Robbar

দেবতার জন্ম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 28, 2026 5:52 pm
  • Updated:July 28, 2026 5:52 pm  

আসলে মানুষ অসহায় বলেই সে দেবতাকে বিশ্বাস করে। মানুষের এই অসহায়ত্ব নিয়েই ব্যবসা করে ধর্ম-ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রাষ্ট্র সমস্ত কিছু দেখেশুনেও যদি সংবিধানের প্রাথমিক যুক্তিবোধের বিষয়গুলো ভুলে গিয়ে এই ধরনের অপবিজ্ঞানের চর্চাকে মদত দেয়, তখন মানুষের আর কী দোষ! যদি দেখা যায়, পুরীতে রথযাত্রার আগে কয়েকজন চিকিৎসক ‘জগন্নাথদেব’-এর মূর্তিতে স্টেথোস্কোপ ঠেকিয়ে তার শরীরের পরীক্ষা করছেন এবং সেই দৃশ্যও বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে বহুলভাবে প্রচারিত হয়, তাহলে আর সাধারণ মানুষের কী করণীয়!

সুমন সেনগুপ্ত

সরকারের তরফ থেকে অমরনাথ যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এটা করা হয়ে থাকে বহু বছর ধরে। এই বছর অমরনাথের বরফ গলে গিয়েছে, কারণ চারদিকের উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে। তা বরফ গলে গেলে কী হবে? মানুষজন কি আর শিবলিঙ্গ দেখতে যাবেন না? যে সময়ে কথা বলার দরকার ছিল বায়ুদূষণ নিয়ে, তার ফলে আমাদের পরিবেশে কীভাবে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি, তা নিয়ে– সেই সময়ে দেখা গেল অন্য দৃশ্য। উত্তরপ্রদেশের এক ব্যক্তি তার একটি ফ্রিজের মধ্যে দেখেছেন যে, বরফ জমে শিবলিঙ্গের মতো হয়ে আছে– যা অনেকটা অমরনাথের মতো দেখতে। তারপর যা করণীয় আজকের সময়ে সেটাই করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দেন, ওই ফ্রিজের দরজা খুলে। প্রচার করে দেন যে, তাঁর ফ্রিজের মধ্যে স্বয়ং ভগবান শিব অধিষ্ঠান করছেন। তারপর দেখা গেল, সেটাই অমরনাথ ভেবে দলে দলে মানুষজন তার বাড়িতে হাজির হচ্ছেন। শুরু হয়ে গেছে ভজন-কীর্তন গান। চলছে পূজা-অর্চনা। ফ্রিজের দরজা খুলে রাখলে, ওই বরফ দ্রুত গলে যাবে হয়তো, কিন্তু মানুষকে কত সহজে বোকা বানানো যায়, তা এই ঘটনা আবার প্রমাণ করল।

ফ্রিজের মধ্যে স্বয়ং ভগবান শিব

এরপরেও কেউ যদি মনে করেন যে, আমাদের দেশে সোনাম ওয়াংচুকের মতো মানুষের প্রয়োজন আছে, তাহলে তিনিই সবচেয়ে বড় মূর্খ! আমাদের দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞানচেতনা আর সমস্ত যত যুক্তিবাদী ধারণা গত এক দশক ধরে ধীরে ধীরে শেষ হয়েছে এবং আগামী দিনে আরও শেষ হবে। সেই জন্যই সরকারি পয়সা খরচ করে শ্রাবণমাসে হেলিকপ্টার থেকে গোলাপের পাপড়ি ছেটানো হবে তারকেশ্বরের জলযাত্রীদের উপর। কোটি কোটি টাকা খরচ হবে সমস্ত ধামগুলো রক্ষণাবেক্ষণ এবং পুনরায় গঠনের জন্য, আর অনেকে ভাববেন সোনাম ওয়াংচুক এবং কিছু ছাত্র অনশন করে দেশ বাঁচাবেন! তাই কখনও হয়?

যখন দরকার ছিল বিজ্ঞানচেতনা, বিজ্ঞানভাবনা এগুলোতে শান দেওয়া, তখন আমরা ক্রমশ পিছিয়েছি। যখন দরকার ছিল আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আরও যুক্তিবাদী করে তোলা, তখন আমরা পিছিয়ে গিয়েছি। মনে পড়ে যাচ্ছে, শিবরাম চক্রবর্তীর ‘দেবতার জন্ম’ ছোট গল্পটির কথা। চলাফেরার পথে প্রায় রোজ হোঁচট খাওয়া একটি পাথরকে কীভাবে কিছু মানুষ দেবতা বানিয়ে পুজো শুরু করল, তারই গল্প। কীভাবে সেই পাথর ঘিরে প্রথমে সন্ন্যাসী ও পরবর্তীতে ভক্ত সমাগম শুরু হল এবং তা থেকে একটা আস্ত মন্দির এবং ধর্মস্থানে পরিণত হল ওই পাথর পুনঃস্থাপিত করা গাছতলা সেটারই গল্প। গল্পটি বহু দিনের পুরনো হলেও আজও কতটা প্রাসঙ্গিক– তা উত্তরপ্রদেশের ওই ডিপ ফ্রিজের ঘটনাটি দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বলিউডের ‘পিকে’ ছবিটির একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে দেখানো হয়েছিল কোনও টাকাপয়সা না বিনিয়োগ করেও, এই ধরনের মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে একদল মানুষ ফুলেফেঁপে উঠছেন।

পিকে ছবিতে দেবতার জন্মের দৃশ্য

১৯৯৩ সালে আমেরিকায় এই একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল। রাস্তায় একটি পাথর পড়েছিল। তা সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অসুবিধা করছিল। সেই কারণে স্থানীয় পুলিশ পাথরটিকে সেই জায়গা থেকে সরিয়ে একটি পার্কে রেখে দেয়। কিছুদিন পরে দেখা যায়, ওই অঞ্চলের বেশ কিছু ভারতীয় সেই পাথরটিকে ফুল-জল দিয়ে পুজো করছেন। এই ঘটনায় ভারতের কতটা মুখোজ্জ্বল হয়েছিল জানা নেই, কিন্তু ভারতের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী যে অংশটি আছে তাঁদের মুখ কতটা উজ্জ্বল হয়েছিল, তা বোধহয় বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারতের সংবিধানে কী লেখা আছে এই বিষয়ে সেটা কি আমরা জানতে চাই? সংবিধানের প্রস্তাবনা ভারতকে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল নীতি (সর্ব ধর্ম সমভাব) রাষ্ট্রকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা থেকে বিরত রাখে এবং নিশ্চিত করে যে শাসনব্যবস্থা যেন ধর্মীয় গোঁড়ামির পরিবর্তে বস্তুনিষ্ঠ, যৌক্তিক ও তথ্য-প্রমাণ-ভিত্তিক হয়। ভারতের সংবিধান মৌলিক কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ৫১এ(এইচ) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবতাবাদ এবং অনুসন্ধান ও সংস্কারের মানসিকতা’ গড়ে তোলাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করে যৌক্তিক চিন্তাধারাকে উৎসাহিত করে। এটি অন্ধবিশ্বাস থেকে সরে এসে যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণমূলক চিন্তাধারাকে গ্রহণ করার নির্দেশ দেয় এবং নাগরিকদের সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে ক্রমাগত প্রশ্ন করা, যাচাই করা ও সংস্কার করার আহ্বান জানায়।

গণেশের দুধ খাওয়ার গুজব

কিন্তু এই সমস্ত কিছুই তো এখন বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। একটা সময়ে সারা বাংলায় গুজব ছড়িয়েছিল গণেশ দুধ খাচ্ছে। দলে দলে মানুষ গণেশমূর্তিতে দুধ ঢালার জন্য লাইন দিতে শুরু করলেন। চারিদিকে চূড়ান্ত শোরগোল। সবাই লিটার লিটার দুধ কিনছে এবং গণেশমূর্তিতে দুধ ঢালতে উদ্যত হচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে সেই সময়ে বিজ্ঞানকর্মীরা মাঠে নামলেন এবং মানুষকে বোঝানো শুরু করলেন যে এই প্রক্রিয়াটি একটি ভৌতবিজ্ঞান প্রক্রিয়া এবং এর মধ্যে কোনও দেবতার অলৌকিকত্ব নেই। এই প্রক্রিয়ার নাম সারফেস টেনশন বা পৃষ্ঠটান। আজকের সময়ে এই বিজ্ঞানচেতনার খুব প্রয়োজন।

ধর্মের আফিম খাইয়ে আর কতদিন মানুষকে ভুল বোঝানো সম্ভব, সেই প্রশ্ন আজকে না করলে আর কবে করা উচিত? ২০২৬-’২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট বিজ্ঞান-চালিত প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জোরালো উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে; তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এর সাফল্য নির্ভর করছে কার্যকর বাস্তবায়ন, সময়মতো অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং উদ্ভাবন খাতে স্বচ্ছ অর্থায়নের ওপর। ২০২৩-’২৪ অর্থবছরে জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের (Department of Biotechnology) বরাদ্দ ২,৬৮৩.৮৬ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১,৬০৭.৩২ কোটি টাকা করা হয়েছিল এবং প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরও কমে ১,৪৬৭.৩৪ কোটিতে নেমে আসে। একইভাবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের ক্ষেত্রে বরাদ্দ ৭,৯৩১.০৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৪,৮৯১.৭৮ কোটি টাকা করা হয় এবং প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪,০০২.৬৭ কোটি টাকায়। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ বা ‘মিশন-মোড’ কার্যক্রমের ওপর জোর: এই বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর মিশন ২.০, সিসিইউএস (CCUS), গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ এবং বায়ো-ম্যানুফ্যাকচারিং হাবের মতো বড় বড় উদ্যোগগুলোকে সহায়তা করা হয়েছে; তবে নীতিগত ঘোষণার বাইরে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। জিডিপির (GDP) শতাংশ হিসেবে ভারতের গবেষণা ও উন্নয়নে মোট ব্যয়ের (GERD) হার ০.৬% থেকে ০.৭%-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে; এই হার বিশ্ব-গড়ের চেয়ে কম এবং চিন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই কম। আরও একটা কারণ অবশ্য আছে এর পিছনে। তা হল ভারতের বেসরকারি খাতের তুলনামূলক কম বিনিয়োগ– যা মোট ব্যয়ের মাত্র ৩৬%-এর মতো– অথচ উল্লিখিত দেশগুলোতে বেসরকারি খাতের অবদান ৭০%-এরও বেশি।

আসলে মানুষ অসহায় বলেই সে দেবতাকে বিশ্বাস করে। মানুষের এই অসহায়ত্ব নিয়েই ব্যবসা করে ধর্ম-ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রাষ্ট্র সমস্ত কিছু দেখেশুনেও যদি সংবিধানের প্রাথমিক যুক্তিবোধের বিষয়গুলো ভুলে গিয়ে এই ধরনের অপবিজ্ঞানের চর্চাকে মদত দেয়, তখন মানুষের আর কী দোষ! যদি দেখা যায়, পুরীতে রথযাত্রার আগে কয়েকজন চিকিৎসক ‘জগন্নাথদেব’-এর মূর্তিতে স্টেথোস্কোপ ঠেকিয়ে তার শরীরের পরীক্ষা করছেন এবং সেই দৃশ্যও বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে বহুলভাবে প্রচারিত হয়, তাহলে আর সাধারণ মানুষের কী করণীয়! যখন আরও বেশি করে যুক্তিবোধের চর্চার প্রয়োজন ছিল, তখন আগামী প্রজন্মকে এই ভূত, ভগবান, দত্যি-দানোর মধ্যে আটকে রাখার উদ্দেশ্য কী– সেই প্রশ্ন করার কি সময় হয়নি? বাঙালির আজকে খুব প্রয়োজন ছিল শিবরাম চক্রবর্তীদের, যাঁরা হয়তো নতুন করে লিখতেন ফ্রিজের ভিতরে ‘দেবতার জন্ম’!