Robbar

ট্রাম্পের আগ্রাসনের ধরনই কি অনাগত পৃথিবীর জন্য স্বাভাবিক হয়ে উঠবে?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:January 15, 2026 6:18 pm
  • Updated:January 15, 2026 6:18 pm  

সভ্যতার এক ভীষণ সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এই প্রত্যেকটা পদক্ষেপ, পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতালিপ্সু মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, মানুষের কোনও বিবর্তন হয়নি। সার্বভৌমত্ব, অন্যান্য মানুষ বা দেশের মতামত, আন্তর্জাতিক আইন সমস্ত কিছুই শব্দবন্ধ মাত্র। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার এই প্রবল আগ্রাসী পদক্ষেপ কালকের পৃথিবীর জন্য স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে না তো?

মহুয়া সেন মুখোপাধ্যায়

২০২৬ সালের প্রথম শনিবার। দিনের শুরুই এক ‘ব্রেকিং নিউজ’ দিয়ে।

আমেরিকান সেনাবাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ করেছে ভেনেজুয়েলায়। শুক্রবার রাত্রি ১০.৪৬ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সবুজ সংকেত দেন,। রাত্রি ২.২০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোর বাসভবন থেকে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে আসা হয়। ভোর চারটের মধ্যে তাঁরা আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে সরাসরি নিউ ইয়র্কগামী জাহাজে! ১৫০টি এয়ারক্রাফটের সাহায্যে একজনও আমেরিকান সৈন্যরও প্রাণহানি না -ঘটিয়ে, এরকম একটা সফল সার্জিকাল স্ট্রাইক প্রায় অবিশ্বাস্য! একজন একনায়ককে আমেরিকার বিচারব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসা, আমেরিকার একটি কুখ্যাত জেলে বন্দি রাখা এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা– পুরোটাই ঘটে গেল দু’-তিন দিনে। বর্তমান সরকার আত্মপ্রসাদে ভরপুর। বলা হচ্ছে, নিকোলাস মাদুরোর মতো ‘নারকো-স্টেট’ নিয়ন্ত্রক এবং একনায়ক; যিনি দেশে গণতন্ত্রের কোনও জায়গা রাখেননি, তাঁকে পদচ্যুত করে, গ্রেফতার করে, আমেরিকার আইনের আওতায় এনে, আসলে ভেনিজুয়েলাতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

কিন্তু একটা দেশের ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা কথা আছে না? আর আন্তর্জাতিক আইন? কী বলে তা?

আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও রাষ্ট্র অন্য কোনও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করতে পারবে না। আগ্রাসন একটি আন্তর্জাতিক এবং অত্যন্ত ‘গুরুতর’ অপরাধ। ইউনাইটেড নেশনস-এর জেনারেল অ্যাসেম্বলি চার্টার অনুযায়ী, এক রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অন্য রাষ্ট্রের সীমানা লঙ্ঘন করা বা নৌ ও বিমানবাহিনীর আক্রমণ, বোমাবর্ষণ, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন– এ সমস্ত কিছুই আদতে আগ্রাসন। একমাত্র দু’টি পরিস্থিতিতে এ পদক্ষেপ কোনও দেশ নিতে পারে– যখন সে নিজে আক্রান্ত হয়, অথবা ইউনাইটেড নেশনসের সিকিউরিটি কাউন্সিল যখন এই বিষয়ে সম্মতি দেয়। কিন্তু ভেনিজুয়েলা আক্রমণের ক্ষেত্রে এই দুটোর কোনওটাই হয়নি, বরং আগ্রাসনের প্রত্যেকটি পদক্ষেপই সচেতন সিদ্ধান্ত হিসাবে নেওয়া হয়েছে। একথা সকালের আলোর মতো পরিষ্কার যে, ‘নারকো-রাষ্ট্র’ পরিচালনা করতেন বলে তাঁকে অপহরণ করে আমেরিকার আওতায় আনা হয়নি, যদিও গত বছর থেকে সেটার ওপর ভিত্তি করে বারবার অভিযোগ করা হয়েছে মাদুরোকে। জানুয়ারি মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরেই এই মর্মে এগজিকিউটিভ অর্ডার আনেন সমস্ত ড্রাগ-কার্টেল, বিশেষত দক্ষিণ আমেরিকার কুখ্যাত ড্রাগ-কার্টেলগুলি হচ্ছে বিদেশি সন্ত্রাসবাদী সংস্থা এবং তাদের দমন করার জন্য অত্যন্ত কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। নভেম্বর মাসে তাতে যুক্ত হয় ভেনেজুয়েলার ‘কার্টেল দে লস সোলেস’। সম্প্রতি মাদুরকে আদালতে এই মরমে অভিযুক্ত করা হয়েছে মাদুরো যে ড্রাগ কারতেলের প্রধান, তারা ইউরোপে পাচার হওয়া কোকেনের ৭৫ শতাংশ কোকেন রপ্তানি করে। সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ‘৬-৭টি অজ্ঞাতপরিচয় ছোট-বড় নৌকো মাদক বহন করছে’ অভিযোগ এনে ধ্বংস করে দেওয়া, প্রশান্ত মহাসাগরে একটি জলযান আক্রমণ করায় ১৫ জনের মৃত্যু, ধীরে ধীরে ‘সাদার্ন স্পিয়ার’ অপারেশনের দ্বারা ভেনেজুয়েলার জলসীমায় আমেরিকান নৌ-বাহিনী উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যাওয়া, সিআইএ-র দ্বারা ড্রোন অপারেশন– এসব চলতে থাকে। অন্তত ১৫০ জন মানুষের প্রাণ যায় এই আক্রমণগুলোয়। তাঁদের পরিচয় কী– সেই তথ্য যদিও সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।

এরপর আসে ৩ জানুয়ারি। বিমানপথে সশস্ত্র আক্রমণ। অন্তত ৮০ জন স্থানীয় মানুষের মৃত্যু। রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং সিরিয়া ফ্লোরেসকে গভীর রাত্রে তাঁদের শয়নকক্ষ থেকে গ্রেফতার। মাদুরো একজন একনায়ক, তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন– এ সমস্ত কথা সর্বজনবিদিত, কিন্তু তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ভেনিজুয়েলার মানুষদের গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়াই কি বর্তমান সরকারের উদ্দেশ্য ছিল? যদিও সেই সিদ্ধান্ত দেশের নাগরিকদেরই অধিকার, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত তো কখনওই অন্য একটি শক্তিশালী দেশের হতে পারে না। তাহলে কী কারণে এই আক্রমণ?

রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো

বিষয়টিকে গোপন করার কোনও চেষ্টাও করেননি আমেরিকান রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প। মাদুরো নিউ ইয়র্কে বিচারাধীন হওয়ার পরের দিনই তিনি ঘোষণা করেন যে, ভেনেজুয়েলা আমেরিকাকে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল পেট্রোলিয়াম সরাসরি দেবে এবং সে কাজটি উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে চলা অন্তবর্তী সরকার করবে। তিনি আরও বলেন, এই বিষয়ে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বতী সরকার আমেরিকান সরকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করছেন। এখন থেকে শুরু করে অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত, ভেনিজুয়েলাতে উৎপাদিত তেল পৃথিবীর বাজারে বিক্রি করার দায়িত্ব আমেরিকার এবং তিনি এ-ও জোর দিয়ে বলেন যে, এর ফলে তেলের দাম কমবে, আমেরিকা লাভবান হবে। এই অর্থ ভেনেজুয়েলার পেট্রোলিয়াম শিল্পের পরিকাঠামোর উন্নতির কাজে নিয়োজিত হবে। এইভাবে ভেনেজুয়েলার খনিজ তেলের অধিকার রাতারাতি হস্তান্তর হয়ে গেল। ভেনিজুয়েলার সঙ্গে আমেরিকার তেলজনিত কারণে সম্পর্ক বহুদিনের। ভেনিজুয়েলাতে পেট্রোলিয়াম উৎপাদন শুরু হওয়ার সময় থেকেই আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলির সাহায্যেই কারখানাগুলি গড়ে ওঠে। ভেনেজুয়েলা যে তেল উৎপাদন হয় তা ‘ভারী ক্রুড তেল’, যা পৃথিবীর কয়েকটি দেশে উৎপন্ন হয়। তেলের ঘনত্ব অনুযায়ী তার প্রয়োগ যেমন আলাদা, তেমনই ভারী ক্রুড তেল পরিশোধন করার কারখানাও আলাদা। আর সেই কারণে ভারী ক্রুড তেল পরিশোধনকারী কারখানা কয়েকটি আছে আমেরিকার দক্ষিণ দিকের গালফ কোস্ট বরাবর রাজ্যগুলিতে, যেখানে এই তেল ভেনিজুয়েলা থেকে পৌঁছনো সুবিধাজনক। ভেনিজুয়েলাতে সাতের দশকে পেট্রোলিয়াম জাতীয়করণ করার পরেও এই সম্পর্ক ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর, পেট্রোলিয়াম রফতানির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেক কঠিন হয়। সরকার বিদেশি কোম্পানিগুলির ওপর অনেক বেশি কঠোর নিয়ম জারি করে, আর তখন থেকেই এই সম্পর্ক নষ্ট হওয়া শুরু। ২০১৩ সালে চাভেজের পর মাদুরো ক্ষমতায় এলেও একই রকম কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। আমেরিকান কোম্পানিগুলির বেশিরভাগ ভেনিজুয়েলা থেকে বেরিয়ে আসে। আমেরিকা ২০১৭ সালে ভেনিজুয়েলার সরকার নিয়ন্ত্রিত পেট্রোলিয়াম কোম্পানি ‘PDVSA’-কে আমেরিকান অর্থনেতিক বাজার থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়, ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেয়, ‘ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক’ পরিচালিত সংস্থা ভেনিজুয়েলাকে বিশাল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় আমেরিকাকে, বিশেষত যে কোম্পানিগুলি ভেনেজুয়েলা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে তাদেরকে, যা ভেনেজুয়েলা দিতে পারে না। রফতানি ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে চিন, রাশিয়াকে তেল রফতানি করতে হয়। বেশ কিছু দশক ধরে আমেরিকার কঠোর নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থা ভেনিজুয়েলার পেট্রোলিয়াম শিল্পের অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে বেশ নড়বড়ে করে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য বলছে, যেহেতু আমেরিকান তেল কোম্পানিদের ভেনিজুয়েলা ছাড়তে হয়েছিল এবং ভেনিজুয়েলার সরকার তাদের ঋণ শোধ করেনি, তাই তেলের ওপর অধিকার আমেরিকার। তাই কীভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা আমেরিকা ঠিক করবে।

ভেনিজুয়েলা বন্ড বিরোধী প্রতিবাদ

ইরাক যুদ্ধের কথা এখনও মনে আছে। ২০০৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট, কলিন পাওয়েল, সিকিউরিটি কাউন্সিলের সামনে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে বিরাট বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন সিআইএ-র কাছে পরিষ্কার প্রমাণ আছে ইরাকে লুকনো আছে গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র। তিনি তাঁর বক্তব্যে ‘ওয়েপনস্ অফ মাস ডেস্ট্রাকশন’ কথাটা ১৭ বার ব্যবহার করেন এবং সেটাই হয়ে যায় আমেরিকার সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার চাবিকাঠি। ইতিহাস বলে, এর মধ্যে কতটা মিথ্যে, কতটা সত্যি। কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার আগে, ইউনাইটেড নেশনস, অন্য দেশের এবং নিজের দেশের মানুষদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা এতে ছিল। টিভিতে, রেডিওতে, খবরের কাগজে ওই কথাটা বারবার বলে জনমত তৈরি করার চেষ্টা ছিল। যাতে এই যুদ্ধ ঘোষণাকে ‘আগ্রাসন’ বলা না হয়। এখন আর সেটা নেই। এখন রাষ্ট্রপতি নিজের কাজকে সমর্থন করার জন্য ১৮২৩ সালে, জেমস মনরোর লেখা ‘মনরো ডক্টরিন’-কে ব্যবহার করছেন। সদ্য ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা পাওয়া দেশে রচিত এই ডকুমেন্টে বলা হয়, ইওরোপিয়ান কোনও দেশ পশ্চিম গোলার্ধের কোনও বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। পশ্চিম গোলার্ধের দায়িত্ব আমেরিকার। ট্রাম্প গর্ব করে আরও বলেন, তাঁরা এটাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তাই ‘মনরো ডকট্রিন’ এখন ‘ডনরো ডকট্রিন’। ফলে তিনি কলম্বিয়া, কিউবা-কে হুমকি দিচ্ছেন এবং ডেনমার্কের টেরিটরি গ্রিনল্যান্ডকে অচিরেই অধিগ্রহণ করার কথা স্বাভাবিকভাবেই ঘোষণা করছেন। সভ্যতার এক ভীষণ সংকটময় মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। এই প্রত্যেকটা পদক্ষেপ, পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতালিপ্সু মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, মানুষের কোনও বিবর্তন হয়নি। সার্বভৌমত্ব, অন্যান্য মানুষ বা দেশের মতামত, আন্তর্জাতিক আইন সমস্ত কিছুই শব্দবন্ধ মাত্র। প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতার এই প্রবল আগ্রাসী পদক্ষেপ কালকের পৃথিবীর জন্য স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে না তো?