
এক রাষ্ট্রনেতা তাঁর রাজনৈতিক প্রচারমূলক ‘মিত্রোঁতা’য় শুনিয়েছেন, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের তরফে ভোটকে সামনে রেখে যে-সংকল্পপত্র ঘোষিত হয়েছে, সেটিকে ‘ইস্তাহার’ হিসেবে মুদ্রিত করা আসলেই একটি বিশেষ ধর্মের বা সম্প্রদায়ের মানুষকে খুশি করার জন্য। এবং একইসঙ্গে তিনি শুনিয়েছেন, ‘ইস্তাহার’ কোনও বাংলা শব্দ নয়, উর্দু শব্দ, যা উদ্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।
ক্যালিগ্রাফি স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
ভোটের বাতাসে আলোচনা হু হু ভাসছে। এখানে যেকোনও বিস্ময়ের সটান অপমৃত্যু ঘটেছে। সম্মাননীয় মানুষদের নিয়ে করা যাচ্ছেতাই নিম্নরুচির মিম আর ঘোড়ার ডিম– কোনওটাই অবাস্তব নয়। অবাক হওয়ার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। এখন ঘেরাটোপের আড়াল থেকে যে-কেউ, যেকোনও কথা, অবলীলায় বলে যেতে পারছেন। সে ঘেরাটোপ ভার্চুয়াল হোক বা প্রোটোকলের। কেউ পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন না, সেই আবডালের ফুটো দিয়ে নিজের অমায়িক ঠোঁটদুটো গলিয়ে দিয়ে।
আলোচনা হচ্ছে, ভাষার ধর্ম, ধর্মের ভাষা, ভাষার বা ধর্মের সঙ্গে জাতিসত্তার রাজনৈতিক মোকাবিলা নিয়ে। রাজনীতির ‘ইস্তাহার’ বা ‘ইস্তাহার’-এর রাজনীতি নিয়েও।
এক রাষ্ট্রনেতা তাঁর রাজনৈতিক প্রচারমূলক ‘মিত্রোঁতা’য় শুনিয়েছেন, বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের তরফে ভোটকে সামনে রেখে যে-সংকল্পপত্র ঘোষিত হয়েছে, সেটিকে ‘ইস্তাহার’ হিসেবে মুদ্রিত করা আসলেই একটি বিশেষ ধর্মের বা সম্প্রদায়ের মানুষকে খুশি করার জন্য। এবং একইসঙ্গে তিনি শুনিয়েছেন, ‘ইস্তাহার’ কোনও বাংলা শব্দ নয়, উর্দু শব্দ, যা উদ্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে।

বিপক্ষ রাজনৈতিক দলটিও এই ভাষণ হজম করে মুখ ফুলিয়ে বসে আছেন, এমন নয়। তাঁদের মুখপাত্র জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপ্রধান ধর্মীয় মেরুকরণের উদ্দেশ্যে জাতিসত্তায় মোচড় দিতে গিয়ে নিজের ভাষাজ্ঞানের দৈন্য প্রকাশ করে ফেলেছেন। কারণ, রাষ্ট্রনেতাটির কাছে অধুনা ব্রাত্য (চার বছর আগে যেহেতু তাঁরই দলের সংকল্প পত্রের সাফিক্স-এ ‘ইস্তাহার’ কথাটা ছিল) ‘ইস্তাহার’ কোনও ‘উর্দু শব্দ’ নয়, ‘আরবি শব্দ’ এবং এমন ‘আরবি শব্দ’ ব্যবহারিক বাংলায় ছড়াছড়ি।
চারপাশের প্রতিক্রিয়া দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, জনতা দ্বিধাখণ্ডিত এবং নিজেদের রাজনৈতিক পছন্দ অনুসারে মত বেছে নিচ্ছেন। অবশ্য জনতার স্বভাব অনেকটা খিদেলাগা ময়াল সাপের মতো। খেয়ে তো ফ্যালে, কিন্তু কী খাচ্ছি বা কতটা খাচ্ছি, সেটা সচরাচর ঠাহর করতে পারে না। গপ্ করে একটা কিছু গিলে ফেলে চিত্তির হয়ে পড়ে থাকে কিংবা উপায়ান্তর না-দেখে সেই বেঢপ নিজেকেই সহ্য করে। সেই মৌলিক স্বভাবদোষেই একদল ভাবলে, ও তাই তো! গুরু ঠিকই তো বলছে! এ ব্যাটারা তো যথেষ্ট হিন্দু নয়, এমনকী, বাঙালিও নয়! একটা ‘মোল্লাদের’ শব্দ সাঁটিয়ে নিজেদের নির্বাচনের সংকল্পপত্র ঘোষণা করছে! তবে তো ঠিকই ভেবেছি! অতএব এদের ভোট নয়।
অন্যদল ভাবছে, ওই তো, অধ্যাপক বললে ‘ইস্তাহার’ উর্দু নয়, আরবি শব্দ। তাহলে আর ‘মোল্লাদের’ থাকল কই? এটা তা হলে তো আর একটা জুমলা হল! অচ্ছে দিন দেখাচ্ছ ভায়া! যতই কর হামলা ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু এইসব করে তর্কটার তো সমাধান হল না! কারণ, ‘ইস্তাহার’ শব্দটা উর্দু না-হয়ে যদি আরবি হয়, তা হলেও তো সেটা রাষ্ট্রগুরুর উদ্দেশ্যকে যথেষ্ট প্রতিরোধ করল না! কারণ, আরব তো আর হিন্দুরাষ্ট্র নয়! ওদিকে উর্দু শব্দ হলেই সেটা কেন পরিত্যাজ্য হবে, সেটাও তো বোঝা গেল না! আমরা আদার ব্যাপারী, জাহাজের খোঁজ নেব না, তাই বলে ‘ইস্তাহার’-এর খোঁজও নেব না! আলবাত নেব।

নিঃসন্দেহে ‘ইস্তাহার’ আরবি শব্দ, উর্দু নয়। যিনি ‘ইস্তাহার’ উর্দু শব্দ বলেছেন, তিনি ভুল বলেছেন। আর এমন আরবি শব্দে বাংলার শব্দভাণ্ডার বোঝাই। শুধু বাংলা ভাষা নয়, বাংলা ভাষার প্রতি দরদ ঘেনিয়ে সিমপ্যাথি তরঙ্গ তুলতে চাওয়া নেতা নিজেও যে ভাষায় কথা কন, সেখানেও আরবি ভাষা ঠাসা। আদালত, আইন, দুনিয়া, হিসাব, কিতাব, খবর, সময়, দরকার, হক, আমল, দফতর, আদেশ, ফয়সালা, বিচার, দলিল, সাক্ষী, জবানবন্দি, জিনিস, মাল, বাজার, দোকান, খরচ, লাভ, ক্ষতি, কলম, কাগজ, বাতিল, জুলুম, কদর, বাতাস, শয়তান, রাস্তা, সফর, আফসোস, আশা, রুটি– এইভাবে দেখলে পাতা ভরে যাবে, আরবি কৃতঋণ শব্দের তালিকা শেষ হবে না।
আসলে ভাষা জীবন্ত নদীর মতো। নানা সময়ে নানা স্রোত তাতে এসে মিশে তাকে পুষ্ট করে, সেই নিয়ে দুষ্টুর দল যদি এদিক-ওদিক ধর্মীয় মেরুকরণের কর্মডিম্ব প্রসব করতে আসেন, তা প্রতিরোধযোগ্য। বাংলা স্বীকৃত ধ্রুপদী ভাষা। সুপ্রাচীন ভাষাতাত্ত্বিক ইতিহাস রয়েছে তার। তবে সাহিত্যিক ইতিহাস মোটামুটি খ্রিস্টীয় অষ্টম বা দশম শতকের দিকে শুরু হয়েছে। চর্যাগানের কালে। এই দেড় হাজার বছরে বাংলা শব্দভাণ্ডারে হাজার ৭৫ শব্দ জমেছে। তার মধ্যে মোটামুটি ৯,০০০ অর্থাৎ প্রায় ১২% বিদেশি ভাষার শব্দ মিশে রয়েছে। সেই ৯,০০০ শব্দের সিংহভাগই পশ্চিম এশিয়ার অর্থাৎ, ওই আরবি-ফারসি শব্দ।

বাংলা ভাষার প্রথম অভিধান বাংলা ভাষায় ছাপা হয়নি, বাংলা হরফে ছাপা হয়নি, এমনকী, বঙ্গদেশেও ছাপা হয়নি। রোমান হরফে বাংলা-পর্তুগিজ অভিধান ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন থেকে প্রকাশিত হয়। এর ৩০ বছর পরে ১৭৭৪ সালে যে-অভিধানের সন্ধান পাওয়া যায়, সেটিও একটি বাংলা-ফারসি শব্দকোষ। ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজির পাশাপাশি আরবি-ফারসি ভাষা দফতরি ভাষা হিসেবে খুব চালু ছিল। বাংলা যেহেতু সেই ব্রিটিশ ভারতের ১৯১১ সাল পর্যন্ত রাজধানী ছিল, সেহেতু বাংলার শব্দভাণ্ডার জুড়ে আরবি-ফারসি ভাষার এমন রমরমা। ১৯২৩ সালে কাজী ওয়াজেয়উদ্দীন আহমদ ‘মক্তব অভিধান’ লিখেছিলেন সেই পরম্পরায়। কাজী আবদুল ওদুদ থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হয়ে হরেন্দ্র পাল বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ নিয়ে বিস্তারিত চর্চা করেছেন। কারও-র মনে হয়নি সেইসব শব্দের সঙ্গে ধর্মের কোনও যোগ আছে। ফলে যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন বলে চালানো যা, আরবিকে উর্দু বা উর্দুকে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভাষা বলে চালানোও তাই। আহাম্মকি করলেই তো হল না!
ওদিকে আবার প্রশ্ন তুলে বসে আছি, উর্দু হলেই বা কী ক্ষতি হত? দেখুন, উর্দু শব্দ বলে আদতেই কিছু হয় বলে আমাদের মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন না। উর্দুভাষায় অনেক কবিতা, গজল লেখা হয়েছে বটে, কিন্তু তার শব্দাবলি তো প্রায় পুরোটাই আরবি-ফারসি, অথবা হিন্দি। হিন্দির মূলে রয়েছে বৈদিক ভাষা। অতএব, উর্দু একান্তভাবে ভারতীয় ভাষা। উর্দুর সব ক্রিয়াপদ পুরোপুরি হিন্দির অনুরূপ। তাই ‘খাঁটি’ উর্দু শব্দ বলে কিছুই হয় না। স্বাভাবিকভাবে তার কোনও খাঁটি সাম্প্রদায়িক চরিত্র থাকাও ততটাই অসম্ভব। ফলে সিদ্ধান্ত হল, প্রথমত ‘ইস্তাহার’ উর্দু শব্দ নয়, আরবি। দ্বিতীয়ত, আরবি শব্দ মানেই ‘অবাঙালি’ আয়োজন নয়, বিপুলভাবে বঙ্গীয় এবং ততোধিক ভারতীয়। আসুন, সুভাষ মুখুজ্জের সঙ্গে আর একবার খুঁজে নিই ‘ইস্তাহার’-এর মধ্যেই লুকোনো বাঙালি ‘সুন্দর’কে–
‘যখন ভোঁ বাজতেই
মাথায় চটের ফেঁসো জড়ানো এক সমুদ্র
একটি করে ইস্তাহারের জন্যে
উত্তোলিত বাহুর তরঙ্গে তোমাকে ঢেকে দিল
যখন তোমাকে আর দেখা গেল না–
তখনই
আশ্চর্য সুন্দর দেখাল তোমাকে।’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved