
ইউনাইটেড নেশনস থেকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সম্প্রতি আলোচনা করা হয় যে, কেন মহিলা আইনজীবী বা জাজ আরও বেশি সংখ্যায় দরকার সারা বিশ্বে। জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বক্তব্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে যে, মহিলারা জাজ বা জাস্টিস রূপে উঠে এলে কোনও বিশেষ শুনানি বা ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে, তা নয় কিন্তু আইনি পরিভাষা (লিগাল ল্যাঙ্গুয়েজ) বদলাতে মহিলাদের ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।
পূর্ব দিল্লির পতপারগঞ্জকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি একটি ওয়েব সিরিজ মুক্তি পায়। ‘মামলা লিগ্যাল হ্যায়’ নামের এই কমেডি ড্রামাতে আদালত চত্বরের নানা খুনসুটি, রসিকতা আর মামলা মোকদ্দমার মজার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। গল্পের মূলে অনন্যা নামে এক চরিত্র, সদ্য বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে এসে পূর্ব দিল্লির কোর্টে নিজের পসার জমাতে চায় সে। মহিলা জাজ, মহিলা উকিল এবং সর্বোপরি এই ধরনের চিত্রায়ন মনোরঞ্জনের পাশাপাশি একটা বেশ লিঙ্গ-নিরপেক্ষ সমাজের হদিশ দেয়। নয়ের দশকের বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমাতেও মহিলা জাজ দেখা যায়, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা সিনেমার হিরোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে চলে বিচার ও প্রশ্নোত্তর। এমন সব সিনেমা-সিরিজ দেখে প্রশ্ন জাগে, এ হেন দৃশ্যায়ন আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত! মহিলা প্রতিনিধিত্বের এমন নজির সত্যিই কি দিল্লি বা বাংলায় দেখা যায়?

পরিসংখ্যান বলছে, সুপ্রিম কোর্টের ৩৩ জন জাজের মধ্যে একজন মহিলা এবং সমস্ত রাজ্যের হাইকোর্ট মিলিয়ে মহিলা জাজের সংখ্যা ১৫% (৭৮১-এর মধ্যে ১১৬ জন মহিলা)। এই পরিস্থিতিতে চিফ জাস্টিস সূর্যকান্ত কিছুদিন আগে মন্তব্য করেন যে, মহিলা আইনজীবীরা জাজের আসনে বসলে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন হবে তা না, কিন্তু মহিলারা ক্ষমতায় থাকলে আমরা একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি (পার্সপেক্টিভ) পেতে পারি (যেটা জরুরি)। প্রধান বিচারপতি বলতে চেয়েছেন, যে কোনও আইনি মামলা সম্যকভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য নিজের লিঙ্গপরিচিতি অবশ্যই জরুরি হয়ে পড়ে। যেমন ২০১৮ সালে আর্টিকেল ৩৭৭ স্ক্র্যাপের জন্য লড়ে গিয়েছিলেন মেনকা গুরুস্বামী ও অরুন্ধতী কাটজু, LGBTQIA+ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে গুরস্বামী বা কাটজুকে বাহবা দেওয়া হয় নিজেদের অভিজ্ঞতা বা সমাজচেতনাকে কাজে লাগিয়ে আইনি পথে লড়ার জন্য।
যে কোনও ফৌজদারি মামলায়, বিশেষ করে তা যদি ধর্ষণ, জেন্ডার ভায়োলেন্স বা লিঙ্গসাম্যের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত হয়, সেখানে মহিলাদের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত জরুরি, শুধুমাত্র উকিলের ভূমিকায় নয়, বরঞ্চ সর্বোচ্চ আসনে বিচারপতির ভূমিকাতেও। এখন প্রশ্ন হল, এই প্রভূত পরিমাণ জেন্ডার গ্যাপ বা লিঙ্গ ব্যবধানের কারণ কী? ল স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুরুষের তুলনায় মহিলাদের এনরোলমেন্টের সংখ্যা কম– এমন তো নয়; তাহলে ঠিক কোথায় গিয়ে একটা অদৃশ্য কাচ তৈরি হয়ে যাচ্ছে, যাকে টেনে হিঁচড়ে, কোনওভাবেই মেয়েরা পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছে না?

একজন সদ্য বি.এ. এল.এল.বি করা মেয়েকে যদি জিজ্ঞেস করেন, সে লিটিগেশনে যেতে চায় নাকি কর্পোরেটে? মোটামুটি ৮০% মেয়েরা এক বাক্যে বলবে– কর্পোরেট অফিস, যেখানে কাজের সময়সীমা বাঁধা, পরিষ্কার বাথরুম, মবিলিটির সুবিধা এবং সর্বোপরি সুরক্ষা অনেক বেশি। আমাদের দেশে লিটিগেশনকে পুরুষালি (ম্যাসকুলিন) পেশা হিসেবে দেখা হয়। গবেষণা বলছে যে, দেশের উচ্চপদস্থ বা হাইপ্রোফাইল মামলাগুলি সাধারণত পুরুষ উকিলদের কাছেই যায়। লিটিগেশনে থাকতে হলে বাঁধা-ধরা কাজের সময় প্রায় নেই, একজন আইনজীবীকে সবসময় তার মক্কেলদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, ১০টা থেকে ৫টা ডিউটি বা কর্পোরেটে ৮ ঘণ্টার থেকেও সময়বিশেষে কাজ অতিরিক্ত হতে পারে। আমাদের দেশে মহিলাদের, সে যত উচ্চশিক্ষিতই হোক, প্রথাগত ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ করে রাখা হয়। বিজ্ঞানী হলেও সে মায়ের ভূমিকা পালন করবে, জাজ হলেও সে কারওর না কারওর স্ত্রী বা প্রফেসর হলেও গৃহস্থালির কাজ তদারকি করা আবশ্যক, এমন নীতিবোধ চারপাশে ভীষণ স্বাভাবিক। এই প্রত্যাশা থেকেই বাড়ির বাইরে, অফিসে, আদালত চত্বরে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হবে, এমন কেরিয়ারকে মেয়েসুলভ বলে মনে করা হয় না।
ডোমেস্টিক বার্ডেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি বা আরও নানা কারণে লিটিগেশন বা উকিল হয়ে কোর্টে মামলা লড়ার ক্ষেত্রে মহিলা আইনজীবীদের থেকে পুরুষ আইনজীবীরা এগিয়ে থাকে আমাদের দেশে। এছাড়াও জাজ হওয়ার দৌড়ে প্রাধান্য দেওয়া হয় বরিষ্ঠতা, ব্যক্তিগত যোগাযোগে কে কত এগিয়ে এবং (খাতায়-কলমে না-হলেও) রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব। জাজ হওয়ার নিয়মসর্বস্বতা যে খুব স্বচ্ছ তাও নয়, এই জটিল প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা বরিষ্ঠতার নিরিখে মেয়েরা স্বভাবতই পিছিয়ে পড়ে। যদিও এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই পিছনে ফিরে তাকালে দেখব যে, সুপ্রিম কোর্টের প্রথম মহিলা আইনজীবী ছিলেন জাস্টিস এম ফাতিমা বিবি, ১৯৭৯ সালে। এরপর রুমা পাল, আর ভানুমতি বা হিমা কোহলির মতো ব্যক্তিত্বদের নাম শোনা যায়।
কলকাতা হাইকোর্টে নয়ের দশকে প্র্যাকটিস করতেন বাংলার মেয়ে রুমা পাল। ২০০০ সালে তাকে সুপ্রিম কোর্টে আসার জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়। অক্সফোর্ড থেকে বিসিএল ডিগ্রি অর্জন করে এসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে জাজ হয়ে ওঠার কাহিনি আমাদের সকলকে অনুপ্রেরণা দেয়। ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সুপ্রিম কোর্টে জাজ হিসেবে মনোনীত হন। এমনকিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে বটে, কিন্তু কোর্টরুমের বাইরে ল ফার্মগুলিতে মহিলারা কীভাবে কাজ করেন, সে দিকেও নজর দেওয়া দরকার।

ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটি, দিল্লি (NLUD), ২০১৯-এর একটি রিপোর্টে বলছে যে, বড় বড় শহরগুলির লিগাল ফার্মে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং কাদের চাকরিতে বহাল রাখা হবে, এই হিসাবে পুরুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। হাই প্রোফাইল বা অর্থকরী কোনও মামলা আসলে সেখানে লিঙ্গপক্ষপাত (জেন্ডার বায়াস) একরকম স্বাভাবিক। এভাবে কাজের নিরিখে সেনসিটিভ বা গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টগুলি পুরুষ আইনজীবীদের তত্ত্বাবধানে চলে গেলে মেয়েরা কর্মদক্ষতার প্রসঙ্গে অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। বায়োডাটা বা সিভিতে হাই প্রোফাইল কোনও মামলার উল্লেখ তারা করতে পারে না। এ যেন একটা ইনফিনিট লুপ বা চক্রব্যূহের মতো: একদিকে তাৎপর্যপূর্ণ মামলা মোকদ্দমা না-পাওয়া অপরদিকে জটিল বা চ্যালেঞ্জিং প্রজেক্ট না-হলে কেরিয়ারের গ্রাফ নিম্নমুখী। এই দ্বিমুখী আক্রমণে দেখা যাচ্ছে সারা ভারতে নামকরা লিগাল ফার্মে মাত্র ১৯% মহিলা রয়েছেন ম্যানেজিং পার্টনার রূপে।
লিটিগেশনের মতোই ল ফার্মেও লিঙ্গবৈষম্যের কাঠামো একই যুক্তিতে আবর্তিত হয়। মহিলা বলে প্রমোশন দিলে তারা বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবে তো? এখানেও পারিবারিক ভূমিকা বা প্রসবকালীন ছুটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের আইনি মানচিত্রে একটা চলতি কথা হল: বাবা-কাকা আইনজীবী হলে তবেই ওই পথে যেও, অর্থাৎ, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা পারিবারিক সূত্রে কেউ সিনিয়র আইনজীবী থাকলে সে নব্য প্রজন্মের মেনটারিং করতে পারবে; এই মেন্টরিং বা শলাপরামর্শের ক্ষেত্রেও মেয়েরা পিছিয়ে থাকে। যেহেতু গত ৫০-৬০ বছরে মহিলা আইনজীবী বা জাজের সংখ্যা একেবারে নগণ্য (পুরুষের তুলনায়), তাই ফিমেল সিনিয়র আইনজীবী থাকবে পরিচিত মহলে, যার অভিজ্ঞতা সাহায্য করবে সদ্য পাশ করা কোনও মেয়েকে, এমন দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই আমাদের চারপাশে।
এবারের নারী দিবস উপলক্ষে সর্বভারতীয় মিডিয়ায় তিন প্রজন্মের মহিলা আইনজীবীদের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়। নয়ের দশক থেকে শুরু থেকে ২০২৩ পর্যন্ত, আইন নিয়ে পড়াশোনা করা মেয়েরা তাদের কর্মক্ষেত্রে কতটা সুরক্ষিত বোধ করেন, সেই নিয়ে এই আলোচনা ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। রিটায়ার্ড জাস্টিস অঞ্জনা প্রকাশ নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, পাটনায় কর্মরত থাকাকালীন তাঁর ক্লায়েন্ট বা সাধারণ মানুষদের থেকে কখনওই বৈষম্যমূলক কোনও আচরণ তিনি পাননি। বিহারের মতো রাজ্য, যাকে অনায়াসেই ‘পশ্চাৎপদ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়, সেখানে মহিলা আইনজীবী বলে তাকে আলাদা করে দেখেনি লোকজন, কিন্তু অত্যন্ত শিক্ষিত মহল থেকেই বৈষম্যের ইঙ্গিত আসে। পাটনায় একটি কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়, প্রকাশের পুরুষ সহকর্মীরাই ছিলেন সম্মেলনের মুখ্য আয়োজক, যেখানে ফুড বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক বা খাবার ঠিকমতো সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, সেই দায়িত্বে রাখা হয় অঞ্জনাকে এবং ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের অন্য সমস্ত মহিলা আইনজীবীদের। সেমিনারের মূল বিভাগে না রেখে খাবার বিতরণের দায়িত্বে একজন সিনিয়র জাজকে রাখা, কেবল তার লিঙ্গ পরিচিতি দেখে, এমন ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করার পর তাকে শেষমেশ মূল সম্মেলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অঞ্জনা স্বীকার করে নেন যে, তিনি উচ্চশিক্ষিত পরিবার থেকে এসেছেন, তাই বাড়ির ভিতরে কখনও মেয়ে বলে আলাদা ব্যবহার পেতে অভ্যস্ত নন। কিন্তু নিজের পুরুষ সহকর্মীদের মধ্যে ‘জেন্ডার স্টিরিওটাইপ’ এভাবে প্রোথিত দেখে অবাক হয়েছিলেন সেবার। কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার রোল ঠিক করে দেওয়ার মতো অত্যন্ত কুরুচিকর দৃষ্টান্ত আমাদের সকলেরই কমবেশি দেখা। অফিস-অনুষ্ঠানে মহিলা সহকর্মীরা চায়ের তদারকি করবে, এ যেন অলিখিত নিয়ম। সেই সাক্ষাৎকার পর্বে প্রবীণ আইনজীবীর পরে নব্য প্রজন্মের আইনজীবী বিধি ঠাকরেকে তার অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। ঠাকরে বলছেন যে, আজকাল ভার্চুয়াল কোর্ট তৈরি হয়েছে, যেখানে বাড়িতে বসেও মহিলা আইনজীবীরা মাতৃত্বকালীন সময়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া বার কাউন্সিলে ৩০% মহিলা রিজার্ভেশন আইন আদালতকে একটা আপাদমস্তক ‘বয়েস ক্লাব তৈরি হওয়া থেকে ব্রাত্য রাখে’। এমন নিয়ম অবশ্যই আশাপ্রদ কিন্তু সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হলে কিছু আইনের অবতারণা জরুরি।
২০১৩ সালে POSH আইন (Prevention of Sexual Harassment of Women in Workplaces) পাশ হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে সর্বক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে। এই আইননুযায়ী প্রত্যেকটি কর্পোরেট কোম্পানিতে (১০ জনের বেশি কর্মরত সদস্য থাকলেই) একটি আইসিসি (ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি) তৈরি করতে হবে, যারা যে কোনও যৌন হয়রানির ঘটনা ৯০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বাধ্য থাকবে। বলা ভালো যে, খুব বড় কোম্পানি ছাড়া ছোট ল-ফার্ম বা সংস্থাগুলি এই আইনের ধার ধারে না। ৯০ দিনের সময়সীমা এক্ষেত্রে প্রহসনের মতো শোনায়, উপরন্তু সমীক্ষা বলছে যে, বেশিরভাগ মাঝারি বা ছোট সংস্থাগুলিতে বিগত অনেক বছর ধরে কোনও কমপ্লেন নথিভুক্তই করা হয়নি। আকাশি চাওলা, যিনি কর্পোরেটে মেয়েদের সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করে চলেছেন, তিনি বলছেন যে অভিযোগ না আসার প্রবণতা কখনওই প্রমাণ করে না যে, কোনও যৌন হয়রানি হয়নি, বরঞ্চ ইঙ্গিত দেয় যে, বেশিরভাগ কোম্পানিতে অভিযোগ দায়ের করার মতো পরিবেশই নেই। সেক্সিস্ট জোক, মিসোজিনি বা ভার্বাল ভায়োলেন্সও যে যৌন হেনস্তার মধ্যে পড়ে, এই সচেতনতা একটি ‘all male’ অফিস চত্বরে প্রয়োগ করা দুরূহ। লিগাল ফার্মে এই বৈষম্য মেটানোর পথ আরও কঠিন, কোনও জুনিয়র মহিলা আইনজীবীর পক্ষে এক সিনিয়র পুরুষ আইনজীবীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা একপ্রকার অসম্ভব। উচ্চপদে আসীন আইনজীবীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, রাজনৈতিক সংযোগ বা আইসিসির ভেতরেই স্বজনপোষণের ঘটনা POSH-এর বিশ্বাসযোগ্যতা নস্যাৎ করে।
ইউনাইটেড নেশনস থেকে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে সম্প্রতি আলোচনা করা হয় যে, কেন মহিলা আইনজীবী বা জাজ আরও বেশি সংখ্যায় দরকার সারা বিশ্বে। জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের বক্তব্যই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে যে, মহিলারা জাজ বা জাস্টিস রূপে উঠে এলে কোনও বিশেষ শুনানি বা ন্যায় বিচার পাওয়া যাবে, তা নয় কিন্তু আইনি পরিভাষা (লিগাল ল্যাঙ্গুয়েজ) বদলাতে মহিলাদের ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। যে কোনও মামলার শুনানিতে অধিষ্ঠিত বিচারপতিকে কিছু ফ্যাক্ট বা তথ্য দেখানো হয়। যে তথ্য এবং পরিস্থিতির ওপর বিচার করেই আগামীতে জাজ তাঁর সিদ্ধান্ত জানান। কিন্তু মামলা চলাকালীন কোন ফ্যাক্টের ওপর জোর দিতে হবে, কোন তথ্যই বা বেশি জরুরি, তা নির্ধারণে সহায়ক হয় বিচারপতির নিজস্ব অভিজ্ঞতা, জীবনবোধ, দর্শন, এমনকী তার নিজের লিঙ্গ বা শ্রেণি। জাতিসংঘের এই প্রবন্ধে বলা হচ্ছে, আইনি পরিভাষাতেও কীভাবে জায়গা করে নেয় পুরুষতান্ত্রিক শব্দ। ‘মাই লর্ড’ থেকে ‘বিচারপতি’, লিঙ্গবৈষম্য শুরু হয় একেবারে গোড়াতেই। তাই মহিলা জাস্টিস বা জাজদের সংখ্যা বাড়লে যৌন হয়রানি, মেনস্ট্রুয়াল লিভ, মাতৃত্বকালীন ছুটি বা POSH-এর মতো আইনের সুসংবদ্ধ প্রয়োগ সম্ভব। স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কারণে মেয়েরা ছুটি পাবে কি না, কোন সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের প্রযুক্তিবিদ্যায় কোটা দেওয়া হবে, এমন সমস্ত আইনি সিদ্ধান্তে শুধু পুরুষরা বেঞ্চে থাকলে (কিংবা জাজ হিসেবে থাকলে) কোথাও যেন একপেশে হয়ে দাঁড়ায় সমগ্র বিষয়টি।

ভারতের মতো দেশে যেখানে ম্যারিটাল রেপ থেকে অ্যালুমনি, প্রত্যেকটি জেন্ডার সেনসিটিভ বিষয়ে নিয়ে আজ তর্ক-বিতর্ক তুঙ্গে, সেখানে সুপ্রিম কোর্টে ৩৩ জনের মধ্যে ১ জন মহিলা জাজ, এই পরিসংখ্যান নিতান্ত হাস্যকর এবং লজ্জাজনক। সারা বিশ্বে সবথেকে বেশি মহিলা বিচারপতি দেখা যায় পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে; হাঙ্গেরি, স্লোভানিয়া, লাটভিয়া বা গ্রিসে মহিলা জাজরা ৭০% সিট অধিগ্রহণ করে থাকে। আমেরিকায় সেখানে ৫১ শতাংশ এবং ভারতে মাত্র ১১ শতাংশ। ভারতীয় আদালতে লিঙ্গ ভারসাম্য বজায় রাখতে কেবল সংরক্ষণ বা আইন বলবৎ একমাত্র পন্থা হতে পারে না। পিতৃতান্ত্রিক ভাবনাচিন্তা সমাজের সর্বস্তরে যেভাবে প্রোথিত, সেখানে মহিলাদের লিটিগেশন বা ল ফার্মে পদোন্নতির জন্য সার্বিক চিন্তাভাবনার পরিবর্তন দরকার। শুধু কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে কথা বলে লাভ নেই; যেমন গত সপ্তাহে হোলি উদযাপনের জন্য কানপুর বার অ্যাসোসিয়েশনে ক্যাবারে ডান্স আয়োজিত হয়। প্রশ্ন ওঠে যে, এই ধরনের মনোরঞ্জন ব্যক্তিগত স্তরে কেউ উপভোগ করতেই পারেন, কোনও পাব বা শুঁড়িখানায় গিয়ে, কিন্তু একটি আদ্যোপান্ত প্রশাসনিক, সরকারি সংস্থার মধ্যে থেকে এই ধরনের আয়োজন কি মিসোজেনাস নয়? কানপুরের এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে যে আদালতের সর্বোচ্চ পদে মহিলা জাজ নিয়োগ অনেক দূরের বিষয়, আসলে এখনও ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অফিস বা কর্মক্ষেত্র মহিলাদের ইনক্লুসিভ বা সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করে না।
তবে আজকাল যে সংখ্যক মেয়েরা আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে উদ্যোগী হচ্ছে, তার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখে আগামিদিনে সমতা আসবে বলে আশা রাখা যায়। ২০ বছর আগে তিন প্রজন্মের মহিলা আইনজীবীদের একসঙ্গে বসিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করানোর কথা ভাবা যেত না, এখন তা সম্ভব হচ্ছে। আশা, আগামী দিনে মহিলা প্রতিনিধিত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে এবং রুমা পাল, ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে তৃতীয় কোনও বাঙালি মেয়েও সুপ্রিম কোর্টে নিজের জায়গা করে নিতে পারবে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved