
দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’ নাটকে অর্দ্ধেন্দুশেখরের অভিনয় সম্পর্কে গিরিশচন্দ্র লিখছেন, ‘রামমাণিক্য যখন মঞ্চে প্রবেশ করিত, তখন মনে হইত না যে কোনো ভদ্রলোক অভিনয় করিতেছেন, মনে হইত যেন সাক্ষাৎ এক নেশাখোর মাতাল আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে।’ অর্দ্ধেন্দুশেখর কিন্তু টলমল পায়ে চিৎকার করে মাতলামি করতেন না, তিনি মাতালের সেই চেষ্টাটা ফুটিয়ে তুলতেন– সে নিজেকে সোজা রাখার চেষ্টা করছে। চোখের পাতা আধবোজা, কথার স্বরে একটু জড়তা, কিন্তু যুক্তিতে তীক্ষ্ণ– এই সূক্ষ্ম কাজগুলো তিনি আয়ত্ত করেছিলেন কলকাতার ডোমপাড়া এবং মদের দোকানগুলোতে গিয়ে মাতালদের পর্যবেক্ষণ করে।
২৫ তারিখ, মাস জানুয়ারি। ১৮২৪ সালের এই দিনে কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে আধুনিক বাংলা নাটকের লেখক ‘রেবেল পোয়েট’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম। ঠিক তার পঁচিশটি বসন্ত পেরিয়ে, ২৬-তম বছর ১৮৫০ সালে এই একই দিনে উত্তর কলকাতার বাগবাজারে মিত্র মুস্তফী বংশে জন্ম নিলেন বাংলা রঙ্গমঞ্চের ‘নটচূড়ামণি’ অর্দ্ধেন্দুশেখর মুস্তফী। এই সমাপতন কি শুধুই গাণিতিক?

মাইকেল যদি হন বাংলা নাটকের ‘ব্রহ্মা’ বা স্রষ্টা, তবে অর্দ্ধেন্দুশেখর ছিলেন তার ‘বিষ্ণু’ বা পালনকর্তা। মাইকেল বাংলা নাটকে দিয়েছিলেন হাড়-মাংস-কঙ্কাল– অর্থাৎ গঠন; ট্র্যাজেডির আভিজাত্য ও সংলাপের আধুনিকতা। আর অর্দ্ধেন্দুশেখর তাতে ফুঁকেছিলেন প্রাণবায়ু– অর্থাৎ, অভিনয়ের সেই ‘স্বাভাবিকতা’ বা ‘Natural Acting’, যা বাংলা থিয়েটারকে যাত্রার মেলোড্রামা থেকে মুক্তি দিয়েছিল।

উলুবেড়িয়ার মিত্র মুস্তফীরা বাগবাজারে এসে বসত স্থাপন করেছেন, সেই বাড়ির নবীনকৃষ্ণ মুস্তফী একজন সুপণ্ডিত এবং বেহালাবাদক– অর্দ্ধেন্দুশেখরের পিতা। আর পাঁচটা বাঙালি বাড়ির মতো মুস্তফীদের বাড়িতেও আসতেন কথক ঠাকুর– পুরাণ পাঠ করতে। এমনই একদিন কথক ঠাকুর এসেছেন। তিনি পৈতেতে আঙুল জড়িয়ে, গায়ে নামাবলি দিয়ে, সুর করে পুরাণ পাঠ করছেন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলে কথক ঠাকুরের পায়ে ঝিঁ ঝিঁ ধরে গেছে, তিনি অবচেতনে পা নাড়াচ্ছেন। ছোট্ট অর্দ্ধেন্দু কিন্তু পুরাণ কথার চেয়ে বেশি লক্ষ করছেন ওই পা নাড়ানোটা। পরে বন্ধুদের সামনে যখন তিনি কথক সেজে বসছেন, তখন ওই অবিকল পা নাড়ানো, নস্যি নেওয়ার সময় মুখের ওই বিশেষ ভঙ্গি– সব হুবহু করে দেখাচ্ছেন। স্কুলের শিক্ষক হোক বা বাড়ির পরিচারক– কারও হাঁটাচলা, কারও তোতলামি, কিছুই তার এক্স-রে চোখ এড়াত না। গিরিশচন্দ্র লিখেছিলেন, অর্দ্ধেন্দু বাল্যকালেই একটা গভীর সত্য বুঝেছিলেন– ‘মানুষের বাহ্যিক আচরণের মধ্যেই তাহার অন্তরের স্বরূপ লুক্কায়িত থাকে।’ আজকের দিনে যাকে আমরা ‘Body Language’ বলি, ১৫০ বছর আগে এক কিশোর সেটাকে নিজের অভিনয়ের ব্যাকরণ বানিয়ে ফেলছে। তিনি কিন্তু বুলি আউড়ে নকল করতেন না। তিনি নকল করতেন মানুষের ‘Mannerism’।
বেলগাছিয়ার ছোকরা অর্দ্ধেন্দুশেখরের জীবনের ‘ইউরেকা মোমেন্ট’ আসে ১৮৫৯ সালে। পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারে তখন সাজ সাজ রব। কারণ ‘অলীক কু-নাট্য রঙ্গ’ দেখে বিরক্ত মাইকেল লিখে ফেলেছেন প্রথম আধুনিক বাংলা নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। তারই মঞ্চায়নে বালক অর্দ্ধেন্দু দর্শক। সে সময় বাংলা অভিনয় জগতে উচ্চকন্ঠে সুর করে সংলাপ বলাই ছিল দস্তুর। কিন্তু বেলগাছিয়ায় মাইকেলের নাটকে অর্দ্ধেন্দু দেখলেন এক ভিন্ন ধারা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা সংলাপ এবং কেশবচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের (যিনি ‘বিদূষক’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন) অভিনয় দেখে তিনি শিখলেন, কৌতুকাভিনয় মানে কেবল হাসানো নয়, তার মধ্যে থাকবে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক শ্লেষ। বুঝলেন, নাটক মানে চরিত্রের চামড়ার নিচে সেঁধিয়ে যাওয়া। মাইকেলের লেখা গদ্য সংলাপ শুনে বুঝলেন– আরে! এ তো আমাদের রোজকার কথার মতোই, অথচ কী গভীর! সেই রাতেই অর্দ্ধেন্দু ঠিক করে ফেললেন– ‘আমি যদি কখনও অভিনেতা হই, তবে মাইকেলের ওই নির্দেশিত পথেই চলিব।’ মাইকেল যেমন বাংলা কবিতায় অমিত্রাক্ষর ছন্দ এনে ‘মিউজিক’ বদলে দিয়েছিলেন, অর্দ্ধেন্দু তেমনি অভিনয়ে আনতে চাইলেন গদ্যময় স্বাভাবিকতা।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাট্যপ্রতিভার দু’টি দিক ছিল– প্রহসন (Farce) এবং ট্র্যাজেডি। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই দুই বিপরীত মেরুর সার্থক রূপায়ণ ঘটেছিল একমাত্র অর্দ্ধেন্দুশেখরের অভিনয়ে। গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর স্মৃতিচারণায় বারবার বলেছেন, অর্দ্ধেন্দু ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একই সন্ধেয় কমেডিতে পেটে খিল ধরিয়ে দিতে পারতেন, আবার ট্র্যাজেডিতে দর্শককে কাঁদাতে পারতেন।
দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’ নাটকে অর্দ্ধেন্দুশেখরের অভিনয় সম্পর্কে গিরিশচন্দ্র লিখছেন, ‘রামমাণিক্য যখন মঞ্চে প্রবেশ করিত, তখন মনে হইত না যে কোনো ভদ্রলোক অভিনয় করিতেছেন, মনে হইত যেন সাক্ষাৎ এক নেশাখোর মাতাল আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে।’ অর্দ্ধেন্দুশেখর কিন্তু টলমল পায়ে চিৎকার করে মাতলামি করতেন না, তিনি মাতালের সেই চেষ্টাটা ফুটিয়ে তুলতেন– সে নিজেকে সোজা রাখার চেষ্টা করছে। চোখের পাতা আধবোজা, কথার স্বরে একটু জড়তা, কিন্তু যুক্তিতে তীক্ষ্ণ– এই সূক্ষ্ম কাজগুলো তিনি আয়ত্ত করেছিলেন কলকাতার ডোমপাড়া এবং মদের দোকানগুলোতে গিয়ে মাতালদের পর্যবেক্ষণ করে। আজকের দিনে আল পাচিনো বা রবার্ট ডি নিরোর ‘Method Acting’ নিয়ে গদগদ আমরা কি ১৮৭০-এর দশকের কলকাতার এই অভিনয়শিল্পীকে তাঁর যোগ্য সম্মান জানিয়েছি?

এবার আসি সেই কিংবদন্তির কথায়, যা বাংলা থিয়েটারের লোকগাথায় পরিণত হয়েছে। নাটক: ‘নীলদর্পণ’। চরিত্র: অত্যাচারী নীলকর সাহেব ‘উড’ (Wood)। অভিনেতা: অর্দ্ধেন্দুশেখর। তাঁর অভিনয় এতটাই জীবন্ত এবং ঘৃণ্য হয়ে উঠেছিল যে, দর্শকাসনে বসে থাকা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজেকে সামলাতে না পেরে নিজের পায়ের চটিজুতো খুলে মঞ্চে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। অর্দ্ধেন্দুশেখরের ভাষায় ‘ইহা আমার অভিনয়ের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।’
এই দুই ২৫ জানুয়ারি-জাতকের জীবনের, তথা বাংলা থিয়েটারের আরও একটি মাইলফলক তৈরি হয়েছিল ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকের রিহার্সাল রুমে। রাজা ভীমসিংহকে তাঁর প্রাণের চেয়ে প্রিয় কন্যা কৃষ্ণকুমারীর মৃত্যু পরোয়ানায় সই করতে হবে। রাজনীতি ও পিতৃত্বের এক ভয়াবহ দ্বন্দ্ব। মাইকেল মধুসূদন দত্ত নিজে উপস্থিত রিহার্সালে। গিরিশচন্দ্র লিখছেন, অর্দ্ধেন্দুশেখর এই দৃশ্যে একটাও কথা বলেননি। তিনি শুধু কলমটা হাতে নিলেন। তাঁর হাতটা কাঁপছে। মুখে কোনও সংলাপ নেই, শুধু চোখের চাউনি আর চোয়ালের পেশির সামান্য নড়াচড়া। সই করতে গিয়েও পারছেন না, কলমটা ধরে রাখতে পারছেন না। একটা দীর্ঘশ্বাস… এবং এক অসহ্য নীরবতা। এই নির্বাক অভিনয়-দৃশ্য শেষ হতেই শেক্সপিয়র গুলে খাওয়া মধুসূদন দৌড়ে গিয়ে অর্দ্ধেন্দুকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে জল। বললেন, ‘আমি যা লিখেছি, তুমি তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু দেখিয়েছ। আমার লেখার সার্থকতা আজ তোমার অভিনয়ে।’ এই আলিঙ্গন ছিল আসলে সাহিত্য (Text) এবং অভিনয় (Performance)-এর মিলন। মাইকেল বুঝেছিলেন, তাঁর ট্র্যাজেডি কেবল অর্দ্ধেন্দুর অভিনয়েই পূর্ণতা পাবে।

কাট টু ২০২০-’২১ সাল। করোনা অতিমারী। লকডাউন। থিয়েটার হলগুলোতে ঝুলছে তালা। অভিনেতারা ঘরে বন্দি। নাট্যকার ও নির্দেশক ব্রাত্য বসু সিদ্ধান্ত নিলেন, মঞ্চ যখন নেই, তখন উপন্যাসই হবে তাঁর মঞ্চ। অর্দ্ধেন্দুশেখর (অদা) এবং অমৃতলাল বসু (অমৃত)– এই দুই নামের সন্ধিতে তৈরি করলেন ‘মেটা-থিয়েটার’ অদামৃতকথা। ইতিহাস আর কল্পনার মিশেলে তৈরি হল এক আশ্চর্য আখ্যান। যখন বাস্তবে থিয়েটার করা সম্ভব ছিল না, তখন ব্রাত্য বসু উপন্যাসের পাতায় থিয়েটারকে বাঁচিয়ে রাখলেন। অমৃতলাল বসু তাঁর ডায়েরিতে অর্দ্ধেন্দুকে নিয়ে যে ভাষায় লিখেছেন, তা সাধারণ সখ্যের চেয়ে অনেক বেশি গভীর। ব্রাত্য বসু উপন্যাসে খুব সাহসিকতার সাথে এই সম্পর্কের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম ‘হোমো-সোশ্যাল’বা ‘ইরোটিক’ টানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ব্রাত্য বসু উপন্যাসে দেখিয়েছেন, অর্দ্ধেন্দু যখন ‘বিমলা’ বা অন্য কোনও নারী চরিত্রে সাজতেন, তখন তাঁর হাঁটাচলা, চোখের চাউনি– সব বদলে যেত। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের কঠোর পুরুষালি বর্ম ছেড়ে তাঁরা ক্ষণিকের জন্য তরল, নমনীয় এবং সংবেদনশীল হয়ে উঠতেন। মঞ্চ তাঁদের লিঙ্গ-পরিচয়ের সীমানা ভুলিয়ে দিত। মাইকেল-মুস্তফীর এই আলোচনায় ব্রাত্য বসুর এই উপন্যাসের কথা চলে আসে; কারণ, ব্রাত্যবাবুর এই উপন্যাস বাংলা থিয়েটারের এক ইতিহাস-উত্তর আখ্যান। চিঠিচাপাটি নথিপত্রের ফাঁকফোকর দিয়ে কল্পনার আলো প্রবেশ করিয়েছেন।
মাইকেল মধুসূদনের কলম, অর্দ্ধেন্দুশেখরের শরীর এবং ব্রাত্য বসুর আখ্যান– এই তিনে মিলে তৈরি হয়েছে বাঙালির নাট্য-ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য ত্রিভুজ। গিরিশচন্দ্র যথার্থই লিখেছিলেন, ‘নটের জীবন জলের লিখন’। অর্থাৎ, নটের অভিনয় শেষ হলেই তা মুছে যায়। কিন্তু ব্রাত্য বসুর মতো নট-লেখক যখন সেই মুছে যাওয়া লিপিকে উপন্যাসে ধরে রাখেন, তখন তা আর জলের লিখন থাকে না– হয়ে ওঠে আগামীর পাথেয়। আর হ্যাঁ আরও একটা কথা, ২৫ কিন্তু সত্যিই বাঙালির থিয়েটারে নিয়ে এসেছে অদ্ভুত এক সমাপতন। ব্রাত্য বসুর জন্মদিন যদিও সেপ্টেম্বরে, কিন্তু তারিখটা? অনুমান করুন দেখি!
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন হালদার-এর অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved