ততদিন কিন্তু এই ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তা সে যত কঠিন আইন আনা হোক না কেন। একজন কন্যা-সন্তানের বাবা হিসেবে এবং একজন পুরুষ হিসেবে এই কথা বলা ছাড়া আর কী বা বলতে পারি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved