Sridevi and her career towards being a star | Robbar
Robbar
  • ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ২৭ আগস্ট ২০২৬

সর্বসংহা দেবী নন

শ্রীদেবীর ইন্টারভিউ পড়লে বোঝা যায় শ্রীদেবী ঠিক সর্বসংহা, নিপীড়িতা দেবীটি নন। বরং তিনি একজন লোভী শিল্পী, যিনি তাঁর সবক’টি কাজেই একটা ছাপ রেখে যেতে চান সচেতনভাবে। অত্যন্ত বুঝেশুনে, বুদ্ধিদীপ্তভাবে তিনি সাজিয়ে তুলেছেন তাঁর এই জার্নি– যা নিয়ে তাঁরও অনেক ক্ষোভ থাকতেই পারত, কিন্তু ‘ভিকটিম’ হয়ে নয়, শ্রীদেবী আস্তে আস্তে ‘পাওয়ার’টি নিজের করায়ত্ত করেছেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:October 1, 2025 12:01 pm | Updated:February 24, 2026 8:18 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

মেয়েটি নাকি চার বছর বয়স থেকেই তাক লাগানো অভিনয় করত। কাঁদতে বললে, চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ত নিমেষে– একবার দু’বার নয়, প্রত্যেক টেক-এই। নাচতে বললে ঝড় উঠত ছোট্ট ছোট্ট পায়ে। মাত্র পাঁচ-ছ’ বছর বয়েসে একটি শট দেওয়ার সময় নাকি এই মেয়ে এমনই মগ্ন ছিল যে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির সামনে চলে আসে। অ্যাক্সিডেন্ট হয়। সেরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আবার শুটিং শুরু হয়। স্টুডিও ফ্লোর ছিল তার খেলার মাঠ, মেক-আপ রুম ছিল তার বান্ধবীর চিলেকোঠা, রোজকার ডবল শিফ্‌ট শুটিং ছিল তার সকালে উঠে ইশকুল যাওয়া, পরীক্ষায় বসা।

মেয়েটি হয়তো বুঝতেই পারেনি কবে সে একের পর এক সিনেমা করতে করতে যুবতী হয়ে উঠল। কবে সে শিশুশিল্পী থেকে হিরোইন হয়ে উঠল, আর কবে সে হিরোইন থেকে নাম্বার ওয়ান স্টার হয়ে উঠল বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির। সবটাই যেন খুব স্বাভাবিক, ঠিক যেমন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রছাত্রী ইশকুল, কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকে, গোল্ড মেডেল নিয়ে বেরয়, দারুণ একটা ভবিষ্যত খুঁজে নেয়– তেমনই। মেয়েটির নাম শ্রীদেবী। এই নাম শুনলেই একটা বোমা ফাটার কথা বুকে– আটের দশক থেকে প্রায় মধ্য নব্বই অবধি শ্রীদেবী এক নম্বরের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। তারপর এলেন আরেক বলিউডি কিংবদন্তি অভিনেত্রী, মাধুরী দীক্ষিত। এরপর স্টারডমের হিসেবনিকেশ আস্তে আস্তে পালটাতে শুরু করল হিন্দি ছবির বাজারে। আর কোনও ‘হিরো’ বা ‘হিরোইন’ এভাবে এত দীর্ঘদিন ‘১ নম্বর’-এর দণ্ড হাতে নিয়ে রাজত্ব করতে পারেনি।

হিসেব অনুযায়ী শ্রীদেবী বলিউড ইন্ডাস্ট্রির অভিনেত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে তারকা সভার উচ্চতম জায়গাটি নিজের কবজায় রেখেছিলেন। শ্রীদেবীর স্টারডম এমনই ছিল যে, তার পুরুষ সহ-অভিনেতাদের– যারা নিজেরাও একেকজন স্টার– তাঁদের থেকেও তাকে নিয়ে চর্চা হত বেশি। পোস্টারে, নায়কের পাশে তার ছবির সাইজ বড় বই ছোট হত না। শ্রীদেবী নাকি আটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই ১০ লাখ টাকা পারিশ্রমিক নিতেন, যা সেই সময়ে কোনও ‘স্টার’ হিরোও পেতেন না। এই অংকের পারিশ্রমিকের পরেও তার ঝুলিতে ৩০০-র বেশি সিনেমা; এবং সবচেয়ে মজার কথা– হিন্দি তথা আট-নয়ের দশক জুড়ে তৈরি নিম্ন মানের বলিউড ছবির বাজারে, শ্রীদেবী অভিনীত সিনেমাগুলির বেশিরভাগই বিরক্তিকর রকমের বাণিজ্যিক হওয়া সত্ত্বেও হিরোইনকে একটি আবশ্যিক এবং শক্তিশালী চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা সিনেমা।

শ্রীদেবীর নায়িকা বা মেগাস্টার হয়ে ওঠার গল্প শুধু ভারতীয় সিনেমা কেন, পৃথিবীর যে কোনও দেশের ঝিকমিকে রুপোলি দুনিয়ার, দু’-তিন দশক আগেকার বেশিরভাগ ‘নায়িকা’দের গল্পের সঙ্গেই হুবহু মিলে যায়। তাদের ছোটবেলা বলে কিছু নেই; ইশকুল, বাড়ি, খেলার মাঠ, বন্ধু বলে কিছু নেই। তাদের সেই অর্থে একটি কানায় কানায় ভরে ওঠা ‘সংসার’ বলে কিছু নেই। প্রেম এসেছে তাদের জীবনে, তবে সে প্রেমের চরিত্র আলাদা। আমাদের দুনিয়ার প্রেম মানে ‘স্ক্যান্ডাল’, যা নিয়ে থোর-বড়ি-খাড়া দশটা-পাঁচটার দুনিয়ার না আছে নিন্দেমন্দর (ইদানিং যাকে ‘ট্রোলিং’ বলা চলে) বিরতি, না আছে কৌতূহলের শেষ।

লিজ টেইলর থেকে আমাদের সুরাইয়া, মধুবালা, মীনা কুমারী এমনকী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মহুয়া রায়চৌধুরী এবং অবশ্যই আরও অনেকেই কোথাও না কোথাও একইভাবে লড়ে গেছেন বেঁচে থাকার লড়াইটা। হয়তো ভাগ্যের ওপর একটা চাপা অভিমান নিয়েই– অন্তত তেমনটিই লাগে তাদের বেশ কিছু ইন্টারভিউ পড়লে। কিন্তু শ্রীদেবীর ইন্টারভিউ পড়লে বোঝা যায় শ্রীদেবী ঠিক সর্বসংহা, নিপীড়িতা দেবীটি নন। বরং তিনি একজন লোভী শিল্পী, যিনি তাঁর সবক’টি কাজেই একটা ছাপ রেখে যেতে চান সচেতনভাবে। অত্যন্ত বুঝেশুনে, বুদ্ধিদীপ্তভাবে তিনি সাজিয়ে তুলেছেন তাঁর এই জার্নি– যা নিয়ে তাঁরও অনেক ক্ষোভ থাকতেই পারত, কিন্তু ‘ভিকটিম’ হয়ে নয়, শ্রীদেবী আস্তে আস্তে ‘পাওয়ার’টি নিজের করায়ত্ত করেছেন।

শ্রীদেবীর দীর্ঘ কাজের পরিধিতে হয়তো একটি ছবিও নেই, যেখানে তিনি শুধুই ‘সুন্দর’টি সেজে, কিছু নাচগান, খানিক কান্নাকাটি, আর ফুলে ফুলে ধাক্কা খাওয়া প্রেম করে অডিয়েন্সকে গুডবাই করে দিয়েছেন। উল্টে শ্রীদেবী এমন সব চরিত্র বেছে নিয়েছেন, যে চরিত্রগুলি এই বলিউডি ভাবমূর্তি নির্ভর বাজারে কোনও হিরোইন নেবেন না। ‘লাডলা’-র শ্রীদেবীর চরিত্রটি প্রথমে করছিলেন দিব্যা ভারতী। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর ছবিটি অনেক ঘুরে শেষ পর্যন্ত যায় শ্রীদেবীর কাছে। শ্রীদেবী চরিত্রটি লুফে নেন এবং এমনভাবে কাজটি করতে থাকেন, যা পরিচালককেও অবাক করে দেয়। হিরোইন খুব খারাপ হলে তো দর্শক নেবে না; তাছাড়া দিব্যাও চরিত্রটি করছিলেন সাবধানে, যাতে চরিত্রটি নেগেটিভ হলেও sympathy পেতে পারে! শ্রীদেবী চরিত্রটিকে এমন জায়গায় নিয়ে যান, যেখানে ছবির শেষে হিরো অনিল কাপুর যখন তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন– দর্শক হাততালি দিয়ে উঠছে! চরিত্রটির অভিনয়ের মাধ্যমে এতটাই বিরাগ তিনি তৈরি করেছিলেন দর্শকের মনে। তেমনই চ্যালেঞ্জিং ছিল ‘লামহে’র মা-মেয়ের চরিত্র দু’টি। বিশেষত মেয়েটির চরিত্রটি, যে পাগলের মতো বয়সে অনেক বড় একটি মানুষের প্রেমে পড়ছে।

zoom
‘লামহে’ ছবিতে শ্রীদেবী

শুধু ছবি নেওয়া বা, ছবি ছাড়া দেখেও তারিফ করতে হয় শ্রীদেবীকে। সেই সময়ের রীতিমতো আকাশছোঁয়া বাজেটের ছবি ‘আজুবা’– অমিতাভ বচ্চন হিরো, শ্রীদেবী ছেড়ে দিয়েছেন, কারণ হিরোইনের তেমন কিছু করার ছিল না ছবিতে। ছেড়ে দিয়েছেন সুপারহিট ছবি ‘ডর’, আর সে প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘শাহরুখের চরিত্রটি পেলে নিশ্চয়ই করতাম কিন্তু ক্যারিয়ারের এই জায়গায় পৌঁছে কিরণের চরিত্রটি করার কোনও কারণ পেলাম না!’

দীর্ঘ ১৫ বছর পর ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ করার সময় জনৈক ইন্টারভিউয়ে এই কামব্যাক নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে, শ্রীদেবী বলেন– পছন্দের স্ক্রিপ্ট আর চরিত্র না পেলে ১৫ বছর কেন, তিনি আর কোনও দিন সিনেমা না করলেও তাঁর কিছু যাবে আসবে না। আবার এই স্ক্রিপ্ট যদি তিনি ৫-৬ বছর আগেও পেতেন তখনই করতেন। ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ সত্যিই একটি সহজ অথচ ক্রিটিকাল ছবি, যেখানে শ্রীদেবী ‘শশী’ চরিত্রটিতে এককথায় অনবদ্য। প্রসঙ্গত এই সময়ই এক ইন্টারভিউয়ে শ্রীদেবী বলেন, যা তিনি পারেন– তার কিছুই করে উঠতে পারেননি এখনও। তিনি এখনও অপেক্ষা করছেন তাঁর স্বপ্নের চরিত্রটির জন্য।

তাঁর শেষ ছবি ‘মম’ প্রসঙ্গে শ্রীদেবীর সহ-অভিনেতা নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী বলেছিলেন, সেটে তিনি আশ্চর্য হয়ে দেখতেন শ্রীদেবী কীভাবে প্রত্যেকটি মুহূর্ত চরিত্রটিকে নিয়ে বাঁচছেন। এমনটাই, যেন এই ছবিটিই তাঁর জীবনের প্রথম ছবি।

এই সময় থেকে আস্তে আস্তে পালটাচ্ছে বলিউডি সিনেমার গল্পগুলো। পালটে গেছে ‘হিরো-হিরোইন-ভিলেন’-এর চেনা ছক, এর কিছু সময় পরে চলে আসবে OTT– গল্প, গল্পবলা সবটাই হয়ে উঠবে আরও আলাদা। হয়তো সত্যিই তাঁর স্বপ্নের চরিত্রটি তৈরি হতে পারত এইবার, কিন্তু তার আগেই শ্রীদেবী মারা যান। রহস্যময়ীর রহস্যাবৃত মৃত্যু!

'90 cinema bollywood Indian movie Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sridevi দেবীপক্ষ শ্রীদেবী

Share this article on