

আমাদের মনগুলো তো বদলে গিয়েছে। আমাদের সুইট ড্রিমসে শুধু সন্দেহ আর ঘৃণা। তাই ‘ক্রিমিনাল অফেন্সে মামলা ঠুকে দেব’– এ হল রাষ্ট্র-ব্যবহৃত অ্যাপারেটাস। যার নাম শুনলে পাবলিক হেবি ভয় পেয়ে সাইলেন্ট মোডে চলে যায়। বলে, ঘাট হয়েছে! আর স্লোগান দেব না! সব মিলিয়ে, একটা ভয়ের আবহের মধ্যে ঠেলে ফেলা। আমার ব্যাকরণ অনুযায়ী কথা না বললে, তুমি ঘোর অপরাধী। তোমার নামে চার্জশিটও প্রস্তুত।
ভরা বাজারের ভেতরে ছুটে মরছে উন্মাদ একজন। সকালবেলার ঝলমলে আলো আছে, তবু সে জ্বালিয়েছে একটি লণ্ঠন। বিরামহীন চিৎকারে বলছে: আমি ঈশ্বরকে খুঁজছি! আশেপাশে যারা ছিল, প্রত্যেকেই নাস্তিক। ঈশ্বরের অস্তিত্ব ফালাফালা করে বলল, ঈশ্বর কি পথ হারিয়ে ফেলল একজন শিশুর মতো? কেউ আবার বলছে, সে কি আমাদের ভয়ে লুকিয়ে পড়েছে কোথাও? বাজারে হাসির হল্লা উঠেছে যেই, উন্মাদ বলল, আমি তোমাদের বলব ঈশ্বর কোথায়। এই আমরা মানে তুমি, মানে আমি, আমরা সকলে তাকে হত্যা করেছি। তারপর সে আঁধার, শীতকাল, অনন্ত কিচ্ছু-নার কথা বলে। বলে, যারা ঈশ্বরের কবর খুঁড়ছে, তাদের কথাও। সেই কবর থেকে ঐশ্বরিক পচনের গন্ধকথা। ঈশ্বরও পচনশীল! উন্মাদ বলে, ঈশ্বর মৃত। কোনওদিন বেঁচে উঠবে না আর।

এরপরই ফ্রেডরিখ নিৎশে সেই দুর্দান্ত প্রশ্নটি ছুড়বেন। অতএব, চার্চের কী প্রয়োজন? ঈশ্বরের সমাধি ও মূর্তি– মৃত্যুর পরে অর্থহীন হয়ে যায় না? এটুকু পড়ামাত্র তেড়েফুঁড়ে উঠবে একাধিক মানুষ। প্রথম প্রশ্ন হয়, ক্রোধে ও হিংসায়: তুমি কে হে? কোন অওকাতে বাতেলা ঝাড়ছ ঈশ্বরের নামে? আধার কার্ড আছে? তৎক্ষণাৎ মব লিঞ্চিং অথবা ঠুকে দাও একখানা মামলা। এলেবেলে নয়, স্ট্রেট ফৌজদারি– ওই হতচ্ছাড়া আমার ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছে! তারপর আদালত। বিচার। অবশেষে, ফয়সালা। কেমন টাইট দিলাম, মামা? আরেকবার ট্যাঁ-ফো করে দেখা কেমন পারিস! কারণ একুশ শতকের ভারতবর্ষে, ‘টাইট’ আমাদের ভিত্তি। ‘প্রোটিন শেক’ আমাদের ভবিষ্যৎ।
ছাদে বসে থাকি একা। আর একটা অনন্ত ‘কিচ্ছু না’-র মধ্যে ভেসে বেড়ায় আমারই সহনাগরিক। যেখানে নৈতিকতা নেই। মূল্যবোধ নেই। চিন্তার আদর্শ নেই। এই কথাগুলোই আসলে বলতে চেয়েছিলেন নিৎশে। গায়ের জোরে চাপিয়ে দেননি ঘুণাক্ষরেও। তবু আমাদের মনে হল, ভারি অনাচার!

সম্প্রতি রাজধানীতে একটি সম্মেলনের বিষয় ছিল: ফৌজদারি মামলায় নীতিবোধ– আত্মপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের কর্তব্য। বক্তব্য রেখেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি, জাস্টিস উজ্জ্বল ভুঁইয়া। একটি সাধারণ প্রশ্ন তিনি করেছেন: অহর্নিশি যত তুচ্ছাতিতুচ্ছ ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তিই কি আদালতের কাজ?
অর্থ হয়: একটা বই, একটা কবিতা, একটা সিনেমার নাম, একটা ইউটিউব ভিডিও, একটা খাদ্য, একটা স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো, একটা বিক্ষোভ কর্মসূচি, একটা জামিনের দাবি জানিয়ে স্লোগান, একটা সামাজিক মাধ্যমের মন্তব্য– সমস্তটাই হালফিলে ফৌজদারি মামলার আওতায় বিচার্য। আদালত যদি মনে করে, তুমি শনি-মঙ্গলে আমিষ খাবে, তবেই খাবে। আদালত যদি বলে, তুমি জনসমক্ষে ক্লিভেজ দেখাবে না, তাহলে দেখাবে না। আদালত যদি নির্ধারণ করে, তুমি না-মানুষ, শিগগির দেশ ছেড়ে পালাও। জাস্টিস ভুঁইয়া বলছেন: লক্ষ করবেন, সাম্প্রতিক সময়ে ফৌজদারি মামলার অভিযোগসমূহ বড়ই হাস্যকর। যেমন, গাছ থেকে আম পড়ল আর ভাবাবেগে আঘাত লেগে গেল। এ-ঘটনা যদি অপরাধ বলে বিবেচিত হয় কখনও, তবে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেই অপমান করা হয়।

এআই যতই আটের দশক ফিরিয়ে দিক, ধুরন্ধরে রণবীর সিং যতই চুল খুলে নাচুক, বিরিয়ানিতে খাসির মাংস যতই তুলতুলে হয়ে যাক, ভাবাবেগের পাঁচতল্লাটে কেউ নেই তবু। আমার দেশে, ভাবাবেগ এই মুহূর্তে এক নম্বরে ট্রেন্ডিং। রক্তে সকাল-বিকেল অ্যাড্রিনালিন আর ডোপামিনের রাশ। সকাল-বিকেল আমরা উদ্দাম ও ধার্মিক। সকাল-বিকেল আমাদের শার্টের কলার তোলা।
আখেরে আদালতের প্রকৃত বিচার-প্রক্রিয়া এবং বিচারপতির কনসেন্ট্রেশন– উভয়ই বিভ্রান্ত ও থমকে যাচ্ছে। ধরা যাক, একজনের গুগল সার্চ-হিস্ট্রিতে পাওয়া গিয়েছে চারু মজুমদারের নাম। আর অন্যজন ধর্ষণের পরে খুন করেছে একটি দলিত মেয়েকে। দু’টি ক্ষেত্রেই যদি ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ লাগু হয়, তবে দেশের বিচারব্যবস্থা উচ্ছন্নে যায়। বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় ক্রমে ক্রমে। ‘ফৌজদারি’ শব্দটা বড় ঠুনকো হয়ে ওঠে। আর এইভাবেই, একটা ‘এনকাউন্টার-সংস্কৃতি’ ভারতের জনসমষ্টির ভ্যালিডেশন আদায় করতে শুরু করে। মার দো গোলি!
জাস্টিস ভুঁইয়া একটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ করলেন। গোটা দেশে অমীমাংসিত ক্রিমিনাল কেসের সংখ্যা, ৪.২৭ কোটি। অর্থাৎ বিচারব্যবস্থা ধুঁকছে। এরপরে যদি প্রতিদিন নিত্যনতুন ট্রায়ালের মাজাকি লাগে, তবে একজন বিচারপতি করবেটা কী? অন্যের ভাবাবেগে ডেটল লাগাবে? ভাবতে বসবে, হুম! অমুকের টিফিনবাক্সে কি সত্যিই গোমাংস ছিল? আপনারাই বলুন মশাই, ফৌজদারি মামলা কি একেকটা ইনস্টাগ্রাম রিল? তিরিশ সেকেন্ড অন্তর স্ক্রল করলেই ফিনিশ? এদিকে আমাদের অজান্তেই, অপরাধের যে ধারণা, চরিত্র এবং অভিঘাত, কেমন গুলিয়ে গেল দেখুন!
মুম্বইয়ের আকাশে ঘুড়ি উড়ছিল তখন। গণেশ চতুর্থীর বিকেল। চারটে রং ঘুড়ির গায়ে। সবুজ, কালো, লাল ও সাদা। অর্থাৎ, যেন এক ফিলিস্তিনি পতাকা। ঘুড়ি হয়ে উড়ছিল। স্বাধীন। যে মেয়েটি ঘুড়ি উড়িয়েছিল, তার ঘরে ঢুকে এল পুলিশ। ক্যাজুয়াল পোশাক। জিজ্ঞেস করে, ওই রঙের ঘুড়ি কেন উড়িয়েছ? রাষ্ট্রের চোখে তুমি সন্দেহজনক। কেস ঠুকব একটা?

জাস্টিস ভুঁইয়া একটি দুর্দান্ত প্রসঙ্গ টানলেন তারপর। বললেন, ইদানীং একজন পুলিশ এত ক্ষিপ্ত আচরণ করেন কেন? তাঁর কাঁধে যে গুরুদায়িত্ব বর্তেছে, তা পালন করতে সে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। নইলে বিচার-বহির্ভূত হত্যা কেন বেড়ে যাচ্ছে দেশে? আমার মনে পড়ছে, যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন। দেশের ছাত্রদের ওপরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হচ্ছে। অনর্গল ও অনায়াসে লাঠিচার্জ। এবং সবশেষে, পেলেট গান। হতে পারে, হাইয়ার অথরিটি আদেশ করেছিল। তবু একজন পুলিশের নীতিবোধ? সংযম? মানসিক স্থিতি? রক্তে সকাল-বিকেল অ্যাড্রিনালিন আর ডোপামিনের রাশ। সকাল-বিকেল আমরা উদ্দাম…
শ্যামনগর স্টেশনে, মাস-দেড়েক আগে একজন নাট্যকর্মীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল– কালো পাজামা-পাঞ্জাবি কেন পরেছ? তুমি কি মুসলমান? তারপরেই, প্রবল মারধোর। জাস্টিস ভুঁইয়ার কথাটা মনে পড়ল। কে কোন পোশাক পরবে, কেন পরবে– সেটা কি আদালত ঠিক করে দেবে এইবার? এ কি জঘন্যতম অপরাধের মধ্যে এক? নয় তো। তাহলে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া কেন বাপু? নিজেরা নিজেদের মনুষ্যধর্ম অ্যাপ্লাই করলেই তো কেস খতম!
জাস্টিস ভুঁইয়া যত সহজেই সমাধান বাতলে দিক, আমাদের মনগুলো তো বদলে গিয়েছে। আমাদের সুইট ড্রিমসে শুধু সন্দেহ আর ঘৃণা। তাই ‘ক্রিমিনাল অফেন্সে মামলা ঠুকে দেব’– এ হল রাষ্ট্র-ব্যবহৃত অ্যাপারেটাস। যার নাম শুনলে পাবলিক হেবি ভয় পেয়ে সাইলেন্ট মোডে চলে যায়। বলে, ঘাট হয়েছে! আর স্লোগান দেব না! সব মিলিয়ে, একটা ভয়ের আবহের মধ্যে ঠেলে ফেলা। আমার ব্যাকরণ অনুযায়ী কথা না বললে, তুমি ঘোর অপরাধী। তোমার নামে চার্জশিটও প্রস্তুত।
“আসলে, কেউ বড়ো হয় না, বড়োর মত দেখায়,
নকলে আর আসলে তাকে বড়োর মত দেখায়
গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়াও, দেখবে কত ছোটো,
সোনার তাল তাংড়ে ধরে পেয়েছো ধূলিমুঠো…”

আজ থেকে ১২ বছর আগে, পরিচালক চৈতন্য তামহানে একটি ছবি তৈরি করেছিলেন– ‘কোর্ট’। নারায়ণ কাম্বলে গ্রেপ্তার হয়েছেন। কী অভিযোগ? একটি বস্তিতে গান গাইছিলেন নারায়ণ কাম্বলে। সেই গান শুনে, একজন ম্যানহোল-শ্রমিক আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু নারায়ণ কাম্বলের সঙ্গে সেই শ্রমিকের ইহজীবনে কখনও আলাপ হয়নি। পাশাপাশি, সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই আমরা শুনেছি, নারায়ণ কাম্বলের গান। যেখানে তিনি আঁধার, শীতকাল ও শ্রেণি-বর্ণের ভেদাভেদের কথা বলেন। অর্থাৎ, অভিযোগ মনগড়া ও মিথ্যা। এরপর ধীরগতিতে আদালতের ফ্যান ঘোরে। দেওয়ালে ফ্যাকাশে নীল রঙ ফুটে ওঠে। পার্কে ঘুরতে ঘুরতে, একসময় বিচারপতি ঘুমিয়ে পড়েন। নারায়ণ কাম্বলের কী হয়? দেশের স্থবির বিচারব্যবস্থায় চক্কর খেতে খেতে, সেই উন্মাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সকালবেলার আলোয় যে জ্বালিয়েছিল একটা লণ্ঠন…
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved