publication of essays and stories by ritwik ghatak | Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

২০০৫ সালে দে’জ পাবলিশিং থেকে বিশিষ্ট গদ্যকার এবং চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ঋত্বিকের প্রায় যাবতীয় গদ্যরচনা ও সাক্ষাৎকার একত্রে ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ নামে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন চন্দন গোস্বামীর মতো বেশ কয়েকজন ঋত্বিক-অনুরাগী মানুষ। ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’র কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন বিশিষ্ট গ্রন্থ-সম্পাদক তরুণ পাইনও। সুবিমল লাহিড়ী বইটির প্রুফ দেখে দিয়েছিলেন।

Published by: Robbar Digital

Posted:November 29, 2025 8:23 pm | Updated:November 29, 2025 8:23 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৫৭.

বাংলা ভাষার যে কোনও প্রকাশকের মতোই সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের লেখা বা তাঁদের কাজ নিয়ে দে’জ থেকে বই করার ইচ্ছে আমার বহুকালের। এমনিতে সিনেমার বই আমাদের কম নেই, অনেক দিন ধরেই আমি সিনেমার নানা দিক নিয়ে বই করে আসছি। সে-প্রসঙ্গে পরে বিস্তারে যাওয়া যাবে। কিন্তু সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণালের প্রতি বাঙালি পাঠকের যে-বাড়তি আগ্রহ আছে তা আমি সাতের দশক থেকেই বুঝি। কিন্তু আগে সত্যজিৎ রায়ের বাংলা বই প্রায় সবই আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হত। ফলে আমি তাঁর লেখা বই ছাপার সুযোগ পাইনি। পরে অবশ্য অপু দু’-একটি বই করতে পেরেছে এবং আগামী দিনেও দে’জ থেকে সত্যজিৎ-সংক্রান্ত বেশ কিছু বই প্রকাশিত হবে। মৃণাল সেনের বইও আমি করেছি– সেও অনেক পরের কথা। কিন্তু সবার আগে আমি সুযোগ পেয়েছিলাম ঋত্বিক ঘটকের বই করার। 

zoom
ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক আবার সম্পর্কে মহাশ্বেতাদির কাকা– মণীশ ঘটকের ভাই। মহাশ্বেতাদি ‘তুতুল’ বইতে লিখেছেন–

‘তুতুলের ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে যে ছোট, সেই ঋত্বিক ঘটক চিত্রপরিচালক হিসেবে খুব পরিচিত। তুতুল সবচেয়ে বড় ভাই, জন্মালেন ১৯০২ সালে। ঋত্বিক আর প্রতীতি যমজ ভাই-বোন জন্মাল ১৯২৫ সালের নভেম্বরে। আমি ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। জন্মালাম ১৯২৬ সালের জানুয়ারিতে। ঋত্বিক বা প্রতীতিকে ‘কাকা’ বা ‘পিসি’ বলার কথাই ওঠে না। চিরকাল ‘ভবা’ আর ‘ভবী’ বলেছি। যেহেতু আমার মায়ের কাছে অনেক থাকত ওরা। আমরা অনেকদিন অবধি জানতাম ওরা আর আমি ভাইবোনই নিশ্চয়।’ 

ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে আমার কখনও সরাসরি পরিচয় হয়নি। কিন্তু ঋত্বিকের স্ত্রী সুরমা ঘটকের সঙ্গে আমার পরিচয় বহুকালের। সুরমা বউদি যতদিন জীবিত ছিলেন, সেই সম্পর্ক অটুট ছিল। তাঁদের দুই অকাল প্রয়াত মেয়ের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক ছিল। ছেলে ঋতবানের সঙ্গেও আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ইদানীং ঋতবান অসুস্থ হয়ে পিজি হাসপাতালে ভরতি হয়ে আছেন– তাঁর সঙ্গে এখনও আমার টেলিফোনে যোগাযোগ আছে। ঋত্বিক-সুরমার মেয়ে সংহিতা ঘটকের একটি বইও আমি প্রকাশ করেছি ২০১২-র বইমেলায়– ‘ঋত্বিক এক নদীর নাম’।

zoom
ঋত্বিক ও সুরমা ঘটক

সুরমা বউদির সঙ্গে আমার আলাপটা সুবীরদার (সুবীর ভট্টাচার্য) মাধ্যমে হয়েছিল। সেটাও ঋত্বিকের প্রয়াণের বেশ কিছুদিন পরে। দে’জের বই সম্পাদনার কাজে যুক্ত হওয়ার আগে সুবীরদা আশা প্রকাশনীর হয়ে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন। আশা প্রকাশনী থেকে বেরনো বইয়ে প্রকাশক হিসেবে শীলা ভট্টাচার্যের নাম ছাপা হলেও, কার্যত প্রকাশনাটা ছিল শংকর ভট্টাচার্যের। কিন্তু আশা প্রকাশনী বেশিদিন চলেনি। সেই আশা প্রকাশনী থেকেই ১৯৭৭-এর মহালয়ার দিন প্রকাশিত হয় সুরমা ঘটকের বই– ‘ঋত্বিক’। আমি যতদূর জানি, এই বইটির হয়ে ওঠায় শঙ্খ ঘোষ, অরুণ সেন, অজয় গুপ্ত-সহ অনেক মানুষের সহযোগ আছে। তবে আশা প্রকাশনীর তরফে নিঃসন্দেহে সুবীরদার একটা বাড়তি ভূমিকা ছিল। ‘ঋত্বিক’ বইটির প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় সুরমা ঘটক লিখেছিলেন⎯ 

“১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে আমার শিলং জেলের ডায়েরি থেকে চোর, খুনী, পাগলী ও গণিকা মেয়েদের কথা লিপিবদ্ধ করছিলাম। তখন একদিন সিরাজ আমাকে বার বার বলেছিল, ‘বৌদি, ঋত্বিকদা সম্বন্ধে লিখুন।’ আমি বলেছিলাম লিখব পরে।

ছোটোবেলা থেকেই আমার সমস্ত কাগজপত্র গুছিয়ে রাখা অভ্যেস। আমার বাবারও রাখতাম। গত একুশ বছরের প্রায় প্রতিটি চিঠি ও কাগজপত্র আমার কাছে আছে। ভেবেছিলাম পরে একদিন এই সব-কিছুর ভিত্তিতে গুছিয়ে লিখব। তখন কি জানতাম এত তাড়াতাড়ি লিখবার সময় আসবে? আর যাঁর মনে প্রথম থেকেই খুব ইচ্ছে ছিল আমি লিখি, তাঁর সম্বন্ধে লিখেই আমার জীবনে প্রথম লেখা প্রকাশ হবে, কোনোদিনও ভাবিনি।

১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে ‘চিত্রবীক্ষণে’র প্রতিনিধিরা সাঁইথিয়া গিয়েছিলেন। তখন ‘চিত্রবীক্ষণ’ ঋত্বিক সংখ্যার জন্য আমার যা যা দেওয়া সম্ভব সবই দিয়েছিলাম।… এরপর ওদের বিশেষ অনুরোধে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আমার স্মৃতিচারণাটি লিখেছিলাম। একটি প্রবন্ধের মধ্যে এর বেশি লেখা সম্ভব নয়। ভেবেছিলাম পরে একদিন বিস্তৃতভাবে লিখব।

অকস্মাৎ গত বছর গ্রীষ্মের ছুটির শেষে ‘আশা প্রকাশনী’র তরফ থেকে বিস্তৃতভাবে লেখার অনুরোধ বিশেষভাবে এলো। এত তাড়াতাড়ি লেখার কথা আমি তখনো ভাবিনি। কিন্তু বিশেষ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত তাঁদের কথা দিলাম। সুবীরবাবুর [সুবীর ভট্টাচার্য] চিঠি পেলাম: ‘আপনি কথা দেওয়ার জন্য আমরা সম্মানিত বোধ করছি।’”  

তবে আমার সঙ্গে যখন সুরমা বউদির আলাপ ততদিনে তিনি সাঁইথিয়া ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছেন। সেই সময় থেকেই তিনি অহীন্দ্র মঞ্চের পাশে চেতলার সি আই টি হাউসিং কমপ্লেক্সে থাকতেন। ১৯৭৬-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ঋত্বিকের অকালমৃত্যুর পরে তিনি সাঁইথিয়ার চাকরি ছেড়ে শিয়ালদার কাছে টাকী গার্লস (পুরো নামটা অবশ্য টাকী হাউস গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড গার্লস হাই স্কুল) স্কুলে পড়াতেন। 

১৪ মার্চ ১৯৮৩ সালে সুরমা ঘটক আমাকে একটি চিঠি লেখেন। তার আগে সম্ভবত টেলিফোনে আমাদের কথা হয়েছিল। সেই চিঠিতে সুরমা বউদি লিখছেন– 

“…সুধাংশুবাবু, এবার বইমেলার বেশ কিছুদিন আগে আশা প্রকাশনীর শঙ্কর ভট্টাচার্য ঋত্বিক বইটির স্বত্ত [য.] ছেড়ে দিয়েছেন লিখিত ভাবে। আমি তখন আপনার কাছে যাইনি, কারণ বইমেলার জন্য ব্যস্ত থাকবেন। এরপরে আমিই কিছুটা ব্যস্ত ছিলাম।

আমি শঙ্কর ভট্টাচার্যের চিঠিটা নিয়ে কবে আপনার কাছে যাব জানাবেন। সোম থেকে শুক্র আমার স্কুল থাকে। বাবার ‘দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে মন্দিরে’র পাণ্ডুলিপিও নিয়ে যাব।

সাক্ষাতেই সব কথাবার্তা হবে। ‘ঋত্বিক রচনাবলী’ ‘ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ই বের করবে। আমি অনেক গল্প খুঁজে পেয়েছি, আরো সংগ্রহ করছি।

আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে আপনার সঙ্গে দেখা করব। আপনি সেই অনুযায়ী সময় দেবেন।…”

চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে আমি তাঁকে দে’জ থেকে ঋত্বিকের রচনাবলি প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সে-কাজটা তাঁরা ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকেই করবেন বলে স্থির করেছিলেন। তবে সুরমা বউদির ‘ঋত্বিক’ বইটা আমি তখন করে উঠতে পারিনি। অনেক পরে সে-বই অনুষ্টুপ থেকে নতুন করে প্রকাশিত হয়। চিঠিতে তাঁর বাবার লেখা ‘দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে মন্দিরে’ বইটিও সেসময় দে’জ থেকে প্রকাশ করা যায়নি। সম্ভবত এই বইটি পরে এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স থেকে বেরিয়েছিল। সুরমা বউদির বাবা কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্য এক সময় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের শিলং শাখার সম্পাদক ছিলেন। তিনি কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’-র গদ্য অনুবাদ করেছিলেন। সে-বইতে মূল ও অনুবাদ দুই-ই ছাপা হয়েছিল। তাঁর আরেকটি বই হল ‘সংক্ষিপ্ত বৈষ্ণব অভিধান’। এছাড়া তাঁর অন্যান্য লেখালিখিও আছে। তবে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্টও শেষপর্যন্ত ঋত্বিক রচনাবলি প্রকাশ করতে পারেনি। এমনকী অপু একবার উদ্যোগী হয়ে ঋত্বিকের যাবতীয় চিত্রনাট্যের সংগ্রহ প্রকাশ করতে চেয়েছিল– কিন্তু সে-কাজও নানান জটিলতায় করা যায়নি। অবশ্য ২০০৬-এর বইমেলায় ঋত্বিক ঘটকের অসমাপ্ত ছবি– ‘বগলার বঙ্গদর্শন’-এর চিত্রনাট্যটি দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। 

সুরমা বউদি বা তাঁর বাবা কুমুদরঞ্জন ভট্টাচার্যের বই না করতে পারলেও পরে কিন্তু আমি দে’জ থেকে ঋত্বিক ঘটকের কয়েকটি বই করেছি। দে’জ পাবলিশিং থেকে ঋত্বিকের প্রথম বই– ‘ঋত্বিক ঘটকের গল্প’ হিরণ মিত্রের প্রচ্ছদে ২০০০ সালের বইমেলার সময় প্রকাশিত হয়। এর আগে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে ১৯৮৭ সালে ঋত্বিক ঘটকের জন্মদিনে (নভেম্বর মাসের ৪ তারিখ) প্রকাশিত হয়েছিল পনেরোটি গল্পের একটি সংকলন। সে-বইয়ের প্রচ্ছদ ছিল শিল্পী মীরা মুখোপাধ্যায়ের। বইটি ডিজাইন করেছিলেন সোমনাথ ঘোষ। প্রতিটি গল্পের শুরুতে একটি করে ছবি ছিল। তার মধ্যে একটি ছবি ছিল ঋত্বিকেরই আঁকা। তাছাড়াও কমলকুমার মজুমদার, খালেদ চৌধুরী, কে. জি. সুব্রহ্মণ্যন, চিত্তপ্রসাদ, শ্যামল দত্তরায়, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ, গণেশ পাইন, গণেশ হালুই, সোমনাথ হোর, পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়, মৃণাল দাস, অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়– তেরোজনের আঁকা চোদ্দোটি ছবি ছিল। এই গল্প সংকলনে প্রয়াত শিল্পীদের কাজগুলি বাদ দিলে, নতুন ছবিগুলি শিল্পীরা নিজেরা বেছে নিয়ে ইলাসট্রেশন না করে, ঋত্বিকের গল্প পড়ে নিজেদের মতো করে ছবি এঁকেছিলেন। কিন্তু দে’জ সংস্করণ ‘ঋত্বিক ঘটকের গল্প’ বইটিতে আমরা মূলত ছবির স্বত্বগত কারণে ট্রাস্টের বইয়ের ছবিগুলি ব্যবহার করতে পারিনি। কিন্তু আগেরবারের পনেরোটি গল্প থেকে দে’জ সংস্করণে দুটি গল্প বেড়ে গল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় সতেরোয়।

বইটির ভূমিকায় গোপাল হালদার লিখেছিলেন– 

“প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেল– শেষ হয়ে যাচ্ছিল বাঙালি জীবনের মূল্যমান, পিতার স্নেহ, মাতার মমতা, সংসারের সকলের সঙ্গে সকলের বন্ধন– য়ুরোপীয়দের মহাযুদ্ধের বলি হচ্ছিল বাঙলাদেশ, ভারতবর্ষ। মন্বন্তর, মহামারী, মৃত্যুর বিরুদ্ধে কতটুকু প্রতিরোধ রচনা করতে পেরেছিল মানুষ? তবু চেষ্টা করেছিল, কিছু প্রাণ-যন্ত্রণায় অস্থির তরুণ-তরুণী দাঁড়িয়ে উঠেছিল, নানা ছোট বড় সংগঠন গড়েছিল এই শপথ ঘোষণা করে ‘আমরা মরব না মরতে দেব না আমাদের ভাই বোনদের’। ঘোষণা করেছিল তাদের গানের দল পথে ঘাটে ট্রামে বাসে; ঘোষণা করেছিল কবিরা কবিতায়, সাহিত্যিকরা গল্পে উপন্যাসে, সম্মিলিত সাহিত্য সংস্কৃতির আয়োজনে; মাঠের সভায়, পথের মিছিলে, নাট্যমঞ্চের নাটকে, নৃত্যতে।

এদের মধ্যে এসেছিল সেদিনকার অক্লান্ত জীবনশিল্পী ঋত্বিক ঘটক– ধূমকেতুর মতো উজ্জ্বল যার উদয় আর নাতিদীর্ঘ জীবনের সেরূপ অবসান– তবু চলচ্চিত্রের জগৎ সে উদ্ভাসিত করে গিয়েছে তারই মধ্যে। ঋত্বিকের পরিচয়টাই উজ্জ্বলতম ছটায় এখনকার মানুষের প্রাণকে করে তোলে সরসিত ও সঞ্জীবিত। কিন্তু তখনকার আমাদের কাছে ঋত্বিকের অন্য পরিচয়ও ছিল নতুন নতুন প্রতিশ্রুতিতে স্ফুটনোন্মুখ কবিতায়, ছোটগল্পে, নাটকে আর কত কাজে, তখনই সে দীপ্যমান– জীবন্ত, অক্লান্ত শিল্পশক্তি শিরায় শিরায় তার উত্তরাধিকার সূত্রে। সে না জানুক তখনও এই প্রতিভাবান পরিবার আমার পরিচিত। ঋত্বিক যখন চল্লিশের মহামানবিক আহ্বানে সব ছেড়ে এসে তখনকার বাঙালির প্রগতিশীল আয়োজনের সঙ্গে দাঁড়াল আমি তাই আশায় উল্লসিত হয়েছিলাম।… অনেকদিন পরে আজ ঋত্বিকের গল্প হাতে পেয়ে তাই বহু কথা মনে পড়ল– অশান্ত ঋত্বিকের সেই প্রথম আয়োজন অশান্ত সেই যুগের খণ্ডে খণ্ডে চিত্ররচনার উৎসাহ। মনে পড়ল সে কাল, সে উদ্যম উদ্যোগ, আমার ছিয়াশি বৎসরের চোখে আজ ঝাপসা, আর মনে পড়ল সে ঋত্বিককে যে সেকালকে হারিয়ে যেতে দেয়নি ধরে রাখতে চেয়েছে। এই গল্পগুলি তারই সাক্ষ্য।…”

ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক কারণেই তাঁর আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ও কিছু স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি নিয়ে হয়। গত শতাব্দীর চারের দশকে বাংলার মানুষ এক ভয়াবহ সময় কাটিয়েছে। মন্বন্তর, দাঙ্গার দিন পেরিয়ে দেশটা দু’-টুকরো করে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম। দেশভাগের যন্ত্রণা ঋত্বিক ঘটক কোনওদিন ভুলতে পারেননি। তাঁর ছবিগুলির মূল থিমও দেশ খুইয়ে বসা মানুষের জীবনযন্ত্রণা। ‘কিছু খণ্ড চিন্তা: কিংবা কিছু উপলব্ধি’ নামে একটি লেখায় ঋত্বিকের চিন্তার একটা ধরতাই পাওয়া যায়– 

“আমার দিন কাটিয়াছে পদ্মার ধারে, একটি দুঁদে ছেলের দিন। গহনার নৌকার মানুষদের দেখিয়াছি, যেন অন্য গ্রহের বাসিন্দা। মহাজনী হাজার-দু’হাজার মণি ভাড়া করিয়া পাটনা-বাঁকিপুর-মুঙ্গের অঞ্চলের মাল্লারা পার হইয়া যাইত, একজাতীয় ভাঙা দেহাতি আর পদ্মাপারী বাংলার টান মাখানো কথা বলিয়া। জেলেদের দেখিয়াছি, ইলশাগুঁড়ির প্রথম বর্ষায় বেজায় খুশি হইয়া বেসুরা টান মারিত, জলমাখানো হাওয়াতে দমকায় দমকায় ভাসিয়া আসিত কেমন অস্পষ্ট মন-কেমন-করা পাগল সুর। স্টিমারে শুইয়া রাত্রে দোল খাইয়াছি মাতাল নদীর দাপটে, আর শুনিয়াছি এঞ্জিনের ধস্ ধস্, সারেঙের ঘন্টি, খালাসির বাঁও-না-মেলা আর্তনাদ।

পদ্মায় শরতে নৌকা লইয়া পালাইতে গিয়া একবার ঢুকিয়া আর বাহির হইতে পারি না– তিনমাথা সমান উঁচু কাশবন হইয়াছে কাতলামারির চরটার কাছে, ভীষণ সাপ থাকে ওখানে। নৌকা দুলাইয়া দুলাইয়া চেষ্টা করিতে যাইয়া সেই ডাকাতিয়া কাশের ঝোপের সাদা রেণু উড়িয়া উড়িয়া দেহমন আচ্ছন্ন করিয়া নিশ্বাস প্রায় আটকাইয়া দিয়াছিল। কাশগুলি পাকা ছিল। একবার ‘সিন্ধু-গৌরবের’ রাজা জাহিরের পার্টের জন্য হায়ার (hired) হইয়া গিয়া ট্রেন ফেল করিয়া সন্ধেবেলা পৌঁছিয়াছি অপরিচিত রেলস্টেশনের লাইনের লাল আলোয় রহস্যময় পাড়াগাঁয়ে। সামনের হাওড়বিল ডাকসাইটে ভূতের জায়গা, কোজাগরীর আগের রাত্রে সেই আবছা বিলে দুই বন্ধু মিলিয়া সারারাত লগি ঠেলিয়াছি, দিগন্তলীন বিলে মাঝে মাঝে জাগিয়া আছে দ্বীপের মতো গ্রাম। নীহার পড়িতেছে, কাঁপিতেছি, শেষে বোঝা গেল, আমাদের ধন্দ লাগিয়াছে। দু-ঘণ্টার পথ সারারাত্রে পার হইতে পারিতেছি না, পাঁক খাইতেছি। সেই শেষ রাত্রে দাঁতে দাঁত লাগা হিমে সে এক অদ্ভুত হতাশার অনুভূতি।…

মা-বাবা-দাদা-দিদি, অনেক মানুষ। হৈ হৈ করিয়া বহুজনা মিলিয়া ভাতখাওয়া, দুগ্‌গাপূজা, মুসলমান চাষিদের সেই বাঁ-পায়ে পিতলের মল পরিয়া শারি গান, ডানপিটা সব বন্ধু। মারপিট। আম-লিচু-ডাব চুরি। পড়িয়া পা ভাঙিয়া যাওয়া, ধরা পড়িয়া মার খাওয়া। বাড়ির দেওয়ালে নোনা ধরিয়া কত দাগ। কত শব্দ, ছবি, কত মন।

একটা জীবনপ্রণালী, মানুষের এক বিচিত্র প্রবাহ। আর নাই। যদি থাকিত।… দাঁড়াইতে পারিতাম তাহার উপরে, বলিতে পারিতাম কিছু। এমনভাবে সব-কিছুকে বিকৃত মন লইয়া দেখিতাম না। ভবিষ্যৎকে এত ভয় করিতাম না, দেশের এবং মানুষের ভবিষ্যৎকে।

এগুলা প্রাণময়, এগুলা উদ্দাম। কিন্তু এই তো আমার আছে। আমি যদি লিখিতে পারিতাম, কবি হইতাম, চিত্রকর হইতাম, হয়তো এগুলা হইতে জারাইয়া লইয়া বাড়িতে পারিতাম। কিন্তু আমি যে ছবি তুলি। আমার মতো আর কেউ হারায় নাই। যাহা দেখিয়াছি, তাহা দেখাইতে পারিতেছি না।” 

দেশভাগের এই যন্ত্রণা থেকে ঋত্বিক আজীবন মুক্তি পাননি। ‘বিড়ম্বিত কালে’ জন্মানোর মাশুল দিয়েছেন সংবেদনশীল মানুষটি। প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ সময়ে মুক্তি না পেলেও, তারপর আরও সাতটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি মুক্তি পেয়েছে– ‘মেঘে ঢাকা তারা’ খানিকটা বাণিজ্যসফলও হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে তাঁর ছবি আর আর্থিক সাফল্যের মুখ দেখেনি বললেই চলে। ব্যক্তিগত জীবনের ছন্দও নড়ে গিয়েছিল। তাঁর নিজের শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’কে অনেকে আত্মজৈবনিক ছবিও বলে থাকেন। সে-ছবিতে ঋত্বিক নিজের অন্তরাত্মাকে খুলে দেখিয়েছেন। শঙ্খদা (শঙ্খ ঘোষ) ‘ইশারা অবিরত’ বইয়ের ‘চলচ্চিত্র আর কবিতা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন– “‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’-র সূচনাংশে নীলকণ্ঠকে একবার দেখানো হচ্ছিল বিকৃত একটা চেহারায়। ক্যামেরাকে এমন একটা কোণ থেকে ধরা হয়েছিল যে মানুষটাকে মনে হচ্ছিল বেঢপ, ভাঙাচোরা, যেন ভুল জায়গা থেকে দেখছি তাকে। অথচ, তার ভিতরটাকে দেখতে চাইলে, গোটা ছবির ভেতরটাকে দেখতে চাইলে, সেইটেই ছিল তাকে ঠিক জায়গা থেকে দেখা। এই ধরনের শট কমই আসে বাংলা ফিল্মে। ‘যুক্তি তক্কো’-তেও যে তা মুহুর্মুহু আছে এমন নয়। কিন্তু এইসব ভাঙচুরই হয়তো কবিতার সত্যের দিকে আমাদের নিয়ে যেতে পারে অনেক বেশি।” ঋত্বিকের নিকট বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন বাংলার আর এক দামাল প্রতিভা শক্তিদাও (শক্তি চট্টোপাধ্যায়)। ঋত্বিককে নিয়ে লেখা তাঁর এলিজি (‘কিছু মায়া রয়ে গেলো’ বইতে সংকলিত) থেকেও বাংলা সিনেমার ‘আঁফা তেরিবল’ ঋত্বিককে অনেকটা চেনা যায়– 

‘মৃত্যুর ভিতরে তবে পরিত্রাণ ছিলো!
বেঁচে-বত্‌তে থাকা নিয়ে বিড়ম্বিত ছিলে আজীবন।
আলোকস্তম্ভের মতো আলো দিয়ে দেখাতে তীরের
কতো কাছাকাছি আছো, পদতলে ডুবন্ত পাহাড়–
সুতরাং, সাবধান! যাত্রী ও তরণী সম্‌ঝে বাও।
বামে বা দক্ষিণে যাও,
সমঝে বাও, সর্বনাশ আছে!
কী সর্বনাশিনী বিষ পান ক’রে মধুক্ষরণের
মতো প্রেম দিয়ে গেলে ভুল বাংলাদেশে–
অবিস্মরণীয় প্রেম দিয়ে গেলে ভুল বাংলাদেশে!’ 

২০০৫ সালে দে’জ পাবলিশিং থেকে বিশিষ্ট গদ্যকার এবং চলচ্চিত্রবিদ্যার অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ঋত্বিকের প্রায় যাবতীয় গদ্যরচনা ও সাক্ষাৎকার একত্রে ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ নামে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের কাজে যুক্ত ছিলেন চন্দন গোস্বামীর মতো বেশ কয়েকজন ঋত্বিক-অনুরাগী মানুষ। ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’র কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন বিশিষ্ট গ্রন্থ-সম্পাদক তরুণ পাইনও। সুবিমল লাহিড়ী বইটির প্রুফ দেখে দিয়েছিলেন। তরুণদা, সুবিমলদার কথা পরে আবার বলব। আপাতত ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ বইটির কথা বলি। ‘ঋত্বিক ঘটকের গল্প’ এবং ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরও কিছু’ বইদু’টি প্রকাশ করে আমার ঋত্বিক রচনাবলি করার পুরনো ইচ্ছের অনেকটাই কিন্তু মিটে গেছে। কেননা এর বাইরে ঋত্বিকের নাটক ছাড়া খুব বেশি লেখা থাকার কথা নয়। ঋত্বিক ঘটকের নাটকের সংগ্রহ প্রকাশ করেছিল পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি– কিন্তু সে-বইও বেশ কিছুদিন হল বাজারে অলভ্য।

‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ বইটির ভূমিকায় সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় লিখেছেন–

“ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র বিষয়ক সমালোচনা ও প্রতিবেদনগুলির একত্র সন্নিবেশ ছিল জরুরি। ঋত্বিকের নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও ছোটো লেখাগুলি অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে নানা কৃশতনু ও অবহেলিত পত্রপত্রিকায়। এক সময় ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ নামের একটি ছোটো সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। দুঃখের বিষয় তা খুব যত্নে মুদ্রিত ছিল না আর দীর্ঘদিন তা জনচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে।

এই বইতে রচনাগুলিকে সাজানোর সময় আমাদের প্রতি মুহূর্তেই মনে হয়েছে সব শব্দ সমাবেশ খুলে ধরছে এক বিপ্লবের দরজা, তারা যেন ঋত্বিকের চলচ্চিত্রের সঙ্গেই হাত ধরাধরি করে আছে। তত্ত্বায়নের ক্ষেত্রেও ঋত্বিক ছিলেন এক পথ-প্রদর্শক সুতরাং আমরা নিশ্চিত যে এই লেখাগুলি নেহাত সিনেমার পাদটীকা নয়।… চলচ্চিত্রবিদ্যার ছাত্র হিসেবে আমি শ্রদ্ধায় নত হয়ে পড়ি কেননা অব্যর্থভাবে প্রমাণিত হয় ঋত্বিক চলচ্চিত্রকে শুধু শিল্পকর্ম বিবেচনা করেন না। ইতিহাসের পরিসরে তার আখ্যানকর্ম একটি প্রশ্ন-সাম্প্রতিকের অবতারণাও করে।… তিনি ভ্রষ্টস্মৃতি স্ব-সমাজকে ফিরিয়ে দিতে চান সক্রিয় স্মরণের অধিকার।…” 

zoom
সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটক

রামকিঙ্কর বেইজের একটি ছবি অবলম্বন করে বইটির প্রচ্ছদ করা হয়েছিল। ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ বইটি প্রকাশের পরে পাঠকমহলে যথেষ্ট সাড়া পড়ে যায়। দু’-মলাটের মধ্যে ঋত্বিকের এতগুলো লেখা এর আগে কখনও আসেনি। তবে এ-কাজটিও সুরমা বউদি এবং ঋতবান ঘটকের সাগ্রহ অনুমোদন ছাড়া করা সম্ভব হত না। 

অনেক সময় সংস্কৃতিজগতে আমরা নানা শিবির দেখি– কিন্তু এই বিভাজন আসলে ভীষণ অসার। আমি লোকমুখে শুনেছি সত্যজিৎ আর ঋত্বিকের অনুরাগী শিবিরের কথা। কিন্তু ‘চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু’ বইয়ের ‘একমাত্র সত্যজিৎ রায়’ প্রবন্ধে ঋত্বিক যা লিখেছেন তাতে এই শিবির বিভাজন কতটা হাস্যকর তা বোঝা যায়। ঋত্বিক লিখেছেন– 

“[‘পথের পাঁচালী’ ছবিটি দেখলাম] একবার নয়, পর পর সাতবার। অবাক হয়ে গেলাম, আমার সন্দেহ একেবারে অলীক প্রমাণিত হল। এখানে-ওখানে নানারকম আপত্তি থাকলেও সবমিলিয়ে অপু-দুর্গা একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠল, আমার সামনে ফুটে দাঁড়াল। মনে আছে তখন বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বার বার একটা কথাই বলেছিলাম যে ‘পথের পাঁচালী’তে এমন কিছু নেই যা আমরা হাজার বার ভাবিনি এবং স্বপ্ন দেখিনি। ‘পথের পাঁচালী’ ছবির চিন্তার দিক থেকে বা রচনাশৈলীর দিক থেকে এমন কিছুই আনেনি আমার কাছে, যা আমি হাজার বার কল্পনাই করেছি, স্বপ্নই দেখেছি, উনি সেটা গুছিয়ে-গাছিয়ে খেটে তৈরি করে ফেলেছেন।

zoom
সত্যজিৎ ও ঋত্বিক। নিমাই ঘোষের তোলা ছবি।

মারাত্মক এবং প্রচণ্ড বৈপ্লবিক তফাত। যে তফাত ওঁকে আমাদের নবযুগের স্রষ্টার আসনে বসিয়ে দিল, যে আসন থেকে তাঁকে সরাতে কোনোদিনই কেউ পারবে না।” 

আবার, ১৯৭৬-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরলা মেমোরিয়াল হলে ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া আয়োজিত ঋত্বিকের স্মরণসভায় গিয়ে সত্যজিৎ বলেছিলেন– ‘ঋত্বিক মনেপ্রাণে বাঙালি পরিচালক ছিল, বাঙালি শিল্পী ছিল– আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি। আমার কাছে সেইটে তাঁর সবচেয়ে বড়ো পরিচয় এবং সেইটেই তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান ও লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য।’

গণনাট্য সংঘের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের যোগের কথা আগেই বলেছি, তবে এই গণনাট্যেই তিনি পরিচিত হন বাংলা তথা ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যশিল্পী বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে। ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বিজন ভট্টাচার্য আর মহাশ্বেতা দেবীর বিয়ের পর তাঁরা নিকটাত্মীয়ও হয়ে পড়েন। বিজন ভট্টাচার্য আর ঋত্বিকের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ।

zoom
বিজন ভট্টাচার্য

বিজন ভট্টাচার্য ঋত্বিকের মৃত্যুর পর লিখেছিলেন– 

‘…প্রচণ্ড এই প্রতিক্রিয়াশীলতার মাঝখানে ঋত্বিকের ছবিতে কিন্তু কোনো অবক্ষয়ের নজির নেই। শ্মশানের মাঝখানে বসে কাপালিক ঋত্বিককে কি আমরা আবিষ্কার করতে পেরেছি?
ঋত্বিক খেলো মদ আর বিষক্রিয়া হল আমাদের। এখনও প্রলাপ। শত আলাপ। মাঝখানে হঠাৎ একদিন চেয়ে দেখি করোটি ও কারণ নিয়ে ঋত্বিক আর শবাসনে বসে নেই।
শ্মশান ছেড়ে পালিয়েছে কাপালিক।’

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম 

Bijan Bhattacharya Mahasweta Devi Meghe dhaka tara partition Ritwik Ghatak Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray Surama Ghatak

Share this article on