Robbar

প্রসূনের অকাদেমি পুরস্কার বাণিজ‍্যকলুষমুক্ত বাংলা কবিতার স্বীকৃতি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 22, 2026 12:03 pm
  • Updated:March 22, 2026 12:03 pm  

আত্ম-উন্মোচনকে প্রসূন, আমাদের প্রসূন, ব‍্যবহারিক এমন একটি স্তরে নিয়ে গিয়েছে তা সাধনা-ছুঁইছুঁই। নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখে, বা বসিয়ে রেখে, কিংবা থামিয়ে দিয়ে দূর থেকে সে দেখেছে। ঘুরে ঘুরে সে দেখেছে। ব‍্যথিত মনের কোনও যুবতীর বয়ানেও সে লিখে গেছে। গভীর গাঙ্গেয় দেশে ঢুকে পড়ার সাধে বারবার আমোদে সে নিজেকে বহন করছে। নাট‍্যকার যেভাবে চরিত্রদের দিয়ে বলান, প্রসূনের কবিতায় তেমনই চরিত্ররা ঘোরাফেরা করে। কখনও কখনও তারা কথা বলতেও শুরু করে।

মৃদুল দাশগুপ্ত

এ লেখার গোড়াতে দুটো কথা বলে নেওয়া দরকার। বাংলা কবিতা লিটল ম‍্যাগাজিনগুলিতে বাহিত হচ্ছে– প্রসূন বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়কে পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে সাহিত‍্য অকাদেমি এতে স্বীকৃতির শিলমোহর দিয়েছে। বাংলা কবিতা বাণিজ‍্যিক বিষয়াদির উল্টোদিকের ব‍্যাপার, এই স্বীকৃতিও দিয়েছে সাহিত‍্য অকাদেমি। বাণিজ‍্যকলুষমুক্ত বাংলা কবিতার এই স্বীকৃতিতে আহ্লাদে, আমি– প্রসূনকে যাঁরা এই পুরস্কারের জন‍্য মনোনীত করলেন, সাহিত‍্য অকাদেমির সেই নির্বাচকদের ধন‍্যবাদ জানাচ্ছি।

প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়

যেহেতু প্রসূন আমার সমকালীন কবি, প্রসূনের কথা, তার কবিতার কথা বলতে গেলে, আমাদের সূচনাকালের কথা খানিক বলে নিতে হবে। মহাভারতের এই পূর্বাঞ্চল, উভয় বাংলা তখন দুলছিল– ওই বাংলা মুক্তিব‍্যাকুল, এই বাংলা সমাজবদলের স্বপ্নে সংসদীয় ও সশস্ত্র উভয়পন্থায় দুলছিল। আমার বিবেচনায়, সত্তর দশকীয় কবিরা নৃত‍্যরত ওই সময় থেকেই ছন্দোসিক্ত হয়েছেন। সৃষ্টিসুখের ঘোর জেগেছিল ওই তখন, এই পশ্চিম বাংলায়। ওই সময়ের গান ভাবুন, নাটক ভাবুন, সিনেমা ভাবুন, এমনকী ফুটবল ভাবুন (প্রসূন ভারী ফুটবল অনুরাগী, আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ে মহাগ্রন্থ আছে ওর)। কলকাতার কেন্দ্রিকতা তছনছ করে মফস্‌সল বাংলা থেকে, ত্রিপুরা, কাছাড়, বিহার থেকে পদধ্বনি শোনা যেতে লাগল আমাদের সময়ের কবিতাপ্রয়াসীদের। তখন ‘পুরী সিরিজ’ লিখে ‘এরোপ্লেনের বিচ্ছিরি ছায়া বুলিয়ে’ উৎপলকুমার বসু চলে গিয়েছিলেন বিলেতে, ‘ফিরে এস, চাকা’-র কবি বিনয় মজুমদার ছিলেন হাসপাতালে। ওই রূপকথার জগতে কৃত্তিবাসের কবিরা, পঞ্চাশ দশকের কবিরা তখন তাঁদের তুঙ্গ সময়ে ঝলমল করছিলেন। তবু তাঁদের কবিতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হল না সত্তর দশকীয় কবিতা, বরং ছিটকে গেল ধু ধু মাঠে, বনবাদাড়ে– তা আমার বিবেচনায়, ভাস্কর চক্রবর্তী পঞ্চাশ ও সত্তরের মাঝখানে একটি পাঁচিল তুললেন বলে। বাংলা কবিতা থেকে কাব‍্যিকতারও সমাপ্তি ঘটল। আমাদের সময়েই বাংলা কবিতা হয়ে পড়ল বিবিধ ও বিস্তারিত।

সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ

ওই উতরোলে প্রসূনের আগমন, যতদূর মনে পড়ছে, একটু পরে। সেই সমারোহে তামাম বাংলায় তরুণ কবিদের গোনাগুনতির হিসেবে সেকালে একটা বলাবলি ছিল, আর্লি সেভেন্টিস, লেট সেভেন্টিস। প্রসূন হল ওই লেট সেভেন্টিস-এর কবি। ১৯৮৩ সালে প্রসূনের প্রথম কাব‍্যগ্রন্থ ‘বালি ও তরমুজ’ বেরনোর কয়েক বছর আগে, হতে পারে তা ১৯৭৪-৭৫ সাল, প্রসূনের সঙ্গে আমার আলাপ, সম্ভবত গৌতম চৌধুরী সম্পাদিত ‘অভিমান’ পত্রে প্রসূন কবিতা লিখেছিল, গৌতমই প্রসূনের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেয়। প্রসূনের বন্ধু প্রবুদ্ধ মিত্রর সঙ্গেও বন্ধুত্ব হয়, তখন আমাদের মধ‍্যে প্রসূনের প্রতিবেশী প্রবুদ্ধই একমাত্র গল্পকার। ১৯৮৩ সালে প্রসূনের ‘বালি ও তরমুজ’ যখন বের হয়, আমি তখন যুগান্তর দৈনিক পত্রে কর্মরত। যুগান্তর অফিসভবনটি ছিল বাগবাজারে, প্রসূনের বাড়ির অদূরে। বাগবাজার স্ট্রিটেই প্রসূন, প্রবুদ্ধের বাড়ির কাছে থাকতেন রণজিৎ দাশ, গৌরাঙ্গ ভৌমিক। যুগান্তর-এ কাজ করতেন, তাঁর ছেলে ভিক্টর, ভালোনাম অনুরূপ আমাদের বন্ধু। আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, সেকালে কেন বাগবাজার টগবগ করত।

পয়লা বই ‘বালি ও তরমুজ’-এ-ই প্রসূনের সত্তর দশকীয় চিহ্নগুলি টের পাওয়া গেল:

‘হামাগুড়ি দিয়ে এসো, টলোমলো পায়ে ছুটে এসো বেবী
গ্লাক্সোবেবী, উড়ে এসো, আমাদের কোলে এসো

সাহেব বাচ্চার মতো ফর্সা পোঁদ, ফর্সা নুঙ্কু দুলিয়ে হৈ হৈ করে
গরীবের ঘরে এসে পড়ো’
(গ্লাক্সো বেবী/ বালি ও তরমুজ)

‘আজ সাধ যায় পুনর্বার, বন্দুকের নল
একান্ত গোপনে বসে তোমার সম্মুখে সব খোলাখুলি বলি

বহু ছেলে খুন হয়ে যাওয়ার পরেও আমি আবার আবার
বিসর্জনের তাসার সঙ্গে নেচেছি’
(স্বীকারোক্তি: বন্দুকের নলকে/ বালি ও তরমুজ)

সুদক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কাদামাটি, বৃষ্টি, নোনা,
মাছের ভেরীর
মধ‍্যে দিয়ে বাস ছুটল

সূর্য ডুবল ধানের গভীরে, আর হাত নাড়তে গিয়ে বালকের
খুলে গেল ধরে থাকা প‍্যান্ট
(মফস্বলের বাস/ বালি ও তরমুজ)

প্রসূনের কবিতায় কোনও ভান নেই, অছিলা নেই, এবং প্রসূন অবিচল অকপট। সুস্থির, একইসঙ্গে সময়ে বেদনাবাহী প্রসূন উড়াল দিল পরের বই ‘উন্মেষগোধূলি’ থেকে। সে লিখল:

‘…কেন যাও আস্তাবলে
ঘোড়ার কেশর ধরে কেন কাঁদো গোধূলি আলোয়’

আত্ম-উন্মোচনকে প্রসূন, আমাদের প্রসূন, ব‍্যবহারিক এমন একটি স্তরে নিয়ে গিয়েছে তা সাধনা-ছুঁইছুঁই। নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখে, বা বসিয়ে রেখে, কিংবা থামিয়ে দিয়ে দূর থেকে সে দেখেছে। ঘুরে ঘুরে সে দেখেছে। ব‍্যথিত মনের কোনও যুবতীর বয়ানেও সে লিখে গেছে। গভীর গাঙ্গেয় দেশে ঢুকে পড়ার সাধে বারবার আমোদে সে নিজেকে বহন করছে। নাট‍্যকার যেভাবে চরিত্রদের দিয়ে বলান, প্রসূনের কবিতায় তেমনই চরিত্ররা ঘোরাফেরা করে। কখনও কখনও তারা কথা বলতেও শুরু করে।

প্রসূনের ‘উপাদান কারণ’ কাব‍্যগ্রন্থটির প্রথম প্রকাশ ২০১৪, ‘মধুরতুমুল’ কাব‍্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় সূচিতে তা জানানো আছে। তবে পূর্ববর্তী ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’, ‘আনন্দ ভিখিরি’ বই দু’টি ও ‘রামলীলা ময়দান’ পুস্তিকাটির প্রকাশকাল জানানো নেই। এছাড়া ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র ভূমিকায় প্রসূন জানিয়েছে শ্রেষ্ঠ কবিতায় সে ‘গুপ্ত দাম্পত‍্যকথা’, ‘রাধাতপা চতুর্দশী’, ‘টুরিস্ট কাহিনী’র কোনও কবিতা রাখেনি। আঁটোসাটো বই থেকে আলাদা করে কবিতা নির্বাচিত করা যাচ্ছে না বলে। এছাড়া ইস্তাহারধর্মিতার কারণে ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ কাব‍্যগ্রন্থটিও রাখেনি প্রসূন।

‘উত্তর কলকাতার কবিতা’ ও ‘আনন্দ ভিখিরি’ কাব‍্যগ্রন্থ দু’টি ২০১৪-র আগে প্রকাশিত। সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলিতে প্রসূন বলেছে, সে মনে করে আফ্রিকাতেও উত্তর কলকাতা রয়েছে। বালকবেলা থেকে প্রসূন সাবেকিয়ানার ক্ষয়িষ্ণু অবশিষ্ট দেখেছে উত্তর কলকাতায়, ওই জনসমাজের অবতলের সমাজটিকে জড়িয়ে ধরেছে।

সাক্ষাৎকারগুলিতে প্রসূন তার প্রপিতামহ ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ‍্যাবিনোদের ঋণস্বীকার করেছে। ‘আলিবাবা’-সহ অগুন্তি নাটকের রচয়িতা ক্ষীরোদপ্রসাদ সিমলার নরেন্দ্রনাথ দত্তের, স্বামী বিবেকানন্দের সমবয়সী ছিলেন। বিবেকানন্দ তাঁর গদ‍্যে অবাধে উত্তর কলকাতার বাকবুলির জেল্লা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রসূন কবিতায় উত্তর কলকাতার ওই কথ‍্যভাষাকে প্রাণবন্ত করেছে। ‘আমার মেয়ের বিয়ের ঝলমলে…’ ‘বেজে উট্‌চে জগোঝম্পো…’ ‘কাকে শুইয়ে দিয়েছে গা নাকে তুলো চোখে…’ এসব কবিতা প্রসূনের ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’ বইটির। সত্তর দশকীয় উড়ানের পর ওই প্রসূনের স্বকীয় অবতরণক্ষেত্র।