Robbar

জয়ের উল্লাস অথচ ভিড়ের ভাঙন

কিছু কিছু ‘ভিড়’ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আগ্রাসনের আরেক চতুর মুখচ্ছবি। ভিড়ের মধ্যে সেই মিশে থাকা ভিড় আনন্দজল-ভরা চোখের চিৎকৃত ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’ বা ‘জনগণমন’র মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায় ‘ভারতমাতা কি জয়’ কিংবা ‘জয় শ্রীরাম’। ভিড় থেকে আলাদা হয়ে ওঠে আরেক ভিড়।

→

ছিল নেই, মাত্র এই

শেষমেশ রাত ৯টার ঘণ্টাধ্বনি। একযোগে হাততালি। স্টল থেকে রাস্তায় নেমে আসা। চারপাশ দেখে নেওয়া, চারপাশের মধ্যে আকাশের পতনোন্মুখ চাঁদটিও পড়ে। চোখ ছলছল। হাতে হাত, জড়িয়ে ধরা। বন্ধুবান্ধব, অর্ধপরিচিত-অপরিচিতর দিকেও কয়েক পলক বাড়তি দৃষ্টি। মলিন হাসি। বারেবারে আর আসা হবে না। ওই যে অলীক বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল বইপত্রিকা, প্রকাশন– হয়তো প্রকাশন আর নেই, বন্ধুত্বও– তবুও আলিঙ্গন, তবু কিছু মায়া রয়ে গেছে।

→

বইমেলায় ভূতের কেত্তন

বইমেলার আনাচেকানাচে পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য, ভূত-মুখোশ পরে উদ্দাম নাচ– ভয়াল, ভয়ংকর, আতঙ্ক, অঘোরী, পিশাচ, বই, বাণিজ্য, বিপণনে মিলে মেলার মাঠে এক্কেবারে কুম্ভীপাক! অজানার উদ্দেশে বাঙালির দুর্মর আকর্ষণ বরাবরই। আবার মোচ্ছবেও বাঙালির বেজায় আগ্রহ। সেই পথ ধরেই বীভৎস রস ক্রমে আসিতেছে।

→

বইমেলার বিবিধ কৌতুকী

এক ফোক্কড় যুবককে গীতা বেচতে এসেছিলেন এক টিকি-রসকলি ভক্ত-সেলসম্যান। যুবকের চটজলদি উত্তর: ‘হরেকৃষ্ণ, আমি সিপিয়েম করি’ এবং পলায়ন। আরেক জন, ৫৫০ নম্বরে আদমের স্টলের ভেতরে এক সুন্দরীকে দেখে মন্তব্য করে গেলেন– ‘দ্যাখ, দ্যাখ, আদমের স্টলে ইভ!’ আবেগপ্রবণ হয়ে কবিতা পাঠ করতে গিয়ে একটি ছেলে, স্পষ্ট শুনলাম, মাইকে বললেন– ‘শীৎকার কবে আসবে, সুপর্ণা!’ মেলা ভাঙার পরে পশ্চিমবঙ্গ মণ্ডপে ঢুকতে বাধা পেয়ে এক যুবক বন্ধুকে ফোনে জানালেন– পশ্চিমবঙ্গে লকআউট, নিশ্চয়ই বাম সরকার ফিরছে।

→

মেলায় পাবেন শ্রেষ্ঠ শত্রুর জন্য উপহারের বই!

শনিবারের বারবেলায়, নিশ্চিতভাবেই বহু বাঙালিই পরস্পরের পাদুকায় পদাঘাত করেছেন, নেহাত বইমেলার সঙ্গে সংস্কৃতির একটা ঘাঁতঘোঁত আছে, বাস-ট্রাম-মেট্রো-ট্রেন হলে একটা এসপার-ওসপার হয়ে যেত নিশ্চিত! তবে মেলাতেও খাস বাংলায়, সাংস্কৃতিক পদ্ধতিতে খিস্তি করার বেশ কিছু উপায় আছে। সত্রাজিৎ গোস্বামীর ‘অকথ্য শব্দের অভিধান’, অভ্র বসুর ‘বাংলা স্ল্যাং: সমীক্ষা ও অভিধান’, কিন্নর রায়ের ‘খিস্তোলজি’র মতো বই অনায়াসে শত্রুপক্ষকে গিফট করে বলুন, ‘সব আপনারই জন্য!’

→

‘না কিনুন, একবার হাতে নিয়ে দেখুন!’

ভিড়ভর্তি মেলার মাঠে দু’ হাত অন্তর ছবি! হাতছানি দিয়ে ডাকছে, কতকটা আদ্যিকালের ছাপানো বিজ্ঞাপনের অদৃশ্য সুরে– ‘না কিনুন, একবার হাতে নিয়ে দেখুন!’ বিস্তর শিল্পী, লেখক, সম্পাদক, ছাপাখানার কর্মীদের সমবেত সম্মেলনে এক মহা ধুমধাম। বইয়ের ছবি? ছবির বই? নাকি ছবিতে গল্প? কোনটা? বোধহয় সবগুলোই সত্যি।

→

বইমেলার লিটল ম্যাগ টুকরো টুকরো দৃশ্যের আনন্দভৈরবী

টেবিল, টেবিল নয়। কাগজের চোখ। এক ঝলক চোখে চোখ রেখেছ কি টেবিলের নিজস্ব চরিত্র পড়া যাবে। কী খায়, কোন দিকে হাঁটে, আহত-আক্রান্ত হলে কত রাগে, কতটুকু কাঁদে। সবই তো টেবিলে। দাহপত্র, জারি বোবাযুদ্ধের অবিন্যস্ত মাংস কেটে কেটে ছড়িয়ে রাখা; কালি কলম ইজেলের নিপুণ গৃহিণীপনা; সবই তো টেবিলে। কড়চার এ পর্বে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন।

→

মেলার মাঠ খেলার মাঠ

ব‌ইমেলার এক এবং দুই নম্বর গেট, বাকি প্রবেশ-ফটকের তুলনায় একটু বেশিই শান্ত, জনহীন। প্রথমত, মাসের শেষ, দ্বিতীয়ত, সপ্তাহের কেজো-দিনের মাঝামাঝি। ফলে ভরদুপুরে ব‌ইমেলার ‘এক’ ও ‘দুই’ ভাতঘুমের মতো আয়েশি, ঝিমধরা। সেই ঝিমুনিকে অট্টহাসিতে আত্মারাম খাঁচা করে দিলেন দুই সত্তরোর্ধ্ব। একজনের প্রবেশ ঘটছিল, অন্যজনের প্রস্থান। সেই আসা-যাওয়ার মাঝেই দুই বন্ধুর দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ। ‘অনেকদিন পর আবার চেনা মুখ, বন্ধু কী খবর মুহূর্ত বলুক!’  সুখ-দুখের নানা কথায় ব‌ইমেলা তখন আক্ষরিক অর্থেই ‘মিলনমেলা’।

→

অনর্গল বইয়ের খোঁজে

যে বইমেলায় একটা বই বেরলেই, খানিক বিক্রিটিক্রি হলেই, তরুণ লেখক ভাবেন, পরের বইয়ের আগে অগ্রিম পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য, যে বইমেলায় স্টলের নিচে লেখা থাকে ফেসবুকের ফলোয়ার সংখ্যা, যে বইমেলায় রোবটের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতেও ভিড় হয়, যে মেলা অফুরন্ত সেলেব-সেলফি শিকারোৎসব– সেই মেলায় এক প্রবীণ শিল্পী, বাংলা সাহিত্যের প্রচ্ছদ-অলংকরণের ইতিহাস সংরক্ষক ও লিখিয়ে আত্মপরিচয় যতসম্ভব ঝাপসা করে দিয়ে বলছেন, ‘ওই আর কী।’

→

দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ভিড়ে পাঠকও কি দুষ্প্রাপ্য?

মাসের শেষ। পকেটে টান। তবু প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটিতে মেলা জমজমাট। যদিও জনৈক প্রকাশক জানালেন, ‘বইমেলা, না দেশপ্রিয় পার্ক– ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।’ পাঠক দুষ্প্রাপ্য। বইও। দরদাম না করলেই পকেট গড়ের মাঠ! হুঁ হুঁ বাওয়া, দেখলে হবে? খরচা আছে! থুড়ি, কড়চা আছে।

→