
পুষ্যা নক্ষত্রের প্রাচীন নাম তিষ্যা। অতএব তিষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে পৌষালি দেবীর নাম যে ‘তুষু’ বা ‘টুসু’ হবে এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। পৌষমাসের কিশোরীব্রতের অন্যতম লোক-উৎসব টুসুপুজো। কুমারী মেয়েদের ব্রতটি এই নাক্ষত্রিক তিথিতে পালিত হয়। ‘তিষ্যা’ শব্দটি তুষ ধাতু+য প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন। ধানের তুষ থেকেও ‘তুষু’ বা ‘টুসু’ শব্দটি এসেছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। তবে তুষু বা টুসু যে প্রাচীন নাক্ষত্রিক দেবী, সন্দেহ নেই।
১৭.
পৌষমাস লক্ষ্মীমাস। সমৃদ্ধি, প্রাচুর্য, সচ্ছলতা, প্রাপ্তির প্রতীক পৌষমাস। লোকপ্রবাদ বলে, ‘কারও পৌষমাস তো কারও সর্বনাশ’। মাঠে মাঠে সোনার ফসল– ধান কাটা থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে খামারবাড়িতে পালাবন্দি করা, ধান ঝাড়া, গোলাজাত করার শ্রম-মহাকাব্যের শান্তিপর্ব পৌষমাস।
এই কারণে বাংলার কৃষি সংস্কৃতির সিংহভাগ গড়ে উঠেছে পৌষমাসে। তুসু বা টুসু স্থাপনা, পৌষলক্ষ্মীর আরাধনা, পৌষ আগলানো, পৌষপার্বণ, পৌষ-নাহানো, পিঠে-পুলির উৎসব, পৌষবুড়ির আরাধনা ইত্যাদি বৈচিত্রময় দেবখণ্ড বঙ্গের ধান্যমঙ্গলকে কাব্যময় করে তুলেছে।
বার বা দিনের নামকরণে গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্রের নাম থাকলেও মাসের নামকরণে নক্ষত্রই প্রধান। পৌষমাসের নামকরণ হয়েছে ‘পুষ্যা’ নক্ষত্র অনুসারে। জোড়া নক্ষত্র কাল্পনিক গাভীর বাঁটের মতো দেখতে। যেন অমৃতসুধা বর্ষণের ইঙ্গিত। আবার ‘পুষ্যা’ শব্দের অর্থ পুষ্টকারী, পালনকারী বা ফলদানকারী। সুতরাং ফসল তোলার মাস বলে উৎসবও বেশি। এমন ইঙ্গিত মেলে সম্রাট অশোকের নামে প্রচারিত কলিঙ্গদেশের ধৌলী আর জৌগড় শিলানুশাসনে। সুকুমার সেন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন (বঙ্গভূমিকা, পৃ. ১৭), অশোকের সময়ে ভাদুপরব ও পৌষপার্বণ অনুষ্ঠিত হত।

এহ বাহ্য! পুষ্যা নক্ষত্রের প্রাচীন নাম তিষ্যা। অতএব তিষ্যা নক্ষত্রের নাম অনুসারে পৌষালি দেবীর নাম যে ‘তুষু’ বা ‘টুসু’ হবে এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। পৌষমাসের কিশোরীব্রতের অন্যতম লোক-উৎসব টুসুপুজো। কুমারী মেয়েদের ব্রতটি এই নাক্ষত্রিক তিথিতে পালিত হয়। ‘তিষ্যা’ শব্দটি তুষ ধাতু+য প্রত্যয় যোগে নিষ্পন্ন। ধানের তুষ থেকেও ‘তুষু’ বা ‘টুসু’ শব্দটি এসেছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। তবে তুষু বা টুসু যে প্রাচীন নাক্ষত্রিক দেবী, সন্দেহ নেই।
ফলদানকারী মাস বলে প্রাচীনকালে অনেক রাজা মহারাজার পৌষমাসে সিংহাসনে অভিষেক হত। বরাহমিহির তাঁর ‘বৃহৎসংহিতা’ গ্রন্থের ৪৮ অধ্যায়ে রাজ্যাভিষেককে ‘পুষ্যাভিষেক’ বলেও বর্ণনা করেছেন। তিষ্যা বা পুষ্যা নক্ষত্রও দেবতা হিসাবে ভারতীয় সমাজে প্রাচীনকালে পূজিত হত– এমন কথাই লিখেছেন পাণিনি তাঁর ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থে।
টুসু উপলক্ষে ধানের পুজো হয়। অঘ্রান সংক্রান্তিতে জমি থেকে একগোছা ধান এনে পিঁড়িতে স্থাপনা করা হয়। এই ধানগোছাকে বলে ‘ডেনি-মাই’। ধানের দেশ বর্ধমান জেলায় বলে ‘দাওন’। গ্রিক শস্যদেবী ডিমেটরের সঙ্গে ‘দাওন’ বা ‘ডেনিমাই’ শব্দের শুধু ধ্বনিগত মিল নেই; প্রকৃতিগত মিলও রয়েছে।

গ্রিকদেবী ডিমেটর শুধু শস্যকে পরিপক্ব করেন না, তিনি শস্যের পাহারাদার। হোমারের ‘ওডিসি’ কাব্যে শস্যদেবী ডিমেটরের স্বর্ণকেশের কথা আছে, যা স্পষ্টত পাকা ফসলের প্রতীক। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শস্য কাটার পর শেষ আঁটিকে দাওনের মতোই পবিত্রভাবে বাড়ি আনা হয়।
টুসু উপলক্ষে নতুন মাটির সরায় চালের গুঁড়ো লাগিয়ে তুষ ভর্তি করা হয়। সাধারণত অগ্রহায়ণ সংক্রান্তিতে টুসুর স্থাপনা হয় খলা বা সরায়। সরাগুলির চারপাশে থাকে কয়েকটি প্রদীপ। উঠোনে বা তুলসিতলায় আলপনা আঁকা হয়। সেখানে টুসুর খলা বা সরা বসিয়ে সাঁঝের বেলায় আরাধনা চলে। ফুল মিষ্টি চিঁড়ে মুড়কি ইত্যাদি নৈবেদ্য থাকে।
গাঁদাফুল, সরষেফুল, গলঘসা, মুলো, বেগুন, বুনো বা মেঠো ফুলে টুসুর আরাধনা চলে। টুসুপুজোর মন্ত্র বলতে টুসুর গান। সে গানে ফুটে উঠেছে নারীর কামনা বাসনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা। গানের শেষে টুসু ঘুমিয়ে পড়ে। আবার পরের দিন সাঁঝের দিকে টুসুর জাগরণ। এইভাবে টুসুর আরাধনা চলে সারা পৌষমাস ধরে।

সংক্রান্তির আগের দিন টুসুর জাগরণের রাত। এদিন সাররাত জেগে টুসু পুজো চলে। পোড়ামাটির সরায় থাকে নতুন ধান, তুষ মিশ্রিত গোবরের নাড়ু, নানা ধরনের ফুল, কড়ি ইত্যাদি। চারপায়া রথের মতো রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি চৌদলের মধ্যে টুসুকে রেখে বিসর্জন দেওয়া হয় সংক্রান্তির পরের দিন।
চৌদলগুলি পাঁচ কিংবা নয় চূড়া মন্দিরের মতো দেখতে। একে বলে টুসুর ভেলা। সরা, চৌদল ছাড়াও অনেকে টুসুর মূর্তি পুজো করেন। দ্বিভুজা মূর্তিগুলি শাস্ত্রীয় লক্ষ্মী ঠাকুরের মতো দেখতে। কোনও কোনও মূর্তি আবার ময়ূর বা অশ্ববাহনা। পৌষ সংক্রান্তিতে অন্যতম লোকপরব পৌষপার্বণ অনুষ্ঠিত হয় জাঁকজমক সহকারে।

সংক্রান্তির দিনে শস্যলক্ষ্মীর আরাধনা করেন বউ-ঝিরা। ১৭ কাঠা নতুন ধান বর্গাকারে বিছিয়ে তার উপর কাঠের পেঁচা, সামুদ্রিক কড়ি প্রভৃতি দিয়ে সাজান। পুরুত ঠাকুর পুজো করেন। সেদিন মা লক্ষ্মীর অন্নভোগ হয়। বাড়ির উঠোন, খামারবাড়িতে নানা ধরনের আলপনায় সুচিত্রিত করেন গিন্নিরা। এই প্রসঙ্গে মরাই-লক্ষ্মীর কথা বলা প্রয়োজন। মরাইয়ের চারপাশে এদিন আলপনা থাকে। মরাইয়ের গায়ে অঙ্কিত ঠাকুর ঠাকরুনের পুজো করেন বাড়ির গিন্নিরা।

পৌষপার্বণে মহিলাদের প্রাধান্য থাকলেও পুরুষদের বিশেষ ভূমিকা আছে। তাঁরা আঁউরি বাঁউরি চাঁউরি তৈরি করেন। কার্তিক সংক্রান্তিতে মুঠ আনা খড়কে লক্ষ্মীঘর থেকে এনে, সেই খড় জলে ভিজিয়ে দিয়ে হাঁটুতে চেপে আড়াই পাক প্যাঁচ দিয়ে দড়ির মতো বানান। পাকানো খড়কে বিভিন্ন স্থানে দিয়ে লক্ষ্মীর বন্ধন দেন। বলা হয় ছড়ামন্ত্র–
আঁউড়ি বাঁউড়ি চাঁউড়ি
তিনদিন পিঠা খাওনি
তিনদিন না কোথা যেও–
ঘরে বসে পিঠে খেও।
বাঁধন মূলত তিনদিন থাকে। এই সময় কাউকে ধার দিতে বা নিতে নেই। তিনদিন পর চাঁউড়ি বাঁউড়িকে জলে দেওয়া হয়। অধিকাংশ গবেষক দাবি করেন ‘আঁউড়ি’ মানে লক্ষ্মীর আগমন। ‘বাঁউড়ি’ মানে লক্ষ্মীর বন্ধন। ‘চাঁউড়ি’র অর্থ লক্ষ্মীর কাছে চাওয়া অর্থাৎ কোনও কিছু কামনা করা।

পৌষপার্বণ মূলত তিনদিনের উৎসব। সমানে মাস হলে ২৭ তারিখে শুরু লক্ষ্মীর স্নান। লক্ষ্মীর হাঁড়া থেকে লক্ষ্মীর সাজ বের করে গঙ্গাজলে স্নান করিয়ে শুকিয়ে নেওয়া শুরু। ২৮ তারিখে লক্ষ্মী স্থাপনা। বাড়িঘর গোবর দিয়ে মার্জিত করে আল্পনায় সাজিয়ে তোলেন ঠকুরঘর থেকে বাড়ির উঠোন মায় দুয়ার পর্যন্ত। খামারবাড়িও একইভাবে সাজানো হয়। লক্ষ্মীপুজোর পর লক্ষ্মীর ভোগ দেওয়া হয়। সেখানেও থাকে নানা ধরনের শাকসবজির পদ-সহ পিঠে ও পায়েস।

পৌষসংক্রান্তির রাতে শুরু পৌষ আগলানোর পালা। ‘আগলানো’ শব্দটির মধ্যে সুপ্রাচীন জাদুবিশ্বাস নিহিত আছে। লক্ষ্মী বড় চঞ্চলা। তাকে ঠিকঠাক আগলাতে না পারলে লক্ষ্মীর স্থানে অলক্ষ্মী প্রবেশ করে জীবনকে রিক্ত-নিঃস্ব করে দারিদ্র কণ্টকিত করে তুলবে। রাতে গিন্নিরা গোবরের তিনটি করে গোলাকে একত্রে বসিয়ে ধান দূর্বা সিঁদূর আতপচালের গুঁড়ো সরষেফুল মুলোর শিকড় দিয়ে পুজো করেন। শাঁখ বাজিয়ে ছড়া কেটে বলেন–
এসো পৌষ যেও না
জন্মো জন্মো ছেড়ো না
পৌষের মাথায় সোনার বিঁড়ে
হাতে নড়ি কাঁখে ঝুড়ি
পৌষ আসছে গুড়ি গুড়ি
বাহান্নো পৌটি হয়ো
ঘরে বসে পিঠে খেও
এমন সোনার পৌষ যেন জন্ম জন্ম হয়
পরের দিন এগুলি পুকুরের জলে ভাসান দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, পৌষলক্ষ্মী বা টুসুর প্রতীক কিন্তু গোবরের নাড়ু। এর মধ্যে আধ্যাত্মিক তাৎপর্য কী আছে সেটা বোঝা না গেলেও ধানের বাড়বাড়ন্ত কিন্তু গোবরসারের প্রয়োগে।

পৌষপার্বণের অন্যতম আকর্ষণ পিঠেপুলির উৎসব। ৩০ তারিখে দুপুরবেলা থেকে পিঠে তৈরির আয়োজনে মত্ত হয় বাড়ির বউ-ঝিরা। আগে ঢেঁকিতে ভালো করে চাল কুটে নেয়। দুধ ক্ষীর নারকেল নলেনগুড় তিলের ছাঁই রাঙা আলু প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে নানা ধরনের পিঠে বানানো হয়। পুলিপিঠে দুধপিঠে পাটিসাপটা ভাজা পিঠে রসবড়া আসকে পিঠে ইত্যাদি। চিতুই পিঠে সরাতে একসঙ্গে সাতটি হয়। আসকে পিঠে একটিই মাত্র হয়। মুসলমান সমাজেও পিঠে সমান জনপ্রিয়। কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে লিখেছেন, ‘পিঠা বেচিয়া নাম ধরাল্যা পিঠারী’।
পিঠের সঙ্গে নানা ধরনের পুলিও হয়। পুলি শব্দের অর্থ পুর, অর্থাৎ নারকেলের পুর দেওয়া নানা ধরনের পিঠে। দ্বিজ বংশীদাস তাঁর ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে লিখেছেন–
জামাই পুলী দুগ্ধপুলী চন্দ্রপুলী আর।
গোটাপুলী মিঠাপুলী অনেক প্রকার।।
পিঠের সঙ্গে নলেনগুড় এক কথায় চমৎকার। কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন, ‘পিঠে পুলী পেটে যেন ছিটে গুলি ছোটে’। পূর্ব বাংলায় পিঠেকে কেন্দ্র করে বিশেষ লোকাচার হত। সকালের দিকে একটি পাত্রে পিটুলিগোলা করে, কলার ডাঁটার সাহায্যে সূর্য বা ধর্মের উদ্দেশে গোয়ালে, ঢেঁকিশালে একটি করে ছাপ দেওয়া হত। একে বলা হয়েছে ধর্মের পিঠে উৎসব। ধর্মরাজের উৎসবেও পিঠে দেওয়ার প্রথা আছে।

পৌষবুড়ি হল পিঠেপুলির লৌকিক দেবী। প্রথম পিঠের ভাগ পান পৌষবুড়ি। ইনি পিঠে না পেলে রেগে যান। পৌষপার্বণের দিনে সিজাপিঠে চিতুইপিঠে গোকুলপিঠে ভাজাপিঠে ছাচঁপিঠে বানাবার আগে চালগুড়ি আর ময়দা দিয়ে দু’টি নরনারীর মূর্তি বানান বাড়ির গিন্নিরা। এদের নাম চোর-চুন্নি পিঠে। চোরপিঠে খায় সাধারণত অবিবাহিত পুরুষ।
লোকবিশ্বাস হল– এই পিঠে খেলে তার দ্রুত বিয়ে হবে। আর সন্তান কামনায় মহিলারা চুন্নিপিঠে খান। তবে পিঠে খাওয়ার আগে চোর-চুন্নিকে নিয়ে গিয়ে পৌষবুড়িকে পিঠে খাইয়ে আসতে হবে। এবং খাওয়ার অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। তারপরেই শুরু হবে পিঠেপুলি খাওয়ার তোড়জোড়।
বাড়ির অন্দরে পৌষবুড়ির স্থান নেই। সদর দরজার বাইরে বা খামার বাড়িতে অচ্ছেদ্দার আসনে তার ঠাঁই। মাটি দিয়ে বানানো হয় মূর্তি। পেটটা বেশ ঢাউস। চোখ দুটো গোল্লা পাকানো মার্বেলের মতো। হাঁ-করা মুখ। হাত-পা ছড়ানো। শুয়ে থাকা কিংবা ঠেস দেওয়া মূর্তি।

পৌষ সংক্রান্তির দিনে বাড়ির ছোট ছোট ছেলেপুলেরা অব্যবহৃত হাঁড়ি কলসি দিয়ে পৌষবুড়ি বানায়। মাথায় লাগায় উমরো ঝুমরো চুল। হাতে দেয় মাটির সরা। পাশেই রাজ্যের শুকনো পাতা ডাল কাটি জোগাড় করে আগুন ধরিয়ে হুল্লোড় করে কচিকাঁচারা।
পৌষবুড়ির সঙ্গে অনেকটাই মিল রয়েছে বাংলার অনেক স্থানে পূজিত সোদরবুড়ির সঙ্গে। যেমন সুন্দরবন অঞ্চলে পৌষ সংক্রান্তির দিন সোদর ব্রত পালন করেন মহিলারা। সেখানে হাতে মাটি টিপে এক ধরনের ছোট পুতুল করা হয়। তাকে বলা হয় সোদর বুড়ি। অনেক স্থানে আবার লক্ষ্মীর আটনের পাশে একটি ছোট্ট মাটির গর্ত করে তার মধ্যে একটি কুলের ডাল পুঁতে দেওয়া হয়। তলায় রাখা হয় গোবরের তৈরি বুড়ি। এরই নাম সোদরবুড়ি। কুলের ডালে রাখা হয় হলুদ ছোপানো ন্যাকড়া। পুজোর শেষে ব্রতীনিরা সুর করে বলেন–
সোদর যায় ভেসে
ওদোর আসে হেসে।
গ্রামে গ্রামে সংক্রান্তির ভোরবেলায় মেয়ে মরদ ছেলেপুলে নদী বা কাঁদরে পোষ নাইতে যায়। শাস্ত্রীয়ভাবে একেই বলে মকর স্নান। কিন্তু রাঢ় বাংলার গাঁ-গঞ্জে শীতের কামড় সহ্য করে মাঝরাত থেকে নদীতে পড়ে ঝাঁপিয়ে। নাইতে গিয়ে মেয়েপুরুষে আদি রসাত্মক খিস্তি খেউড় করে। ছাপার অযোগ্য সেইসব খিস্তির ছড়া। এটাই দস্তুর। এখন অবশ্য এসব অনুষ্ঠান আর দেখা যায় না।

শাস্ত্রীয়ভাবে মকর সংক্রান্তিকে অতি শুভ দিন হিসাবে ধার্য করা হয়েছে। কথিত আছে, এই দিন থেকে সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হয়। সূর্য মকররাশি থেকে মিথুনরাশিতে গমন করে। উত্তরায়ণ যেমন দেবতাদের দিন, দক্ষিণায়ণ হল দেবতাদের রাত। কথিত আছে, মকর সংক্রান্তিতে ভগীরথের সঙ্গে গঙ্গাদেবী কপিলমুনির আশ্রমে প্রবেশে করে সাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। পিতামহ ভীষ্ম এই পবিত্র দিনে নিজের ইচ্ছানুযায়ী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে মকর সংক্রান্তিতে গঙ্গাস্নান বা নদীস্নান করলে সঞ্চিত পাপের ক্ষয় হয় এবং পুণ্য অর্জিত হয়। গঙ্গাসাগরে স্নান করলে আবার অশ্বমেধতুল্য ফললাভ করেন স্নানার্থীরা– এমনই লোকবিশ্বাস।
জঙ্গলমহলে এ দিনটির বিশেষ তাৎপর্য আছে। কুড়মালি মতে পয়লা মাঘ থেকে নববর্ষ শুরু। তাই জঙ্গলমহলের মূলবাসীরা যেমন হালচার বা হালপুণ্যি করেন, তেমনই আখ্যানযাত্রা বা আইখানযাত্রাকে শুভ বলে মানেন। বাংলার সবচেয়ে বেশি মেলা অনুষ্ঠিত হয় এখ্যান দিনে অর্থাৎ পয়লা মাঘ।
………………..পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব………………..
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved