deys publishing and books of shibnarayan ray | Robbar
Robbar
  • ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

অজয়দার প্রচ্ছদে প্রকাশিত ‘প্রত্যয়, অন্বেষা ও অনুচিন্তন’-এ বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের সঙ্গে তাঁর জার্নাল থেকেও কয়েকটি গদ্য ছাপা হয়েছিল। আর, ‘বাঙালিত্বের খোঁজে এবং অন্যান্য আলোচনা’ বইটিতে প্রবন্ধের সঙ্গে আছে শিবনারায়ণ রায়ের চারটি সাক্ষাৎকার। তার মধ্যে একটি সাক্ষাৎকার– ‘সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতি’– ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকার জন্য দেবেশদার নেওয়া। সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার সময় মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারও ছিলেন। কিন্তু একেবারে শেষে থাকা তাঁর বক্তব্য, লেখক এই বইতে রাখেননি।

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১৮:১০   
Facebook WhatsApp Messenger

৬২.

শিবনারায়ণ রায় যে গৌরদার নিকট বন্ধু ছিলেন সে-কথা বলেছি। দেবেশ রায়ের তিস্তাপার প্রসঙ্গেও একবার শিবনারায়ণ রায়ের কথা বলেছিলাম। গৌরদা শিবনারায়ণ রায় সম্পর্কে লিখেছিলেন– “সাহিত্য, চিত্রকলা, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, নৃতত্ত্ব, সঙ্গীত, নাট্যকলা সর্বত্রই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। কোথায়ও ছাত্রের মন নিয়ে কোথায়ও-বা শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব নিয়ে। তাঁর নিজের বিষয় ইংরেজি সাহিত্য। ইংরেজি এবং বাংলায় তিনি অনেক লিখেছেন। বিতর্ক সৃষ্টিতে তাঁর তুলনা নেই। কলেজ ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ আমি মাড়াইনি কখনও। শিবনারায়ণ আমার ‘ওয়ান ম্যান ইউনিভার্সিটি’।” দে’জ পাবলিশিং-এর সঙ্গে শিবনারায়ণের যোগাযোগের সেতুও ছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ।

zoom
শিবনারায়ণ রায়

আমি যখন শিবদার প্রবন্ধের বইয়ের কাজ শুরু করি, তখনও তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতায় থিতু হননি। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১-র ৩১ মার্চ অবসর নিয়ে তিনি কলকাতায় আসেন এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে। আর আমাদের প্রকাশনা থেকে তাঁর প্রথম প্রবন্ধের বই ‘গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’ প্রকাশিত হয়েছিল সে-বছরের পয়লা বৈশাখেই। দে’জ পাবলিশিং-এর নববর্ষের অনুষ্ঠানে সে-বছর থেকেই তিনি প্রায় নিয়মিত আসতে শুরু করেন। আমাদের অ্যালবামে তাঁর সে-সময়ের ছবিতে দেখছি, কী অপরূপ বুদ্ধিদীপ্ত ছিলেন তিনি।

‘গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’ বইটির শুরুর পাতায় শিবদা রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে লিখেছিলেন– ‘বুদ্ধির ভাষা মান্য করা যদি বহুদিন থেকে দেশের অভ্যাসবিরুদ্ধ হয়, তবে আর সব ছেড়ে দিয়ে ঐ অনভ্যাসের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে।’ আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের এই কথা ক’-টি তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ প্রবন্ধ-বইয়ের ‘সত্যের আহ্বান’ প্রবন্ধটি তাঁকে যে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল, তা বোঝা যায় তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মৌমাছিতন্ত্র’ পড়লে। এই প্রবন্ধের শুরুতে রবীন্দ্রনাথের ‘সত্যের আহ্বান’ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে– ‘লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে মৌমাছি যে চাক তৈরি করে আসছে সেই চাক তৈরি করার একটানা ঝোঁক কিছুতেই সে কাটিয়ে বেরতে পারছে না। এতে করে তাদের চাক নিখুঁত-মতো তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তাদের অন্তঃকরণ এই চিরাভ্যাসের গণ্ডির মধ্যে বন্ধ হয়ে আছে, সে আপনাকে নানা দিকে মেলে দিতে পারছে না…’।

এই প্রবন্ধের শেষে তিনি লিখেছেন–

‘তবু শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যবিধাতা। মৌমাছিতন্ত্রের প্রতি সে আকৃষ্ট হতে পারে, কিন্তু তার মোহপাশ থেকে উদ্ধার পাবার সামর্থ্য তার নিজের মধ্যেই বিদ্যমান। এ সামর্থ্যের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠলে তবেই তার মধ্যে মনুষ্যত্বের স্ফুরণ ঘটে। এবং এ-চেতনা এক-আধজনের মধ্যে আবদ্ধ না-থেকে যখন কোনো সমাজে বেশ কিছুসংখ্যক নরনারীর মধ্যে জাগ্রত হয়, তখনই সে-সমাজে রেনেসাঁসের সূচনা ঘটে। একদা এমনি এক রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে পশ্চিম ইউরোপের মানুষ মধ্যযুগীয় মৌমাছিতন্ত্রের কবল থেকে আপনাকে মুক্ত করেছিল। আজ বিজ্ঞানের বিকাশ এবং ব্যাপক প্রয়োগের ফলে এক সমাজ এবং আরেক সমাজের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে। এ যুগের সম্ভাব্য রেনেসাঁস তাই আজ আর কোনো বিশেষ অঞ্চলে আবদ্ধ না থেকে সর্বমানবীয় ব্যাপ্তি অর্জন করবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই রেনেসাঁস ঘটাতে গেলে একদিকে প্রয়োজন দেশে দেশে সাধারণ মানুষকে মৌমাছিতন্ত্রের আত্মঘাতী রূপ সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা, অন্যদিকে তাদের মধ্যে মানুষের সৃষ্টিশীল সামর্থ্যে প্রত্যয় ফিরিয়ে আনা। যে অল্পসংখ্যক মনীষী আজকের দিনেও এই চেতনা এবং প্রত্যয়ের অধিকারী, অন্যদের উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব তাঁদের। বিশেষ করে তাঁদের দায়িত্ব সেই তরুণ-তরুণীদের প্রতি যাঁরা একদিকে গুরুবাদ, মন্ত্রতন্ত্র এবং অসহায়তাবোধ ও অন্যদিকে উগ্র রাজনীতির বিকল্পের টানাপোড়েনে বিভ্রান্ত। মৌমাছিতন্ত্রের মোহ থেকে এ যুগের মানুষ কতদিনে নিজেদের মুক্ত করতে পারবে, উক্ত বিশ্বনাগরিক মানবতন্ত্রী মনীষীদের উদ্যোগের উপরে তা অনেকখানি নির্ভর করে।’

আমাদের প্রকাশনা থেকে যখন শিবনারায়ণ রায়ের বই বেরতে শুরু করে, প্রায় সেই সময় থেকেই, দে’জের তরফে প্রবন্ধের বইয়ের যাবতীয় কাজ করতেন সুবীরদা, সুবীর ভট্টাচার্য। ‘মৌমাছিতন্ত্র’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ থেকে একটি অংশ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই অংশে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিজম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন– ‘মানুষের ব্যষ্টিগত এবং সমষ্টিগত সীমা এরা ঠিকমত ধরতে পেরেছে তা আমার বোধ হয় না। সে হিসেবে এরা ফ্যাসিস্টদেরই মতো। এই কারণে সমষ্টির খাতিরে ব্যষ্টির প্রতি পীড়নে এরা কোনো বাধাই মানতে চায় না। ভুলে যায়, ব্যষ্টিকে দুর্বল করে সমষ্টিকে সবল করা যায় না। ব্যষ্টি যদি শৃঙ্খলিত হয়, তবে সমষ্টি স্বাধীন হতে পারে না। এখানে জবরদস্ত লোকের একনায়কত্ব চলছে। সোভিয়েট রাশিয়ার… সর্বসাধারণের বিচারবুদ্ধিকে এক ছাঁচে ঢালবার একটা প্রবল প্রয়াস সুপ্রত্যক্ষ; সেই জেদের মুখে স্বাধীন আলোচনার পথ জোর করে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এ অপবাদকে আমি সত্য বলে বিশ্বাস করি।’ কিন্তু বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৯২) ‘মৌমাছিতন্ত্র’-এর ‘উল্লেখ-উদ্ধৃতি নির্দেশিকায় দেখছি, শিবদা রবীন্দ্রনাথের এই সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে লিখেছেন– ‘শ্রীমান সুবীর ভট্টাচার্য আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে ১৯৩০-এর ২৫ সেপ্টেম্বর ইজভেস্তিয়া পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকারটি তৎকালে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৮৮, ১০ জুন এটি প্রথম প্রকাশিত হয়।’

‘গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’ বইটির প্রথম সংস্করণে কোনও ভূমিকা ছিল না। আমার ধারণা, অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে ফেরার সেই সময়ে উনি ভূমিকা লিখে উঠতে পারেননি। তবে দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি ভূমিকাই শুধু লেখেননি, আগের বইয়ের চারটি প্রবন্ধ বাদ দিয়েছিলেন, আবার ছ’-টি নতুন প্রবন্ধ সংযোজিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লিখছেন–

‘দুই সংস্করণের মধ্যবর্তী দশকে পৃথিবীতে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানে আপাতত পৃথিবী জুড়ে মার্কিনী দাপট প্রায় অপ্রতিহত। সম্প্রতি রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েট ইউনিয়ন বিলুপ্ত; রাশিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টি আইনত নিষিদ্ধ; সেখানে আর্থিক দুরবস্থা যেমন প্রকট, রাষ্ট্রিক ভবিষ্যৎ তেমনই অনিশ্চিত। সত্তর বছর ধরে নিরঙ্কুশ জবরদস্তির পরে বলশেভিকরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে বিনা যুদ্ধে গণবিক্ষোভের চাপে। পূর্ব ইয়োরোপে কমিউনিস্ট সাম্রাজ্য তার আগেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।

কিন্তু এই পরিবর্তনের ফলে আমাদের শতকের বিশ্বব্যাপী সংকটের চাপ বিশেষ কমেছে বলে মনে হয় না। ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন প্রক্রিয়া বরং স্পষ্টতর হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পৃথিবীর সব চাইতে শক্তিশালী দেশ। ওয়র্লড ব্যাঙ্ক এবং আই. এম. এফ. এখন পৃথিবীর আর্থিক ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী। বহুজাতিক সংস্থাদের দাপট বিবর্ধমান। যেমন দ্রুতগতিতে পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছে, তেমন প্রযুক্তির বৈপ্লবিক উন্নতির ফলে সাধারণ স্ত্রী-পুরুষের ভাবনা-চিন্তা, আচার-ব্যবহারকে দূরদর্শন, বিজ্ঞাপন, প্রচার ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করবার শক্তিও প্রবলতর এবং কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যে সৃজনধর্মী মানুষদের নিরন্তর সাধনা সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায় সেই অনুভূতিশীল, বিবেকী, কল্পনাপ্রবণ, অন্তনিয়ন্ত্রিত স্ত্রী-পুরুষদের নিঃসঙ্গ বিপন্নতা শতাব্দীর শেষে আজ আরও প্রকট।

অবক্ষয়ের যে প্রক্রিয়ার আলোচনা এই বইটির কেন্দ্রীয় বিষয় পৃথিবীব্যাপী মার্কিনায়নের সম্ভাবনা সেটিকে প্রবলতর করে তুলবে বলেই আশঙ্কা করি। অবক্ষয়ের চেতনা এবং অবক্ষয়কে রোধ করবার আগ্রহ জাগিয়ে তোলাই এই বইটির মুখ্য উদ্দেশ্য। সে প্রয়াস এখনও সমানভাবেই প্রাসঙ্গিক।’

শিবনারায়ণ রায় রবীন্দ্রনাথকে কোন আসনে বসাতেন তা ‘গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’-এর পাতায় স্পষ্ট। তবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর কম বয়সে লেখা প্রবন্ধ নিয়ে কিন্তু একসময় বেশ তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে শান্তিনিকেতনে। সে-সময় শান্তিনিকেতনের ছাত্রী গৌরীদি (গৌরী আইয়ুব) অনেক পরে ‘শিবনারায়ণ রায় বন্ধুবরেষু’ নামে একটি লেখায় বলেছেন–

‘প্রথম যখন সস্ত্রীক শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় তখনও তাঁর ভীষণ পাণ্ডিত্যখ্যাতি আমার কাছে পৌঁছয় নি। তাই তখন তাঁকে বিশেষ ভয় পাইনি।

স্থান-কাল-পাত্রের মধ্যে কাল সম্বন্ধেই আমার স্মৃতি সবচেয়ে দুর্বল। স্থানটা প্রায়ই হুবহু ছবি হয়ে মনে থেকে যায়। শান্তিনিকেতনে মন্দিরের সামনে বকুল গাছতলায় তখন একটা দোকান ছিল শ্রীনিকেতনের। সেই দোকান থেকে কিছু কেনাকাটা সেরে বান্ধবী রুক্মিনী ভাটিয়া আর আমি বার হয়ে আসছিলাম। সামনেই দেখতে পেয়েছিলাম তরুণ শাল গাছের মতো সরল দীর্ঘকায় একটি পুরুষ ও তাঁর সুন্দরী সঙ্গিনীকে। সঙ্গিনীকে আমাদের চেয়ে কম বয়সিনী বলেই মনে হয়েছিল। তাঁরাও বোধহয় ঐ দোকানেই আসছিলেন।

রুক্মিনী আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কয়েক মাস আগে ঝাড়গ্রামে একটা ক্যাম্পে যোগ দিতে গিয়ে ওঁদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যে তার ভালো লেগেছিল সে কথা আগেই তাঁর কাছে শুনেছিলাম। তাই শুধু নাম বলতেই চিনতে পেরেছিলাম। আমার পরিচয় দিতে গিয়ে রুক্মিণী জানিয়েছিল, ফিলসফি অনার্সের ছাত্রী। শিববাবু জানতে চেয়েছিলেন আইয়ুব আমাদের পড়ান কিনা। আমি সদর্থক উত্তর দেওয়ায় উনি মুখখানা একপাশে একটু ঘুরিয়ে বেশ ওপর থেকে কথাটা ছেড়ে দিয়েছিলেন: “আইয়ুব আমার বন্ধু।” আমার সঙ্গে তাঁর উচ্চতার এতটাই পার্থক্য যে কথাটা যে বেশ ওপর থেকেই পড়বে এটা স্বাভাবিক। তবু সেদিন সামান্য একটু সন্দেহ হয়েছিল যে নিজেকে প্রবীণ অধ্যাপক পদবাচ্য ঘোষণা করে আমাকে নেহাৎ নাবালিকা বলে বরখাস্ত করে দিলেন কিনা। যাই হোক ওঁর এই পরিচয়টা জেনে একটু হেসে চুপ করে ছিলাম। মনে মনে বলেছিলাম, আমারও বন্ধু, তবে এখনই সে কথাটা বলা যাবে না।

আইয়ুব যে সেই সময়টায় শান্তিনিকেতনে ছিলেন না, সেটা মনে আছে। তাই মনে হয়, ওটা ১৯৫১ সালের গোড়ার দিকের কথা। হয়তো তখন বসন্তোৎসব ছিল। কিছু লোকসমাগম হয়েছিল যেন আশ্রমে। অসুস্থ হয়ে কয়েক মাসের ছুটি নিয়ে আইয়ুব শান্তিনিকেতন থেকে তখন কলকাতা চলে এসেছিলেন। তাঁকে চিঠিতে জানিয়েছিলাম যে, তাঁর বন্ধু শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।

সেবারের আর কোনও স্মৃতি মনে পড়ে না। ওঁরা বোধহয় দু’-একদিনের জন্য এসে শান্তিনিকেতন দেখে ফিরে যান। কোনও সভা-সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে না। সেবারেই ওঁদের প্রথম শান্তিনিকেতনে যাওয়া কি না, তা কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি পরে।

এরপরের পরিচয় পরোক্ষ ও ভয়াবহ। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক তাঁর কিছু রচনা, সম্ভবত দু’টি প্রবন্ধে– শান্তিনিকেতনকে মুখর করে তুলল। আমার স্বল্প পরিচিত ঐ ভদ্রলোকটি রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন বিষয়ে নানা শ্রদ্ধাহীন মন্তব্য করেছেন বলে শোনা গেল। তিনি না কি লিখেছেন, “দেবেন ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র সাহিত্য সৃষ্টিতে গোয়েটের পর্যায়ে উঠবেন কি করে, তিনি কি কখনও বেশ্যাবাড়ি গিয়েছেন?”… আবার রবীন্দ্রনাথের ছবির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাকি অভিমত দিয়েছেন যে “কবি গুরুদেব যতই কেন ঋষির মুখোশ এঁটে থাকুন, তাঁর মনের কিছু অন্ধকার মহলের খবর ধরা পড়ে গিয়েছে তাঁর ছবিতে।” ইত্যাদি ইত্যাদি। মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মানুষটিকে দেখে তো ভালই লেগেছিল। সঙ্গে স্ত্রী থাকায় তেমন কিছু উগ্র বলেও মনে হয়নি, বরং স্নিগ্ধ-প্রায় শান্তিনিকেতনী রোমান্টিক ধরনেরই মানুষ মনে হয়েছিল।…’

‘গোয়টে ও রবীন্দ্রনাথ’ এবং ‘চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ’ নিয়ে যতই শান্তিনিকেতন মুখর হোক, যতই শিবদার ‘প্রচণ্ড বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে খ্যাতি ততদিনে ছড়িয়ে পড়ুক (আইয়ুবের এমন বন্ধু অবশ্য অনেকেই ছিলেন। গৌরীদির আবার বিখ্যাত মানুষের এগিয়ে গিয়ে পরিচয় করার অভ্যেস কোনওদিনই ছিল না। তাঁর ভাষায়– ‘সিংহশিকারে আমার খুব ভয়।’) গৌরীদি আর আবু সয়ীদ আইয়ুবের বিয়ের পর তাঁদের বাড়িতে এসে শিবনারায়ণ যখন সলজ্জ ভঙ্গিতে একগোছা লাল ও হলুদ গ্ল্যাডিওলি ফুল উপহার দেন, তখন গৌরীদি বোঝেন, শিবনারায়ণ রায় মানুষটি ভেতরে ভেতরে কতটা অন্যরকম। তবে তাঁর দার্শনিক অবস্থানে তিনি সব সময়েই অবিচল, স্থিতপ্রজ্ঞ। আবার এই শিবনারায়ণ রায়ই একসময় রবীন্দ্র ভবনের অধ্যক্ষ হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব ভার সামলেছেন।

zoom
বাঁ-দিক থেকে সন্ধ্যা সেন, সুধাংশুশেখর দে, গৌরকিশোর ঘোষ, শিবনারায়ণ রায়, নিমাই ভট্টাচার্য প্রমুখ

শিবদা মানবেন্দ্রনাথ রায়ের র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজম মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। আমি এই তাত্ত্বিক ব্যাপার ততটা বুঝি না। কিন্তু অন্নদাশংকর রায়ের লেখায় দেখেছি, এই বিষয়টা সংক্ষেপে খুব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়া আছে– প্রয়োজনীয় সমালোচনাও আছে। ‘প্রসঙ্গ শিবনারায়ণ রায়’ প্রবন্ধে অন্নদাশঙ্কর লিখেছেন–

“…তিনি মানবেন্দ্রনাথের মতবাদে বিশ্বাসী, উত্তরসূরি এবং তাঁর সম্বন্ধে একজন authority। মানবেন্দ্রনাথের রচনাবলি তিনি সম্পাদনা করেছেন। মানবেন্দ্রনাথের বিচিত্র জীবন নিয়ে তিনি প্রামাণিক জীবনীও রচনা করেছেন। ডক্টর জনসনের যেমন বসওয়েল, মানবেন্দ্রনাথের তেমনই শিবনারায়ণ। দুজনেই রায়। দুজনেই রায়পন্থী। রায় হলেও আমি কিন্তু রায়পন্থী নই। শিবনারায়ণকে আমি গোড়া থেকেই জানিয়ে রেখেছি। তা সত্ত্বেও তিনি আমাকে শ্রদ্ধা করেন ও আমি তাঁকে স্নেহ করি।

মানবেন্দ্রনাথ বিভিন্ন মতবাদের ভিতর দিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত হয়েছিলেন Radical Humanist। অর্থাৎ এমন এক প্রকার হিউম্যানিস্ট যিনি লিবারল হিউম্যানিস্টদের থেকে কিছু বেশি লিবারল, অথচ রিভোলিউশনারি হিউম্যানিস্টদের থেকে কিছু কম রিভোলিউশনারি। বাংলায় র‍্যাডিক্যাল শব্দটির প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। মৌল বলতে গেলে মৌলবাদীদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়।

আমাদের দেশেও এক প্রকার হিউম্যানিজম্ ছিল। চণ্ডীদাস বলেছিলেন, ‘শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপর মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ বাউলরা সেই মানুষের সন্ধানে ফেরেন। তাঁদের মতে, ‘এই মানুষে আছে সেই মানুষ।’ বাউলনারী যোগমায়া আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবা, এই মানুষই কৃষ্ণ, আর এই মানুষই কংস।’ এমনই অনেক উদাহরণ দিয়েছিলেন। তিনি একবারও ঈশ্বরের নাম করেনি। বাউলরা কেউ করেন না।

এই যে মানবিকবাদ এর সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনও সম্পর্ক নেই। অপর পক্ষে পাশ্চাত্য মানবিকবাদ বিজ্ঞানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যাঁরা থিয়োলজি বিশ্বাস করতেন না তাঁরা ফিলোজফিকে তার থেকে স্বতন্ত্র করেন। সেই ফিলোজফির এক ভাগের নাম হয় ন্যাচারল ফিলোজফি, যার অপর নামগঠন করেছেন তাতে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। এই সংগঠিত দর্শনের অনেকটা এসেছে মানবেন্দ্রনাথের চিন্তার জগৎ থেকে। কোথাও আবার সেই ধারা থেকে সচেতনভাবে একটু দূরে সরে এসে তিনি যোগ করেছেন তাঁর ভিন্ন চিন্তা। এই সব মিলে তৈরি হয়েছে তাঁর বিশিষ্টতা।…”

শিবনারায়ণ রায়ের প্রথম বইটি প্রকাশের বছর পাঁচেক পর– ১৯৮৫-র সেপ্টেম্বরে আমার লেখা একটি চিঠিতে দেখছি লিখেছি– ‘নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপির প্রত্যাশায় আছি। বিশ্বাস আছে নিরাশ হব না।’ নিরাশ সত্যিই হতে হয়নি। ১৯৮৭-র জুলাই মাস থেকেই দেখছি চিঠিপত্রে তাঁর নতুন বইয়ের কথা উঠে এসেছে। শিবদা যদিও বলতেন একবার তিনি নিজে প্রুফ দেখবেন, তবু তাঁর বইয়ের প্রুফ নিয়ে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা থাকত। সেসব নির্দেশ সুবীরদাই পালন করতেন। ১৯৮৮-র ৫ জানুয়ারি একটি হাত-চিঠিতে তিনি আমাকে লিখেছেন–

‘কল্যাণীয়াষু,
প্রবন্ধগ্রন্থটির কিছুটা প্রুফ কি তৈরী হয়েছে? হয়ে থাকলে এর হাতে পাঠিয়ে
দেবেন। যদি না হয়ে থাকে কবে নাগাদ পাঠাতে পারবেন জানালে খুশী হই।
প্যাপিরাস থেকে একটি প্রবন্ধের বই ডিসেম্বরে বেরুবার কথা ছিল।
বেরিয়েছে কিনা জানি না। নাম রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়র ও নক্ষত্র সংকেত।
পুরোপুরি সাহিত্য বিষয়ক। যদি আপনাদের কাছে কপি এসে থাকে, এর
হাতে এক কপি পাঠালে বাধিত হব।…’

‘রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়র ও নক্ষত্র সংকেত’ ১৯৮৭-র ডিসেম্বরে না হলেও অরিজিৎদা (অরিজিৎ কুমার) ১৯৮৮-র জানুয়ারিতে প্রকাশ করেছিলেন। তবে সেদিনই আমি শিবদাকে বই পাঠাতে পেরেছিলাম কি না, আজ আর মনে নেই।

এই সময়ের একটি তারিখ বিহীন চিঠিতে তিনি আমাকে লিখেছেন–

‘কল্যাণীয়েষু,
প্রুফ দেখে ফেরৎ পাঠালাম। ভবিষ্যতে আমাকে শুধু একবার পেজ প্রুফ দেখিয়ে
নিলেই চলবে। তার আগেকার প্রুফ আপনাদের প্রুফরীডারই দেখে দেবেন।
বইটির নাম পরিবর্তন করে বিকল্প দুটি নাম নীচে দিচ্ছি। যেটি আপনাদের
পছন্দ হবে সেটি ব্যবহার করবেন :

১। অনুলম্ব অভিযাত্রা

অথবা

২। খাড়াইএর দিকে

নির্বাচন করে পেজ প্রুফে সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করে নেবেন।
এক একটি ফর্মা ছাপা হয়ে গেলে আমাকে একটি করে ফাইল কপি
পাঠাবেন, তাতে প্রুফ দেখবার সময়ে continuity মিলিয়ে নিতে সুবিধে হয়।…’

শিবদার এই ‘কল্যাণীয়েষু’ সম্বোধনটা একেবারেই পোশাকি ছিল না। তিনি হয়তো আমার সঙ্গে খুব হাসি-রসিকতা কখনও করেননি, কিন্তু তাঁর সঙ্গে দেখা হলেই টের পেয়েছি, তিনি আমাকে কতটা স্নেহ করেন। শান্তিনিকেতনে তাঁদের ৬৩, পূর্বপল্লীর ‘রুদ্রপলাশ’ বাড়িতে মনে হয় আমি কখনও যাইনি। কিন্তু সল্টলেকের বাড়িতে বেশ কয়েকবার গিয়েছি। তবে এই চিঠিতে বইয়ের নাম কেন মাঝ পথে পরিবর্তন করতে হল, তাও আমার মনে পড়ছে না। কিন্তু তাঁর দেওয়া নাম দু’টির মধ্যে দ্বিতীয় বিকল্পটিই বেছে নেওয়া হয়েছিল।

দে’জ পাবলিশিং থেকে অজয়দার (অজয় গুপ্ত) মলাটে তাঁর দ্বিতীয় বই– ‘খাড়াইএর দিকে’ প্রকাশিত হল ১৯৮৮-র মে মাসে। বইটির উৎসর্গের পাতায় লেখা হয়েছিল– ‘সোদরপ্রতিম/ গৌরকিশোর ঘোষ/ অশেষ স্নেহাস্পদেষু’। ১৪টি প্রবন্ধের এই সংকলনের ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন–

‘এই প্রবন্ধগুলি সম্প্রতিকালে লেখা। বিষয় বিভিন্ন, কিন্তু আশা রাখি অনুধ্যায়ী পাঠক-পাঠিকা একটি সাধারণ সূত্র লক্ষ্য করবেন। ইতিহাসের যে খাড়াই ধরে মানুষ চলেছে তার কোনো শেষ আছে কিনা জানা নেই, থাকলেও চোখে পড়ে না। যাঁরা ভেবেচিন্তে স্বেচ্ছায় এই অনুলম্ব যাত্রা বেছে নিয়েছেন তাঁরা আমাদের পথ প্রদর্শক। তাঁরা সকলেই খ্যাতিমান নন, কিন্তু তাঁদের সকলের গঠনেই মাটি এবং জলের চাইতে তেজের অনুপাত বেশি। জড়তা, মূঢ়তা ও ভীরুতার সংক্রাম থেকে মানুষকে রক্ষা করে এই তেজ।

এই পথিকদের সঙ্গে সাধারণ স্ত্রীপুরুষের ব্যবধান কখনো হয়ত প্রায় অনতিক্রম্য ঠেকে। কখনো বা কুয়াশার আড়ালে অন্তহীন পথ আর দেখা যায় না। কখনো এই পথিকরাও পথ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু অদীনসত্ত্ব তাঁদের ব্যক্তিতা, অধৃষ্য তাঁদের প্রত্যয়, অনারত তাঁদের যাত্রা, অনপেক্ষ তাঁদের আরোহণ। আয়েশ-এ তাঁরা অনীহ। তাঁরা মনুষ্য প্রজাতির মনস্বী প্রতিভূ। এঁদের প্রাধিকার যেমন ক্ষমতানির্ভর নয়, এদের ব্যর্থতাও তেমনই নির্বেদসঞ্চারী নয়। এঁদের ট্র্যাজেডিও নভস্পৃক্‌।

অনুলম্ব যাত্রার দিকে পাঠক-পাঠিকাকে আকৃষ্ট করার অভিলাষ এই প্রবন্ধ গ্রন্থনের ধারকসূত্র।…’

শিবনারায়ণ রায়ের প্রাবন্ধিক পরিচয়ে তাঁর কবিতা খানিক আড়ালে চলে গেছে। দে’জ থেকে ১৯৯৯ সালের বইমেলার সময় আমি তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করেছিলাম। উৎসর্গের পাতায় তিনি উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ১০৯ নং সনেট থেকে ছ’-টি পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করে বউদি গীতা রায়-কে ‘প্রিয়তমাসু’ বলে উৎসর্গ করেছিলেন।

গীতা বউদির সঙ্গে শিবদার বিয়ের ঘটনাও কম মজাদার নয়। ‘উন্মূল বেপরোয়া যাযাবরের সঙ্গে’ লেখাটিতে বউদি লিখেছেন– ‘১৯৫১ সালের ১২ মে পারিবারিক অনেক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে আমরা রেজিস্টারি করে বিয়ে করা ঠিক করলাম। আমার বৃদ্ধ বাবা সাতজন্মে শোনেননি বা ভাবেননি তিন আইনের বিয়ে ব্যাপারটা কোনো ব্রাহ্মণ পরিবারে হয়, আমার অন্যান্য দিদিদের বনেদিঘরে হিন্দুমতে বিয়ে হয়েছে। মার আপত্তি, অগুনতি কুটুমসমাজ। বাবার আদরেই আমার এই দশা। একদিকে মা তড়পাচ্ছেন, অন্যদিকে আমার কান্না ও গোঁ দেখে বাবা বেচারা বলছেন “এ বিয়েটা কি তোকে না করলেই নয় মা?” আমি সারা জীবন মুখঝামটা দিয়েছি, আবদার করেছি আমার বাবার কাছে। কাজেই আমি বললাম “তাহলে আমি বিয়েই করব না, একদিন সকালে উঠে আমাকে আর দেখতে পাবে না।” বাবা একবার মা একবার মেয়ে করে করে বেচারা দুর্বল হয়ে গেলেন। লখনউ থেকে ন’জামাইবাবু চলে এলেন গিন্নির হুকুমে “চুলের মুঠি ধরে মেয়েটাকে নিয়ে এসো।” বেশ প্রহসন চলছে– ইতিমধ্যে আমার বড়দিদি ও জামাইবাবু দুজনে চিঠিতে কী যুক্তি করলেন জানি না– একজন ওড়িশায় একজন কলকাতায়– আমাদের ১২ মে এত কাণ্ডের পর তিন আইনের বিয়ে হল। সে বড় মজার বিয়ে, বিয়ে দেখেও আত্মীয়স্বজনের চক্ষু চড়কগাছ। আমাদের যেদিন বিয়ে হয় সেদিন বোম্বে থেকে “র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট” পত্রিকাটিও ওঁর দায়িত্বে কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশ হবে– মানবেন্দ্রনাথ সম্পাদক কিন্তু ম্যানেজিং এডিটর হিসেবে তখন থেকে উনিই সেটা দেখাশোনা করবেন। ১১ মে সারারাত কাগজের জন্যে যা দরকার লেখা, সম্পাদনা ইত্যাদি করে ১২ মে আবার আমাদের স্বর্গীয় বন্ধু যোগেনবাবুর টেম্পল প্রেসে বসে একটু করে প্রুফ দেখেন, হাতে কম্পোজ হয়, আবার দেখেন, করতে করতে সন্ধে– অম্লানদা (অম্লান দত্ত) পাশে গিয়ে নাকি বললেন “রেজিস্ট্রার বোধ হয় এতক্ষণে গীতাদের বাড়ি বসে আছেন, ওঁরা তো কেউ চেনেন না।” “ও তাই তো, চলুন পরে এসে বাদবাকি কাজ করব”, এরকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে উঠলেন। অম্লানদা দেখলেন চটি একদম ছেঁড়া, খুব আস্তে বললেন “ওটা পরে কি গীতাদের বাড়ি যাওয়া উচিত?” তারপর শুনেছি ওঁরা বাটা থেকে চটি কিনে নতুন চটি পরেই উনি সই করতে যান। এখন আমি কোনো কিছু চশমা নাকে দিয়ে না পড়ে সই করি না– তখন ওই কাগজটায় কী লেখা ছিল লজ্জার চোটে আমি পড়িনি, যেখানে সই করতে বলেছে করে দিয়েছি– শুধু ওই কাগজে সই না করলে আমার বাড়ির লোক ওঁর সঙ্গে আমাকে ছাড়বেন না বলে। এরপর রেজিস্ট্রারকে নিয়ে একসঙ্গে খেয়েদেয়ে আবার ৯টা নাগাদ প্রেসে চলে গেলেন এবং ১৩ মে ভোরে ক্লান্ত অথচ উজ্জ্বল মুখ নিয়ে এককপি র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট পত্রিকা হাতে করে নিয়ে এসে আমার হাতে উপহার দিলেন। আমার ননদ বললেন, “হ্যাঁরে, এ কী বিয়ে?” আমরা চোখে চোখে হাসলাম।’

zoom
গীতা রায়-শিবনায়ারণ রায়। ছবিঋণ: অহনা বিশ্বাস

পত্রিকা সম্পাদনার কথা যখন উঠেই গেল তখন ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার কথা বলতেই হয়। মেলবোর্নে ভারতবিদ্যা বিভাগে অধ্যাপনা করতে করতেই তাঁর মনে হয় বাংলা ভাষায় মননশীল প্রবন্ধ ক্রমেই নিম্নগামী হচ্ছে। বাঙালি লেখকেরা গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলি ইংরেজিতেই লিখছেন। অথচ আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না। তাঁর ধারণা হয়েছিল সেসময়– ‘বিভিন্ন খবরের কাগজের দৌলতে এক ধরনের চটজলদি লেখা প্রবন্ধ হিসেবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হতে লাগল– যে যে-বিষয়ে যত কম জানে এবং ফলে সে-বিষয়ে সম্পাদকের ফরমাস মাফিক যত তাড়াতাড়ি লিখতে পারে, তারই তখন প্রাবন্ধিক হিসেবে রবরবা। বিশ শতকের শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদ্যাচর্চার পাঠই যখন প্রায় ওঠবার অবস্থায়, তখন চিন্তাশীল প্রবন্ধ সাহিত্য কেই-বা লিখবে এবং কার জন্যই বা লিখবে।’ তাই তিনি পরিণত বয়সে ফের স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে শুরু করলেন। এমনিতে লিটল ম্যাগাজিন (তাঁর ভাষায় ‘অভিযাত্রা সাহিত্যপত্র’) সম্পর্কে তাঁর ধারণা খুব স্পষ্ট ছিল। একটি প্রবন্ধে তিনি কোন কোন বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে ‘লিটল ম্যাগাজিন’ বলা যাবে না, তার একটি তালিকা করেছিলেন–

‘১। যে পত্রিকার মুখ্য উদ্দেশ্য পত্রিকা থেকে অর্থোপার্জন সেটি লিটল ম্যাগাজিন নয়,

সেটি বাণিজ্যিক পত্রিকা (যদিও সব ব্যবসার মতো সেটিও গণেশ ওলটাতে পারে)।

২। যে পত্রিকা গণমনোরঞ্জনের উদ্দেশে প্রকাশিত (সে উদ্দেশ্য সফল হোক বা না

হোক) সেটি লিটল ম্যাগাজিন নয়।

৩। যে পত্রিকা কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা পরিচালিত তার পাঠক সংখ্যা যত

কমই হোক সেটি লিটল ম্যাগাজিন নয়।

৪। যে পত্রিকা কোনো পেশাদার গোষ্ঠী বা সংগঠনের মুখপত্র সেটি লিটল ম্যাগাজিন

নয়।

৫। বিজ্ঞাপনের আয় এবং/অথবা খ্যাতিমান লেখকদের করুণাসঞ্জাত রচনাদির উপরে

যে পত্রিকার অস্তিত্ব এবং প্রচার নির্ভর করে সেটি লিটল ম্যাগাজিন নয়।’

‘জিজ্ঞাসা’ বাংলা ভাষার এক ধ্রুপদি পত্রিকা। প্রবন্ধের সঙ্গে সঙ্গে ‘জিজ্ঞাসা’য় কবিতা, গল্প, নাটকও প্রকাশিত হয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিখ্যাত গল্প ‘দোজখের ওম’ এই পত্রিকাতেই প্রথম ছাপা হয়েছিল।

শিবদা মেলবোর্ন থেকে ফেরার আগেই এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় বৈশাখ ১৩৮৭ বঙ্গাব্দে। এই পত্রিকা করার সময় তিনি বিভিন্ন শিক্ষিত ও রুচিমান বাঙালিকে পত্রিকার উদ্দেশ্য সম্পর্কে যা লিখে পাঠিয়েছিলেন, তা পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ‘পত্রসূচনা’ নামে ছাপা হয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন–

‘বাংলায় মননশীল মৌলিক এবং পরীক্ষামূলক রচনার নিয়মিত প্রকাশ এই ত্রৈমাসিকের মুখ্য উদ্দেশ্য। আমরা চাই পাঠক-পাঠিকাদের মনের দিগন্ত প্রসারিত হোক, তাঁরা বহির্জগৎ এবং অন্তর্জগৎ সম্পর্কে অধিকতর জিজ্ঞাসু হয়ে উঠুন, তাঁদের বোধবিচারে আরো সুক্ষ্মতা আসুক, মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, সমস্যা ও সম্ভাবনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সূত্রে তাঁদের চেতনা সমৃদ্ধতর হোক, তাঁদের কল্পনা এবং বিবেক, ব্যক্তিগত এবং সমবায়ী উদ্যম সমৃদ্ধতর হয়ে উঠুক মনের উজ্জীবনের সূত্রে ব্যক্তির এবং সমাজের উজ্জীবনের কাজে এই পত্রিকাকে নিষ্ঠার সঙ্গে নিযুক্ত করতে আমরা আগ্রহী।….

শুধু পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বাংলা ভাষাভাষী যে সব ভাবুক, শিল্পী এবং জিজ্ঞাসু আছেন, যাঁরা নানা বিষয়ের এবং শিল্পকলার চর্চায়  নিবিষ্টচিত্ত এবং সমাজের সমৃদ্ধিসাধনে মনস্বীদের দায়িত্ব সম্পর্কে যাঁরা সচেতন, আমাদের উদ্যোগে আমরা তাঁদের আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করব। এই ত্রৈমাসিক কোন দল বা মতবাদের মুখপত্র নয়। এরা পৃষ্ঠায় নানা বিষয়ে নানা ধরনের ভাবনাকল্পনার আদানপ্রদান আমাদের অভীষ্ট। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, প্রাচীন, অর্বাচীন, সমকালীন দুই বাংলা, বাংলার বাইরে যে বিরাট, বিচিত্র, বহুবেধ মানবীয় জগৎ এবং তার উপক্রান্ত ও ভবিষ্য সম্ভবনারাজি– এর যে কোন ক্ষেত্র নিয়েই মৌলিক, পরিচ্ছন্ন এবং প্রশ্নোদ্দীপক রচনা আমাদের কাছে স্বাগত।’

‘জিজ্ঞাসা’ প্রকাশের ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার পর ১৯৯২ সালে প্যাপিরাস থেকে ‘জিজ্ঞাসা সংকলন’ নামে তিনি একটি প্রবন্ধের বই সম্পাদনা করেছিলেন। ‘জিজ্ঞাসা’র ২২ বছরে তিনি দে’জ থেকে ফের একটি সংকলন সম্পাদনা করেন– ‘জিজ্ঞাসার দিগ্‌দিগন্ত/ জিজ্ঞাসা প্রবন্ধ সংকলন/ ১৯৮১-২০০২’। অবশ্য প্যাপিরাসের বইটির প্রবন্ধগুলি এই বইতে রাখা হয়নি। ২৭ মে ২০০৩ সালে আমাকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন–

‘কল্যাণীয়াসু,

৪ঠা জুন বাসা বদল করছি। একই সরকারী আবাসনের মধ্যে একটি বাড়ি পরে দোতলায়।

খাতা বইপত্র প্যাক করা নিয়ে ঝামেলায় আছি। এসব আবার খুলে গুছিয়ে তবে আবার স্থিরচিত্তে গবেষণা এবং লেখার কাজ শুরু করতে পারব। আমার বয়সে সহজ সাধ্য নয়।

“জিজ্ঞাসার দিগদিগন্ত” কতদূর ? এবছর কি পূজোর [য.] আগেই বেরিয়ে যাবে?

আমার গ্রন্থাকারে অসংকলিত কিন্তু খুব সম্প্রতি লেখা এবং বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু প্রবন্ধ সম্পাদন এবং সংকলন করে একটি বই করার অভিলাষ আছে। আমার বই প্রকাশ করে তোমার লাভের আশা যৎকিঞ্চিত। তবু যে তুমি একটির পর একটি আমার প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশ করেছো এতে উৎসাহ বোধ করি। নিজের চিন্তা ছাড়া সংসারকে আর কিছু দেবার সামর্থ্য আমার নেই। নতুন বইটিতে আগ্রহ থাকলে জানিও।… ’

পুজো নয়, শিবদা চিঠি লেখার পরের মাসেই জুন ২০০৩-এ দে’জ থেকে প্রকাশিত হয় ‘‘জিজ্ঞাসার দিগ্‌দিগন্ত/ জিজ্ঞাসা প্রবন্ধ সংকলন/ ১৯৮১-২০০২’। বইটির উৎসর্গের পাতায় লেখা হয়েছিল–

‘যে সব প্রয়াত মনস্বী সহযোগীদের রচনা
বর্তমান সংকলনটিকে বিশেষ করে সমৃদ্ধ করেছে
অন্নদাশঙ্কর রায়
অশীন দাশগুপ্ত
অশোক রুদ্র
আহমদ শরীফ
দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়
নিরঞ্জন ধর
পান্নালাল দাশগুপ্ত
বিমলকৃষ্ণ মতিলাল
ইন্দ্রাণী রায়
মঞ্জুশ্রী চাকী সরকার
মিহিরবিকাশ চক্রবর্তী
তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে এই সংকলন নিবেদিত হল।’

‘জিজ্ঞাসার দিগ্‌দিগন্ত’ প্রকাশের আগে-পরে তাঁর আরও দুটি বই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে– ২০০১ সালের বইমেলায় ‘প্রত্যয়, অন্বেষা ও অনুচিন্তন’ এবং ২০০৪-এর বইমেলায় ‘বাঙালিত্বের খোঁজে এবং অন্যান্য আলোচনা’। ‘প্রত্যয়, অন্বেষা ও অনুচিন্তন’-এর ভূমিকায় তিনি লিখেছেন–

‘আর পাঁচজনের মত আমিও শিশুকাল থেকে জিজ্ঞাসু। আশি বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেখছি আজও আমার মনে প্রশ্ন অন্তহীন।

তবে চল্লিশের দশকে যখন আমার প্রথম তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয় তখন চারপাশের সেই ঘনায়মান অন্ধকারে আমি কয়েকটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম বিগত অর্ধ শতক ধরে যারা আমার জীবনচর্যা এবং ভাবনাচিন্তাকে সংসক্তি দিয়েছে। আমি সম্পূর্ণ সচেতন যে কোনো সিদ্ধান্ত বা ধারণাই প্রশ্নোর্ধ নয়, যে মনকে সর্বদাই প্রশ্নের জন্য উন্মুক্ত রাখা সত্যসন্ধানীর পক্ষে জরুরী। কিন্তু তারই সঙ্গে যুবকালেই এই প্রত্যয়ে পৌঁছেছিলাম যে মনের কতগুলি বৃত্তি বা প্রবণতাকে পূর্বিতা না দিলে এবং যথাসাধ্য পোষণ না করলে, জীবন ক্রমে সঙ্কুচিত এবং শূন্যগর্ভ হয়ে পড়ে। বিস্তারিত তালিকার প্রয়োজন দেখি না, কিন্তু স্বাধীনতা এবং যুক্তিশীলতা, কল্পনা এবং সৃজনীবৃত্তি, সততা এবং সহযোগ, ন্যায়পরায়ণতা এবং প্রেম– ব্যক্তি এবং সমাজের বিকাশের জন্য জীবনে এদের প্রতিষ্ঠা যে অনপনেয় শর্ত, এ বিষয়ে তখনো আমার মনে সংশয় ছিল না, পঞ্চভূতে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি পর্বেও কোনো সংশয় বোধ করি না।…’

অজয়দার প্রচ্ছদে প্রকাশিত ‘প্রত্যয়, অন্বেষা ও অনুচিন্তন’-এ বেশ কয়েকটি প্রবন্ধের সঙ্গে তাঁর জার্নাল থেকেও কয়েকটি গদ্য ছাপা হয়েছিল। আর, ‘বাঙালিত্বের খোঁজে এবং অন্যান্য আলোচনা’ বইটিতে প্রবন্ধের সঙ্গে আছে শিবনারায়ণ রায়ের চারটি সাক্ষাৎকার। তার মধ্যে একটি সাক্ষাৎকার– ‘সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতি’– ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকার জন্য দেবেশদার নেওয়া। সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার সময় মঞ্জুশ্রী চাকী সরকারও ছিলেন। কিন্তু একেবারে শেষে থাকা তাঁর বক্তব্য, লেখক এই বইতে রাখেননি।

গৌরদার কথা দিয়ে শিবনারায়ণ রায়ের কথা লিখতে শুরু করেছিলাম, গৌরদার কথাতেই শেষ করি।

বন্ধু সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন– ‘আমাদের র‍্যাডিক্যাল দলের বন্ধুদের অনেকেই শিবদাকে বলেছেন, দাম্ভিক। বাইরেও তাঁর এই অখ্যাতি। ওঁকে অনেকে ভয়ও করতেন। সমীহও করতেন। কিন্তু আমি কি ওঁকে ভয় করতাম? সমীহ করতাম? ঠিক মনে করতে পারিনে। আমি ওঁকে পেয়েছি, প্রায় সেই প্রথম দিন থেকেই, এক স্নেহময় বন্ধু হিসেবে। যাজ্ঞবল্ক্যের সঙ্গে শিবনারায়ণের সম্ভবত এক জায়গায় মিল ছিল। উভয়েই ছিলেন তার্কিক। এবং দুজনেই তর্কে পরাস্ত হতে জানতেন না। এই আত্মবিশ্বাস শিবনারায়ণেতেও আমি দেখেছি। এটা হয়তো অনেকে দাম্ভিকতা বলে ধরে নিত।… এত জ্ঞান যে মানুষের থাকে, তাঁকে তো আমরা গজদন্তমিনার-নিবাসী বলেই জানি। কিন্তু শিবনারায়ণ গজদন্তমিনারবিহারী নন, তিনি আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ। পরদুঃখে কাতর, পরিবারাশ্রয়ী, পত্নীপ্রেমী, সন্তান ও বন্ধুবৎসল। শিবনারায়ণ তত্ত্বগতভাবে মানবপ্রেমী নন, তিনি সদর্থে সর্বার্থেই মানবপ্রেমী।’

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম

college street Gour Kishore Ghosh Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sibnarayan Ray ইতি কলেজ স্ট্রিট শিবনারায়ণ রায়

Share this article on