how jagatgouri evolved from goddess manasa and chandi | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

কেন চণ্ডীরই সঙ্গে মনসার সমন্বয় দেখা গেল? উত্তর নিহিত আছে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের বণিকখণ্ডের কমলেকামিনী দেবীর পরিকল্পনায়। বণিকখণ্ডের কাহিনিতে দেখা যায়, খুল্লনার স্বামী ও পুত্র সামুদ্রিক পথে কালীদহে কমলেকামিনীকে দেখেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কমলেকামিনী জলদেবী গৌরী বা চণ্ডী। কালীদহ থেকে উত্থিত চৌষট্টিদল পদ্মে অপূর্ব সুন্দরী ষোড়ষী কন্যা রূপে তাঁর আত্মপ্রকাশ। দেবীর হাতে একটি বা দু’টি হাতি। একবার সেই হাতিকে গিলছেন পরে উদ্‌গার করছেন। দেবীর এই ভয়াবহ মায়াদৃশ্য দেখে পিতাপুত্র উভয়ে বিপদে পড়েছিল।

Published by: Robbar Digital

Posted:January 7, 2026 7:58 pm | Updated:January 7, 2026 7:58 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

১৬.

দুই বাংলার জনপ্রিয় লোকদেবী মনসা। বাংলার গ্রামে গ্রামে শারদ দুর্গাপুজোর আগে অবধি তাঁর পুজো হয় সাড়ম্বরে, বহু রূপে ও রূপান্তরে। পণ্ডিতদের মতে, ‘মনসা’ নামটি এসেছে দক্ষিণ ভারতীয় সর্পদেবী ‘মঞ্চাম্মা’ থেকে। কালক্রমে জৈন বৌদ্ধ হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাচীন সর্পদেবীদের মনসা আত্মসাৎ করেছেন। এই কারণে মনসার মধ্যে যেমন জৈন সর্পদেবী পদ্মাবতী ও বৈরাতি, বৌদ্ধধর্মের সর্পদেবী জাঙ্গুলি তারার প্রভাব দেখা যায়, তেমনই মহাভারতের কদ্রু বা জরৎকারুর প্রভাবও পড়েছে। 

মনসার মধ্যে শুধু একাধিক প্রাচীন সর্পদেবীদের ছায়া নেই, দুই বিপরীত মেরুর ও প্রতিদ্বন্দ্বী দেবীর সম্মিলন ঘটেছে। যেমন জগৎগৌরী। ইনি যেমন চণ্ডী মনসা কাল্টের সমন্বয়ী সর্পদেবী তেমনি সমন্বয়ী ধারাটিকে পরিপুষ্ট করেছে বৌদ্ধ জাঙ্গুলি তারাদেবীর ভাবনা। জাঙ্গুলি তারা মহাযান সম্প্রদায়ের শ্রমণদের পূজিত দেবী। নগেন্দ্রনাথ বসু উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ থেকে দ্বিভূজা জাঙ্গুলি তারার মূর্তি আবিষ্কার করেন। সর্পদেবী হিসাবে বাংলায় জাঙ্গুলি অতি জনপ্রিয় দেবী ছিলেন। সাপের ওঝাকেও একসময় জাঙ্গুলিক বলা হত। সেইদিক থেকে দেখলে জগৎগৌরী আসলে চণ্ডী, মনসা ও জাঙ্গুলি তারার সমন্বয়ী দেবী।

zoom
সর্পদেবী মঞ্চাম্মা

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের প্রকৃতি খণ্ডে ৪৫ অধ্যায়ে মনসার একাধিক নাম সম্পর্কে পুরাণকার লিখেছেন–

জরৎকারুর্জগদগৌরী মনসা সিদ্ধযোগিনী।
বৈষ্ণবী নাগভগিনী শৈবী নাগেশ্বরী তথা।।
জরৎকারুপ্রিয়াস্তিকমাতা বিষহরীতি চ।
মহাজ্ঞানযুতা চৈব সা দেবী বিশ্বপূজিতা।।

শ্লোকাবলী থেকে মনসার ১২টি নাম পাওয়া যায়– জরৎকারু, জগৎগৌরী, মনসা, সিদ্ধযোগিনী, বৈষ্ণবী, নাগভগিনী, শৈবী, নাগেশ্বরী, জরৎকারুপ্রিয়া, আস্তিকমাতা, বিষহরী ও মহাজ্ঞানযুতা। 

পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া জেলায় কয়েকটি স্থানের মনসাপুজো ‘জগৎগৌরী’ নামে বিখ্যাত এবং ঐতিহ্যবাহী। ‘জগৎগৌরী’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ অতিশয় গৌরবর্ণা বা সুন্দরী। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এ প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে, 

ভৃশং জগৎসু গৌরী সা সুন্দরী চ মনোহরা।
জগদগৌরীতি বিখ্যাতা তেন সা পূজিতা সতী।।

zoom
বৌদ্ধদেবী জাঙ্গুলি তারা

অর্থাৎ এই দেবী জগতে অতিশয় গৌরবর্ণা, সুন্দরী ও মনোহরা। এই জন্য দেবীর আরেক নাম জগৎগৌরী। কিন্তু এহ বাহ্য! সব জায়গায় না-হলেও অনেক স্থানে জগৎগৌরী মনসাপুজোর সঙ্গে মিশে আছে চণ্ডী কাল্টের ভাবধারা। অর্থাৎ এই ধরনের মনসাপুজোগুলি মনসা ও চণ্ডীর সমন্বয়ী রূপের। 

অথচ মনসামঙ্গলকাব্যে চণ্ডী ও মনসা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেবী চরিত্র রূপে অঙ্কিত হয়েছে। মনসামঙ্গলকাব্যের দেবখণ্ড অনুসারে মনসা শিবের মানসকন্যা। সুতরাং চণ্ডী তাঁর সৎমাতা। চণ্ডীর সঙ্গে মনসার বিরোধের কাহিনি কবিগণ অল্পবিস্তর বর্ণনা করেছেন। মনসার এক চক্ষু কানা করে দেওয়া থেকে শুরু করে মনসা ও জরৎকারুর দাম্পত্যজীবনে সংকট ডেকে আনা; এমনকী মনসাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া এবং সিজুয়া পর্বতে স্থানান্তরিত করা ইত্যাদি ঘটনা চণ্ডীর প্ররোচনাতে সংঘটিত হয়েছে। 

মনসামঙ্গলের নরখণ্ডের কাহিনির প্রধান চরিত্র চাঁদ সদাগরের তীব্র মনসা-বিরোধিতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে দেবী চণ্ডীর উসকানিমূলক কথাবার্তা। বিপ্রদাস পিপিলাই তাঁর মনসাবিজয় কাব্যে লিখেছেন, 

পদ্মাবতী দুষ্টবতী বড় দূরাচারী।
সিজুয়া শিখর ঘর সদা মন্দকারী।।
দেবপুর মাঝে তার বড় অপমান।
না পূজিহ তারে কভু শুন সম্বিষ্ঠান।।

zoom
মনসাপটে মনসামঙ্গল কাব্য

এই সমস্ত ঘটনা থেকে সহজেই বোঝা যায়, মনসা ও চণ্ডী কাল্টের বিরোধিতা মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মনসার মতো চণ্ডী লৌকিক দেবী হলেও দেবী দুর্গার সঙ্গে সহজেই তাঁর আত্মীকরণের ফলে চণ্ডীপুজো সমগ্র হিন্দুসমাজে দ্রুত গৃহীত হয়। রাঢ় অঞ্চলে অধিকাংশ গ্রামের অধিশ্বরী হয়ে ওঠেন দেবী চণ্ডী। 

মনসার ভাগ্যে এই আত্মীকরণ প্রথমদিকে সম্ভবপর হয়নি। কারণ মনসার পূর্বে হিন্দুসমাজে পূজিত কোনও প্রভাবশালী সর্পদেবীর কথা জানা যায় না। তাছাড়া সমাজের প্রান্তীয় বর্গের মানুষজন যেমন রাখাল, ধীবর, ধর্মান্তরিত মুসলমান প্রভৃতিরা মনসাকে মেনে নিলেও উচ্চবর্ণ মনসাকে প্রথমদিকে স্বীকার করেনি। 

মেনে না-নেওয়ার অন্যতম কারণ হল, তাঁরা অধিকাংশই ছিলেন চণ্ডী উপাসক। সেই কারণে মনসামঙ্গল কাব্যে চণ্ডী ও মনসার বৈরিতাকে কবিরা বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী পর্যায়ে বিশেষ করে চাঁদ সদাগরের মনসাপুজোর মধ্য দিয়ে সেই বিরোধিতার অবসান ঘটে। মনসাপুজো যেমন সমাজের উচ্চবর্ণ কর্তৃক গৃহীত হয় তেমনি মনসা ও চণ্ডীর মধ্যে সমন্বয় আসে। সেই সমন্বয়ী রূপের পুজো অনেক স্থানের জগৎগৌরী পুজোর মধ্যে দেখা যায়।

zoom
হস্তীবাহনা মনসা

 

প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কেন চণ্ডীরই সঙ্গে মনসার সমন্বয় দেখা গেল? উত্তর নিহিত আছে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের বণিকখণ্ডের কমলেকামিনী দেবীর পরিকল্পনায়। বণিকখণ্ডের কাহিনিতে দেখা যায়, খুল্লনার স্বামী ও পুত্র সামুদ্রিক পথে কালীদহে কমলেকামিনীকে দেখেছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কমলেকামিনী জলদেবী গৌরী বা চণ্ডী। কালীদহ থেকে উত্থিত চৌষট্টিদল পদ্মে অপূর্ব সুন্দরী ষোড়ষী কন্যা রূপে তাঁর আত্মপ্রকাশ। দেবীর হাতে একটি বা দু’টি হাতি। একবার সেই হাতিকে গিলছেন পরে উদ্‌গার করছেন। দেবীর এই ভয়াবহ মায়াদৃশ্য দেখে পিতাপুত্র উভয়ে বিপদে পড়েছিল। 

ড. সুকুমার সেনের মতে কমলেকামিনী দুর্গা চণ্ডী অভয়া নন, তিনি দেবীর প্রাচীনতর রূপভেদ দুর্গা মনসা কমলার বেশান্তর। ড. সেন লিখেছেন– ‘হয়তো আসলে এখানে নাগ ছিল এবং সে নাগ হাতি নয়, সাপ। মনসা কমলার মুখ হইতে সাপ বাহির হওয়া ও পুনরায় মুখের ভিতর চলিয়া যাওয়া অসম্ভব বা অশ্রুতপূর্ব ব্যাপার নয়। রূপকথার পাতালবাসিনী শঙ্খিনী রাজকন্যার গল্পে এ ঘটনা পাইয়াছি।’ (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৪১৪)

মনসার সঙ্গে জলেরও গভীর যোগ রয়েছে। স্বামী শংকরানন্দ তাঁর ‘মনসাচরিত’ গ্রন্থে (পৃ. ৬৫) লিখেছেন–

‘দেবী বিষহরী জলের দেবী। কারণ রঘুনন্দন ধৃত ধ্যানে আছে, 

পদ্মনাভে গতে শয্যাং দেবৈঃ সর্বৈরনন্তরম।
পঞ্চম্যামসিতে পক্ষে সমুত্তিষ্ঠতি পন্নগী।।

(অর্থাৎ) পদ্মনাভ বিষ্ণু যখন দেবগণসহ নিদ্রামগ্ন হইলেন তখন পন্নগী জাগিলেন। বিষ্ণুর নিদ্রার সময়কাল বর্ষাকাল। সুতরাং বিষ্ণু বা আদিত্য যখন নিদ্রিত তখন বৃষ্টি ও মেঘ জাগরিত। তাই পন্নগী এই স্থানে বৃষ্টির দেবী।’ 

zoom
জগৎগৌরী

ড. সেন তাঁর প্রাগুক্ত গ্রন্থে (বাসাই, পৃ. ১৫৬) জানিয়েছেন, ঋকবেদে উল্লিখিত জলদেবী গৌরীর সঙ্গে মনসার যথেষ্ট মিল আছে। সুতরাং মনসার সঙ্গে চণ্ডীর সম্পর্ক প্রথম থেকেই ছিল। জগৎগৌরী সেই মনসা ও চণ্ডীর সমন্বয়ী রূপ। জগৎগৌরী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাবে, তার আগে চণ্ডীপুজো নামে মনসা ও চণ্ডীর সমন্বয়ী ঐতিহ্যবাহী পুজোর কথা বলা প্রয়োজন। 

পূর্ব বর্ধমান জেলার মালডাঙার সন্নিকটে চন্দ্রপুর গ্রামের পশ্চিম দিকে দু’ কিমি পথ পেরিয়ে প্রাচীন গ্রাম বৈঁচি। পাশাপাশি অবস্থিত গ্রামগুলি হল উত্তরদিকে গীধগ্রাম, দক্ষিণে চন্দ্রপুর নরসোণা, পশ্চিমে সরগ্রাম, পূর্বে কামালগ্রাম। প্রসঙ্গত, কামালগ্রামের অধিশ্বরী দেবী কমলেকামিনী। 

zoom
বাংলার সর্পদেবী

বৈঁচী গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে শীর্ণকায়া কাঁদর যা উত্তর পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে স্থানীয় খড়িনদীতে গিয়ে মিশেছে। জনসংখ্যা প্রায় হাজার চারেক। মুসলমান বসতি নেই। প্রায় ৪৫ ঘর ব্রাহ্মণ বসতি। এছাড়া উগ্র ক্ষত্রিয় জেলে কৈবর্ত বাগদি দাস মুচি হাড়ি ডোম জাতির বসবাস। 

বৈঁচি গ্রামের গ্রাম্যদেবী বৈঁচি চণ্ডী। তিন পোয়া উচ্চতার পাথুরে সর্পদেবী। দেবী কমলাসনে বসে আছেন। মাথায় সর্পছত্র। এক হাতে পদ্ম অপর হাতে নাগ। তবে মূল মূর্তিটি কয়েক বছর পূর্বে চুরি হয়ে গেছে। পুরাতন মূর্তির ফোটোগ্রাফ থেকে বর্তমান মূর্তিটি বানানো হয়েছে।

দেবীর সেবাইত ঘোষাল বংশ। বেশ কয়েক পুরুষ আগে ঘোষাল বংশের দেবপ্রসাদ ঘোষাল স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে কামালের মৌজায় অবস্থিত কাদম্বিনী নামক পুকুর থেকে দেবী মূর্তি উদ্ধার করে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর সেবা-মন্দির সাবেকি মাটির চৌরিঘর। খড়ের ছাউনি। দাওয়া উঁচু বারান্দা। শোনা গেল, মাটির মন্দির ভেঙে দেবীর দালান মন্দির হবে। বর্তমানে দেবীর অধিষ্ঠান গ্রামের অভ্যন্তরে দক্ষিণমুখী দালান মন্দিরে। সামনে পুকুর। পূর্বদিকে বারোয়ারি পাকা ক্লাবঘর। মন্দিরে শিবের পাশাপাশি বৈঁচি চণ্ডী পূজিত হচ্ছেন। স্থানটি চণ্ডীতলা নামে অধিকতর পরিচিত।

zoom
বৈঁচি চণ্ডী

দেবীর নিত্যসেবা তিনবেলা। সকালে বাল্যভোগ, দুপুরে অন্নভোগ; পাঁচরকম ভাজা ব্যঞ্জনাদি ও পরমাণ্ণ, সন্ধ্যা শীতল। দেবীর পুজো হয় চণ্ডী ও মনসার ধ্যানে। মনসার ধ্যান হিসাবে যে স্তোত্রটি ব্যবহৃত হয় ধর্মরাজ পূজাবিধানে তার উল্লেখ আছে–

কান্ত্যা কাঞ্চনসন্নিভ্যাং সুবদনাং পদ্মাসনাং শোভনাং
নাগৈন্দ্রঃকৃতশেখরামহিময়ীং দিব্যাঙ্গরাগান্বিতাম।
চার্বঙ্গী দধতীং প্রসাদমধিপং নিত্যং করাভ্যাং মুদা
বন্দে শংকরপুত্রিকাং বিষহরীং পদ্মোদ্ভবাং জাগুলীম।।

[অর্থাৎ, দেহকান্তিতে দেবী কণকতুল্য, সুন্দর বদনযুক্ত, পদ্মাসনা, সর্পমুকুট বিশিষ্ট সর্পময়ী এবং দিব্য অঙ্গরাগে সমন্বিতা, হস্তদ্বয়ের দ্বারা সানন্দে প্রসাদ ধারণকারিনী শিবতনয়া পদ্মজাতা বিষহরী জাগলী দেবীকে বন্দনা করি।]

স্তোত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে বৈঁচিচণ্ডী আসলে সর্পদেবী জাঙ্গুলী তারা, যিনি মনসা ও চণ্ডীর সমন্বয়ী মাতৃরূপে পূজিত হচ্ছেন। দেবীর বাৎসরিক পুজো দশহরার দিনে। প্রথমে মাটির মন্দিরে দেবীর নিত্যসেবার পর চণ্ডীতলায় শোভাযাত্রা-সহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দেবীর আরেক দফা পুজো ও চণ্ডীপাঠ করা হয়। গ্রামের বিভিন্ন পাড়া থেকে মই সাজিয়ে বাজনা সহ পুজোর নৈবেদ্য নিয়ে আসা হয়। সেগুলির পুজো করার পর দেবীকে চতুর্দোলায় চাপিয়ে শোভাযাত্রা-সহ গ্রামের দক্ষিণ দিকে নতুনপুকুরে নিয়ে যান ভক্তরা স্নানের জন্য।

zoom
নাগছলন

তেল হলুদ আমলা মাখিয়ে দেবীর স্নানের পর ঘাট-বেদীতে বসিয়ে আবার শুরু হয় পুজো ও চণ্ডীপাঠ। দেবীপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রায় অর্ধশতাধিক পশুবলি। পুজোর পর দেবী পুনরায় চতুর্দোলায় চেপে চণ্ডীতলার মন্দিরে আসেন। এখানে দেবীর ষোড়োশোপচারে পুজোপাঠ চলতে থাকে। চণ্ডীতলার মন্দির প্রাঙ্গণে তিনদিকে চলে পশুবলি। সম্মুখদিকে উচ্চবর্ণের, পশ্চিমদিকে দাস হাড়িদের এবং পূর্বদিকে বাগদিদের পশুবলি। প্রায় তিন শতাধিক পশুবলি হয়। বলির পর হোম ও পায়সান্ন ভোগ দেওয়া হয় দেবীর উদ্দেশ্যে।

পরেরদিন বাসপুজো। সকালে নিত্যসেবার পর দেবীকে চতুর্দোলায় চাপিয়ে শুরু হয় গ্রাম প্রদক্ষিণ। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাড়ার মোড়ে মোড়ে রয়েছে একটি করে সুউচ্চ বেদী। সেই বেদীতে দেবীকে স্থাপন করে চলে পুজো ও পশুবলি। এর নাম মাইচপুজো। ‘মাইচ’ কথাটি এসেছে মঞ্চ থেকে। পুজোপাঠ সাঙ্গ করে আবার দেবী চলেন অন্য পাড়ার উদ্দেশ্যে। সেখানেও একইভাবে পুজো ও পশুবলি অনুষ্ঠিত হয়। 

বাগদিপাড়ার প্রতিটি বাড়ির দুয়ারে দুয়ারে দেবীর পুজো ও পশুবলি অন্যতম পুজোর বৈশিষ্ট্য। রাত্রি ১২টার সময় দেবী মূল মন্দিরে ফিরে আসেন। বৈঁচী চণ্ডীর পুজোপলক্ষে চারদিন ধরে মেলা বসে গ্রামে। অনুষ্ঠিত হয় নানাবিধ্য গ্রাম্য লোকসংস্কৃতির আসর, যাত্রা কবিগান বাউল প্রভৃতি গানের আসর বসে।

………………..পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব………………..

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

buddhist goddess chandi Folklore janguli manasa Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar snake goddess taradevi

Share this article on